পৃথিবীর মতো আরেকটি গ্রহ কি আছে? দ্বিতীয় পৃথিবীর সন্ধানে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা
- Author: Admin
- August 14, 2026
পৃথিবীর মতো আরেকটি গ্রহ কি আছে?
রাতের আকাশের দিকে তাকালে অসংখ্য নক্ষত্র দেখা যায়। একসময় মানুষ ভাবত, পৃথিবী হয়তো মহাবিশ্বের একেবারেই ব্যতিক্রমী একটি জগৎ। কিন্তু আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার আমাদের সেই ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে। এখন আমরা জানি, সূর্য ছাড়াও অসংখ্য নক্ষত্রের চারদিকে গ্রহ ঘুরছে। ইতিমধ্যে হাজার হাজার এমন বহির্গ্রহের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে মানুষের সামনে আরও গভীর একটি প্রশ্ন এসেছে—এই বিপুল সংখ্যক গ্রহের মধ্যে কি কোথাও পৃথিবীর মতো আরেকটি পৃথিবী রয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা মোটেও শুধু পৃথিবীর মতো দেখতে একটি নীল গ্রহ খুঁজে পাওয়ার ব্যাপার নয়। একটি গ্রহকে সত্যিকারের ‘দ্বিতীয় পৃথিবী’ বলতে হলে তার আকার, ভর, পৃষ্ঠের প্রকৃতি, তাপমাত্রা, নক্ষত্র থেকে দূরত্ব, বায়ুমণ্ডল, পানি ধরে রাখার ক্ষমতা এবং দীর্ঘ সময় ধরে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ বজায় রাখার সামর্থ্য—সবকিছু বিবেচনা করতে হয়। পৃথিবীর সমান আকারের গ্রহ পাওয়া আর পৃথিবীর মতো বাসযোগ্য গ্রহ পাওয়া একই বিষয় নয়।
আমাদের সৌরজগতের বাইরে অন্য নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণকারী গ্রহকে বলা হয় বহির্গ্রহ। এগুলো সরাসরি দেখা অত্যন্ত কঠিন। কারণ একটি নক্ষত্র তার গ্রহের তুলনায় বিপুল পরিমাণ বেশি আলো ছড়ায়। দূর থেকে দেখলে ক্ষীণ গ্রহটি তার নক্ষত্রের প্রচণ্ড আলোর মধ্যে প্রায় সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়। ঠিক যেন বহু কিলোমিটার দূর থেকে একটি উজ্জ্বল বাতির পাশে ঘুরতে থাকা ক্ষুদ্র পোকাকে শনাক্ত করার চেষ্টা করা।
এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বেশ কিছু পরোক্ষ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এর মধ্যে অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতিতে কোনো গ্রহ তার নক্ষত্রের সামনে দিয়ে অতিক্রম করার সময় নক্ষত্রের আলো সামান্য কমে যাওয়া পর্যবেক্ষণ করা হয়। একই ব্যবধানে বারবার আলো কমে গেলে বিজ্ঞানীরা অনুমান করতে পারেন যে সেখানে একটি গ্রহ রয়েছে। আলো কতটা কমেছে তা বিশ্লেষণ করে গ্রহটির আনুমানিক আকারও নির্ণয় করা সম্ভব।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিতে গ্রহের মহাকর্ষের কারণে নক্ষত্রের ক্ষুদ্র দোলন পরিমাপ করা হয়। আমরা সাধারণভাবে বলি গ্রহ নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে, কিন্তু বাস্তবে নক্ষত্র ও গ্রহ উভয়ই তাদের যৌথ ভরকেন্দ্রকে ঘিরে ঘোরে। বিশাল গ্রহ নক্ষত্রের ওপর সামান্য টান সৃষ্টি করে। সেই ক্ষুদ্র গতিবিধি নক্ষত্রের আলো বিশ্লেষণ করে শনাক্ত করা যায়। এভাবে গ্রহটির ন্যূনতম ভর সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
