বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

বক্সার প্রোটোকল কী? ১৯০১ সালের অসম চুক্তি কীভাবে চীনের ইতিহাস বদলে দিয়েছিল

Series: বক্সার প্রোটোকল: চীনের অপমান, বিদেশি শক্তি ও এক অসম চুক্তির ইতিহাস

  • Author: Admin
  • August 14, 2026
বক্সার প্রোটোকল কী? ১৯০১ সালের অসম চুক্তি কীভাবে চীনের ইতিহাস বদলে দিয়েছিল
বক্সার প্রোটোকল কী?

উনিশ শতকের শেষ দিকে চীন ছিল এক অদ্ভুত সংকটের মধ্যে আটকে থাকা বিশাল সাম্রাজ্য। কাগজে-কলমে দেশটি তখনও চিং রাজবংশের অধীনে স্বাধীন সাম্রাজ্য, কিন্তু বাস্তবে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, জাপানসহ বিভিন্ন বিদেশি শক্তি চীনের বন্দর, বাণিজ্য, ভূখণ্ড ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করছিল। এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে জমে ওঠা ক্ষোভ থেকেই জন্ম নিয়েছিল বক্সার আন্দোলন। কিন্তু সেই আন্দোলনের পরিণতিতে চীন যে চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়, সেটিই ইতিহাসে বক্সার প্রোটোকল নামে পরিচিত। ১৯০১ সালের এই চুক্তি শুধু একটি বিদ্রোহের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটায়নি; এটি চিং সাম্রাজ্যের দুর্বলতা প্রকাশ করে এবং চীনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

বক্সার প্রোটোকলের পটভূমি বুঝতে হলে উনিশ শতকের চীনের পরিস্থিতি বুঝতে হয়। আফিম যুদ্ধের পর থেকেই বিদেশি শক্তিগুলো একের পর এক চুক্তির মাধ্যমে চীনে বিশেষ বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করেছিল। বিভিন্ন বন্দর বিদেশিদের জন্য খুলে দেওয়া হয়, বিদেশি নাগরিকেরা বিশেষ আইনি সুবিধা লাভ করে এবং মিশনারি কার্যক্রম দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। একই সময়ে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক সংকট ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ বাড়ছিল।

এই পরিবেশে উত্তর চীনে গড়ে ওঠে ইহেচুয়ান নামে পরিচিত একটি আন্দোলন, যাদের পশ্চিমারা সাধারণভাবে “বক্সার” নামে ডাকত। তাদের মধ্যে বিদেশি প্রভাব ও খ্রিস্টান মিশনারিদের বিরুদ্ধে তীব্র বিরোধিতা ছিল। আন্দোলন দ্রুত সহিংস হয়ে ওঠে। বিদেশি মিশনারি এবং চীনা খ্রিস্টানদের ওপর হামলা চালানো হয়, রেলপথ ও টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত সংকট বেইজিং পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

১৯০০ সালের জুনে বেইজিংয়ের বিদেশি দূতাবাস এলাকা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। চিং দরবারের ভেতরেও বক্সারদের নিয়ে গভীর বিভাজন ছিল। কেউ আন্দোলন দমন করতে চেয়েছিলেন, আবার দরবারের শক্তিশালী একটি অংশ মনে করেছিল বক্সারদের কাজে লাগিয়ে বিদেশিদের চীন থেকে বিতাড়িত করা সম্ভব। সম্রাজ্ঞী বিধবা সিশির সরকার শেষ পর্যন্ত বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক যুদ্ধে রূপ নেয়।

এর প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি নিয়ে গঠিত আট-জাতি জোট সামরিক অভিযান শুরু করে। বিদেশি বাহিনী উত্তর চীনে অগ্রসর হয়ে ১৯০০ সালের আগস্টে বেইজিং দখল করে। চিং রাজদরবার রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে যায়। রাজধানীতে বিদেশি সেনাদের প্রবেশ চীনের জন্য শুধু সামরিক পরাজয় ছিল না; এটি ছিল সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক অসহায়তার প্রকাশ।

এরপর শুরু হয় শান্তি আলোচনার দীর্ঘ প্রক্রিয়া। বিদেশি শক্তিগুলো এমন শর্ত সামনে আনে, যা চিং সরকার কার্যত প্রত্যাখ্যান করার অবস্থায় ছিল না। অবশেষে ১৯০১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর চিং সাম্রাজ্য এবং বিদেশি শক্তিগুলোর প্রতিনিধিদের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি “Final Protocol” হিসেবে পরিচিত হলেও ইতিহাসে এটি Boxer Protocol বা বক্সার প্রোটোকল নামেই বেশি পরিচিত।

চুক্তিটির সবচেয়ে আলোচিত শর্ত ছিল বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ। চীনকে ৪৫০ মিলিয়ন হাইকওয়ান তায়েল রৌপ্য ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হয়। সংখ্যাটি ছিল প্রতীকীভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ—তৎকালীন চীনের জনসংখ্যার আনুমানিক হিসাবে প্রায় প্রত্যেক মানুষের জন্য এক তায়েল ধরে এই অঙ্ক নির্ধারণের ব্যাখ্যা প্রচলিত ছিল। কিন্তু চীনের প্রকৃত আর্থিক বোঝা ৪৫০ মিলিয়ন তায়েলেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

