বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

আক্কাদীয় সাম্রাজ্য: ইতিহাসের প্রথম সাম্রাজ্য কেন হঠাৎ ভেঙে পড়েছিল?

সিরিজ: হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন সভ্যতার রহস্য

আক্কাদীয় সাম্রাজ্য: ইতিহাসের প্রথম সাম্রাজ্য কেন হঠাৎ ভেঙে পড়েছিল?
আক্কাদীয় সাম্রাজ্য

মানব ইতিহাসে এমন বহু রাজা ছিলেন যারা প্রতিবেশী নগর বা রাজ্য জয় করেছিলেন। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে মেসোপটেমিয়ায় এমন এক শাসকের আবির্ভাব ঘটে, যিনি বিজয়ের ধারণাকেই নতুন মাত্রা দেন। তাঁর নাম সারগন অব আক্কাদ। দক্ষিণের সুমেরীয় নগররাষ্ট্রগুলোকে পরাজিত করে তিনি এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন নগর এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চল একই রাজশক্তির অধীনে আসে। এই কারণেই আক্কাদীয় সাম্রাজ্যকে সাধারণত মানব ইতিহাসের প্রথম বৃহৎ ভূখণ্ডভিত্তিক সাম্রাজ্যগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কিন্তু এর উত্থান যতটা নাটকীয়, পতন তার চেয়েও রহস্যময়। সারগনের বিজয়ের প্রায় দুই শতাব্দীর মধ্যেই আক্কাদীয় কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ভেঙে পড়ে। একসময় যে রাজারা নিজেদের পৃথিবীর চার দিকের অধিপতি হিসেবে উপস্থাপন করতেন, তাদের উত্তরসূরিরা বিদ্রোহ, বহিরাগত আক্রমণ এবং রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মুখে সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। প্রত্নতাত্ত্বিক ও পরিবেশগত গবেষণা আবার এই পতনের সময়ের কাছাকাছি ভয়াবহ শুষ্কতার একটি পর্যায়ের ইঙ্গিত দিয়েছে। ফলে প্রশ্নটি আজও গুরুত্বপূর্ণ—আক্কাদকে কি শত্রুরা ধ্বংস করেছিল, নাকি প্রকৃতি ও সাম্রাজ্যের নিজস্ব দুর্বলতা মিলেই তার পতন ঘটিয়েছিল?

আক্কাদীয় সাম্রাজ্যের জন্ম বোঝার জন্য তার আগের মেসোপটেমিয়াকে দেখতে হয়। দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ায় উরুক, উর, লাগাশ, উম্মা ও কিশের মতো সুমেরীয় নগররাষ্ট্র ছিল। তাদের নিজস্ব শাসক, মন্দির, কৃষিজমি এবং সেনাবাহিনী ছিল। একই সংস্কৃতির অনেক বৈশিষ্ট্য ভাগ করে নিলেও রাজনৈতিকভাবে তারা প্রায়ই একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। পানি, কৃষিজমি, বাণিজ্যপথ এবং মর্যাদা নিয়ে সংঘর্ষ চলত।

এই বিভক্ত রাজনৈতিক পরিবেশেই সারগনের উত্থান। তাঁর শৈশব সম্পর্কে পরবর্তী যুগের কাহিনিতে বহু কিংবদন্তি যুক্ত হয়েছে। একটি বিখ্যাত কাহিনিতে বলা হয়, শিশুকালে তাঁকে ঝুড়িতে রেখে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং পরে একজন পানি সংগ্রাহক তাঁকে লালন করেন। এসব গল্প ঐতিহাসিক জীবনী হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। তবে এগুলো প্রমাণ করে যে সারগন পরবর্তী মেসোপটেমীয় সংস্কৃতিতে কিংবদন্তিতুল্য বিজেতায় পরিণত হয়েছিলেন।

সারগনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজন ছিলেন উরুকের শাসক লুগালজাগেসি। তিনি ইতিমধ্যেই দক্ষিণের একাধিক নগরের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সারগন তাঁকে পরাজিত করেন এবং উরুক, উর ও লাগাশসহ গুরুত্বপূর্ণ সুমেরীয় কেন্দ্রগুলো নিজের অধীনে আনেন। প্রাচীন রাজকীয় শিলালিপিতে তাঁর বিজয়কে অত্যন্ত নাটকীয় ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে।

সারগনের সাফল্যের বিশেষত্ব ছিল শুধু নগর জয় নয়; জয় করা অঞ্চলকে একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে ধরে রাখার চেষ্টা। তিনি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে নিজের অনুগত কর্মকর্তা ও শাসক নিযুক্ত করেন, সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখেন এবং মন্দির ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের ওপর রাজকীয় প্রভাব বিস্তার করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজধানী ছিল আক্কাদ বা আগাদে। আশ্চর্যজনকভাবে, এত গুরুত্বপূর্ণ নগর হওয়া সত্ত্বেও এর সুনির্দিষ্ট অবস্থান আজও নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়নি।

সাম্রাজ্যের বিস্তার সম্পর্কে আক্কাদীয় রাজকীয় শিলালিপি কখনো অতিরঞ্জিত ভাষা ব্যবহার করেছে, তাই প্রাচীন দাবিগুলোকে আধুনিক মানচিত্রের নির্ভুল সীমান্ত হিসেবে দেখা ঠিক নয়। তারপরও আক্কাদীয় রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব দক্ষিণ মেসোপটেমিয়া থেকে উত্তরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। সিরিয়া ও উচ্চ মেসোপটেমিয়ার সঙ্গে তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ ছিল। একটি নগরের রাজা থেকে বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের সম্রাট—মেসোপটেমীয় রাজনীতিতে এটি ছিল বিশাল পরিবর্তন।

এই সাম্রাজ্য চালাতে শুধু সেনাবাহিনী যথেষ্ট ছিল না। প্রয়োজন ছিল খাদ্য, কর, শ্রম, কর্মকর্তা এবং যোগাযোগব্যবস্থার। কিউনিফর্ম মাটির ফলকভিত্তিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জমি, শস্য, পশু, শ্রম ও বিভিন্ন পণ্যের হিসাব রাখা হতো। স্থানীয় প্রশাসনকে বৃহত্তর রাজশক্তির সঙ্গে যুক্ত করার ফলে আক্কাদীয়রা পূর্ববর্তী সুমেরীয় প্রশাসনিক ঐতিহ্যকে আরও বৃহৎ রাজনৈতিক কাঠামোয় ব্যবহার করতে সক্ষম হয়।

সারগনের শাসন শেষ হওয়ার পরেই অবশ্য সাম্রাজ্যের দুর্বলতা প্রকাশ পেতে শুরু করে। তাঁর পুত্র রিমুশ ক্ষমতায় এসে বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্রোহের মুখোমুখি হন। রাজকীয় শিলালিপিতে দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার বিদ্রোহ দমনের উল্লেখ রয়েছে। এর অর্থ গুরুত্বপূর্ণ—সারগনের বিশাল বিজয় সত্ত্বেও সাম্রাজ্যের অধীন নগরগুলো নিজেদের স্বাধীন রাজনৈতিক পরিচয় ভুলে যায়নি। কেন্দ্রীয় ক্ষমতা সামান্য দুর্বল হলেই বিদ্রোহের সম্ভাবনা তৈরি হতো।

রিমুশের পরে মানিশতুশু এবং তারপর সারগনের নাতি নারাম-সিন ক্ষমতায় আসেন। নারাম-সিন আক্কাদীয় সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বিখ্যাত শাসকদের একজন। তাঁর শাসনামলে সাম্রাজ্য আবার সামরিক শক্তির শীর্ষে পৌঁছায়। বিখ্যাত নারাম-সিন বিজয়স্তম্ভে তাঁকে পাহাড়ের দিকে অগ্রসরমান বিজয়ী শাসক হিসেবে দেখানো হয়েছে। তিনি নিজেকে শুধু রাজা হিসেবে নয়, অসাধারণ ঐশ্বরিক মর্যাদাসম্পন্ন শাসক হিসেবেও উপস্থাপন করেন।