একটি সম্ভাব্য দ্বিতীয় পৃথিবী খুঁজতে বিজ্ঞানীরা প্রথমেই জানতে চান গ্রহটি পাথুরে কি না। বৃহস্পতি বা শনির মতো বিশাল গ্যাসীয় গ্রহের পরিবেশ পৃথিবীর সঙ্গে খুব কমই মেলে। তাই পৃথিবী, শুক্র বা মঙ্গলের মতো কঠিন পৃষ্ঠবিশিষ্ট ছোট গ্রহ বিশেষ আগ্রহের বিষয়। কোনো গ্রহের আকার ও ভর উভয়ই জানা গেলে তার গড় ঘনত্ব হিসাব করে সেটি মূলত পাথুরে, জলসমৃদ্ধ নাকি গ্যাসে আবৃত—সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
এরপর আসে অত্যন্ত আলোচিত বাসযোগ্য অঞ্চল। কোনো নক্ষত্রের চারপাশে এমন একটি দূরত্বের অঞ্চল থাকতে পারে যেখানে উপযুক্ত বায়ুমণ্ডল থাকলে গ্রহের পৃষ্ঠে তরল পানি টিকে থাকা সম্ভব। গ্রহটি নক্ষত্রের খুব কাছে থাকলে প্রচণ্ড তাপে পানি বাষ্প হয়ে যেতে পারে। আবার খুব দূরে থাকলে পানি স্থায়ীভাবে বরফ হয়ে থাকার আশঙ্কা বাড়ে। মাঝামাঝি উপযুক্ত অঞ্চলটিকেই সাধারণভাবে বাসযোগ্য অঞ্চল বলা হয়।
কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণা রয়েছে। বাসযোগ্য অঞ্চলে অবস্থান করলেই কোনো গ্রহ বাসযোগ্য হয়ে যায় না। আমাদের সৌরজগতের শুক্র এই সমস্যাটি বোঝার চমৎকার উদাহরণ। আকারে পৃথিবীর কাছাকাছি হলেও তার ঘন কার্বন ডাই-অক্সাইডসমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল অত্যন্ত শক্তিশালী তাপধারণ প্রক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ফলে শুক্রের পৃষ্ঠ এতটাই উত্তপ্ত যে সেখানে পৃথিবীর পরিচিত প্রাণের টিকে থাকা অকল্পনীয়।
অন্যদিকে মঙ্গল দেখায় বিপরীত সমস্যা। সেখানে একসময় নদী, হ্রদ কিংবা প্রবাহমান পানির অস্তিত্ব ছিল বলে শক্তিশালী ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমানে তার বায়ুমণ্ডল অত্যন্ত পাতলা এবং পৃষ্ঠ শীতল ও শুষ্ক। অর্থাৎ একটি গ্রহে পানি থাকার ইতিহাস থাকলেই সেটি কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর মতো পরিবেশ ধরে রাখতে পারবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
এ কারণেই দ্বিতীয় পৃথিবীর সন্ধানে বায়ুমণ্ডল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি গ্রহের বায়ুমণ্ডল তার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, ক্ষতিকর বিকিরণের কিছু অংশ প্রতিহত করতে পারে এবং পৃষ্ঠে তরল পানি টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু শত শত আলোকবর্ষ দূরের ক্ষুদ্র একটি গ্রহের বায়ুমণ্ডল পরীক্ষা করা অসাধারণ কঠিন কাজ।
এখানে আলো নিজেই বিজ্ঞানীদের তথ্যবাহক হয়ে ওঠে। কোনো বহির্গ্রহ তার নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় নক্ষত্রের আলোর সামান্য অংশ গ্রহটির বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে আসে। বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন অণু আলোর নির্দিষ্ট অংশ শোষণ করে। সেই আলোকে বর্ণালিতে বিভক্ত করে বিজ্ঞানীরা জলীয় বাষ্প, কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেনসহ বিভিন্ন অণুর সম্ভাব্য উপস্থিতি অনুসন্ধান করতে পারেন। ভবিষ্যতে আরও উন্নত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পৃথিবীর মতো ছোট গ্রহের বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে অনেক বেশি নির্ভুল তথ্য পাওয়ার আশা রয়েছে।
