বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

প্যারিস শান্তি চুক্তি: ১৯৭৩ সালে কেন ভিয়েতনাম ছেড়ে গেল মার্কিন সেনাবাহিনী?

সিরিজ: ভিয়েতনাম যুদ্ধ

প্যারিস শান্তি চুক্তি: ১৯৭৩ সালে কেন ভিয়েতনাম ছেড়ে গেল মার্কিন সেনাবাহিনী?
শান্তিচুক্তির আড়ালে অসমাপ্ত ভিয়েতনাম যুদ্ধ

১৯৭৩ সালের ২৭ জানুয়ারি প্যারিসে স্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভিয়েতনামে যুদ্ধের অবসান ও শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার সমঝোতা বলা হয়েছিল। এর ফলে মার্কিন যুদ্ধসেনা প্রত্যাহার, যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি এবং দক্ষিণ ভিয়েতনামে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দুই মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শেষ যুদ্ধসেনারা ভিয়েতনাম ছেড়ে যায়। কিন্তু চুক্তিটি ভিয়েতনামের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী সরকারের মৌলিক বিরোধ মেটাতে পারেনি, উত্তর ভিয়েতনামের সেনাদের দক্ষিণ থেকে সরায়নি এবং স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানও প্রতিষ্ঠা করেনি। প্যারিস চুক্তি তাই ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ করার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অংশগ্রহণ শেষ করার সমঝোতা ছিল।

শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছিল আরও প্রায় পাঁচ বছর আগে। ১৯৬৮ সালের টেট অফেনসিভের পর প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন উত্তর ভিয়েতনামের ওপর বোমাবর্ষণ সীমিত করেন এবং আলোচনার আহ্বান জানান। মে মাসে প্যারিসে যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর ভিয়েতনামের প্রতিনিধিদের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু কে বৈধ পক্ষ হিসেবে টেবিলে বসবে, টেবিলের আকৃতি কেমন হবে এবং প্রতিনিধিদের মর্যাদা কী হবে—এসব প্রশ্ন নিয়েই কয়েক মাস কেটে যায়। পরে দক্ষিণ ভিয়েতনাম এবং দক্ষিণের কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন জাতীয় মুক্তি ফ্রন্টের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকারী অস্থায়ী বিপ্লবী সরকারও আলোচনায় যোগ দেয়।

প্রকাশ্য বৈঠকগুলোর পাশাপাশি ১৯৬৯ সাল থেকে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার এবং উত্তর ভিয়েতনামের জ্যেষ্ঠ নেতা লে দুক থোর মধ্যে গোপন আলোচনা শুরু হয়। প্রকাশ্য বৈঠকে উভয় পক্ষ নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরলেও প্রকৃত দর-কষাকষির বড় অংশ চলত এসব গোপন বৈঠকে। কিসিঞ্জারের লক্ষ্য ছিল এমন একটি সমঝোতা, যা মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করলেও দক্ষিণ ভিয়েতনামকে তাৎক্ষণিক পতনের হাত থেকে রক্ষা করবে। লে দুক থো চাইছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, দক্ষিণে বিপ্লবী শক্তির রাজনৈতিক স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যৎ পুনরেকত্রীকরণের পথ।

প্রথমদিকে উত্তর ভিয়েতনাম দাবি করেছিল, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পাশাপাশি দক্ষিণ ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট নগুয়েন ভ্যান থিয়েউকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে একটি নতুন জোট সরকার গঠন করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছিল, দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বাইরে থেকে নির্ধারণ করা যাবে না এবং উত্তর ভিয়েতনামের সেনাদেরও দক্ষিণ থেকে প্রত্যাহার করতে হবে। এই দুটি প্রশ্ন—দক্ষিণে কারা সরকার গঠন করবে এবং সেখানে থাকা উত্তর ভিয়েতনামের সেনাদের কী হবে—আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

