বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

আফ্রিকার জন্য প্রতিযোগিতা: মিশর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের ইতিহাস

সিরিজ: ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার

আফ্রিকার জন্য প্রতিযোগিতা: মিশর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের ইতিহাস
কায়রো থেকে কেপ—আফ্রিকায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের রক্তাক্ত ইতিহাস

উনিশ শতকের শুরুতে ইউরোপীয় শক্তিগুলো আফ্রিকার উপকূলের কিছু বন্দর, বাণিজ্যকেন্দ্র ও বসতি নিয়ন্ত্রণ করলেও মহাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল স্বাধীন আফ্রিকান রাজ্য, সাম্রাজ্য ও সমাজের অধীনে ছিল। কিন্তু ১৮৮০-এর দশক থেকে মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে ইউরোপীয় শক্তিগুলো প্রায় পুরো আফ্রিকাকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। ইতিহাসে এই দ্রুত দখলপ্রক্রিয়া “আফ্রিকার জন্য প্রতিযোগিতা” নামে পরিচিত। ব্রিটেন এতে সবচেয়ে সক্রিয় শক্তিগুলোর একটি ছিল। সুয়েজ খাল ও নীল নদ থেকে পূর্ব আফ্রিকার বন্দর, মধ্য আফ্রিকার খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চল এবং দক্ষিণ আফ্রিকার স্বর্ণ ও হীরার খনি পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যিক স্বার্থ বিস্তৃত হয়েছিল।

ব্রিটিশ সম্প্রসারণের পেছনে একক কারণ ছিল না। শিল্পবিপ্লবের পর ব্রিটিশ কারখানার জন্য কাঁচামাল, বিনিয়োগের ক্ষেত্র এবং নতুন বাজারের প্রয়োজন বেড়েছিল। বাণিজ্যপথ, বন্দর ও কয়লা সরবরাহকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ নৌবাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভারতীয় সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা ব্রিটিশ নীতির কেন্দ্রে থাকায় সুয়েজ খাল, লোহিত সাগর ও পূর্ব আফ্রিকার উপকূল বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব পায়। একই সঙ্গে ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম, পর্তুগাল ও ইতালির সম্প্রসারণ ব্রিটেনে এই আশঙ্কা তৈরি করে যে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে প্রতিদ্বন্দ্বীরা গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল দখল করে নেবে।

অভিযাত্রী, মিশনারি ও ভূগোলবিদেরাও সাম্রাজ্য বিস্তারের পথ তৈরি করেন। ডেভিড লিভিংস্টোনের মতো অভিযাত্রীরা আফ্রিকার অভ্যন্তরভাগ সম্পর্কে ইউরোপীয়দের জ্ঞান বাড়ান এবং বাণিজ্য ও খ্রিষ্টধর্মের মাধ্যমে দাসবাণিজ্য নির্মূলের কথা বলেন। কিন্তু মানবিক ও ধর্মীয় ভাষার আড়ালে বণিক, চার্টারপ্রাপ্ত কোম্পানি ও সরকার নতুন নদীপথ, খনিজসম্পদ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের সম্ভাবনা খুঁজছিল। “সভ্যতা”, “বাণিজ্য” ও “খ্রিষ্টধর্ম” সাম্রাজ্যিক প্রচারের জনপ্রিয় শব্দ হলেও বাস্তবে দখলের কেন্দ্রে ছিল ক্ষমতা, সম্পদ ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা।

১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল চালু হওয়ার পর মিশর ব্রিটেনের কাছে আফ্রিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়। ব্রিটেন থেকে ভারতে যাওয়ার দ্রুততম সমুদ্রপথ এই খালের মধ্য দিয়ে গেছে। ১৮৭৫ সালে ব্রিটিশ সরকার মিশরের খেদিভের সুয়েজ খাল কোম্পানির শেয়ার কিনে নেয়। মিশরের ঋণসংকট কাজে লাগিয়ে ব্রিটেন ও ফ্রান্স দেশটির অর্থনীতির ওপর যৌথ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধে আহমদ উরাবির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শক্তিশালী হলে ব্রিটেন ১৮৮২ সালে আলেকজান্দ্রিয়ায় গোলাবর্ষণ করে এবং তেল এল-কেবিরের যুদ্ধে মিশরীয় বাহিনীকে পরাজিত করে দেশটি দখল করে।

