কানপুরের বিদ্রোহ ও নানা সাহেব: অবরোধ, সংঘর্ষ ও ১৮৫৭ সালের রক্তাক্ত অধ্যায়
Series: সিপাহী বিদ্রোহ ১৮৫৭: ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের মহাবিদ্রোহ
- Author: Admin
- August 13, 2026
কানপুরের বিদ্রোহ ও নানা সাহেব
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের বহু যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে কানপুরের ঘটনাবলি বিশেষভাবে আলোচিত, কারণ এখানে সামরিক বিদ্রোহ, রাজনৈতিক প্রতিশোধ, দীর্ঘ অবরোধ, বেসামরিক মানুষের মৃত্যু এবং পরবর্তী ব্রিটিশ প্রতিহিংসা এক ভয়াবহ চক্রে পরিণত হয়েছিল। তৎকালীন ব্রিটিশ নথিতে শহরটির নাম ছিল Cawnpore। জুন থেকে জুলাই ১৮৫৭ পর্যন্ত মাত্র কয়েক সপ্তাহে এখানে যা ঘটেছিল, তা ব্রিটেন ও ভারতের জনমতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। আর এই পুরো অধ্যায়ের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন নানা সাহেব—শেষ মারাঠা পেশোয়া বাজিরাও দ্বিতীয়ের দত্তকপুত্র, যার ব্রিটিশদের সঙ্গে পুরোনো বিরোধ বিদ্রোহের সময় সরাসরি রাজনৈতিক সংঘর্ষে রূপ নেয়।
নানা সাহেবের প্রকৃত নাম ছিল ধোন্দু পন্ত। মারাঠা শক্তির পতনের পর তাঁর দত্তকপিতা বাজিরাও দ্বিতীয় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে পেনশন পেতেন এবং কানপুরের কাছাকাছি বিঠুরে বসবাস করতেন। ১৮৫১ সালে বাজিরাওয়ের মৃত্যুর পর নানা সাহেব দাবি করেন যে পেশোয়াকে দেওয়া পেনশন তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে তাঁকেও দেওয়া উচিত। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে। ব্রিটিশদের যুক্তি ছিল, পেনশনটি ব্যক্তিগতভাবে বাজিরাওকে দেওয়া হয়েছিল; এটি উত্তরাধিকারসূত্রে স্থানান্তরযোগ্য নয়।
এই সিদ্ধান্ত নানা সাহেবের জন্য শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি ছিল না। এটি তাঁর মর্যাদা ও পেশোয়া পরিবারের উত্তরাধিকারের প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িত ছিল। তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছে দাবি পুনর্বিবেচনার চেষ্টা করেন এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী আজিমুল্লাহ খানকে ইংল্যান্ডেও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। ফলে ১৮৫৭ সালের আগেই নানা সাহেবের সঙ্গে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সম্পর্কের মধ্যে গভীর অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
কানপুর ছিল সামরিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গঙ্গার তীরবর্তী এই শহর কলকাতা থেকে উত্তর-পশ্চিম ভারতের দিকে যাওয়া যোগাযোগপথের ওপর অবস্থান করত। সেখানে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একটি বড় সেনানিবাস ছিল। ১৮৫৭ সালের মে মাসে মিরাট ও দিল্লির বিদ্রোহের সংবাদ পৌঁছানোর পর কানপুরের ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। কানপুরে ব্রিটিশ বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন প্রবীণ কর্মকর্তা মেজর জেনারেল হিউ হুইলার।
হুইলার দীর্ঘদিন ভারতে কাজ করেছিলেন এবং ভারতীয় সিপাহীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। প্রথমদিকে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে কানপুরের সিপাহীদের বড় অংশ সম্ভবত অনুগত থাকবে। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। দিল্লিতে বিদ্রোহীদের সাফল্যের খবর, বাহাদুর শাহ জাফরকে প্রতীকী সম্রাট হিসেবে গ্রহণ এবং উত্তর ভারতের বিভিন্ন সেনানিবাসে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ায় কানপুরেও উত্তেজনা বাড়ে।