এখানেই আসে আরও আকর্ষণীয় একটি ধারণা—জীবচিহ্ন। কোনো দূরবর্তী গ্রহে সরাসরি জীবাণু, উদ্ভিদ বা প্রাণী দেখা সম্ভব না হলেও তার বায়ুমণ্ডলে এমন রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা থাকতে পারে, যা জীবনের উপস্থিতির সম্ভাবনা নির্দেশ করে। উদাহরণ হিসেবে অক্সিজেন ও মিথেনের মতো কিছু গ্যাস বিশেষ পরিস্থিতিতে একসঙ্গে পাওয়া গেলে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ বাড়তে পারে।
তবে কোনো একটি গ্যাস পাওয়াই প্রাণ আবিষ্কারের প্রমাণ নয়। অক্সিজেনসহ বিভিন্ন পদার্থ জীববিহীন ভূতাত্ত্বিক বা আলোক-রাসায়নিক প্রক্রিয়াতেও তৈরি হতে পারে। তাই একটি সম্ভাব্য জীবচিহ্নকে পুরো গ্রহীয় পরিবেশের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করতে হয়। নক্ষত্রের প্রকৃতি, গ্রহের তাপমাত্রা, অন্যান্য গ্যাস, সম্ভাব্য সমুদ্র, ভূতাত্ত্বিক কার্যকলাপ এবং বিকিরণ—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা না করলে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব।
দ্বিতীয় পৃথিবীর সন্ধানে নক্ষত্রের ধরনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সূর্য তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল একটি নক্ষত্র। কিন্তু ছায়াপথে সূর্যের চেয়ে ছোট ও শীতল লাল বামন নক্ষত্রের সংখ্যা অনেক বেশি। এ ধরনের নক্ষত্রের চারপাশে পৃথিবীর আকারের গ্রহ খুঁজে পাওয়া তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক। নক্ষত্র ছোট হওয়ায় একটি ছোট গ্রহ তার সামনে দিয়ে গেলে আলো কমার অনুপাত তুলনামূলকভাবে বেশি হয়।
তবে লাল বামন নক্ষত্রের গ্রহগুলোর সামনে বিশেষ সমস্যা রয়েছে। তাদের বাসযোগ্য অঞ্চল নক্ষত্রের খুব কাছে হতে পারে। ফলে সেখানে থাকা গ্রহগুলো শক্তিশালী নাক্ষত্রিক বিস্ফোরণ ও উচ্চশক্তির বিকিরণের মুখোমুখি হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে এমন বিকিরণ একটি গ্রহের বায়ুমণ্ডল ক্ষয় করে দিতে পারে। কাছাকাছি কক্ষপথে থাকার কারণে কোনো কোনো গ্রহের একই দিক সবসময় নক্ষত্রের দিকে থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে। তখন একদিকে স্থায়ী দিন এবং অন্যদিকে স্থায়ী রাত তৈরি হতে পারে।
তবুও এমন গ্রহকে সরাসরি বাতিল করা যায় না। পর্যাপ্ত ঘন বায়ুমণ্ডল কিংবা বিশাল মহাসাগর থাকলে তাপ এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পরিবাহিত হতে পারে। ফলে স্থায়ী দিন-রাত থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো অঞ্চলে সহনীয় পরিবেশ তৈরি হওয়া তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব। বাসযোগ্যতার বিজ্ঞান তাই শুধু ‘কত গরম’ বা ‘কত ঠান্ডা’—এই দুই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়।
দ্বিতীয় পৃথিবীর সন্ধানে বিশেষ আলোচিত গ্রহমণ্ডলগুলোর একটি হলো ট্র্যাপিস্ট-১। পৃথিবী থেকে প্রায় চল্লিশ আলোকবর্ষ দূরের একটি ছোট ও শীতল নক্ষত্রকে সাতটি পৃথিবীর কাছাকাছি আকারের গ্রহ প্রদক্ষিণ করছে। এদের কয়েকটি এমন দূরত্বে রয়েছে যেখানে উপযুক্ত পরিস্থিতিতে তরল পানির সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করা যায়। তবে এগুলোর কোনো একটিকে এখনই পৃথিবীর সত্যিকারের যমজ বলা যায় না।