এই অর্থ ৩৯ বছরের মধ্যে সুদসহ পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয়। বার্ষিক চার শতাংশ সুদের কারণে শেষ পর্যন্ত মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ মূল ক্ষতিপূরণের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ানোর কথা ছিল। অর্থ সংগ্রহের জন্য চীনের শুল্ক ও অন্যান্য সরকারি রাজস্বের ওপর চাপ বাড়ে। ফলে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের মূল্য শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় চীনের অর্থনীতি ও জনগণকে।

কিন্তু বক্সার প্রোটোকল শুধু অর্থ আদায়ের চুক্তি ছিল না। এর রাজনৈতিক ও সামরিক শর্তগুলো আরও অপমানজনক বলে বিবেচিত হয়েছিল।

বেইজিংয়ের বিদেশি দূতাবাস এলাকাকে বিশেষভাবে সুরক্ষিত অঞ্চলে পরিণত করা হয়। সেখানে বিদেশি শক্তিগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সেনা মোতায়েনের অধিকার লাভ করে এবং চীনা নাগরিকদের বসবাসের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। অর্থাৎ চীনের রাজধানীর মধ্যেই এমন একটি অঞ্চল তৈরি হয় যেখানে বিদেশি শক্তির সামরিক উপস্থিতি স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

বিদেশি শক্তিগুলো বেইজিং থেকে সমুদ্রের দিকে যোগাযোগপথ রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থানে সৈন্য মোতায়েনের অধিকারও পায়। বিশেষ করে রাজধানী ও উপকূলীয় অঞ্চলের মধ্যবর্তী কৌশলগত পথ বিদেশি বাহিনীর নাগালের মধ্যে চলে আসে। নিজের রাজধানীর নিরাপত্তা ও যোগাযোগব্যবস্থার ওপর একটি স্বাধীন সরকারের যে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা, চিং সাম্রাজ্য সেই ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারায়।

চুক্তিতে চীনের কিছু প্রতিরক্ষা স্থাপনা ধ্বংস করার ব্যবস্থাও ছিল। বিশেষভাবে তাকু বা দাগু দুর্গগুলো, যেগুলো সমুদ্রপথে তিয়ানজিন ও বেইজিংয়ের দিকে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ফলে ভবিষ্যতে বিদেশি শক্তির সামরিক প্রবেশ ঠেকানোর ক্ষেত্রে চীনের সক্ষমতা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।

বক্সার আন্দোলনকে সমর্থন বা বিদেশিদের বিরুদ্ধে সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত বলে বিবেচিত বেশ কিছু চীনা কর্মকর্তাকে শাস্তি দেওয়ার শর্তও ছিল। কারও মৃত্যুদণ্ড হয়, কেউ নির্বাসিত হন, আবার কারও পদমর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয়। যেসব এলাকায় বিদেশিদের বিরুদ্ধে গুরুতর সহিংসতা ঘটেছিল, সেখানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সরকারি পরীক্ষার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। চীনের ঐতিহ্যবাহী আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই পরীক্ষা ছিল সামাজিক মর্যাদা ও সরকারি চাকরিতে প্রবেশের প্রধান পথ। তাই এই নিষেধাজ্ঞার ছিল গভীর প্রতীকী তাৎপর্য।

আরও অপমানজনক ছিল বিদেশি দেশগুলোর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রকাশের ব্যবস্থা। জার্মান রাষ্ট্রদূত ক্লেমেন্স ফন কেটেলার বক্সার সংকটের সময় বেইজিংয়ে নিহত হয়েছিলেন। তার মৃত্যুর জন্য জার্মানির কাছে ক্ষমা প্রকাশ করতে চীনকে বিশেষ প্রতিনিধি পাঠাতে হয়। একইভাবে জাপানি দূতাবাসের কর্মকর্তা সুগিয়ামা আকিরার হত্যার ঘটনাতেও আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

এসব শর্ত একত্রে বিবেচনা করলে বোঝা যায় কেন বক্সার প্রোটোকলকে চীনের ইতিহাসে তথাকথিত “অসম চুক্তি” ব্যবস্থার অন্যতম কঠোর উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। দুই সমান শক্তির মধ্যে স্বাভাবিক সমঝোতার পরিবর্তে এটি ছিল সামরিকভাবে পরাজিত একটি রাষ্ট্রের ওপর বিজয়ী বিদেশি শক্তিগুলোর চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থা।

তবে এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব সম্ভবত অর্থ বা ভূরাজনীতির চেয়েও গভীরে ছিল। বক্সার সংকট চীনের জনগণের সামনে চিং রাজবংশের দুর্বলতাকে নির্মমভাবে উন্মোচিত করে দেয়। সাম্রাজ্য বিদেশি শক্তিকে ঠেকাতে পারেনি, বক্সার আন্দোলনকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি এবং শেষ পর্যন্ত রাজধানী পর্যন্ত রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছিল। পরাজয়ের পর আবার সেই সরকারকেই বিপুল ক্ষতিপূরণ ও রাজনৈতিক ছাড় মেনে নিতে হয়।

