অতিরিক্ত ওজন হৃদ্‌স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলে?……

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

অতিরিক্ত ওজন হৃদ্‌স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলে? ঝুঁকি ও প্রতিরোধের উপায়

অতিরিক্ত ওজন হৃদ্‌স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলে? ঝুঁকি ও প্রতিরোধের উপায়
অতিরিক্ত মেদ কমান, হৃদ্‌যন্ত্রের যত্ন নিন।

অতিরিক্ত ওজন কেন হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

সিঁড়ি ভাঙতে গিয়ে হাঁপিয়ে যাওয়া কিংবা অল্প হাঁটলেই ক্লান্ত হয়ে পড়াকে অনেকেই শুধু ওজন বাড়ার স্বাভাবিক ফল মনে করেন। কিন্তু শরীরে অতিরিক্ত মেদ জমার প্রভাব বাহ্যিক পরিবর্তনের চেয়ে গভীর। এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, রক্তের চর্বি, শর্করার বিপাক এবং হৃদ্‌পেশির কাজ করার ধরন বদলে দিতে পারে। দীর্ঘদিন এসব পরিবর্তন চলতে থাকলে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ে।

তবে ওজন বেশি হলেই কারও হৃদ্‌রোগ আছে—এমন সিদ্ধান্ত ঠিক নয়। ঝুঁকি নির্ভর করে মেদের পরিমাণ ও অবস্থান, বয়স, বংশগত বৈশিষ্ট্য, ধূমপান, শারীরিক সক্রিয়তা এবং আগে থেকে থাকা রোগের ওপর। একই ওজনের দুজন মানুষের হৃদ্‌স্বাস্থ্য সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে।

স্থূলতা কেবল ইচ্ছাশক্তির অভাবের ফলও নয়। ঘুম, বংশগতি, কিছু ওষুধ, হরমোনের সমস্যা, খাদ্যপ্রাপ্যতা ও জীবনযাপনের পরিবেশ এতে ভূমিকা রাখে। তাই হৃদ্‌যন্ত্রের সুরক্ষায় প্রয়োজন দোষারোপের বদলে ব্যক্তির বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা।

পেটের মেদ কীভাবে রক্তনালির ক্ষতি করে

চামড়ার নিচে জমা মেদ এবং পেটের গভীরে অভ্যন্তরীণ অঙ্গের চারপাশে জমা মেদ একভাবে কাজ করে না। গভীরের মেদ বিপাকীয়ভাবে বেশি সক্রিয়। এটি এমন কিছু পদার্থ নিঃসরণ করে, যা শরীরে দীর্ঘস্থায়ী নিম্নমাত্রার প্রদাহ এবং রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

শর্করা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা

অতিরিক্ত মেদের কারণে কোষে শর্করা প্রবেশে সহায়ক হরমোনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। তখন রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে শরীরকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। এই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে দ্বিতীয় ধরনের বহুমূত্র রোগের ঝুঁকি বাড়ে। দীর্ঘদিন বেশি শর্করা রক্তনালির দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত করে হৃদ্‌রোগের আশঙ্কা আরও বাড়াতে পারে।

ধমনিতে আবরণ জমার প্রক্রিয়া

পেটের মেদের সঙ্গে রক্তে ক্ষতিকর চর্বিকণার অস্বাভাবিকতা প্রায়ই দেখা যায়। প্রদাহ ও এসব চর্বিকণা ধমনির দেয়ালে চর্বিসমৃদ্ধ আবরণ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এতে হৃদ্‌পেশিতে রক্ত সরবরাহকারী ধমনি সরু হতে পারে। কোনো আবরণ ফেটে তার ওপর রক্ত জমাট বাঁধলে রক্তপ্রবাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে হৃদ্‌পেশির অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এটি খাবারের তেল সরাসরি গিয়ে রক্তনালিতে আটকে যাওয়ার মতো সরল ঘটনা নয়; বরং বহুদিন ধরে চলা জটিল জৈবিক প্রক্রিয়া।

