ঘুমের অভাব কীভাবে ক্ষুধা বাড়ায় এবং ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করে?
কম ঘুমে ক্ষুধা ও খাবার বাছাই—দুটিই বদলাতে পারে।
কম ঘুমের পর বেশি খেতে ইচ্ছা হয় কেন?
রাতে কম ঘুমানোর পরদিন অনেকেরই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি খিদে পায়। বিশেষ করে মিষ্টি, ভাজাপোড়া বা দ্রুত খাওয়া যায় এমন খাবার তখন বেশি আকর্ষণীয় লাগে। এর পেছনে কেবল ইচ্ছাশক্তির ঘাটতি নেই। ঘুম মস্তিষ্কের ক্ষুধা বোঝা, খাবার থেকে তৃপ্তি পাওয়া এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। ঘুম কম হলে এসব প্রক্রিয়ার ভারসাম্য বদলাতে পারে।
ধরা যাক, একজন মানুষ প্রতিদিন রাত এগারোটায় ঘুমান, কিন্তু কাজের চাপে কয়েক দিন ধরে রাত দুটো পর্যন্ত জেগে থাকছেন। তাঁর জেগে থাকার সময় বেড়েছে তিন ঘণ্টা। এই বাড়তি সময়ে খাবার দেখার, রান্নাঘরে যাওয়ার বা কিছু খেয়ে নেওয়ার সুযোগও বেড়েছে। পরদিন ক্লান্ত অবস্থায় নিয়মিত খাবার তৈরি করার বদলে সহজলভ্য খাবার বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। অর্থাৎ ঘুমের অভাব একদিকে খাবারের প্রতি আকর্ষণ বদলায়, অন্যদিকে খাওয়ার সুযোগ ও দৈনন্দিন অভ্যাসও বদলে দেয়।
তবে এক রাত কম ঘুমালেই যে ওজন বেড়ে যাবে, তা নয়। ওজনের ওপর প্রভাব পড়ে যখন কম ঘুম, বাড়তি খাওয়া ও কম নড়াচড়ার মতো ঘটনা বারবার ঘটতে থাকে।
ক্ষুধা ও তৃপ্তির সংকেতে কী পরিবর্তন ঘটে?
শরীরে ঘ্রেলিন নামের একটি হরমোন ক্ষুধার সংকেত দিতে সাহায্য করে। লেপটিন মস্তিষ্ককে শরীরে সঞ্চিত শক্তি সম্পর্কে সংকেত দেয় এবং তৃপ্তি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। কিছু নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষায় কম ঘুমের পর ঘ্রেলিন বৃদ্ধি, লেপটিন হ্রাস এবং বেশি ক্ষুধা অনুভবের ঘটনা দেখা গেছে। ফলে পর্যাপ্ত খাবার খাওয়ার পরও কারও আবার কিছু খেতে ইচ্ছা হতে পারে।
কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয় যে কম ঘুমালে সবার ঘ্রেলিন বাড়বেই এবং লেপটিন কমবেই। গবেষণায় হরমোনের ফল সব সময় একরকম পাওয়া যায়নি। খাবারের পরিমাণ, ঘুম কমার মাত্রা, নমুনা নেওয়ার সময় এবং ব্যক্তিভেদে ফল বদলাতে পারে। তবু কম ঘুমের সঙ্গে বেশি খাবার খাওয়ার সম্পর্ক একাধিক পরীক্ষায় দেখা গেছে। তাই ক্ষুধা বাড়ার পুরো কারণ শুধু এই দুই হরমোন দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।
ঘুমের অভাবে মস্তিষ্কের খাবার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তও প্রভাবিত হতে পারে। ক্লান্ত অবস্থায় তাৎক্ষণিক আনন্দ দেয় এমন খাবার বেশি আকর্ষণীয় মনে হওয়া এবং পেট ভরার পর থামার সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ফলে ক্ষুধা খুব বেশি না বাড়লেও খাবারের ধরন ও পরিমাণ বদলে যেতে পারে।
রাতের অতিরিক্ত খাবার কীভাবে ওজন বাড়ায়?