আরেকটি বিখ্যাত গ্রহ প্রক্সিমা সেন্টরি বি। এটি সূর্যের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টরিকে প্রদক্ষিণ করে এবং পৃথিবীর তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি মহাজাগতিক প্রতিবেশে অবস্থিত। গ্রহটি তার নক্ষত্রের বাসযোগ্য অঞ্চলের মধ্যে থাকার কারণে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু প্রক্সিমা সেন্টরি একটি সক্রিয় লাল বামন নক্ষত্র। এর শক্তিশালী বিস্ফোরণ গ্রহটির বায়ুমণ্ডল ও সম্ভাব্য বাসযোগ্যতার জন্য বড় সমস্যা হতে পারে।
কেপলার-১৮৬এফ ছিল পৃথিবীর কাছাকাছি আকারের এমন প্রথম দিকের বহির্গ্রহগুলোর একটি, যেটি তার নক্ষত্রের বাসযোগ্য অঞ্চলে পাওয়া যায়। এর আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এটি দেখিয়েছিল যে পৃথিবীর আকারের গ্রহও নক্ষত্রের এমন অঞ্চলে থাকতে পারে যেখানে তরল পানির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা যায়।
কেপলার-৪৫২বি আবিষ্কারের পর এটিকেও অনেক সময় পৃথিবীর আত্মীয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। এটি সূর্যের সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ একটি নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে এবং তার কক্ষপথও বাসযোগ্যতার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গ্রহটির ব্যাস পৃথিবীর চেয়ে বড় এবং এর প্রকৃত ভর ও গঠন সম্পর্কে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাই এটি পাথুরে পৃথিবীসদৃশ গ্রহ, নাকি ভিন্ন ধরনের বৃহত্তর জগৎ—তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।
এই উদাহরণগুলো একটি মৌলিক বিষয় পরিষ্কার করে—এখন পর্যন্ত আমরা এমন কোনো গ্রহ আবিষ্কার করিনি, যাকে সব গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য যাচাই করে নিশ্চিতভাবে ‘পৃথিবী ২.০’ বলা যায়। আমরা পৃথিবীর আকারের গ্রহ পেয়েছি, বাসযোগ্য অঞ্চলে থাকা গ্রহ পেয়েছি এবং পাথুরে হওয়ার সম্ভাবনাযুক্ত গ্রহও পেয়েছি। কিন্তু একই সঙ্গে পৃথিবীর মতো আকার, ভর, তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডল, স্থিতিশীল জলবায়ু, তরল মহাসাগর এবং জীবনের সম্ভাব্য চিহ্ন—সবকিছুর শক্তিশালী প্রমাণ এখনো কোনো একক গ্রহে পাওয়া যায়নি।
এর একটি বড় কারণ দূরত্ব। এক আলোকবর্ষ হলো আলো এক বছরে যে বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করে। আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রমণ্ডলও চার আলোকবর্ষের বেশি দূরে। বর্তমান মানুষের তৈরি মহাকাশযানের গতিতে সেখানে পৌঁছাতে হাজার হাজার বছর লেগে যেতে পারে। ফলে আপাতত দ্বিতীয় পৃথিবীর সন্ধান মূলত দূরবর্তী পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভরশীল।
