প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্য: উপনিবেশের সৈন্য, নতুন ম্যান্ডেট ও সর্বোচ্চ বিস্তার
সিরিজ: ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার
বিশ্বযুদ্ধে উপনিবেশের সৈন্য ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার
১৯১৪ সালের আগস্টে ইউরোপে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটেন কেবল একটি ইউরোপীয় রাষ্ট্র হিসেবে যুদ্ধে প্রবেশ করেনি; তার সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল পৃথিবীব্যাপী বিস্তৃত একটি সাম্রাজ্য। কানাডা থেকে ভারত, অস্ট্রেলিয়া থেকে পশ্চিম আফ্রিকা এবং নিউজিল্যান্ড থেকে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসিত অঞ্চলগুলো সৈন্য, শ্রমিক, খাদ্য, অর্থ ও কাঁচামাল সরবরাহ করতে শুরু করে। যুদ্ধের প্রধান সিদ্ধান্তগুলো লন্ডনে নেওয়া হলেও তার মূল্য দিয়েছিল বহু মহাদেশের মানুষ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বৈশ্বিক শক্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এবং তার সর্বোচ্চ ভৌগোলিক বিস্তারের প্রধান সোপান হয়ে ওঠে।
যুদ্ধের শুরুতে ব্রিটেনের নিয়মিত স্থলবাহিনী জার্মানি, ফ্রান্স ও রাশিয়ার বিশাল সেনাবাহিনীর তুলনায় ছোট ছিল। ব্রিটিশ শক্তির প্রধান ভিত্তি ছিল রয়্যাল নেভি। কিন্তু পশ্চিম ইউরোপে দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধ শুরু হলে বিপুলসংখ্যক সৈন্যের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই ঘাটতি পূরণে ব্রিটেন নিজের জনশক্তির পাশাপাশি ডোমিনিয়ন, ভারত এবং অন্যান্য উপনিবেশের ওপর নির্ভর করে। সাম্রাজ্যিক নৌপথ ও বন্দরব্যবস্থা ব্যবহার করে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ও সামরিক উপকরণ যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউফাউন্ডল্যান্ড ছিল স্বশাসিত ডোমিনিয়ন। ব্রিটেন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে সাংবিধানিকভাবে তারাও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, যদিও নিজস্ব বাহিনী সংগঠন ও যুদ্ধসহায়তার মাত্রা নির্ধারণে তাদের সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব অঞ্চলে সাম্রাজ্যের প্রতি আনুগত্য, ব্রিটিশ পরিচয়, দেশপ্রেম, কর্মসংস্থানের আকর্ষণ এবং ব্যক্তিগত অভিযানের আকাঙ্ক্ষা থেকে বহু মানুষ স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা কমে গেলে বাধ্যতামূলক সেনাভর্তির প্রশ্ন তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি করে।
কানাডা থেকে ছয় লক্ষের বেশি মানুষ সামরিক বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। ১৯১৭ সালের ভিমি রিজের যুদ্ধে কানাডীয় সেনারা কঠিন জার্মান প্রতিরক্ষা দখল করে নিজেদের স্বতন্ত্র সামরিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করে। সোম, পাসশেনডেল এবং যুদ্ধের শেষ পর্যায়ের আক্রমণগুলোতেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বিপুল হতাহতের কারণে কানাডার ইংরেজিভাষী ও ফরাসিভাষী জনগণের মধ্যে বাধ্যতামূলক সেনাভর্তি নিয়ে গভীর বিরোধ দেখা দেয়। যুদ্ধে অংশগ্রহণ কানাডার জাতীয় আত্মপরিচয় শক্তিশালী করলেও তার অভ্যন্তরীণ ভাষাগত ও রাজনৈতিক বিভাজনও প্রকাশ করে।
অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সম্মিলিত বাহিনী গ্যালিপলি অভিযানের মাধ্যমে বিশেষ পরিচিতি পায়। ১৯১৫ সালে মিত্রশক্তি দার্দানেলিস প্রণালি দখল করে উসমানীয় সাম্রাজ্যকে যুদ্ধ থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং রাশিয়ার সঙ্গে সমুদ্রযোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেছিল। দুর্গম উপকূল, দুর্বল পরিকল্পনা, রোগ ও উসমানীয় প্রতিরোধের কারণে অভিযান ব্যর্থ হয়। অস্ট্রেলীয় ও নিউজিল্যান্ডীয় বাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। সামরিক পরাজয় হওয়া সত্ত্বেও গ্যালিপলি তাদের জাতীয় স্মৃতিতে সাহস, আত্মত্যাগ ও স্বতন্ত্র পরিচয়ের প্রতীকে পরিণত হয়।
ভারতীয় সেনাবাহিনী ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় উপনিবেশিক সামরিক শক্তি। যুদ্ধকালে ব্রিটিশ ভারত থেকে দশ লক্ষেরও বেশি সৈন্য ও সহায়ক কর্মী বিদেশে পাঠানো হয়। তারা ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের শীতল পরিখা, মেসোপটেমিয়ার মরুভূমি, পূর্ব আফ্রিকার দুর্গম অঞ্চল, মিশর, সিনাই, ফিলিস্তিন এবং গ্যালিপলিতে যুদ্ধ করে। পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত, রাজপুতানা, নেপাল ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা সৈন্যদের অপরিচিত আবহাওয়া, ভাষা ও যুদ্ধপদ্ধতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
১৯১৪ সালে ভারতীয় সেনারা দ্রুত পশ্চিম রণাঙ্গলে পৌঁছে ব্রিটিশ বাহিনীর সংকট সামাল দিতে সাহায্য করে। ইপ্রের যুদ্ধে তারা তীব্র লড়াইয়ে অংশ নেয়। পরে অধিকাংশ ভারতীয় পদাতিককে পশ্চিম রণাঙ্গল থেকে সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হলেও ভারতীয় অশ্বারোহী ও অন্যান্য ইউনিট সেখানে থেকে যায়। মেসোপটেমিয়ায় উসমানীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযানের অধিকাংশ সৈন্যই ছিল ভারতীয়। ১৯১৬ সালে কুত নগরীতে ব্রিটিশ-ভারতীয় বাহিনীর আত্মসমর্পণ সাম্রাজ্যের জন্য অপমানজনক বিপর্যয় সৃষ্টি করে। পুনর্গঠনের পর তারা ১৯১৭ সালে বাগদাদ দখল করে এবং যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত অগ্রযাত্রা চালায়।
ভারত শুধু সৈন্য দেয়নি; অর্থ, খাদ্য, ঘোড়া, পোশাক, অস্ত্রোপকরণ ও বিপুল পরিমাণ যুদ্ধসামগ্রীও সরবরাহ করেছিল। দেশীয় রাজারা অর্থ, সৈন্য ও চিকিৎসা সহায়তা দিয়ে ব্রিটিশ যুদ্ধপ্রচেষ্টাকে সমর্থন করেন। ভারতীয় জনগণের কাছ থেকে কর ও যুদ্ধঋণের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। মূল্যবৃদ্ধি, খাদ্যসংকট এবং যুদ্ধকালীন চাহিদা সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তোলে। ব্রিটিশ সরকার যুদ্ধের বিনিময়ে ভারতীয়দের অধিক রাজনৈতিক অংশগ্রহণের আশা জাগালেও যুদ্ধোত্তর দমননীতি সেই প্রত্যাশাকে দ্রুত ক্ষুব্ধ জাতীয়তাবাদে রূপান্তরিত করে।
আফ্রিকায় ব্রিটিশ বাহিনী শুধু ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারীদের ওপর নির্ভর করেনি। পশ্চিম ও পূর্ব আফ্রিকার উপনিবেশগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক আফ্রিকান সৈন্য ও বাহক নিয়োগ করা হয়। নাইজেরিয়া, গোল্ড কোস্ট, সিয়েরা লিওন, গাম্বিয়া, কেনিয়া, উগান্ডা ও নিয়াসাল্যান্ডের মানুষ জার্মান উপনিবেশগুলোর বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নেয়। পূর্ব আফ্রিকার যুদ্ধ ছিল বিশেষভাবে দীর্ঘ ও কঠিন। দুর্গম বন, রোগ, খাদ্যাভাব এবং দুর্বল পরিবহনব্যবস্থার কারণে যুদ্ধরত সৈন্যের চেয়ে রসদ বহনকারী আফ্রিকান শ্রমিকদের ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি ছিল।