অনেক সময় কম ঘুমের প্রভাব দুপুরের মূল খাবারের চেয়ে রাতের নাশতায় বেশি বোঝা যায়। রাত জেগে কাজ বা বিনোদনের সময় বিস্কুট, চিপস, মিষ্টি পানীয় কিংবা অন্য নাশতা খাওয়া সহজ। এগুলো অল্প সময়ে খাওয়া যায় বলে কতটা খাওয়া হলো, তা খেয়াল করা কঠিন। রাতের খাবার যথেষ্ট খাওয়ার পরও এসব নাশতা দিনের মোট খাদ্যের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
এখানে কখন খাওয়া হচ্ছে এবং কেন খাওয়া হচ্ছে—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। রাত এগারোটায় সত্যিকারের ক্ষুধা লাগলে খাবারের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু ক্লান্তি, একঘেয়েমি বা জেগে থাকার জন্য কিছু চিবিয়ে খাওয়ার ইচ্ছাকে ক্ষুধা ভেবে বারবার খেলে অতিরিক্ত খাবার যোগ হয়। অন্যদিকে সকালে দেরিতে ওঠার কারণে নাশতা বাদ দিয়ে পরে খুব ক্ষুধার্ত অবস্থায় বড় পরিমাণে খাওয়ার অভ্যাসও তৈরি হতে পারে।
দীর্ঘ সময় জেগে থাকলে শরীর কিছু বাড়তি শক্তি খরচ করে। কিন্তু সেই খরচের চেয়ে বেশি খাবার খেলে অতিরিক্ত শক্তি শরীরে জমতে পারে। তাই ‘রাত জেগেছি, নিশ্চয়ই অনেক শক্তি খরচ হয়েছে’—এই ধারণার ভিত্তিতে বাড়তি খাবার খাওয়া ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে না।
ক্লান্তি, রক্তে শর্করা ও দৈনন্দিন কাজের সম্পর্ক
ঘুম কম হলে পরদিন শরীরচর্চা বা হাঁটাহাঁটির আগ্রহ কমে যেতে পারে। একজন মানুষ নির্ধারিত ব্যায়াম করলেও দিনের বাকি সময়ে বেশি বসে থাকতে পারেন, সিঁড়ির বদলে লিফট নিতে পারেন বা ক্লান্তির কারণে কাজ শেষে আর বাইরে বের না-ও হতে পারেন। এসব ছোট পরিবর্তন দীর্ঘ সময় ধরে চললে মোট দৈহিক কার্যক্রম কমে যায়।
অপর্যাপ্ত ঘুম রক্তে শর্করা সামলানোর প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সম্পর্কিত। নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষায় ঘুম কমানোর পর শরীরের ইনসুলিনের প্রতি সাড়া বদলানোর ঘটনা দেখা গেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে কয়েক রাত কম ঘুমালেই কারও ডায়াবেটিস হবে। বাস্তবে খাবার, শারীরিক কার্যক্রম, পারিবারিক ঝুঁকি ও অন্যান্য শারীরিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
ওজনের সঙ্গে ঘুমের সম্পর্ক দুই দিকেই কাজ করতে পারে। ঘুম কম হলে ওজন নিয়ন্ত্রণ কঠিন হতে পারে; আবার অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে শ্বাস আটকে আসা বা ঘুম বারবার ভাঙার সমস্যা থাকলে পর্যাপ্ত ঘুম পাওয়াও কঠিন হয়। জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার লক্ষণ বা যথেষ্ট সময় বিছানায় থেকেও দিনের বেলা তীব্র ঘুম ঘুম ভাব থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ক্ষুধা ও ঘুমের এই চক্র কীভাবে সামলাবেন?
প্রথমে নিজের ঘুম ও খাওয়ার সময় কয়েক দিন লক্ষ্য করুন। কোন রাতে দেরি করে ঘুমিয়েছেন, পরদিন কখন বেশি ক্ষুধা পেয়েছে এবং রাতের নাশতা কতটা বেড়েছে—এগুলো লিখে রাখলে ব্যক্তিগত ধরনটি বোঝা সহজ হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমের লক্ষ্য রাখা উপকারী, যদিও ব্যক্তিভেদে প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে।
প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ওঠার অভ্যাস করুন। বিকেল বা সন্ধ্যার পর চা-কফি খেলে রাতে ঘুম আসতে দেরি হয় কি না, খেয়াল করুন। শোবার ঠিক আগে ভারী খাবার এবং দীর্ঘক্ষণ উজ্জ্বল পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা কমান। দিনের বেলায় নিয়মিত হাঁটা বা অন্য শারীরিক কার্যক্রমও ঘুমের অভ্যাস গুছিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে।
রাত জাগতেই হলে আগে থেকে পরিমিত খাবারের ব্যবস্থা রাখুন। সত্যিকারের ক্ষুধা লাগলে পরিকল্পনা করে খাবার খান এবং পর্দার সামনে বসে প্যাকেট থেকে অন্যমনস্কভাবে খাওয়া এড়িয়ে চলুন। পরদিন ক্লান্ত থাকবেন ভেবে সহজ, পুষ্টিকর খাবারের প্রস্তুতি রাখলেও তাৎক্ষণিক খাবারের ওপর নির্ভরতা কমে।
পর্যাপ্ত ঘুম ওজন কমানোর কোনো একক সমাধান নয়। তবে ঘুম ঠিক থাকলে ক্ষুধার সংকেত বোঝা, খাবারের পরিমাণ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং দিনের কাজকর্ম বজায় রাখা সহজ হতে পারে। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনায় খাবার ও চলাফেরার পাশাপাশি ঘুমের জন্যও নির্দিষ্ট সময় রাখা দরকার।
মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন কি? বার্নআউটের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ ও করণীয়
গর্ভাবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্য কেন হয়? কারণ, প্রতিকার ও নিরাপদভাবে কমানোর উপায়
পেশি গঠনের জন্য শুধু প্রোটিন খেলেই কি যথেষ্ট? পেশি বাড়ানোর সম্পূর্ণ বিজ্ঞান
প্রতিদিন ফল খাওয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং কতটুকু যথেষ্ট? সঠিক পরিমাণ ও উপকারিতা
দ্রুত খাওয়ার অভ্যাস কীভাবে ওজন বাড়াতে পারে? ক্ষুধা, হরমোন ও অতিরিক্ত খাওয়ার বিজ্ঞান
খালি পেটে পানি পান নিয়ে প্রচলিত ধারণাগুলো কতটা সত্য? বিজ্ঞান কী বলে