নারাম-সিনের শাসনেই রাজকীয় আদর্শের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়। তাঁর সঙ্গে যুক্ত উপাধিগুলোর মধ্যে “চার দিকের রাজা” ধারণা সাম্রাজ্যবাদী সার্বভৌমত্বের অসাধারণ প্রকাশ। আক্কাদীয় রাজা আর শুধু একটি নগরের অভিভাবক নন; তিনি নিজেকে পরিচিত পৃথিবীর বৃহত্তর অংশের ওপর কর্তৃত্বের দাবিদার হিসেবে তুলে ধরছেন।

কিন্তু এই বিশাল সাম্রাজ্যের একটি মৌলিক সমস্যা ছিল—এটি পরিচালনা করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। দূরবর্তী অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে সৈন্য রাখতে হয়, বিদ্রোহ দমন করতে হয়, কর্মকর্তাদের আনুগত্য নিশ্চিত করতে হয় এবং দীর্ঘ যোগাযোগপথ সচল রাখতে হয়। স্থানীয় শাসক বা নগর যদি কেন্দ্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াত, তাকে সামরিকভাবে দমন করার খরচও বহন করতে হতো। সাম্রাজ্যের বিস্তার যত বাড়ে, তার প্রশাসনিক ও সামরিক ব্যয়ও তত বাড়তে পারে।

নারাম-সিন নিজেও বড় ধরনের বিদ্রোহের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁর শিলালিপিতে একাধিক নগর ও রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত বিদ্রোহের কথা পাওয়া যায়। তিনি সেই বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হন, কিন্তু ঘটনাটি দেখায় যে আক্কাদীয় সাম্রাজ্যের ভেতরে রাজনৈতিক আনুগত্য সবসময় নিশ্চিত ছিল না।

নারাম-সিনের পরে তাঁর পুত্র শার-কালী-শার্রি সিংহাসনে বসেন। তাঁর সময়েই সাম্রাজ্যের ওপর চাপ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিভিন্ন অঞ্চল কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে যেতে থাকে, বহিরাগত গোষ্ঠীর আক্রমণ বৃদ্ধি পায় এবং আক্কাদীয় রাজশক্তির বিস্তৃত ভূখণ্ডের ওপর কর্তৃত্ব দুর্বল হয়।

এই পতনের আলোচনায় সবচেয়ে রহস্যময় বিষয়গুলোর একটি হলো খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২২০০ সালের জলবায়ুগত পরিবর্তন, যাকে আধুনিক গবেষণায় প্রায়ই ৪.২-কিলোইয়ার জলবায়ু ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন পরিবেশগত রেকর্ডে এই সময়ের কাছাকাছি শুষ্কতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিশেষ করে উত্তর মেসোপটেমিয়ার বৃষ্টিনির্ভর কৃষি দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে গুরুতর চাপের মুখে পড়ে থাকতে পারে।

উত্তরের কৃষি উৎপাদন আক্কাদীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বৃষ্টিপাত কমে গেলে শস্য উৎপাদন কমতে পারে, বসতি সংকুচিত হতে পারে এবং জনগোষ্ঠী অপেক্ষাকৃত পানি-নিরাপদ অঞ্চলে স্থানান্তরিত হতে পারে। কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে এই সময়ের কাছাকাছি বসতি পরিবর্তন বা পরিত্যাগের প্রমাণকে জলবায়ুগত চাপের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে।

তবে এখানেই সতর্কতা জরুরি। “একটি মহাখরা আক্কাদীয় সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করেছিল”—এমন সরল সিদ্ধান্ত বর্তমান প্রমাণের তুলনায় অতিরিক্ত নিশ্চিত। সব অঞ্চল একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, পতনের সময়কালও সর্বত্র এক নয়। জলবায়ু ছিল সম্ভবত একটি শক্তিশালী চাপ, কিন্তু রাজনৈতিক ও সামরিক সমস্যাগুলো আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল।