পূর্ব আফ্রিকায় লক্ষাধিক মানুষকে বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তারা অস্ত্র, গোলাবারুদ, খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী বহন করত। রোগ, অপুষ্টি, ক্লান্তি এবং অমানবিক শ্রমপরিবেশে অসংখ্য বাহকের মৃত্যু ঘটে, কিন্তু দীর্ঘদিন যুদ্ধের প্রচলিত ইতিহাসে তাদের অবদান প্রায় অদৃশ্য ছিল। পশ্চিম রণাঙ্গলের তুলনায় আফ্রিকার অভিযানকে গৌণ মনে করা হলেও স্থানীয় সমাজের ওপর এর প্রভাব ছিল ভয়াবহ। সেনা সংগ্রহ, জোরপূর্বক শ্রম, খাদ্য অধিগ্রহণ ও কৃষিকাজ ব্যাহত হওয়ায় বহু অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ ও সামাজিক বিপর্যয় দেখা দেয়।
ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ থেকেও হাজার হাজার মানুষ ব্রিটিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ রেজিমেন্টে যোগ দেয়। তারা মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে সামরিক ও শ্রমসংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করে। বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনেক কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্যকে সরাসরি যুদ্ধের বদলে বন্দরে মাল ওঠানো, রাস্তা নির্মাণ এবং গোলাবারুদ বহনের কাজে নিয়োগ করা হতো। সমান বিপদ ও কষ্টের মুখোমুখি হয়েও তারা শ্বেতাঙ্গ সৈন্যদের তুলনায় বৈষম্যমূলক আচরণ ও সীমিত সুযোগ পেত। যুদ্ধ শেষে এই অভিজ্ঞতা ক্যারিবীয় অঞ্চলে রাজনৈতিক সচেতনতা ও সমঅধিকারের দাবি জোরদার করে।
দক্ষিণ আফ্রিকার বাহিনী জার্মান দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকা দখলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরে দক্ষিণ আফ্রিকান সৈন্যদের পূর্ব আফ্রিকা ও পশ্চিম রণাঙ্গলে পাঠানো হয়। কিন্তু দেশটির শ্বেতাঙ্গ নেতৃত্ব কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে অস্ত্রধারী সৈন্য হিসেবে ব্যাপকভাবে নিয়োগে অনিচ্ছুক ছিল। কৃষ্ণাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের প্রধানত নিরস্ত্র শ্রমবাহিনীতে নেওয়া হয়। ১৯১৭ সালে সৈন্যবাহী মেন্ডি জাহাজ ডুবে ছয় শতাধিক দক্ষিণ আফ্রিকান শ্রমিকের মৃত্যু যুদ্ধের এক মর্মান্তিক অথচ দীর্ঘদিন অবহেলিত অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
সাম্রাজ্যের নৌবাহিনী যুদ্ধের পুরো সময় ব্রিটেনের অস্তিত্ব রক্ষায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। রয়্যাল নেভি জার্মান বন্দর অবরোধ করে, আটলান্টিকের বাণিজ্যপথ পাহারা দেয় এবং উপনিবেশ থেকে সৈন্য ও খাদ্য পরিবহন নিরাপদ রাখে। জার্মান ডুবোজাহাজের আক্রমণে বিপুলসংখ্যক বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবে গেলে খাদ্য ও কাঁচামাল সরবরাহ হুমকির মুখে পড়ে। বহরবদ্ধভাবে জাহাজ চলাচল, নৌপাহারা ও সাম্রাজ্যের বিভিন্ন বন্দরের সহযোগিতা শেষ পর্যন্ত এই বিপদ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