ব্রিটিশরা সম্ভাব্য বিপদের কথা বিবেচনা করে একটি অস্থায়ী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করে। কিন্তু হুইলারের নির্বাচিত প্রতিরক্ষা অবস্থান ছিল অত্যন্ত দুর্বল। সেখানে শক্তিশালী দুর্গপ্রাচীর ছিল না, পর্যাপ্ত ছায়া বা নিরাপদ আশ্রয়ও ছিল সীমিত। অথচ বিদ্রোহ শুরু হলে শত শত ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় সৈনিক, কর্মকর্তা, নারী, শিশু এবং বেসামরিক মানুষকে এই ছোট এলাকাতেই আশ্রয় নিতে হয়।
১৮৫৭ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে কানপুরের ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে বিদ্রোহ শুরু হয়। বিদ্রোহী সিপাহীদের একটি অংশ প্রথমে দিল্লির দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলেও পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর তারা কানপুরে ফিরে আসে এবং নানা সাহেবের নেতৃত্ব গ্রহণ করে। ঠিক কোন পর্যায়ে নানা সাহেব বিদ্রোহের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত হন এবং তাঁর সামনে কতটা বিকল্প ছিল—এ নিয়ে পরবর্তীকালে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি কানপুরের ব্রিটিশবিরোধী শক্তির প্রধান রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন।
নানা সাহেব নিজেকে মারাঠা পেশোয়া ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। তাঁর চারপাশে বিদ্রোহী সিপাহী, মারাঠা অনুসারী এবং বিভিন্ন সহযোগী সমবেত হয়। তাঁদের মধ্যে তাঁতিয়া টোপে পরবর্তীকালে ১৮৫৭–৫৯ সালের প্রতিরোধের অন্যতম বিখ্যাত সামরিক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠবেন। আজিমুল্লাহ খানও নানা সাহেবের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বিদ্রোহীরা হুইলারের প্রতিরক্ষা ঘাঁটিকে ঘিরে ফেলে। শুরু হয় কানপুর অবরোধ, যা প্রায় তিন সপ্তাহ স্থায়ী হয়। জুন মাসের প্রচণ্ড গরমে প্রতিরক্ষা ঘাঁটির অবস্থান দ্রুত অসহনীয় হয়ে ওঠে। পর্যাপ্ত খাবার, পানি, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব দেখা দেয়। বিদ্রোহীদের কামানের গোলাবর্ষণ নিয়মিত চলতে থাকে এবং প্রতিরক্ষা এলাকার ভেতরে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
পানির সংকট বিশেষভাবে ভয়াবহ ছিল। প্রতিরক্ষা এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ কূপ থেকে পানি সংগ্রহ করতে গিয়েও গুলির মুখে পড়ার ঝুঁকি ছিল। প্রচণ্ড গরম, রোগ, ক্ষুধা এবং গোলাবর্ষণ মিলে অবরুদ্ধদের দুর্দশা চরমে পৌঁছে যায়। বহু শিশু ও বেসামরিক ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়ে। যুদ্ধক্ষেত্রের সরাসরি আঘাতের পাশাপাশি তৃষ্ণা, তাপ ও রোগও কানপুরের অবরোধে প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছিল।
অবরোধ যত দীর্ঘ হয়, ব্রিটিশদের অবস্থান তত দুর্বল হয়ে পড়ে। উদ্ধারকারী বাহিনী দ্রুত পৌঁছাবে—এই আশাও ক্রমে ক্ষীণ হতে থাকে। এই অবস্থায় জুনের শেষদিকে নানা সাহেবের পক্ষ থেকে আত্মসমর্পণ ও নিরাপদে সরে যাওয়ার প্রস্তাব আসে। বলা হয়, যারা অস্ত্র ছেড়ে দেবে তারা গঙ্গাপথে এলাহাবাদের দিকে চলে যেতে পারবে।