মহাকাশ দূরবীক্ষণযন্ত্র এই অনুসন্ধানকে বিপ্লবীভাবে এগিয়ে নিয়েছে। কেপলার মহাকাশ দূরবীক্ষণযন্ত্র দীর্ঘ সময় ধরে নক্ষত্রের উজ্জ্বলতার ক্ষুদ্র পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে দেখিয়েছে যে গ্রহ মহাবিশ্বে বিরল ব্যতিক্রম নয়। বিপুল সংখ্যক নক্ষত্রের চারদিকে গ্রহ থাকা স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে—এই ধারণার পক্ষে শক্তিশালী পর্যবেক্ষণমূলক ভিত্তি তৈরি হয়।
এরপর টেস পৃথিবীর তুলনামূলকভাবে কাছের উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলোর চারদিকে গ্রহ অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করে। কাছের নক্ষত্রের গ্রহগুলো বিশেষভাবে মূল্যবান, কারণ পরবর্তী শক্তিশালী দূরবীক্ষণযন্ত্র দিয়ে তাদের ভর, কক্ষপথ এবং বায়ুমণ্ডল পরীক্ষা করার সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি।
আর জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণযন্ত্র বহির্গ্রহের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণের ক্ষমতাকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এটি বিশেষ করে অবলোহিত আলো পর্যবেক্ষণ করে দূরবর্তী গ্রহের বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন অণুর উপস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। তবে পৃথিবীর মতো ক্ষুদ্র, তুলনামূলক শীতল গ্রহের বায়ুমণ্ডলে নিশ্চিত জীবচিহ্ন শনাক্ত করা এখনো অত্যন্ত কঠিন।
ভবিষ্যতের আরও উন্নত দূরবীক্ষণযন্ত্রের অন্যতম লক্ষ্য হবে পৃথিবীর মতো ছোট গ্রহকে তাদের নক্ষত্রের তীব্র আলো থেকে আলাদা করে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা। বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে নক্ষত্রের আলো আড়াল করা গেলে পাশে থাকা ক্ষীণ গ্রহের আলো ধরা সম্ভব হতে পারে। এরপর সেই আলো বিশ্লেষণ করে গ্রহটির বায়ুমণ্ডল, মেঘ, পৃষ্ঠ এবং সম্ভাব্য মহাসাগর সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করা হবে।
কোনো একদিন যদি বিজ্ঞানীরা সূর্যের মতো একটি স্থিতিশীল নক্ষত্রের চারদিকে পৃথিবীর কাছাকাছি ভরের একটি পাথুরে গ্রহ খুঁজে পান, যার পৃষ্ঠে তরল পানির শক্তিশালী প্রমাণ রয়েছে এবং বায়ুমণ্ডলে এমন একাধিক রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায় যা দীর্ঘমেয়াদি জীবনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ—তাহলে সেটি মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হবে।
তবুও পৃথিবীর মতো পরিবেশ পাওয়া এবং সেখানে সত্যিই প্রাণ থাকা দুটি আলাদা প্রশ্ন। একটি গ্রহ জীবনের জন্য উপযুক্ত হতে পারে, অথচ সেখানে কখনো প্রাণের জন্ম না-ও হতে পারে। আবার পৃথিবীর জীবনের জন্য প্রতিকূল মনে হওয়া পরিবেশেও সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের জীবনের সম্ভাবনা সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা সতর্কভাবে চিন্তা করেন। কারণ এখন পর্যন্ত আমাদের জানা জীবনের একমাত্র উদাহরণ পৃথিবীর জীবন।