যুদ্ধ ইউরোপের বাইরে ব্রিটিশ ভূখণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগও সৃষ্টি করে। অস্ট্রেলীয় বাহিনী জার্মান নিউগিনি ও প্রশান্ত মহাসাগরের কয়েকটি জার্মান দ্বীপ দখল করে। নিউজিল্যান্ড জার্মান সামোয়া অধিকার করে এবং দক্ষিণ আফ্রিকা জার্মান দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকা দখল করে। আফ্রিকায় ব্রিটিশ ও মিত্রবাহিনী টোগোল্যান্ড, ক্যামেরুন এবং জার্মান পূর্ব আফ্রিকার বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। এসব বিজয়ের মাধ্যমে জার্মান ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য ভেঙে পড়লেও দখলকৃত অঞ্চলগুলো সরাসরি বিজিত সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি।
উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ব্রিটিশ সম্প্রসারণের আরেকটি প্রধান ক্ষেত্র ছিল। ব্রিটিশ ও ভারতীয় বাহিনী বসরা, বাগদাদ এবং মেসোপটেমিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে। মিশর ও সিনাই রক্ষা করার পর ব্রিটিশ বাহিনী ফিলিস্তিনে অগ্রসর হয়ে ১৯১৭ সালে জেরুজালেম দখল করে। একই সময়ে আরব বিদ্রোহকে সমর্থন দিয়ে উসমানীয় শাসন দুর্বল করা হয়। কিন্তু আরবদের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি, ফ্রান্সের সঙ্গে গোপন ভূখণ্ড-বণ্টন এবং ফিলিস্তিনে ইহুদি জাতীয় আবাসের প্রতি সমর্থন—এই পরস্পরবিরোধী নীতিগুলো ভবিষ্যৎ সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করে।
১৯১৮ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বিজয়ী শক্তিগুলো পরাজিত জার্মানি ও উসমানীয় সাম্রাজ্যের ভূখণ্ড ভাগ করে। জাতিপুঞ্জের ম্যান্ডেটব্যবস্থায় এসব অঞ্চলের জনগণকে ভবিষ্যৎ স্বশাসনের জন্য প্রস্তুত করার কথা বলা হলেও বাস্তবে বিজয়ী শক্তিগুলোই প্রশাসনিক কর্তৃত্ব লাভ করে। ব্রিটেন ইরাক, ফিলিস্তিন ও ট্রান্সজর্ডানের ম্যান্ডেট পায়। টাঙ্গানিকার অধিকাংশ অঞ্চলও ব্রিটিশ তত্ত্বাবধানে আসে। প্রশান্ত মহাসাগরের জার্মান ভূখণ্ডগুলোর কিছু অংশ অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড পরিচালনা করতে শুরু করে এবং দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকার দায়িত্ব পায় দক্ষিণ আফ্রিকা।
এই নতুন ম্যান্ডেটগুলো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক উপনিবেশ ছিল না, কিন্তু সেখানে ব্রিটিশ বা ব্রিটিশ ডোমিনিয়নের প্রশাসন, সামরিক উপস্থিতি ও অর্থনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহিনী, স্থানীয় সেনাদল ও অনুগত শাসকের মাধ্যমে তুলনামূলক কম ব্যয়ে কর্তৃত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়। ইরাকে ১৯২০ সালের বৃহৎ বিদ্রোহ দেখিয়ে দেয় যে স্থানীয় জনগণ বিদেশি শাসন সহজে গ্রহণ করবে না। ফিলিস্তিনে আরব ও ইহুদি জাতীয় আকাঙ্ক্ষার দ্বন্দ্ব ব্রিটিশ প্রশাসনকে ক্রমবর্ধমান সংকটের মধ্যে ফেলে।
নতুন ভূখণ্ড যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ শতকের তৃতীয় দশকের শুরুতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তার সর্বোচ্চ ভৌগোলিক বিস্তারে পৌঁছে যায়। তখন সাম্রাজ্যটি প্রায় সাড়ে তিন কোটি বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড এবং পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশের ওপর কোনো না কোনোভাবে কর্তৃত্ব করত। মানচিত্রে এই বিস্তার বিজয়ের চূড়ান্ত নিদর্শন বলে মনে হলেও বাস্তবে ব্রিটেন যুদ্ধের ঋণ, সামরিক ব্যয়, সামাজিক অস্থিরতা ও উপনিবেশিক প্রতিরোধে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সাম্রাজ্যের মানচিত্র যখন সবচেয়ে বড়, তার আর্থিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি তখন আগের তুলনায় অনেক বেশি নড়বড়ে।