রিচার্ড নিক্সন প্রশাসন আলোচনার পাশাপাশি ভিয়েতনামাইজেশন নীতি গ্রহণ করে। দক্ষিণ ভিয়েতনামের সেনাবাহিনীকে বড় করা, আধুনিক অস্ত্র দেওয়া এবং ধীরে ধীরে মার্কিন সেনা ফিরিয়ে নেওয়া হয়। ১৯৬৯ সালে ভিয়েতনামে পাঁচ লাখের বেশি মার্কিন সেনা থাকলেও পরবর্তী তিন বছরে তাদের অধিকাংশ দেশে ফিরে যায়। প্রত্যাহারের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে নিহত সেনার সংখ্যা কমে এবং নিক্সন আলোচনায় সময় পান। একই সঙ্গে কম্বোডিয়া ও লাওসে অভিযান এবং উত্তর ভিয়েতনামের ওপর বিমান হামলার মাধ্যমে হ্যানয়ের ওপর চাপ বজায় রাখা হয়।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পেছনে শুধু একটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত কাজ করেনি। যুদ্ধ তখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গভীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বোঝায় পরিণত হয়েছিল। কয়েক দশকের সংঘাতে ৫৮ হাজারের বেশি মার্কিন সামরিক সদস্য নিহত হন, আরও অনেকে আহত বা মানসিক আঘাত নিয়ে দেশে ফেরেন। বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ তরুণ সমাজে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। টেট অফেনসিভ, মাই লাই গণহত্যা, কম্বোডিয়া অভিযান, কেন্ট স্টেট হত্যাকাণ্ড এবং পেন্টাগন পেপারস সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

আমেরিকার বড় অংশ আর বিশ্বাস করছিল না যে দক্ষিণ ভিয়েতনামের জন্য অসীমকাল যুদ্ধ করা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। কংগ্রেসে যুদ্ধের অর্থায়ন ও প্রেসিডেন্টের সামরিক ক্ষমতা নিয়ে বিরোধ বাড়ছিল। অর্থনৈতিকভাবে যুদ্ধের ব্যয় দেশের বাজেট, মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক কর্মসূচির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। সামরিক নেতৃত্বও বুঝতে পেরেছিল, বিপুল অগ্নিশক্তি দিয়ে বহু যুদ্ধে জয়লাভ করা গেলেও উত্তর ভিয়েতনামের রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ভাঙা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধক্ষেত্রে অসহায় ছিল না; কিন্তু সামরিক শক্তিকে একটি স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক বিজয়ে রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছিল।

১৯৭২ সালের ইস্টার অফেনসিভ আলোচনার গতিপথ বদলে দেয়। উত্তর ভিয়েতনাম ট্যাংক, কামান ও নিয়মিত সেনা নিয়ে দক্ষিণে বড় আক্রমণ চালায়। দক্ষিণ ভিয়েতনামের বাহিনী প্রথমদিকে গুরুতর সংকটে পড়লেও মার্কিন বিমানশক্তির সহায়তায় আন লক ও কনটুম ধরে রাখে এবং পরে কুয়াং ত্রি শহর পুনর্দখল করে। যুক্তরাষ্ট্র অপারেশন লাইনব্যাকারের মাধ্যমে উত্তর ভিয়েতনামের রেলপথ, সেতু ও সামরিক রসদব্যবস্থায় আঘাত করে এবং হাইফং বন্দরে মাইন স্থাপন করে।

অভিযানে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির পর উত্তর ভিয়েতনাম আলোচনায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ ছাড় দিতে প্রস্তুত হয়। তারা থিয়েউকে চুক্তির আগে ক্ষমতাচ্যুত করার দাবি প্রত্যাহার করে এবং দক্ষিণের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য একটি সমঝোতামূলক কাঠামো মেনে নেয়। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র উত্তর ভিয়েতনামের সেনাদের দক্ষিণ থেকে প্রত্যাহারের শর্ত কার্যত বাদ দেয়। এই সমঝোতা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—মার্কিন সেনারা চলে যাবে, কিন্তু দক্ষিণে অবস্থানরত উত্তর ভিয়েতনামের নিয়মিত বাহিনী নিজ অবস্থানে থাকতে পারবে।