মিশর আনুষ্ঠানিকভাবে অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন থাকলেও প্রকৃত ক্ষমতা ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের হাতে চলে যায়। সুয়েজ খাল, নীল নদের সেচব্যবস্থা এবং তুলা উৎপাদন ব্রিটিশ নীতির প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। ব্রিটিশরা দখলকে সাময়িক বলে ঘোষণা করলেও কয়েক দশক সেখানে সেনা রেখে দেয়। মিশরের ওপর নিয়ন্ত্রণ ব্রিটেনকে ভূমধ্যসাগর থেকে লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগর পর্যন্ত সাম্রাজ্যিক যোগাযোগের প্রধান প্রবেশদ্বার দেয়।

মিশরের দক্ষিণে সুদান ছিল পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। মিশরীয় শাসনের বিরুদ্ধে মুহাম্মদ আহমদ নিজেকে মাহদি ঘোষণা করে ১৮৮১ সালে বিদ্রোহ শুরু করেন। তার অনুসারীরা দ্রুত সুদানের বড় অংশ দখল করেন। ১৮৮৫ সালে খার্তুম পতন এবং ব্রিটিশ জেনারেল চার্লস গর্ডনের মৃত্যু ব্রিটেনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কিছু সময় সুদান মাহদিবাদী রাষ্ট্রের অধীনে থাকলেও ব্রিটিশরা নীল নদ, মিশরের নিরাপত্তা এবং ফরাসি অগ্রগতির আশঙ্কায় অঞ্চলটি পুনর্দখলের সিদ্ধান্ত নেয়।

হার্বার্ট কিচেনারের নেতৃত্বে ব্রিটিশ-মিশরীয় বাহিনী রেলপথ, নৌযান, আধুনিক রাইফেল, কামান ও ম্যাক্সিম মেশিনগান ব্যবহার করে দক্ষিণে অগ্রসর হয়। ১৮৯৮ সালের ওমদুরমানের যুদ্ধে মাহদিবাদী বাহিনী অসাধারণ সাহস দেখালেও আধুনিক অস্ত্রের সামনে বিপর্যস্ত হয়। হাজার হাজার সুদানি যোদ্ধা নিহত হন, অথচ বিজয়ী বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলকভাবে খুব কম ছিল। এই যুদ্ধ প্রযুক্তিগত বৈষম্যের সাহায্যে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের অগ্রযাত্রার নির্মম উদাহরণ হয়ে ওঠে।

সুদান দখলের পর ফাশোদায় ব্রিটিশ ও ফরাসি বাহিনী মুখোমুখি হয়। ফ্রান্স পশ্চিম আফ্রিকা থেকে পূর্ব দিকে বিস্তার করে লোহিত সাগরে পৌঁছাতে চাইছিল, আর ব্রিটেন মিশর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যন্ত উত্তর-দক্ষিণ প্রভাববলয় গড়ার পরিকল্পনা করছিল। যুদ্ধের আশঙ্কা সৃষ্টি হলেও ফ্রান্স শেষ পর্যন্ত পিছু হটে। ১৮৯৯ সালে মিশর ও ব্রিটেনের যৌথ শাসনের নামে অ্যাংলো-মিশরীয় সুদান প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে বাস্তব কর্তৃত্ব ছিল ব্রিটিশদের হাতে। ফাশোদার ফল নীল উপত্যকায় ব্রিটিশ প্রাধান্য নিশ্চিত করে।

পূর্ব আফ্রিকায় ব্রিটিশ আগ্রহের কেন্দ্র ছিল ভারত মহাসাগরের উপকূল এবং নীল নদের উৎসাঞ্চল। জানজিবারের সুলতানের অধীন উপকূলীয় বন্দরগুলো দীর্ঘদিন আরব, আফ্রিকান ও ভারতীয় বণিকদের বাণিজ্যজগতের অংশ ছিল। ১৮৮০-এর দশকে ব্রিটিশ ও জার্মান শক্তি অঞ্চলটিকে নিজেদের প্রভাবক্ষেত্রে ভাগ করতে শুরু করে। ১৮৮৮ সালে ইম্পেরিয়াল ব্রিটিশ ইস্ট আফ্রিকা কোম্পানি বর্তমান কেনিয়ার উপকূলে প্রশাসন ও বাণিজ্যের দায়িত্ব পায়। কোম্পানি লাভজনক শাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হলে ব্রিটিশ সরকার ১৮৯৫ সালে পূর্ব আফ্রিকা রক্ষিত অঞ্চল ঘোষণা করে।