এই কারণেই পৃথিবী আমাদের কাছে শুধু একটি গ্রহ নয়, জীবনের সম্ভাবনা বোঝার একমাত্র নিশ্চিত পরীক্ষাগার। পৃথিবীতে তরল পানি, উপযুক্ত বায়ুমণ্ডল, কার্বনভিত্তিক জটিল রসায়ন, দীর্ঘস্থায়ী শক্তির উৎস, ভূতাত্ত্বিক কার্যকলাপ এবং তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল পরিবেশ কোটি কোটি বছর ধরে একসঙ্গে কাজ করেছে। এর কোন বৈশিষ্ট্যগুলো জীবনের জন্য অপরিহার্য আর কোনগুলো কেবল পৃথিবীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য—এ প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর এখনো আমাদের জানা নেই।
আরও একটি বড় প্রশ্ন হলো, পৃথিবীর মতো গ্রহ আসলে কতটা সাধারণ। যদি ভবিষ্যতের পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে সূর্যের মতো নক্ষত্রের চারদিকে পৃথিবীর আকারের পাথুরে এবং নাতিশীতোষ্ণ গ্রহ খুবই সাধারণ, তাহলে মহাবিশ্বে সম্ভাব্য বাসযোগ্য জগতের সংখ্যা বিপুল হতে পারে। কিন্তু যদি পৃথিবীর মতো দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির জন্য অসংখ্য বিরল শর্ত একই সঙ্গে পূরণ হওয়া প্রয়োজন হয়, তাহলে আমাদের গ্রহ মহাজাগতিক অর্থেও অত্যন্ত বিরল হতে পারে।
দ্বিতীয় পৃথিবীর অনুসন্ধান তাই শুধু নতুন একটি গ্রহ খোঁজার অভিযান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের সবচেয়ে পুরোনো প্রশ্নগুলোর একটি—আমরা কি মহাবিশ্বে একা? হাজার হাজার বহির্গ্রহ আবিষ্কার প্রমাণ করেছে যে গ্রহে পরিপূর্ণ মহাবিশ্বে আমরা বাস করছি। এখন চ্যালেঞ্জ হলো সেই অসংখ্য জগতের মধ্যে কোনগুলো সত্যিকার অর্থে পৃথিবীর মতো তা নির্ণয় করা।
হয়তো আমাদের মহাজাগতিক প্রতিবেশেই এমন একটি গ্রহ রয়েছে যার আকাশে মেঘ জমে, পাথুরে ভূমিতে বৃষ্টি পড়ে এবং বিশাল মহাসাগরের ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে যায়। আবার হয়তো সত্যিকারের পৃথিবীর মতো জগৎ এতটাই বিরল যে আমাদের ছায়াপথে খুব অল্প কয়েকটিই রয়েছে। আজ পর্যন্ত নিশ্চিত দ্বিতীয় পৃথিবী আমাদের হাতে নেই, কিন্তু তাকে খুঁজে বের করার প্রযুক্তি ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে।
আর যদি কোনো দিন দূরবর্তী একটি ক্ষুদ্র আলোকবিন্দুর বর্ণালি থেকে বিজ্ঞানীরা সমুদ্র, উপযুক্ত বায়ুমণ্ডল এবং জীবনের শক্তিশালী রাসায়নিক ইঙ্গিত একসঙ্গে শনাক্ত করেন, তাহলে আবিষ্কারটি শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি নতুন অধ্যায় হবে না। সেটি বদলে দিতে পারে মহাবিশ্বে মানুষের নিজের অবস্থান সম্পর্কে হাজার বছরের ধারণা। তখন প্রথমবারের মতো আমরা হয়তো প্রমাণের ভিত্তিতে বলতে পারব—পৃথিবী অনন্য হতে পারে, কিন্তু পৃথিবী হয়তো একা নয়।
মঙ্গল গ্রহে কি কখনো প্রাণ ছিল? বিজ্ঞানীরা যেসব প্রমাণ খুঁজছেন
ব্ল্যাক হোলের ভেতরে কী আছে? ঘটনা দিগন্তের ওপারের অজানা জগত ও মহাকাশের গভীর রহস্য
মহাবিশ্বের শেষ কোথায়? অসীম মহাকাশের কি সত্যিই কোনো সীমানা আছে?
ডেড সি-তে মানুষ সহজে ডুবে যায় না কেন? অতিরিক্ত লবণাক্ত পানির বিস্ময়কর বিজ্ঞান
আলেকজান্দ্রিয়ার ফারোস: প্রাচীন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের কিংবদন্তি বাতিঘরের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস
ক্যাটিলাইন ষড়যন্ত্র: রোমান প্রজাতন্ত্র দখলের ব্যর্থ গোপন পরিকল্পনার ইতিহাস