রক্তচাপ ও হৃদ্‌পেশির ওপর বাড়তি চাপ

শরীরের আকার বাড়লে অধিক টিস্যুতে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছাতে সাধারণত বেশি রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন হয়। হৃদ্‌যন্ত্রকে সেই চাহিদা মেটাতে বাড়তি কাজ করতে হয়। পাশাপাশি অতিরিক্ত মেদ স্নায়ুতন্ত্র, হরমোন এবং বৃক্কের লবণ-পানি নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলে রক্তচাপ বাড়াতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপ থাকলে হৃদ্‌যন্ত্রকে বেশি প্রতিরোধের বিপরীতে রক্ত পাঠাতে হয়। দীর্ঘদিন এমন চললে বিশেষ করে বাম নিলয়ের দেয়াল পুরু হয়ে যেতে পারে। প্রথম দিকে শরীর এভাবে বাড়তি কাজের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও পরে হৃদ্‌পেশি শক্ত হয়ে স্বাভাবিকভাবে শিথিল হতে অসুবিধা হতে পারে।

ফলে হৃদ্‌যন্ত্রে রক্ত ভরা এবং শরীরের চাহিদামতো রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। এই পরিস্থিতি হৃদ্‌যন্ত্রের অকার্যকারিতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। এর অর্থ হৃদ্‌যন্ত্র থেমে যাওয়া নয়; বরং প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করতে না পারা।

পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট, পা ফুলে যাওয়া, অস্বাভাবিক ক্লান্তি কিংবা শুয়ে থাকলে শ্বাস নিতে সমস্যা এর লক্ষণ হতে পারে। এসব উপসর্গকে শুধু ওজনের কারণে হচ্ছে ধরে নেওয়া উচিত নয়।

অনিয়মিত হৃদ্‌স্পন্দন ও ঘুমের শ্বাসবাধার সম্পর্ক

অতিরিক্ত মেদ হৃদ্‌যন্ত্রের বৈদ্যুতিক সংকেত চলাচল ও গঠনেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে হৃদ্‌যন্ত্রের ওপরের প্রকোষ্ঠে অনিয়মিত স্পন্দনের একটি ধরনের সঙ্গে স্থূলতার সম্পর্ক রয়েছে। উচ্চ রক্তচাপ, প্রকোষ্ঠ বড় হয়ে যাওয়া এবং হৃদ্‌যন্ত্রের আশপাশের মেদের প্রভাব এতে ভূমিকা রাখতে পারে।

এই অনিয়মিত স্পন্দনে কারও বুক ধড়ফড় করে, কারও দুর্বল লাগে, আবার কারও স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। কিছু ক্ষেত্রে প্রকোষ্ঠের ভেতরে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ে। সেই জমাট মস্তিষ্কে পৌঁছালে মস্তিষ্কের রক্তনালি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

ঘুমের মধ্যেও হৃদ্‌যন্ত্র চাপে থাকতে পারে

ঘাড় ও গলার আশপাশে মেদ জমলে ঘুমের সময় শ্বাসপথ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। ফলে বারবার শ্বাস বন্ধ হওয়া ও আবার শুরু হওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। এতে রক্তে অক্সিজেন কমে এবং শরীর বারবার সতর্ক অবস্থায় চলে যায়।

এই পুনরাবৃত্ত চাপ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ কঠিন করতে পারে। জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস আটকে যাওয়া এবং দিনে অতিরিক্ত ঘুম পাওয়া থাকলে মূল্যায়ন জরুরি। তবে নাক ডাকলেই যে এই রোগ আছে, তা নয়।

হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বুঝতে শুধু ওজন মাপা যথেষ্ট নয়

উচ্চতার তুলনায় ওজন বোঝার জন্য দেহভর সূচক ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই সূচক পেশি ও মেদের পার্থক্য কিংবা মেদ কোথায় জমেছে, তা সরাসরি জানায় না। পেশিবহুল ব্যক্তির সূচক বেশি হতে পারে; আবার মোট ওজন তুলনামূলক কম হলেও পেটে ক্ষতিকর মেদ জমে থাকতে পারে।

