বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মহাবিশ্বের শেষ কোথায়? অসীম মহাকাশের কি সত্যিই কোনো সীমানা আছে?

  • Author: Admin
  • August 13, 2026
মহাবিশ্বের শেষ কোথায়? অসীম মহাকাশের কি সত্যিই কোনো সীমানা আছে?
মহাবিশ্বের শেষ কোথায়?

রাতের আকাশের দিকে তাকালে একটি প্রশ্ন খুব স্বাভাবিকভাবেই মনে আসে—এই অসংখ্য তারা, ছায়াপথ আর অন্ধকার মহাশূন্য পেরিয়ে যেতে থাকলে একসময় কি কোনো শেষ প্রান্তে পৌঁছানো যাবে? পৃথিবীর সব পরিচিত জিনিসেরই তো কোনো না কোনো সীমানা আছে। একটি দেশ শেষ হলে আরেকটি দেশ শুরু হয়, সমুদ্রের পরে স্থলভাগ আসে, এমনকি পৃথিবীর পৃষ্ঠও সীমিত। তাহলে মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে কী ঘটে? মহাকাশেরও কি এমন কোনো শেষ আছে, যার ওপারে আর কিছু নেই?

এই প্রশ্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরটি হলো—বিজ্ঞান এখনো নিশ্চিতভাবে জানে না সমগ্র মহাবিশ্ব সসীম নাকি অসীম। তবে আমরা যথেষ্ট নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আমরা যে সীমা পর্যন্ত মহাবিশ্ব দেখতে পাই, সেটি মহাবিশ্বের কোনো দেয়াল, কিনারা বা শেষ প্রান্ত নয়। এটি মূলত আমাদের পর্যবেক্ষণের সীমা।

মহাবিশ্ব নিয়ে চিন্তা করার সময় প্রথমেই “সমগ্র মহাবিশ্ব” এবং “পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্ব”—এই দুটি ধারণাকে আলাদা করতে হয়। আমরা মহাবিশ্বের সবকিছু দেখতে পাই না। আলো অসীম গতিতে চলে না; শূন্যস্থানে আলো প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার অতিক্রম করে। ফলে অত্যন্ত দূরের কোনো বস্তু থেকে আলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে বিপুল সময় লাগে। আমরা যখন সূর্যকে দেখি, তখন প্রকৃতপক্ষে সূর্যের প্রায় আট মিনিট আগের অবস্থা দেখি। দূরের একটি ছায়াপথকে দেখলে আমরা সেটির লক্ষ, কোটি কিংবা শতকোটি বছর আগের অবস্থা দেখতে পারি।

মহাবিশ্বের বর্তমান বয়স প্রায় ১৩৮০ কোটি বছর। তাই প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, আমরা সর্বোচ্চ ১৩৮০ কোটি আলোকবর্ষ দূর পর্যন্ত দেখতে পারব। কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়। আলো যখন দূরের অঞ্চল থেকে আমাদের দিকে যাত্রা শুরু করেছিল, সেই সময়ের মধ্যে মহাবিশ্ব নিজেই প্রসারিত হয়েছে। ফলে যে অঞ্চল থেকে বহু শতকোটি বছর আগে আলো যাত্রা শুরু করেছিল, সেই অঞ্চলটি বর্তমানে আমাদের থেকে অনেক বেশি দূরে অবস্থান করছে।

এই প্রসারণকে হিসাবের মধ্যে নিলে বর্তমানে পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের ব্যাসার্ধ আনুমানিক ৪৬০০ কোটি আলোকবর্ষেরও বেশি এবং ব্যাস প্রায় ৯৩০০ কোটি আলোকবর্ষ। অর্থাৎ আমরা যে গোলাকার মহাজাগতিক অঞ্চলটির তথ্য নীতিগতভাবে পেতে পারি, তার বর্তমান বিস্তার অকল্পনীয় রকম বিশাল।