অবরুদ্ধ ব্রিটিশরা শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবটি গ্রহণ করে। ২৭ জুন ১৮৫৭ সকালে জীবিত সৈনিক, নারী ও শিশুরা প্রতিরক্ষা অবস্থান ছেড়ে গঙ্গার তীরে সতীচৌরা ঘাটের দিকে যায়। সেখানে তাদের বহনের জন্য নৌকা প্রস্তুত থাকার কথা ছিল। কিন্তু যে ঘটনা এরপর ঘটে, সেটিই ১৮৫৭ সালের সবচেয়ে বিতর্কিত ও রক্তাক্ত ঘটনাগুলোর একটিতে পরিণত হয়।
ব্রিটিশরা নৌকায় উঠতে শুরু করার পর হঠাৎ পরিস্থিতি ভেঙে পড়ে। কোথাও গুলির শব্দ শোনা যায়, কিছু নৌকায় আগুন লাগে এবং তীরের বিদ্রোহী সৈন্যরা গুলি চালাতে শুরু করে। ব্রিটিশ সৈন্যরাও পাল্টা গুলি চালায়। মুহূর্তের মধ্যে শান্তিপূর্ণ প্রত্যাহারের পরিকল্পনা সতীচৌরা ঘাটের হত্যাযজ্ঞে পরিণত হয়। অনেক ব্রিটিশ সৈনিক ও বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হন, কেউ পানিতে ডুবে মারা যান, আবার অনেকে বন্দি হন।
কিন্তু এই হত্যাকাণ্ড আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল কি না—এ প্রশ্নে ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে। দীর্ঘদিন ব্রিটিশ বর্ণনায় ঘটনাটিকে নানা সাহেবের পরিকল্পিত বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। অন্য ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ঘাটে বিশৃঙ্খলা, আতঙ্ক, ভুল বোঝাবুঝি এবং হঠাৎ গুলিবিনিময় পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। কে প্রথম গুলি চালিয়েছিল এবং নানা সাহেব ঠিক কতটা পূর্বপরিকল্পিত নির্দেশ দিয়েছিলেন—এই প্রশ্নগুলোর সবকটির নির্ভুল উত্তর ইতিহাসে নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
এই সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কানপুরের ঘটনা খুব দ্রুত যুদ্ধকালীন প্রচারণার অংশ হয়ে উঠেছিল। ব্রিটেনে সতীচৌরা ঘাটের বিবরণ প্রচণ্ড ক্ষোভ সৃষ্টি করে। নানা সাহেবকে নির্মম হত্যাকারী হিসেবে চিত্রিত করা হতে থাকে। অন্যদিকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী স্মৃতির একটি অংশ তাঁকে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের নেতা হিসেবে তুলে ধরে। প্রকৃত ইতিহাস এই দুই সরল চিত্রের চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
সতীচৌরা ঘাট থেকে জীবিত উদ্ধার হওয়া বহু ব্রিটিশ নারী ও শিশুকে বন্দি করা হয়। শেষ পর্যন্ত তাদের রাখা হয় কানপুরের একটি বাড়িতে, যা পরবর্তীকালে বিবিঘর নামে কুখ্যাত হয়ে ওঠে। সেখানে বন্দিদের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত অনিশ্চিত। এদিকে ব্রিটিশ বাহিনী দক্ষিণ দিক থেকে কানপুর পুনর্দখলের জন্য এগিয়ে আসছিল।
ব্রিটিশ বাহিনীর অন্যতম নেতা ছিলেন হেনরি হ্যাভলক। তাঁর বাহিনী এলাহাবাদ থেকে অগ্রসর হয়ে বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। ব্রিটিশ বাহিনী কানপুরের দিকে যত এগিয়ে আসে, বিদ্রোহী নেতৃত্বের মধ্যে বন্দিদের কী করা হবে—এই প্রশ্ন ক্রমে গুরুতর হয়ে ওঠে।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি বিবিঘরে আটক নারী ও শিশুদের হত্যা করা হয়। ঘটনাটি ১৮৫৭ সালের ইতিহাসে গভীর শোক ও আতঙ্কের প্রতীক হয়ে আছে। হত্যাকাণ্ডের পর নিহতদের মৃতদেহ কাছের একটি কূপে ফেলে দেওয়া হয়। নানা সাহেব নিজে সরাসরি হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন কি না, সেটি নিয়েও ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিত প্রমাণের প্রশ্ন রয়েছে। বিদ্রোহী শিবিরের কার নির্দেশে এবং কী পরিস্থিতিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে বিবরণ পরস্পরবিরোধী।