উগান্ডায় বুগান্ডা রাজ্য, মুসলিম, ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং ইউরোপীয় মিশনারিদের প্রতিযোগিতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। নীল নদের উৎস এবং মিশরের নিরাপত্তার যুক্তিতে ব্রিটেন ১৮৯৪ সালে উগান্ডাকে রক্ষিত অঞ্চল ঘোষণা করে। স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে চুক্তি, সামরিক হস্তক্ষেপ ও রাজনৈতিক বিভাজনের মাধ্যমে ব্রিটিশ প্রভাব বিস্তৃত হয়। বুগান্ডার রাজাকে আনুষ্ঠানিকভাবে রেখে পরোক্ষ শাসনের কাঠামো গড়ে তোলা হয়, যেখানে স্থানীয় প্রধানেরা ঔপনিবেশিক প্রশাসনের অধীন থেকে কর সংগ্রহ ও শাসন পরিচালনা করতেন।

মোম্বাসা থেকে ভিক্টোরিয়া হ্রদ পর্যন্ত উগান্ডা রেলপথ নির্মাণ ছিল পূর্ব আফ্রিকায় ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করার একটি বড় প্রকল্প। ১৮৯৬ থেকে ১৯০১ সালের মধ্যে নির্মিত এই রেলপথ সৈন্য, কর্মকর্তা ও পণ্য দ্রুত পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি করে। নির্মাণকাজে ব্রিটিশ ভারত থেকে আনা হাজার হাজার শ্রমিক অংশ নিয়েছিলেন। রোগ, দুর্ঘটনা ও কঠোর শ্রমপরিবেশে তাদের অনেকের মৃত্যু ঘটে। শ্রমিকদের একটি অংশ পরে পূর্ব আফ্রিকায় থেকে যান এবং সেখানে গুরুত্বপূর্ণ এশীয় জনগোষ্ঠী গড়ে তোলেন। নির্মাণের বিপুল ব্যয় নিয়ে সমালোচনার কারণে এটিকে কখনো “পাগলাটে রেলপথ” বলা হতো, কিন্তু পূর্ব আফ্রিকায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় এর ভূমিকা ছিল নির্ণায়ক।

রেলপথের পাশে বসতি, খামার ও প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে ওঠে। কেনিয়ার উর্বর উচ্চভূমির বিশাল অংশ ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারীদের জন্য বরাদ্দ করা হয় এবং কিকুয়ুসহ বিভিন্ন আফ্রিকান জনগোষ্ঠী জমি হারায়। কর আরোপ করে আফ্রিকানদের মজুরিশ্রমে প্রবেশে বাধ্য করা হয়। চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও শ্রম সরবরাহের জন্য পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা চালু হয়। রেলপথ ও বাণিজ্যিক কৃষিকে উন্নয়ন হিসেবে তুলে ধরা হলেও এগুলো প্রধানত ইউরোপীয় বসতি, রপ্তানি অর্থনীতি এবং ঔপনিবেশিক প্রশাসনের স্বার্থ পূরণ করেছিল।

দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্রিটিশ উপস্থিতি আরও আগে শুরু হয়। উত্তমাশা অন্তরীপের কেপ অঞ্চল ভারত ও পূর্ব এশিয়াগামী জাহাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নেপোলিয়নিক যুদ্ধের সময় ব্রিটেন ডাচ কেপ কলোনি দখল করে এবং ১৮১৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেয়। ব্রিটিশ আইন, ইংরেজি ভাষা এবং ১৮৩৪ সালে দাসত্ব বিলোপে অসন্তুষ্ট বহু ডাচভাষী বুর বসতি স্থাপনকারী উত্তরের অভ্যন্তরভাগে চলে যান। এই গ্রেট ট্রেকের মাধ্যমে নাটাল, ট্রান্সভাল ও অরেঞ্জ ফ্রি স্টেট অঞ্চলে নতুন বুর রাষ্ট্র গড়ে ওঠে।