দক্ষিণ এশীয়দের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম দেহভর সূচকেও বিপাকীয় ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। তাই কোমরের মাপ, রক্তচাপ, রক্তের শর্করা ও চর্বির পরীক্ষা একসঙ্গে বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসক পারিবারিক ইতিহাস, ধূমপান, ঘুমের সমস্যা এবং চলাফেরার অভ্যাসও মূল্যায়ন করেন। প্রয়োজন অনুসারে হৃদ্‌যন্ত্রের পরীক্ষা করা হয়; শুধু ওজন বেশি বলেই সবার সব পরীক্ষা দরকার হয় না।

আরেকটি বিষয় হলো, সব ওজন বৃদ্ধি মেদ বৃদ্ধির কারণে হয় না। কয়েক দিনের মধ্যে দ্রুত ওজন বাড়ার সঙ্গে পা ফোলা বা শ্বাসকষ্ট থাকলে শরীরে পানি জমার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে আগে থেকে হৃদ্‌রোগ থাকলে এমন পরিবর্তনে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।

হৃদ্‌যন্ত্রের সুরক্ষায় কার্যকর পরিবর্তন

শুরুতেই অনেক ওজন কমানোর লক্ষ্য নেওয়ার প্রয়োজন নেই। অতিরিক্ত ওজন থাকা ব্যক্তির প্রাথমিক ওজনের প্রায় পাঁচ থেকে দশ শতাংশ কমলে অনেক ক্ষেত্রে রক্তচাপ, শর্করা ও রক্তের কিছু চর্বির মাত্রায় উপকার পাওয়া যায়। যেমন, নব্বই কিলোগ্রাম ওজনের কারও জন্য প্রাথমিকভাবে সাড়ে চার থেকে নয় কিলোগ্রাম কমানো অর্থবহ লক্ষ্য হতে পারে।

খাবারের পরিমাণ ও গুণমান

ভাত সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার বদলে পরিমাণ সামঞ্জস্য করে সঙ্গে শাকসবজি, ডাল, মাছ ও উপযুক্ত আমিষ বাড়ানো বাস্তবসম্মত। মিষ্টি পানীয়, অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, ঘন ঘন মিষ্টি এবং অতিরিক্ত লবণ কমানো দরকার। বাদাম ও তেল পুষ্টিকর হলেও পরিমাণের দিকে নজর রাখতে হবে।

নিয়মিত চলাফেরা

সক্ষম প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে অন্তত দেড়শ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক সক্রিয়তা একটি সাধারণ লক্ষ্য। দ্রুত হাঁটা এর সহজ উদাহরণ। নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন থেকে শুরু করলে অল্প সময় হাঁটুন এবং ধীরে বাড়ান। ওজন খুব বেশি না কমলেও নিয়মিত চলাফেরা হৃদ্‌স্বাস্থ্যের উপকার করে।

ঘুম, চিকিৎসা ও ধারাবাহিকতা

পর্যাপ্ত ঘুম, তামাক বর্জন এবং রক্তচাপ ও শর্করা নিয়ন্ত্রণ ওজন ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি চলতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ওজন কমানোর ওষুধ বা অস্ত্রোপচার বিবেচিত হতে পারে। নিজে থেকে অজানা ওষুধ খাওয়া বা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা নিরাপদ সমাধান নয়।

বুকে চাপ বা ব্যথার সঙ্গে ঘাম, শ্বাসকষ্ট, বমিভাব অথবা বাহু ও চোয়ালে ব্যথা হলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। হৃদ্‌যন্ত্রের যত্নের লক্ষ্য শুধু ওজনের সংখ্যায় পরিবর্তন নয়; বরং দৈনন্দিন সক্ষমতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে রোগের ঝুঁকি কমানো।