যুদ্ধে অংশগ্রহণ ডোমিনিয়নগুলোর রাজনৈতিক মর্যাদাও বদলে দেয়। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা যুদ্ধের মূল্য দেওয়ার বিনিময়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র কণ্ঠ দাবি করে। তারা প্যারিস শান্তি সম্মেলনে পৃথক প্রতিনিধিত্ব পায় এবং জাতিপুঞ্জে পৃথক সদস্য হিসেবে যোগ দেয়। আনুগত্য বজায় থাকলেও লন্ডনের অধীনতা ধীরে ধীরে অংশীদারত্বের ধারণায় রূপ নিতে শুরু করে। পরবর্তী দশকগুলোতে এই পরিবর্তন তাদের পূর্ণ আইনগত স্বায়ত্তশাসনের দিকে নিয়ে যায়।
ভারত ও অন্যান্য উপনিবেশে ফল ছিল আরও বিস্ফোরক। স্বাধীনতা, জাতীয় অধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষার নামে যুদ্ধ চালানো হলেও উপনিবেশের মানুষ নিজেরাই সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। ভারতীয় সৈন্যদের আত্মত্যাগের পরও রাওলাট আইনের মতো দমনমূলক ব্যবস্থা এবং জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ব্রিটিশ প্রতিশ্রুতির অসারতা প্রকাশ করে। মিশর, ইরাক, ভারত, পশ্চিম আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুদ্ধফেরত সৈন্য, শ্রমিক ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা দ্রুত বাড়ে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে একই সঙ্গে প্রসারিত ও দুর্বল করেছিল। উপনিবেশের সৈন্য, শ্রমিক, অর্থ ও সম্পদ ছাড়া ব্রিটেন এত দীর্ঘ যুদ্ধ চালাতে পারত না। বিজয়ের পর নতুন ম্যান্ডেট পাওয়ায় সাম্রাজ্যের মানচিত্র ইতিহাসের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছায়, কিন্তু সেই বিস্তার টিকিয়ে রাখার সামর্থ্য ক্ষয় হতে থাকে। উপনিবেশিত মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বিজয় স্বাধীনতা ও সমঅধিকারের দাবিকে আরও শক্তিশালী করে। ফলে যুদ্ধের পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বাইরে থেকে আগের চেয়ে বিশাল দেখালেও তার ভেতরে উপনিবেশমুক্তির যুগের ভিত্তি ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
মেরি শেলি: ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ লিখে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির ইতিহাস বদলে দেওয়া তরুণী
অ্যাডা লাভলেস: প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে পরিচিত নারীর বিস্ময়কর ইতিহাস
মেরি অ্যানিং: জীবাশ্ম আবিষ্কার করে পৃথিবীর প্রাচীন প্রাণের ইতিহাস যেভাবে বদলে দিয়েছিলেন
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ বিস্তার: পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশ কীভাবে ব্রিটিশ শাসনে এসেছিল?
বোয়ার যুদ্ধ ও দক্ষিণ আফ্রিকা: সোনা, হীরা ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যিক আধিপত্যের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস
আফ্রিকার জন্য প্রতিযোগিতা: মিশর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের ইতিহাস