কিন্তু এখানেই একটি বড় ভুল ধারণা তৈরি হয়। কেউ ভাবতে পারেন, তাহলে ৪৬০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে নিশ্চয় মহাবিশ্বের শেষ। বাস্তবে তা নয়। পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের প্রান্ত হলো আমাদের মহাজাগতিক দিগন্ত, মহাবিশ্বের ভৌত প্রান্ত নয়। পৃথিবীতে সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে যেমন দিগন্ত দেখা যায়, কিন্তু দিগন্তে পৃথিবী শেষ হয়ে যায় না, মহাবিশ্বের ক্ষেত্রেও কিছুটা অনুরূপ ধারণা প্রযোজ্য।

আমরা মহাবিশ্বের একটি নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করছি বলেই আমাদের চারপাশে পর্যবেক্ষণযোগ্য অঞ্চলের একটি সীমা তৈরি হয়েছে। অত্যন্ত দূরের কোনো ছায়াপথে যদি একজন পর্যবেক্ষক থাকতেন, তাঁরও নিজস্ব পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্ব থাকত এবং তিনি নিজেকেই সেই পর্যবেক্ষণযোগ্য অঞ্চলের কেন্দ্রে দেখতে পেতেন। তাই পৃথিবী মহাবিশ্বের বিশেষ কোনো কেন্দ্রে রয়েছে—এমনটি ধরে নেওয়ার কারণ নেই।

এখানে আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, মহাবিশ্বের বয়স যত বাড়ছে, মহাকাশের প্রসারণের কারণে দূরবর্তী অঞ্চলগুলোর পারস্পরিক দূরত্বও পরিবর্তিত হচ্ছে। ছায়াপথগুলো কেবল একটি পূর্বস্থিত শূন্য জায়গার মধ্যে বোমার টুকরোর মতো ছুটে যাচ্ছে—এমন ছবি পুরোপুরি সঠিক নয়। বৃহৎ মহাজাগতিক মাত্রায় স্থান নিজেই প্রসারিত হচ্ছে।

এই কারণে মহাবিস্ফোরণকে কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে সংঘটিত সাধারণ বিস্ফোরণ হিসেবে কল্পনা করাও ভুল। এমন নয় যে মহাবিশ্বের কেন্দ্রে একটি বিন্দু বিস্ফোরিত হয়েছিল এবং পদার্থ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। বরং প্রাথমিক মহাবিশ্ব অত্যন্ত উত্তপ্ত ও ঘন অবস্থায় ছিল এবং পরবর্তীকালে মহাকাশের বিস্তার ঘটেছে। মহাবিস্ফোরণ মহাকাশের মধ্যে সংঘটিত হয়নি; আমাদের বর্তমান মহাজাগতিক বর্ণনায় মহাকাশ নিজেই সেই বিবর্তনের অংশ।

তাহলে মহাবিশ্ব যদি সসীম হয়, তার কি অবশ্যই একটি কিনারা থাকতে হবে? আশ্চর্যজনকভাবে উত্তর হলো—না।

এটি বোঝার জন্য পৃথিবীর পৃষ্ঠের উদাহরণ কার্যকর। পৃথিবীর পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল সসীম। কিন্তু পৃথিবীর পৃষ্ঠ ধরে আপনি কোনো একটি দিকে ক্রমাগত চলতে থাকলে এমন কোনো জায়গায় পৌঁছাবেন না যেখানে একটি বোর্ডে লেখা থাকবে—“এখানেই পৃথিবীর শেষ।” আপনি চলতে চলতে একসময় আবার আগের অঞ্চলে ফিরে আসতে পারেন। অর্থাৎ একটি জ্যামিতিক স্থান সসীম হয়েও সীমানাহীন হতে পারে।

অবশ্য পৃথিবীর পৃষ্ঠ দ্বিমাত্রিক, আর মহাবিশ্বের স্থান ত্রিমাত্রিক। তাই পৃথিবীর উদাহরণটি কেবল ধারণাটি বোঝানোর জন্য। মহাবিশ্বের সামগ্রিক জ্যামিতি ও স্থানিক গঠন অনেক জটিল। তবু মূল শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ—“সসীম” এবং “প্রান্তযুক্ত” একই অর্থ বহন করে না।