১৯৭২ সালের অক্টোবরে কিসিঞ্জার ঘোষণা করেন, “শান্তি হাতের নাগালে।” কিন্তু দক্ষিণ ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট থিয়েউ প্রস্তাবিত চুক্তি দেখে ক্ষুব্ধ হন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, দক্ষিণে থাকা উত্তর ভিয়েতনামের সেনারা যুদ্ধবিরতির সুযোগে নিজেদের শক্তি পুনর্গঠন করবে এবং যুক্তরাষ্ট্র চলে যাওয়ার পর আবার আক্রমণ করবে। তিনি রাজনৈতিক পরিষদের কাঠামো, অস্পষ্ট সীমারেখা এবং উত্তর ভিয়েতনামি বাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে অসংখ্য সংশোধন দাবি করেন। তাঁর দৃষ্টিতে এটি শান্তিচুক্তি নয়, বরং দক্ষিণ ভিয়েতনামের ভবিষ্যৎ পতনের ব্যবস্থা ছিল।

হ্যানয়ও পরবর্তী মার্কিন সংশোধনী ও বিলম্বের বিরুদ্ধে আপত্তি জানায়। আলোচনা অচল হয়ে গেলে নিক্সন ১৯৭২ সালের ১৮ ডিসেম্বর অপারেশন লাইনব্যাকার টু শুরু করেন। এগারো দিনের এই অভিযানে বি-৫২সহ মার্কিন বিমান হ্যানয় ও হাইফং অঞ্চলের রেলইয়ার্ড, বিমানঘাঁটি, যোগাযোগকেন্দ্র ও সামরিক স্থাপনায় তীব্র হামলা চালায়। উত্তর ভিয়েতনামের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে একাধিক বি-৫২ ধ্বংস হয়। একই সঙ্গে বোমাবর্ষণে বেসামরিক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত এবং বহু সাধারণ মানুষ নিহত হন।

এই অভিযানকে যুক্তরাষ্ট্রে কখনো “ক্রিসমাস বোম্বিং” বলা হয়। নিক্সন প্রশাসন দাবি করে, বোমাবর্ষণ হ্যানয়কে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে এনেছিল। তবে উত্তর ভিয়েতনাম অভিযানের আগেই আলোচনায় ফিরতে সম্মত হয়েছিল কি না এবং ডিসেম্বরের হামলায় চুক্তির মূল শর্ত কতটা বদলেছিল, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের বিতর্ক আছে। চূড়ান্ত চুক্তি অক্টোবরের খসড়ার সঙ্গে অনেকাংশে মিল ছিল। তবু হামলা নিক্সনকে দক্ষিণ ভিয়েতনামের কাছে দৃঢ়তা প্রদর্শন এবং হ্যানয়ের ওপর সামরিক চাপ বজায় রাখার সুযোগ দেয়।

১৯৭৩ সালের ২৩ জানুয়ারি কিসিঞ্জার ও লে দুক থো চুক্তির পাঠ অনুমোদন করেন। ২৭ জানুয়ারি প্যারিসে যুক্তরাষ্ট্র, উত্তর ভিয়েতনাম, দক্ষিণ ভিয়েতনাম এবং অস্থায়ী বিপ্লবী সরকারের প্রতিনিধিরা পৃথক নথিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তি অনুযায়ী ভিয়েতনামজুড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সব সামরিক বাহিনী ৬০ দিনের মধ্যে প্রত্যাহার করা হবে এবং একই সময়ে মার্কিন যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দেওয়া হবে।

দক্ষিণ ভিয়েতনামের মানুষকে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়। সাইগন সরকার ও অস্থায়ী বিপ্লবী সরকারের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি জাতীয় সমঝোতা ও ঐক্য পরিষদ গঠনের পরিকল্পনা ছিল, যা নির্বাচন আয়োজনে ভূমিকা রাখবে। ১৭তম সমান্তরালকে স্থায়ী আন্তর্জাতিক সীমান্ত নয়, সাময়িক সামরিক বিভাজনরেখা হিসেবে স্বীকার করা হয়। লাওস ও কম্বোডিয়ার নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতাও সম্মান করার প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তবে চুক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল বাস্তবায়নের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকা। যুদ্ধবিরতির সময় যে পক্ষ যে এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছিল, সেখানে অবস্থান ধরে রাখে। দক্ষিণে উত্তর ভিয়েতনামের কয়েকটি ডিভিশন থেকে যায়। কে কোন ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে, তার সুস্পষ্ট ও সম্মত মানচিত্র ছিল না। আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি কমিশন গঠন করা হলেও তার কাছে শক্তিশালী তদন্ত বা শাস্তি কার্যকর করার ক্ষমতা ছিল না। ফলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগেই উভয় পক্ষ যত বেশি সম্ভব এলাকা দখলের চেষ্টা করে এবং পরে প্রায় প্রতিদিনই লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে।