বুর সম্প্রসারণ এবং ব্রিটিশ বসতি উভয়ই আফ্রিকান রাজ্যগুলোর ভূমি ও স্বাধীনতার সঙ্গে সংঘর্ষ সৃষ্টি করে। দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকায় জুলু রাজ্য ছিল শক্তিশালী সামরিক শক্তি। ১৮৭৯ সালে ব্রিটিশরা জুলুল্যান্ড আক্রমণ করে। ইসান্দলওয়ানার যুদ্ধে জুলু বাহিনী একটি বৃহৎ ব্রিটিশ সেনাদল ধ্বংস করে সাম্রাজ্যকে অপমানজনক পরাজয় উপহার দেয়। কিন্তু ব্রিটেন অতিরিক্ত সৈন্য ও অস্ত্র এনে পরে উলুন্ডির যুদ্ধে জুলুদের পরাজিত করে। রাজা সেতশোয়ায়োর রাষ্ট্র ভেঙে বিভক্ত করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত জুলুল্যান্ড ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে আসে।

১৮৬৭ সালে কিম্বার্লির কাছে হীরা এবং ১৮৮৬ সালে উইটওয়াটারস্র্যান্ডে স্বর্ণ আবিষ্কার দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনৈতিক গুরুত্ব আমূল বদলে দেয়। বিপুল আন্তর্জাতিক পুঁজি ও অভিবাসী খনি অঞ্চলে প্রবেশ করে। সেসিল রোডস হীরার ব্যবসায় বিরাট সম্পদ অর্জন করে ডি বিয়ার্স প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরে কেপ কলোনির প্রধানমন্ত্রী হন। তার স্বপ্ন ছিল কায়রো থেকে কেপ পর্যন্ত ব্রিটিশ প্রভাব, টেলিগ্রাফ ও রেলযোগাযোগের একটি বিশাল অক্ষ নির্মাণ করা।

রোডসের ব্রিটিশ সাউথ আফ্রিকা কোম্পানি ১৮৮৯ সালে রাজকীয় সনদ পায়। কোম্পানিটি চুক্তি, প্রতারণা ও সামরিক শক্তি ব্যবহার করে লিম্পোপো নদীর উত্তরের অঞ্চল দখল করে, যা পরে রোডেশিয়া নামে পরিচিত হয়। ১৮৯০ সালে অগ্রবর্তী বসতি স্থাপনকারী দল বর্তমান জিম্বাবুয়েতে প্রবেশ করে। নেদেবেলে রাজা লোবেঙ্গুলার সঙ্গে দ্বন্দ্বের পর ১৮৯৩–৯৪ সালের যুদ্ধে কোম্পানির বাহিনী ম্যাক্সিম মেশিনগান ব্যবহার করে নেদেবেলে শক্তিকে পরাজিত করে। ১৮৯৬–৯৭ সালে শোনা ও নেদেবেলে জনগণের বৃহৎ প্রতিরোধও নির্মমভাবে দমন করা হয়।

উত্তর ও দক্ষিণ রোডেশিয়ায় জমি, খনিজ অধিকার ও শ্রমের ওপর কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। আফ্রিকানদের সংরক্ষিত এলাকায় সরিয়ে ইউরোপীয় বসতি ও খনি সম্প্রসারণ করা হয়। কুঁড়েঘর কর এবং অন্যান্য কর নগদ অর্থে দিতে বাধ্য করায় বহু মানুষ খনি ও খামারে মজুর হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হন। এভাবে সাম্রাজ্যিক ভূখণ্ড দখলের সঙ্গে একটি জাতিগতভাবে বিভক্ত শ্রমব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যা পরবর্তী দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী অর্থনীতির ভিত্তিকে শক্তিশালী করে।