মহাবিশ্বের বৃহৎ আকারের জ্যামিতি বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা সাধারণত স্থানকে ধনাত্মক বক্র, সমতল অথবা ঋণাত্মক বক্র জ্যামিতির মাধ্যমে আলোচনা করেন। পর্যবেক্ষণ থেকে বর্তমান মহাবিশ্বকে অত্যন্ত কাছাকাছি স্থানিকভাবে সমতল বলে মনে হয়। কিন্তু “সমতল” শুনে কাগজের পাতার মতো কোনো দ্বিমাত্রিক জিনিস ভাবলে ভুল হবে। এখানে সমতল বলতে বৃহৎ মাত্রায় স্থানের জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্য বোঝানো হচ্ছে।

একটি স্থানিকভাবে সমতল মহাবিশ্ব অসীম হতে পারে। অর্থাৎ একই দিকে যতই এগোনো হোক না কেন, কোনো শেষ প্রান্ত নাও পাওয়া যেতে পারে। আবার কিছু জটিল মহাজাগতিক বিন্যাসে স্থান সমতল হওয়া সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে সসীম হওয়ার সম্ভাবনাও তাত্ত্বিকভাবে থাকতে পারে। তাই শুধু মহাবিশ্বের স্থানীয় বক্রতা পরিমাপ করেই তার মোট আকার বা অসীমত্ব সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সহজ নয়।

যদি মহাবিশ্ব সত্যিই অসীম হয়, তাহলে এর অর্থ আরও বিস্ময়কর। আমাদের পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্ব তখন সমগ্র বাস্তবতার একটি ক্ষুদ্র অংশমাত্র। ৯৩০০ কোটি আলোকবর্ষ বিস্তৃত দৃশ্যমান অঞ্চল আমাদের কাছে অকল্পনীয় বিশাল মনে হলেও অসীম মহাবিশ্বের তুলনায় সেটির অংশ কার্যত সীমিত একটি অঞ্চল।

আর যদি মহাবিশ্ব সসীম কিন্তু সীমানাহীন হয়, তাহলেও কোনো মহাজাগতিক দেয়াল থাকার প্রয়োজন নেই। আপনি তাত্ত্বিকভাবে একদিকে এগিয়ে যেতে থাকলেও “মহাকাশ শেষ” এমন কোনো স্থানে পৌঁছাবেন না। তবে মহাবিশ্বের প্রকৃত সামগ্রিক গঠন কী, তা এখনো পর্যবেক্ষণ দিয়ে নিশ্চিত করা যায়নি।

“মহাবিশ্বের বাইরে কী আছে?”—এই প্রশ্নটিও তাই খুব সতর্কভাবে করতে হয়। সাধারণ অভিজ্ঞতায় কোনো কিছুর বাইরে আরেকটি স্থান থাকে। একটি বাক্সের বাইরে ঘর, ঘরের বাইরে বাড়ি, বাড়ির বাইরে পৃথিবী। তাই আমরা স্বাভাবিকভাবেই ভাবি, মহাবিশ্ব যদি কোনোভাবে সীমিত হয়, তবে তার বাইরেও নিশ্চয় কোনো বিশাল শূন্যস্থান থাকবে।

কিন্তু মহাবিশ্ব বলতে যদি সমস্ত স্থান-কালকেই বোঝানো হয়, তাহলে “মহাবিশ্বের বাইরে কোথায়?” প্রশ্নটির মধ্যে একটি ধারণাগত সমস্যা তৈরি হয়। কারণ “বাইরে” বলতেই একটি স্থানিক অবস্থান ধরে নেওয়া হচ্ছে, অথচ স্থান নিজেই মহাবিশ্বের অংশ। প্রচলিত মহাজাগতিক তত্ত্বে মহাবিশ্বকে এমন কোনো বস্তু হিসেবে ভাবার প্রয়োজন নেই, যা আরও বড় একটি খালি ঘরের মধ্যে রাখা আছে।

এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে বিজ্ঞানের কাছে সব উত্তর রয়েছে। মহাবিশ্ব সম্পর্কে এমন বহু তাত্ত্বিক ধারণা রয়েছে যেখানে আমাদের পর্যবেক্ষণযোগ্য অঞ্চল আরও বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ হতে পারে। মহাজাগতিক স্ফীতি সম্পর্কিত কিছু তাত্ত্বিক কাঠামো অত্যন্ত বৃহৎ মহাবিশ্বের সম্ভাবনা নির্দেশ করে। আবার বহু-মহাবিশ্বের ধারণাও বিভিন্ন তাত্ত্বিক আলোচনায় আসে। কিন্তু এগুলোকে সরাসরি পর্যবেক্ষণে প্রতিষ্ঠিত সত্য এবং অনুমাননির্ভর তাত্ত্বিক সম্ভাবনার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।

মহাবিশ্বের সীমানা নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো মহাজাগতিক দিগন্ত। মহাবিশ্ব প্রসারিত হওয়ার পাশাপাশি সেই প্রসারণের হার দীর্ঘমেয়াদে এমন আচরণ করছে যে অত্যন্ত দূরের অনেক অঞ্চল আমাদের থেকে কার্যত ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। দূরবর্তী কোনো ছায়াপথ থেকে ভবিষ্যতে নির্গত আলো হয়তো কখনোই আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারবে না। অর্থাৎ শুধু অতীতের সীমা নয়, ভবিষ্যতে কোন ঘটনার সঙ্গে আমরা কার্যকারণগতভাবে যোগাযোগ করতে পারব, তারও একটি সীমা রয়েছে।

এখানে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়। আমরা বর্তমানে কোনো অত্যন্ত দূরের ছায়াপথ দেখতে পাচ্ছি মানেই সেই ছায়াপথের বর্তমান অবস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারব—এমন নয়। আমরা হয়তো সেটির বহু শতকোটি বছর আগের আলো দেখছি। বর্তমান সময়ে সেটি এত দূরে চলে যেতে পারে যে এখন সেখানে পাঠানো কোনো সংকেত কখনো তার কাছে পৌঁছাতে পারবে না।

আরও গভীরে গেলে আমরা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাই, যেখানে সাধারণ দৃশ্যমান আলো দিয়ে মহাবিশ্বের শৈশবের আগের অংশ দেখা যায় না। প্রাথমিক মহাবিশ্ব একসময় এত উত্তপ্ত ও ঘন ছিল যে আলো মুক্তভাবে দীর্ঘ পথ চলতে পারত না। মহাবিশ্ব প্রসারিত ও শীতল হওয়ার পর ইলেকট্রন ও পরমাণুর নিউক্লিয়াস মিলিত হয়ে নিরপেক্ষ পরমাণু গঠন করতে শুরু করে এবং আলো তুলনামূলকভাবে অবাধে চলতে পারে। সেই যুগের অবশিষ্ট বিকিরণ আজ মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ হিসেবে শনাক্ত করা যায়।

এই বিকিরণকে অনেক সময় পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের এক ধরনের প্রাচীনতম আলোকচিত্র বলা যায়। কিন্তু সেটিও মহাবিশ্বের কোনো দেয়াল নয়। তার ওপারে স্থান ছিল না—এমন নয়; বরং সেই সময়ের আগের মহাবিশ্ব সাধারণ আলোর জন্য অস্বচ্ছ ছিল। অর্থাৎ আমরা একটি পর্যবেক্ষণগত পর্দা দেখি, ভৌত প্রান্ত নয়।

মহাবিশ্বের বিশালতা বোঝার জন্য আমাদের অবস্থানটিও বিবেচনা করা দরকার। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে। সূর্য আকাশগঙ্গা ছায়াপথের শত শত কোটি নক্ষত্রের একটি। আকাশগঙ্গা আবার অসংখ্য ছায়াপথের মহাজাগতিক পরিবেশের অংশ। আরও বৃহৎ মাত্রায় ছায়াপথগুলো এলোমেলোভাবে ছড়ানো নয়; তারা বিশাল তন্তু, গুচ্ছ এবং শূন্য অঞ্চল নিয়ে মহাজাগতিক জাল তৈরি করেছে।

আমরা যত বড় মাত্রায় তাকাই, মহাবিশ্ব তত বেশি সমসত্ত্ব বলে প্রতীয়মান হয়। এই ধারণাই আধুনিক মহাজাগতিক বিজ্ঞানের একটি মৌলিক ভিত্তি। অর্থাৎ যথেষ্ট বৃহৎ মাত্রায় পৃথিবী বা আকাশগঙ্গাকে মহাবিশ্বের বিশেষ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করার পর্যবেক্ষণগত কারণ নেই।