খরা যদি খাদ্য উৎপাদন কমিয়ে থাকে, তবে তার রাজনৈতিক প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারত। শস্য কমলে কর ও উদ্বৃত্ত কমে। উদ্বৃত্ত কমলে সেনাবাহিনী ও প্রশাসন রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন হয়। খাদ্যের মূল্য বাড়লে সামাজিক অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। মানুষ স্থানান্তরিত হলে নতুন অঞ্চলে জমি ও পানির ওপর চাপ বাড়ে। ফলে পরিবেশগত সংকট রাজনৈতিক সংকটকে তীব্র করার একটি বহুগুণক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় গুতীয়দের উত্থান। মেসোপটেমীয় লেখায় গুতীয়দের জাগ্রোস পার্বত্য অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত একটি বহিরাগত জনগোষ্ঠী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পরবর্তী সুমেরীয় সাহিত্য তাদের আক্কাদের ধ্বংসকারী বিশৃঙ্খল শক্তি হিসেবে চিত্রিত করেছে। কিন্তু এই সাহিত্য বহু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রচারণা ও সাহিত্যিক স্মৃতির মিশ্রণ। গুতীয়রা অবশ্যই আক্কাদীয় দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছিল, কিন্তু তারা একাই একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল সাম্রাজ্য হঠাৎ ধ্বংস করে দিয়েছিল—এমন ধারণা খুব সরল।

বরং শার-কালী-শার্রির সময় কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব দুর্বল হতে থাকায় বিভিন্ন স্থানীয় শক্তি স্বাধীন হয়ে ওঠে এবং গুতীয়দের মতো বহিরাগত গোষ্ঠীও মেসোপটেমিয়ার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় প্রবেশ করে। আক্কাদীয় সাম্রাজ্যের শেষ পর্যায়ের রাজতালিকাও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার স্মৃতি বহন করে। বিখ্যাত সুমেরীয় রাজতালিকায় এই সময়কে বোঝাতে প্রশ্ন করা হয়েছে—“কে রাজা ছিল? কে রাজা ছিল না?” এই বাক্যটি ঐতিহাসিক নথির নিরপেক্ষ প্রতিবেদন না হলেও কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ভাঙনের একটি শক্তিশালী সাহিত্যিক প্রতিচ্ছবি।

আক্কাদীয় পতন নিয়ে আরেকটি বিখ্যাত রচনা হলো পরবর্তী যুগের “আক্কাদের অভিশাপ”। সেখানে নারাম-সিনের বিরুদ্ধে দেবতাদের অসন্তোষ এবং নিপ্পুরের পবিত্রতার অবমাননার কারণে আক্কাদের ওপর বিপর্যয় নেমে আসার কাহিনি বলা হয়েছে। বাস্তব ইতিহাস হিসেবে এই কাহিনি ব্যবহার করা যায় না, কিন্তু এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ পরবর্তী মেসোপটেমীয় সমাজ আক্কাদের পতনকে কীভাবে স্মরণ করেছিল তা বোঝায়। তাদের কাছে সাম্রাজ্যের পতন শুধু রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল নৈতিক ও ধর্মীয় বিপর্যয়ও।

আক্কাদের পতনের আরেকটি জটিলতা হলো এর রাজধানী এখনো হারিয়ে আছে। আক্কাদ নগরের অবস্থান নিশ্চিতভাবে জানা না যাওয়ায় সাম্রাজ্যের কেন্দ্রের শেষ পর্যায় সরাসরি প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে পরীক্ষা করা কঠিন। আমরা বিভিন্ন প্রাদেশিক নগর, মাটির ফলক, রাজকীয় শিলালিপি এবং পরবর্তী সাহিত্য থেকে পতনের ছবি পুনর্গঠন করি। ফলে আক্কাদের শেষ দিনগুলো সম্পর্কে এখনো বহু প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর নেই।