স্বর্ণসমৃদ্ধ ট্রান্সভালকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ ও বুর প্রজাতন্ত্রগুলোর সংঘাত তীব্র হয়। ১৮৮০–৮১ সালের প্রথম ইঙ্গ-বুর যুদ্ধে বুররা ব্রিটেনকে পরাজিত করে সীমিত স্বাধীনতা রক্ষা করেছিল। কিন্তু স্বর্ণ আবিষ্কারের পর ট্রান্সভালে ব্রিটিশ ও অন্যান্য বিদেশি শ্রমিক ও ব্যবসায়ীর সংখ্যা বাড়ে। তাদের রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন, খনিশিল্পের নিয়ন্ত্রণ, রোডসের সম্প্রসারণবাদ এবং ১৮৯৫–৯৬ সালের ব্যর্থ জেমসন অভিযানের ফলে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়।

১৮৯৯ সালে দ্বিতীয় ইঙ্গ-বুর যুদ্ধ শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে বুর বাহিনী কয়েকটি ব্রিটিশ শহর অবরোধ করে সাফল্য পায়। পরে বিপুলসংখ্যক সৈন্য এনে ব্রিটেন প্রধান শহর ও রেলপথ দখল করে। বুররা গেরিলা যুদ্ধ শুরু করলে ব্রিটিশ বাহিনী খামার পুড়িয়ে দেওয়া, খাদ্য ধ্বংস এবং বেসামরিক মানুষকে বন্দিশিবিরে পাঠানোর নীতি গ্রহণ করে। দুর্বল খাদ্য, রোগ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে শিবিরগুলোতে হাজার হাজার বুর নারী ও শিশু মারা যায়। পৃথক শিবিরে বন্দী কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানদেরও বিপুল প্রাণহানি ঘটে।

১৯০২ সালের ভেরেনিজিং চুক্তিতে ট্রান্সভাল ও অরেঞ্জ ফ্রি স্টেট ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। ১৯১০ সালে কেপ, নাটাল, ট্রান্সভাল ও অরেঞ্জ রিভার কলোনি যুক্ত হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ইউনিয়ন গঠন করে। এটি স্বশাসিত ডোমিনিয়ন হলেও ক্ষমতা মূলত শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ ও আফ্রিকানারদের মধ্যে ভাগ হয়। কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভোটাধিকার ও ভূমির অধিকার কঠোরভাবে সীমিত ছিল। ১৯১৩ সালের ভূমি আইন দেশের অধিকাংশ জমি শ্বেতাঙ্গদের জন্য সংরক্ষিত করে ভবিষ্যৎ বর্ণবৈষম্য ও বর্ণবাদী শাসনের ভিত্তি আরও শক্ত করে।

আফ্রিকার উপনিবেশ ভাগাভাগিতে ১৮৮৪–৮৫ সালের বার্লিন সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জার্মান চ্যান্সেলর অটো ফন বিসমার্কের আহ্বানে ইউরোপীয় শক্তিগুলো বাণিজ্য, কঙ্গো অববাহিকা ও উপকূল দখলের নিয়ম নিয়ে আলোচনা করে। কোনো আফ্রিকান প্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। সম্মেলন সরাসরি আফ্রিকার সম্পূর্ণ মানচিত্র ভাগ করেনি, কিন্তু শুধু কাগুজে দাবি নয়—কার্যকর দখল প্রতিষ্ঠার নীতি প্রতিযোগিতা ত্বরান্বিত করে। ইউরোপীয়রা মানচিত্রে সীমান্ত টেনে বহু জাতি ও রাজনৈতিক সমাজকে বিভক্ত কিংবা পরস্পরের সঙ্গে জুড়ে দেয়।

ব্রিটেন পশ্চিম আফ্রিকায় নাইজেরিয়া, গোল্ড কোস্ট, সিয়েরা লিওন ও গাম্বিয়াতেও কর্তৃত্ব বিস্তার করেছিল। রয়্যাল নাইজার কোম্পানি বাণিজ্যচুক্তি ও সশস্ত্র অভিযানের মাধ্যমে নাইজার অববাহিকায় প্রভাব গড়ে তোলে। পরে ব্রিটিশ সরকার অঞ্চলটির প্রশাসন গ্রহণ করে। ১৮৯৭ সালে বেনিন নগরীতে শাস্তিমূলক অভিযান চালিয়ে প্রাসাদ ধ্বংস, বিপুল শিল্পসম্পদ লুণ্ঠন এবং রাজ্য দখল করা হয়। আশান্তি রাষ্ট্রও দীর্ঘ প্রতিরোধের পর ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে আসে। এসব বিজয় আফ্রিকায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সামগ্রিক আকার আরও বাড়ায়।