তাহলে যদি কোনো মহাকাশযানকে অসীম শক্তি ও সময় দেওয়া হয় এবং সেটি একদিকে চলতেই থাকে, কী ঘটবে? বাস্তবে এই পরীক্ষা করা অসম্ভব। মহাজাগতিক প্রসারণ, আপেক্ষিকতার সীমা এবং অসীম দূরত্বের কারণে আমরা পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের বাইরের অঞ্চল সরাসরি ঘুরে দেখে আসতে পারি না। আলোর গতির সীমাও এখানে মৌলিক প্রতিবন্ধক।

এই কারণেই মহাবিশ্বের সামগ্রিক আকার নির্ধারণ করা এত কঠিন। আমরা এমন একটি ব্যবস্থার ভেতরে বসে সেটির মোট আকার নির্ণয় করার চেষ্টা করছি, যার কেবল একটি সীমিত অংশ থেকে তথ্য আমাদের কাছে পৌঁছাতে পেরেছে। অনেকটা বিশাল অন্ধকার সমুদ্রে একটি নৌকায় বসে চারপাশের দৃশ্যমান অঞ্চল দেখে সমগ্র সমুদ্রের আকৃতি নির্ধারণ করার মতো—যদিও মহাজাগতিক সমস্যাটি এর চেয়েও অনেক বেশি জটিল।

ভবিষ্যতে আরও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণের উন্নত মানচিত্র, বৃহৎ মাত্রায় ছায়াপথের বণ্টন, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ এবং মহাবিশ্বের জ্যামিতি সম্পর্কিত নতুন তথ্য আমাদের এই প্রশ্নের উত্তর আরও নির্ভুলভাবে দিতে পারে। কিন্তু এমনও হতে পারে যে সমগ্র মহাবিশ্বের আকার সম্পর্কে কিছু তথ্য আমাদের পর্যবেক্ষণযোগ্য দিগন্তের বাইরে থাকার কারণে চিরকাল সরাসরি পরীক্ষার নাগালের বাইরে থেকে যাবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মহাবিশ্বের “শেষ” বলতে আমরা সাধারণত যে দেয়াল বা কিনারার কথা কল্পনা করি, আধুনিক মহাজাগতিক বিজ্ঞানে তার কোনো প্রমাণ নেই। আমরা একটি পর্যবেক্ষণযোগ্য সীমা দেখতে পাই, কারণ আলো সীমিত গতিতে চলে, মহাবিশ্বের বয়স সীমিত এবং স্থান প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু এই সীমার ওপারে মহাবিশ্ব শেষ হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।

সমগ্র মহাবিশ্ব অসীম হতে পারে। আবার সেটি সসীম অথচ সীমানাহীনও হতে পারে। বর্তমান পর্যবেক্ষণ বৃহৎ মাত্রায় মহাবিশ্বকে অত্যন্ত কাছাকাছি সমতল দেখালেও তার মোট বিস্তার সম্পর্কে চূড়ান্ত উত্তর এখনো আমাদের হাতে নেই। তাই “মহাবিশ্বের শেষ কোথায়?” প্রশ্নটির সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক উত্তর কোনো নির্দিষ্ট দূরত্বের সংখ্যা নয়।

বরং উত্তরটি আরও গভীর—আমরা এখন পর্যন্ত মহাবিশ্বের কোনো ভৌত শেষ প্রান্ত খুঁজে পাইনি। আমরা শুধু আমাদের দেখার সীমা খুঁজে পেয়েছি। সেই দিগন্তের ওপারে কত দূর পর্যন্ত মহাকাশ বিস্তৃত, সেখানে কত ছায়াপথ রয়েছে, কিংবা সমগ্র স্থান সত্যিই অসীম কি না—এসব প্রশ্ন এখনো আধুনিক মহাজাগতিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে বিস্ময়কর অমীমাংসিত রহস্যগুলোর মধ্যে রয়েছে।