এই পরিস্থিতি চিং শাসকদেরও বুঝতে বাধ্য করে যে পুরোনো ব্যবস্থায় সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রাখা কঠিন। বক্সার সংকটের পর সরকার “নতুন নীতি” বা শিনঝেং সংস্কার শুরু করে। সেনাবাহিনী আধুনিকীকরণ, শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং পশ্চিমা ধাঁচের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। শতাব্দীপ্রাচীন সাম্রাজ্যিক পরীক্ষা ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত ১৯০৫ সালে বিলুপ্ত করা হয়।

কিন্তু এই সংস্কারগুলো একটি মৌলিক সমস্যার সমাধান করতে পারেনি—চিং রাজবংশের প্রতি জনগণের আস্থা দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছিল। বিদেশি শক্তির কাছে বারবার পরাজয়, অর্থনৈতিক চাপ এবং বক্সার প্রোটোকলের অপমান নতুন ধরনের জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করে। বিপ্লবীরা যুক্তি দিতে শুরু করেন যে শুধু সংস্কার করে নয়, পুরো রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করেই চীনকে পুনর্গঠন করতে হবে।

এই পরিবেশে সুন ইয়াত-সেনসহ বিপ্লবী নেতাদের আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়। বিদেশি আধিপত্যের বিরোধিতা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের দাবি ক্রমে চীনা রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত হয়। মাত্র দশ বছর পর, ১৯১১ সালের সিনহাই বিপ্লব চিং রাজবংশের পতনের পথ খুলে দেয় এবং ১৯১২ সালে দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন রাজবংশের মাধ্যমে চলা চীনা সাম্রাজ্যিক শাসনের অবসান ঘটে।

বক্সার প্রোটোকলের ক্ষতিপূরণের ইতিহাসও পরবর্তী সময়ে নতুন মোড় নেয়। বিভিন্ন দেশ তাদের প্রাপ্য অর্থ নিয়ে ভিন্ন নীতি গ্রহণ করে এবং কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের অর্থের অংশ চীনা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও অন্যান্য প্রকল্পে ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেরত দেওয়া ক্ষতিপূরণের একটি অংশ চীনা শিক্ষার্থীদের আমেরিকায় পড়াশোনার সুযোগ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, যার সঙ্গে পরবর্তীকালে সিংহুয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিকাশের ইতিহাসও যুক্ত হয়ে যায়। ফলে মূলত শাস্তিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি অংশ পরবর্তী সময়ে চীনের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার বিকাশের সঙ্গেও অপ্রত্যাশিতভাবে সম্পর্কিত হয়ে পড়ে।

তবু বৃহত্তর ঐতিহাসিক স্মৃতিতে বক্সার প্রোটোকল শিক্ষা সহায়তার জন্য নয়, বরং জাতীয় অপমানের প্রতীক হিসেবেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি এমন এক সময়ের প্রতিনিধিত্ব করে যখন বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো চীনের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে দেশটির সার্বভৌম ক্ষমতার ওপর গভীর হস্তক্ষেপ করতে সক্ষম হয়েছিল।

একই সঙ্গে ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক শিক্ষা দেয়। বক্সার আন্দোলনের বিদেশিবিরোধী আবেগের পেছনে বাস্তব রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষোভ থাকলেও নির্বিচার সহিংসতা এবং আধুনিক সামরিক শক্তি সম্পর্কে ভুল ধারণা শেষ পর্যন্ত চীনকে আরও ভয়াবহ অবস্থায় ঠেলে দেয়। অন্যদিকে বিদেশি শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়া শুধু নিজেদের নাগরিকদের উদ্ধার বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বিজয়ের পর তারা এমন রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করে যা চীনের সার্বভৌমত্বকে আরও সংকুচিত করে।

তাই ১৯০১ সালের বক্সার প্রোটোকলকে কেবল একটি শান্তিচুক্তি হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি ছিল উনিশ শতকের সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় চীনের দুর্বল অবস্থানের এক নির্মম দলিল। এর মাধ্যমে বিপুল ক্ষতিপূরণের বোঝা চাপানো হয়, রাজধানীতে বিদেশি সামরিক উপস্থিতি বৈধতা পায়, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করা হয় এবং চিং সরকারের রাজনৈতিক মর্যাদা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সবচেয়ে বড় কথা, এই অপমান চীনের ভেতরে একটি প্রশ্নকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছিল—এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা কি টিকে থাকার যোগ্য, যে নিজের রাজধানী, অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্ব বিদেশি শক্তির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই পরবর্তী দশকে সংস্কার, জাতীয়তাবাদ ও বিপ্লবের শক্তিগুলো দ্রুত বিস্তার লাভ করে। এই অর্থে বক্সার প্রোটোকল শুধু বক্সার বিদ্রোহের সমাপ্তি নয়; এটি চিং সাম্রাজ্যের শেষ অধ্যায় এবং আধুনিক চীনের জন্মযন্ত্রণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচনাবিন্দু।