সাম্রাজ্য ভেঙে যাওয়ার অর্থ অবশ্য মেসোপটেমীয় সভ্যতার সমাপ্তি ছিল না। দক্ষিণে বিভিন্ন সুমেরীয় নগর আবার শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কিছু সময়ের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার পরে উরের তৃতীয় রাজবংশ নতুন কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। আক্কাদীয় প্রশাসন ও সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির বহু ধারণাও পরবর্তী মেসোপটেমীয় রাষ্ট্রগুলো গ্রহণ করে।

আর আক্কাদীয় ভাষার প্রভাব ছিল আরও দীর্ঘস্থায়ী। সেমিটিক ভাষাগোষ্ঠীর এই ভাষা পরবর্তী ব্যাবিলনীয় ও আসিরীয় ভাষার ভিত্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে মেসোপটেমিয়ার অন্যতম প্রধান লিখিত ভাষায় পরিণত হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কিউনিফর্মে আক্কাদীয় ভাষা লেখা হয়েছে এবং একসময় এটি প্রাচীন নিকটপ্রাচ্যের আন্তর্জাতিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভাষাও হয়ে ওঠে।

সারগনের স্মৃতিও বিলীন হয়নি। তাঁর মৃত্যুর বহু শতাব্দী পরে মেসোপটেমীয় রাজারা তাঁকে আদর্শ বিজেতা হিসেবে স্মরণ করেছে। তাঁর জীবনকে ঘিরে কিংবদন্তি তৈরি হয়েছে এবং পরবর্তী শাসকেরা তাঁর মতো বিস্তীর্ণ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছে। আক্কাদ রাজনৈতিকভাবে ভেঙে পড়েছিল, কিন্তু সাম্রাজ্য গঠনের যে ধারণা সারগনের রাজবংশ শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেটি আর হারিয়ে যায়নি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আক্কাদীয় সাম্রাজ্যের পতন আমাদের ‘হঠাৎ ধ্বংস’-এর ধারণাকে প্রশ্ন করতে শেখায়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেল। কিন্তু ভেতরে তাকালে দেখা যায় বহু স্তরের সংকট—বিদ্রোহ, প্রশাসনিক চাপ, উত্তরাধিকার সমস্যা, সীমান্তের অনিরাপত্তা, গুতীয়দের আক্রমণ এবং সম্ভবত গুরুতর জলবায়ুগত পরিবর্তন।

আক্কাদীয় সাম্রাজ্য সম্ভবত একটি কারণে ধ্বংস হয়নি; বরং একাধিক সংকট একই সময়ে একে অন্যকে শক্তিশালী করে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের পুনরুদ্ধারক্ষমতাকে ভেঙে দিয়েছিল। খরা খাদ্য ও অর্থনীতিকে দুর্বল করে থাকতে পারে, অর্থনৈতিক দুর্বলতা সেনাবাহিনী ও প্রশাসনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, দুর্বল কেন্দ্র বিদ্রোহকে উৎসাহিত করেছে, আর সেই রাজনৈতিক বিভক্তি বহিরাগত আক্রমণকারীদের সুযোগ দিয়েছে।

চার হাজার বছরেরও বেশি সময় পরে তাই আক্কাদের পতন শুধু একটি হারিয়ে যাওয়া সাম্রাজ্যের রহস্য নয়। এটি ইতিহাসের প্রথম দিকের একটি বিশাল রাজনৈতিক পরীক্ষা—কীভাবে বহু নগর ও জনগোষ্ঠীকে এক শাসনের অধীনে আনা যায়, এবং সেই বিশাল ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তর একসঙ্গে দুর্বল হয়ে গেলে কত দ্রুত সাম্রাজ্য ভেঙে পড়তে পারে। সারগনের সাম্রাজ্য শেষ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তার উত্থান ও পতন পরবর্তী হাজার হাজার বছরের সাম্রাজ্যিক ইতিহাসের জন্য যেন প্রথম বড় সতর্কবার্তা হয়ে রয়ে গেছে।


আপনার পছন্দ হতে পারে