তবু বহুল প্রচারিত “কায়রো থেকে কেপ” পরিকল্পনা কখনো সম্পূর্ণ অবিচ্ছিন্ন ব্রিটিশ ভূখণ্ডে বাস্তবায়িত হয়নি। জার্মান পূর্ব আফ্রিকা বর্তমান তানজানিয়ার বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করত; বেলজীয় কঙ্গো এবং পর্তুগিজ অ্যাঙ্গোলা ও মোজাম্বিকও ব্রিটিশ উত্তর-দক্ষিণ রেখার মাঝে ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মান উপনিবেশগুলোর পুনর্বণ্টনে ব্রিটিশ প্রভাব বাড়লেও কায়রো-কেপ সাম্রাজ্য মূলত একটি কৌশলগত স্বপ্ন এবং প্রচারমূলক ধারণাই থেকে যায়।

আফ্রিকায় ব্রিটিশ দখল কখনো বিনা প্রতিরোধে ঘটেনি। জুলু, আশান্তি, মাহদিবাদী সুদানি, নেদেবেলে, শোনা, কিকুয়ু, বুগান্ডা এবং অসংখ্য জনগোষ্ঠী নানা পদ্ধতিতে প্রতিরোধ করেছিল। কেউ প্রকাশ্য যুদ্ধে লড়েছে, কেউ গেরিলা অভিযান, কর প্রত্যাখ্যান, শ্রম এড়ানো কিংবা সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আন্দোলনের মাধ্যমে বিরোধিতা করেছে। ইউরোপীয় অস্ত্র, অর্থ ও যোগাযোগব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিরোধ দমন সহজ করলেও আফ্রিকান জনগণ নিষ্ক্রিয়ভাবে দখল মেনে নেয়নি।

ব্রিটিশ শাসনে রেলপথ, বন্দর, টেলিগ্রাফ ও কিছু প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নির্মিত হয়েছিল, কিন্তু এসবের প্রধান নকশা ছিল খনি, বাণিজ্যিক খামার ও অভ্যন্তরীণ কাঁচামালকে উপকূলীয় বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করা। উপনিবেশের অর্থনীতিকে স্বনির্ভর শিল্পায়নের পরিবর্তে তুলা, কোকো, চা, কফি, স্বর্ণ, হীরা ও তামার মতো রপ্তানিপণ্যের ওপর নির্ভরশীল করা হয়। নতুন কর, ভূমি বাজেয়াপ্ত ও বাধ্যতামূলক শ্রমব্যবস্থা বহু আফ্রিকান সমাজের জীবিকা ও সামাজিক কাঠামো বদলে দেয়।

মিশর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কোনো একক পরিকল্পনা বা একটিমাত্র যুদ্ধের মাধ্যমে গড়ে ওঠেনি। এটি সুয়েজের কৌশলগত মূল্য, নীল নদের নিয়ন্ত্রণ, পূর্ব আফ্রিকার রেলপথ, চার্টারপ্রাপ্ত কোম্পানি, দক্ষিণের খনিজসম্পদ, বসতি স্থাপন এবং ইউরোপীয় প্রতিযোগিতার সম্মিলিত ফল ছিল। এর সীমানা নির্ধারিত হয়েছিল আফ্রিকান জনগণের সম্মতি ছাড়া এবং এর সমৃদ্ধির বড় অংশ গড়ে উঠেছিল তাদের ভূমি ও শ্রমের ওপর। সাম্রাজ্যের মানচিত্রে বিশাল গোলাপি অঞ্চল ব্রিটিশ ক্ষমতার গৌরব দেখালেও সেই রঙের নিচে লুকিয়ে ছিল যুদ্ধ, উচ্ছেদ, অর্থনৈতিক শোষণ এবং বিভক্ত সীমান্তের দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার।