বিমান এত ভারী হয়েও আকাশে উড়তে পারে কীভাবে? ডানা……

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

বিমান এত ভারী হয়েও আকাশে উড়তে পারে কীভাবে? ডানা, গতি ও উত্তোলনের বিজ্ঞান

বিমান এত ভারী হয়েও আকাশে উড়তে পারে কীভাবে? ডানা, গতি ও উত্তোলনের বিজ্ঞান
ডানা ও বায়ুপ্রবাহের মিথস্ক্রিয়াই ভারী বিমানকে আকাশে রাখে।

বিমানবন্দরের রানওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল যাত্রীবাহী বিমান দেখে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক—এত মানুষ, মালপত্র ও জ্বালানি নিয়ে এই ভারী যন্ত্র আকাশে ওঠে কীভাবে? পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ তো তাকে নিচেই টানছে। উত্তর লুকিয়ে আছে বিমানের ডানা ও চলমান বাতাসের মিথস্ক্রিয়ায়। যথেষ্ট গতিতে বায়ু ডানার চারপাশ দিয়ে প্রবাহিত হলে ওপরের দিকে একটি বল তৈরি হয়, যাকে উত্তোলন বল বলা হয়। সঠিক অবস্থায় এই বল বিমানের ওজন সামলাতে পারে। ইঞ্জিন, ডানা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা একসঙ্গে সেই পরিস্থিতি তৈরি করে।

বিমানের চলাচল বোঝার জন্য চারটি প্রধান বল বিবেচনা করতে হয়। ওজন তাকে নিচে টানে, উত্তোলন ওপরে ধরে রাখে, ইঞ্জিন সামনে যাওয়ার ধাক্কা দেয় এবং বায়ুর বাধা গতির বিপরীতে কাজ করে। সোজা পথে সমান উচ্চতায় স্থির গতিতে উড়লে উত্তোলন ও ওজন সাধারণভাবে ভারসাম্যে থাকে; সামনের ধাক্কাও বায়ুর বাধার সমান হয়। বিমান ওপরে উঠছে, বাঁক নিচ্ছে নাকি গতি বাড়াচ্ছে—তার ওপর এই বলগুলোর সম্পর্ক বদলায়। তাই উড্ডয়ন মানে শুধু ওজনের চেয়ে বড় একটি বল তৈরি করা নয়।

ডানার প্রধান কাজ হলো চারপাশের বায়ুপ্রবাহের দিক ও চাপের বণ্টন বদলানো। একটি কার্যকর ডানা তার আশপাশ দিয়ে যাওয়া বাতাসকে এমনভাবে প্রভাবিত করে যে পেছনের প্রবাহে নিচের দিকে ভরবেগ তৈরি হয়। নিউটনের গতিসূত্র অনুযায়ী, ডানা বাতাসকে নিচের দিকে বল দিলে বাতাসও ডানার ওপর বিপরীত দিকে বল প্রয়োগ করে। এই প্রতিক্রিয়াই উত্তোলন বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। তবে বাতাস শুধু ডানার নিচে ধাক্কা খাচ্ছে—এমন ছবি অসম্পূর্ণ; ওপরের পৃষ্ঠের প্রবাহও বড় ভূমিকা রাখে।

ডানার চারপাশে চাপের পার্থক্য দিয়েও একই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা যায়। সাধারণ উড্ডয়ন অবস্থায় ওপরের পৃষ্ঠে তুলনামূলক কম চাপ এবং নিচের পৃষ্ঠে তুলনামূলক বেশি চাপ থাকে। পুরো পৃষ্ঠজুড়ে এই চাপগুলোর সম্মিলিত প্রভাব উত্তোলন তৈরি করে। অনেক ডানায় ওপরের পৃষ্ঠের কম চাপের অবদান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাতাসের নিচের দিকে বাঁক নেওয়া ও চাপের পার্থক্য দুটি আলাদা প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যাখ্যা নয়; একই বায়ুগতীয় ঘটনার পরস্পর সম্পর্কিত দিক। ডানার আকৃতি ও অবস্থান মিলেই এই প্রবাহ গড়ে ওঠে।

এখানে একটি বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা আছে। বলা হয়, ডানার ওপরের পথ লম্বা বলে ওপর দিয়ে যাওয়া বাতাসকে নিচের বাতাসের সঙ্গে একই সময়ে মিলতে দ্রুত চলতে হয়। বাস্তবে এমন একই সময়ে পৌঁছানোর কোনো নিয়ম নেই। ওপর ও নিচ দিয়ে আলাদা হওয়া বায়ুকণাকে পেছনে আবার জোড়া লাগতে হয় না। উত্তোলন বোঝার জন্য এই কল্পিত শর্ত দরকারও নেই। ডানার গঠন, প্রবাহের দিক এবং চাপের বণ্টন বিশ্লেষণ করলেই সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

ডানার আক্রমণ কোণও গুরুত্বপূর্ণ। এটি ডানার একটি নির্দিষ্ট রেখা ও তার দিকে আসা বায়ুপ্রবাহের মধ্যকার কোণ। উপযুক্ত সীমার মধ্যে কোণ বাড়ালে সাধারণত উত্তোলন বাড়ে। এজন্য শুধু ওপরের দিকে বাঁকা ডানাই উড়তে পারে, এমন নয়; সমমিত গঠনের ডানাও যথাযথ কোণে উত্তোলন তৈরি করে। কিন্তু কোণ অতিরিক্ত বাড়ালে বাতাস ওপরের পৃষ্ঠ অনুসরণ করতে পারে না এবং প্রবাহ বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। তখন উত্তোলন কমে ও বাধা বাড়ে। এই অবস্থাকে বলা হয় স্টল।

স্টল মানে বিমানের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। এটি মূলত ডানার বায়ুপ্রবাহের সমস্যা, যা সংকট আক্রমণ কোণ অতিক্রম করলে ঘটে। কম গতিতে ওজন সামলাতে বেশি আক্রমণ কোণ দরকার হওয়ায় স্টলের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে শুধু কম গতিই এর সংজ্ঞা নয়; তীব্র বাঁক বা অন্য অবস্থায় তুলনামূলক বেশি গতিতেও স্টল সম্ভব। এই কারণেই চালককে গতি, কোণ ও বিমানের ওপর চাপের সম্পর্ক বুঝে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

বড় বিমান ভারী হলেও তার ডানার আয়তন বড় এবং উড্ডয়নের গতি যথেষ্ট বেশি থাকে। বায়ুর ঘনত্ব, গতির বর্গ, ডানার আয়তন ও উত্তোলন-সম্পর্কিত বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে উত্তোলনের পরিমাণ নির্ধারিত হয়। অন্য সব বিষয় অপরিবর্তিত থাকলে বাতাসের তুলনায় গতি দ্বিগুণ হলে উত্তোলন প্রায় চার গুণ হতে পারে। তাই শুধু মোট ওজন দেখে কোনো বিমান উড়বে কি না বোঝা যায় না। ডানার প্রতি একক আয়তনকে কত ওজন বহন করতে হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ইঞ্জিনের প্রধান কাজ বিমানকে সামনে চালানো। জেট ইঞ্জিন বায়ু গ্রহণ করে, জ্বালানি পোড়ায় এবং পেছনের দিকে দ্রুত গ্যাস বের করে সামনের ধাক্কা তৈরি করে। পাখাচালিত বিমানে ঘূর্ণায়মান পাখা বাতাসকে পেছনে ঠেলে দেয়। সাধারণ যাত্রীবাহী বিমানে ইঞ্জিন সরাসরি পুরো ওজন ওপরে তুলে ধরে না; এটি ডানার চারপাশে প্রয়োজনীয় বায়ুপ্রবাহ বজায় রাখতে সাহায্য করে। তাই ইঞ্জিন বন্ধ হলেও বিমান সঙ্গে সঙ্গে পাথরের মতো পড়ে না। উচ্চতা কমিয়ে সামনে এগিয়ে ডানায় প্রবাহ রেখে কিছু দূর গ্লাইড করতে পারে।

উড্ডয়নের সময় রানওয়েতে দৌড়ানোর উদ্দেশ্য প্রয়োজনীয় গতি অর্জন করা। এরপর চালক নাক কিছুটা ওপরে তুলে ডানার আক্রমণ কোণ বাড়ান। উড্ডয়ন ও অবতরণে ডানার পেছনের চলমান অংশ নামিয়ে কার্যকর বাঁক এবং অনেক ক্ষেত্রে আয়তন বাড়ানো হয়। সামনের কিছু চলমান অংশও বড় কোণে প্রবাহ ধরে রাখতে সাহায্য করে। এতে তুলনামূলক কম গতিতে প্রয়োজনীয় উত্তোলন পাওয়া যায়। তবে বায়ুর বাধাও বাড়ে, তাই দ্রুত স্বাভাবিক উড্ডয়নে এসব অংশ সাধারণত গুটিয়ে রাখা হয়।

বাতাসের ঘনত্বও উড্ডয়নে প্রভাব ফেলে। গরম আবহাওয়া বা উঁচু বিমানবন্দরে বায়ু পাতলা হলে একই প্রকৃত গতিতে উত্তোলন কম হয়। তখন বেশি গতি, দীর্ঘ রানওয়ে কিংবা কম ওজন দরকার হতে পারে। একইভাবে সামনের বাতাস ডানার তুলনায় বায়ুর গতি বাড়াতে পারে, যদিও ভূমির তুলনায় বিমানের গতি কম থাকে। ভারী বিমানের উড্ডয়ন তাই কোনো রহস্যময় ভারশূন্যতা নয়। বাতাসের মধ্যে যথাযথ গতিতে সঠিকভাবে তৈরি ডানা চালিয়ে প্রয়োজনীয় বল তৈরি করার সুপরিকল্পিত প্রকৌশল।