চুক্তির অধীনে অপারেশন হোমকামিং শুরু হয় এবং উত্তর ভিয়েতনাম বন্দী মার্কিন বৈমানিক ও অন্যান্য যুদ্ধবন্দীকে মুক্তি দেয়। তাঁদের দেশে ফেরার দৃশ্য যুক্তরাষ্ট্রে আবেগময়ভাবে প্রচারিত হয়। ১৯৭৩ সালের ২৯ মার্চ শেষ মার্কিন যুদ্ধসেনা দক্ষিণ ভিয়েতনাম ত্যাগ করে। একই দিনে শেষ দফার স্বীকৃত মার্কিন যুদ্ধবন্দীরাও মুক্তি পান। তবে দূতাবাসের নিরাপত্তা, সামরিক সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য কাজে কিছু মার্কিন বেসামরিক ও সামরিক-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সেখানে থেকে যান।

চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্রে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ শেষ করে স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর দিকে যাওয়া হয়। কংগ্রেস কম্বোডিয়া ও ইন্দোচীনে নতুন সামরিক অভিযানের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে এবং ১৯৭৩ সালের যুদ্ধক্ষমতা প্রস্তাবের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির একক সামরিক ক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা করে। একই সময়ে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি নিক্সন প্রশাসনকে দুর্বল করে তোলে। ফলে দক্ষিণ ভিয়েতনামকে রক্ষায় আবার বিপুল মার্কিন বিমানশক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা ক্রমে কমে যায়।

প্যারিস চুক্তির স্থপতি হিসেবে কিসিঞ্জার ও লে দুক থোকে ১৯৭৩ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। লে দুক থো পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ তাঁর মতে ভিয়েতনামে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কিসিঞ্জার পুরস্কার গ্রহণ করলেও অনুষ্ঠানটিতে উপস্থিত হননি। সেই সিদ্ধান্তগুলোই চুক্তির বাস্তবতা তুলে ধরে—স্বাক্ষর হয়েছে, সেনা প্রত্যাহার হচ্ছে, কিন্তু যুদ্ধ শেষ হয়নি।

চুক্তির পরও দক্ষিণ ভিয়েতনামি ও কমিউনিস্ট বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ চলতে থাকে। উভয় পক্ষ ভূখণ্ড সম্প্রসারণ, সড়ক নিয়ন্ত্রণ এবং সামরিক ঘাঁটি শক্তিশালী করার চেষ্টা করে। উত্তর ভিয়েতনাম হো চি মিন ট্রেইলকে আরও উন্নত করে দক্ষিণে অস্ত্র, জ্বালানি ও সেনা পাঠায়। অন্যদিকে সাইগন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্যের ওপর নির্ভর করে বিশাল সেনাবাহিনী বজায় রাখে। কিন্তু মার্কিন আর্থিক সহায়তা কমে গেলে জ্বালানি, গোলাবারুদ, যন্ত্রাংশ এবং বিমান পরিচালনায় গুরুতর সংকট দেখা দেয়।

১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম ছেড়েছিল কারণ যুদ্ধের সামরিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক মূল্য আর বহনযোগ্য ছিল না এবং বিজয়ের কোনো স্পষ্ট পথ অবশিষ্ট ছিল না। নিক্সনের ভিয়েতনামাইজেশন, তীব্র বোমাবর্ষণ ও গোপন কূটনীতি এমন একটি চুক্তি তৈরি করেছিল, যা যুদ্ধবন্দীদের ফিরিয়ে আনে এবং মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে সম্মানজনক রূপ দেয়। কিন্তু এটি উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সমাধান করেনি। ফলে প্যারিসে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শেষ হলেও ভিয়েতনামের যুদ্ধ চলতে থাকে—এবং মাত্র দুই বছরের মধ্যে তার চূড়ান্ত ফল নির্ধারিত হয়।


আপনার পছন্দ হতে পারে