তবে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল এবং এর রাজনৈতিক প্রভাব ছিল বিপুল—এই বিষয়ে সন্দেহ নেই। ব্রিটিশ সৈন্য ও জনসাধারণের কাছে “কানপুর” বা “কনপুর” নামটি প্রতিশোধের আহ্বানে পরিণত হয়। বিবিঘরের নিহত নারী ও শিশুদের স্মৃতি ব্যবহার করে ব্রিটিশ সামরিক অভিযানে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর আচরণের নৈতিক যুক্তি তৈরি করা হয়।
১৬ জুলাইয়ের কাছাকাছি কানপুরের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের জন্য निर्णায়ক সংঘর্ষ ঘটে, এবং হ্যাভলকের বাহিনী বিদ্রোহীদের পরাজিত করে শহরের দিকে অগ্রসর হয়। নানা সাহেব বিঠুরের দিকে সরে যান। ব্রিটিশ সৈন্যরা কানপুরে পৌঁছে বিবিঘরের হত্যাকাণ্ডের চিহ্ন দেখতে পাওয়ার পর প্রতিশোধের আবহ আরও তীব্র হয়।
এরপর শুরু হয় আরেক ধরনের সহিংসতা। সন্দেহভাজন বিদ্রোহী এবং স্থানীয় মানুষদের বিরুদ্ধে ব্যাপক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সংক্ষিপ্ত বিচার, ফাঁসি এবং অন্যান্য নির্মম শাস্তির ঘটনা ঘটে। ব্রিটিশ কর্মকর্তা জেমস জর্জ স্মিথ নীল-এর নাম বিশেষভাবে কঠোর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কিছু বন্দিকে মৃত্যুদণ্ডের আগে অপমানজনক আচরণে বাধ্য করার কথাও সমসাময়িক বিবরণে পাওয়া যায়।
ফলে কানপুরের ইতিহাস কেবল সতীচৌরা বা বিবিঘরের হত্যাকাণ্ডে থেমে নেই। এখানে বিদ্রোহী সহিংসতার পর ব্রিটিশ প্রতিশোধ আবার নতুন সহিংসতার জন্ম দেয়। যুদ্ধের উভয় পক্ষের প্রতিশোধপরায়ণতা এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছিল যেখানে সাধারণ মানুষও নিরাপদ ছিল না।
কানপুরের নিয়ন্ত্রণ একবার ফিরে পেলেই যে ব্রিটিশরা স্থায়ীভাবে অঞ্চলটি নিরাপদ করতে পেরেছিল, তা নয়। নানা সাহেব ও তাঁর সহযোগীরা প্রতিরোধ চালিয়ে যান। বিশেষ করে তাঁতিয়া টোপে পরবর্তীতে পুনরায় কানপুর অঞ্চলে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। ১৮৫৭ সালের শেষদিকে কানপুর আবার বড় সংঘর্ষের কেন্দ্র হয়ে ওঠে, যেখানে ব্রিটিশ বাহিনীর নেতৃত্বে থাকা স্যার কলিন ক্যাম্পবেল বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালান।
নানা সাহেবের পরবর্তী জীবনের ইতিহাস রহস্যে আচ্ছন্ন। ব্রিটিশরা তাঁকে ধরার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছিল, কিন্তু তিনি কখনও ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়েননি। বিদ্রোহের সামরিক শক্তি ভেঙে পড়ার পর তিনি উত্তর দিকে সরে যান এবং শেষ পর্যন্ত নেপালের দিকে চলে গিয়েছিলেন বলে সাধারণভাবে মনে করা হয়। কোথায় এবং কখন তাঁর মৃত্যু হয়েছিল, সে সম্পর্কে নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্য নেই। এই অনিশ্চয়তা পরবর্তী সময়ে তাঁকে ঘিরে নানা কিংবদন্তির জন্ম দেয়।
কানপুরের ঘটনাগুলো ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের প্রকৃতি বুঝতেও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে রাজনৈতিক ক্ষোভ ও সামরিক বিদ্রোহের সঙ্গে দ্রুত বেসামরিক মানুষের জীবন জড়িয়ে পড়েছিল। নানা সাহেবের পেনশন ও পেশোয়া উত্তরাধিকার নিয়ে ব্রিটিশদের সঙ্গে বিরোধ ছিল ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক; কিন্তু একবার সিপাহী বিদ্রোহ শুরু হলে তাঁর নেতৃত্ব বৃহত্তর ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের অংশ হয়ে যায়।
একই সঙ্গে কানপুর দেখিয়ে দেয় যে ১৮৫৭ সালের যুদ্ধকে কেবল বীরত্বের সরল কাহিনিতে পরিণত করা ইতিহাসকে অসম্পূর্ণ করে। এখানে বিদ্রোহীরা ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়েছিল, কিন্তু সেই সংঘর্ষের মধ্যেই অসামরিক মানুষ হত্যার মতো ভয়াবহ ঘটনাও ঘটেছিল। আবার ব্রিটিশরা এসব হত্যাকাণ্ডকে সামনে রেখে যে প্রতিশোধ চালায়, তাতেও বহু ভারতীয় নির্বিচারে বা অতি কঠোর শাস্তির শিকার হন।
সতীচৌরা ঘাট ও বিবিঘরের ঘটনা ব্রিটিশ সংবাদপত্র, বই, চিত্রকর্ম এবং রাজনৈতিক বক্তৃতায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। “Remember Cawnpore” ধরনের প্রতিশোধমূলক আবেগ ব্রিটিশ সামরিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। এতে বিদ্রোহকে দমন করার যুদ্ধ আরও নির্মম হয়ে পড়ে এবং ভারতীয় বিদ্রোহীদের একটি সামগ্রিক “বর্বর” শত্রু হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা শক্তিশালী হয়। অন্যদিকে ব্রিটিশ প্রতিশোধের নির্মমতার স্মৃতি ভারতীয়দের মধ্যে ঔপনিবেশিক শাসনের আরেকটি অন্ধকার দিক হিসেবে থেকে যায়।
নানা সাহেবের ঐতিহাসিক মূল্যায়নও তাই একমাত্রিক নয়। তিনি একদিকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নীতিতে ক্ষুব্ধ একজন ক্ষমতাচ্যুত মারাঠা উত্তরাধিকারী, অন্যদিকে ১৮৫৭ সালে কানপুরের বিদ্রোহের প্রধান রাজনৈতিক নেতা। তাঁর শিবিরের অধীনে সংঘটিত সহিংস ঘটনাগুলোর দায় ও তাঁর ব্যক্তিগত নির্দেশের মাত্রা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও কানপুরের বিদ্রোহ তাঁর নামের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হয়ে গেছে।
সবচেয়ে বড় কথা, কানপুর ১৮৫৭ সালের সংঘাতের নির্মম বাস্তবতাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে। অবরোধের মধ্যে তৃষ্ণায় ও গোলায় মানুষের মৃত্যু, সতীচৌরা ঘাটের বিশৃঙ্খল হত্যাযজ্ঞ, বিবিঘরের বন্দিদের হত্যা এবং এরপর ব্রিটিশ প্রতিশোধ—সব মিলিয়ে এখানে বিদ্রোহ আর কেবল রাজনীতি বা সেনাবাহিনীর প্রশ্ন ছিল না। এটি হয়ে উঠেছিল বেঁচে থাকা, প্রতিহিংসা এবং ভেঙে পড়া সামাজিক নিয়মের এক ভয়াবহ যুদ্ধ।
১৮৫৭ সালের কানপুর তাই বিজয়ী ও পরাজিতের সরল ইতিহাস নয়; এটি এমন একটি ট্র্যাজেডি, যেখানে ঔপনিবেশিক সংঘাতের মধ্যে সৈনিক ও বেসামরিক মানুষের জীবন একই সঙ্গে ধ্বংস হয়েছিল। নানা সাহেব এই অধ্যায়ের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক চরিত্র হলেও কানপুরের প্রকৃত উত্তরাধিকার আরও গভীর—এটি দেখিয়ে দিয়েছিল বিদ্রোহ ও প্রতিশোধ যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন একটি রাজনৈতিক সংগ্রাম কত দ্রুত মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে।
নাইটস টেম্পলার ও নাইটস হসপিটালার: ক্রুসেডের কিংবদন্তি যোদ্ধা ধর্মীয় সংগঠনগুলোর উত্থান
ক্রুসেডার রাষ্ট্রগুলোর উত্থান: জেরুজালেম, এডেসা, অ্যান্টিওক ও ত্রিপোলির ইতিহাস
জেরুজালেম দখল ১০৯৯: ক্রুসেডারদের বিজয়, হত্যাযজ্ঞ ও নতুন রাজ্যের জন্ম
হাইপেশিয়া: প্রাচীন আলেকজান্দ্রিয়ার নারী দার্শনিক, গণিতবিদ ও তার নির্মম মৃত্যুর ইতিহাস
বৌডিকা: রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ব্রিটেনের দুর্ধর্ষ যোদ্ধা রানির ঐতিহাসিক বিদ্রোহ
বান ঝাও: প্রাচীন চীনের প্রথম বিখ্যাত নারী ইতিহাসবিদের জীবন, জ্ঞানচর্চা ও অমর উত্তরাধিকার