সুলেমানের পর অটোমান সাম্রাজ্য: প্রাসাদ রাজনীতি, জানিসারি বিদ্রোহ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ইতিহাস
সিরিজ: অটোমান সাম্রাজ্য: উত্থান, স্বর্ণযুগ ও পতনের ইতিহাস
সুলেমানের পর অটোমান ক্ষমতার নতুন সমীকরণ
১৫৬৬ সালের সেপ্টেম্বরে হাঙ্গেরির সিগেতভার দুর্গ অবরোধের সময় সুলতান সুলেমান প্রথম মারা গেলে অটোমান সাম্রাজ্য তার ইতিহাসের এক অসাধারণ পর্যায় অতিক্রম করছিল। ইস্তাম্বুল থেকে বুদা, আলজিয়ার্স থেকে বাগদাদ এবং ক্রিমিয়া থেকে ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তৃত এই রাষ্ট্র ছিল ইউরোপ, ভূমধ্যসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান শক্তি। কিন্তু সুলেমানের মৃত্যুর পর অটোমান সাম্রাজ্য হঠাৎ ভেঙে পড়েনি; বরং ক্ষমতা পরিচালনার ধরন ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করে। সুলতানের ব্যক্তিগত নেতৃত্বের পাশাপাশি প্রাসাদ, গ্র্যান্ড ভিজিয়ার, জানিসারি, রাজপরিবারের নারী, ধর্মীয় অভিজাত এবং প্রাদেশিক শক্তিগুলো রাজনীতিতে আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
পুরোনো ইতিহাসচর্চায় সুলেমানের মৃত্যুর পরের সময়কে প্রায়ই সরাসরি “অটোমান পতনের শুরু” হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। এই ব্যাখ্যায় শক্তিশালী বিজেতা সুলতানদের পর তথাকথিত দুর্বল শাসক, প্রাসাদের ষড়যন্ত্র, দুর্নীতি এবং জানিসারি বিদ্রোহকে সাম্রাজ্যের অবক্ষয়ের প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়। আধুনিক ইতিহাসচর্চায় এই সরল ধারণাকে অনেক বেশি সতর্কতার সঙ্গে দেখা হয়। কারণ ১৫৬৬ সালের পরও অটোমানরা নতুন অঞ্চল জয় করেছে, প্রশাসন পরিবর্তন করেছে, বিশাল যুদ্ধ পরিচালনা করেছে এবং আরও তিন শতাব্দীর বেশি সময় সাম্রাজ্য হিসেবে টিকে ছিল।
সুলেমানের উত্তরসূরি ছিলেন তার পুত্র দ্বিতীয় সেলিম, যিনি ১৫৬৬ থেকে ১৫৭৪ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। তিনি তার পিতা বা প্রপিতামহ প্রথম সেলিমের মতো ব্যক্তিগতভাবে বড় সামরিক অভিযানে নেতৃত্ব দেননি। এই পরিবর্তনকে কখনো সুলতানি নেতৃত্বের দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটি দেখায় যে অটোমান রাষ্ট্র এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যেখানে সুলতানের প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিতি ছাড়াই বিশাল প্রশাসনিক ও সামরিক ব্যবস্থা কাজ করতে পারত।
দ্বিতীয় সেলিমের সময়ে সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ছিলেন গ্র্যান্ড ভিজিয়ার সোকোল্লু মেহমেদ পাশা। সুলেমানের শেষ সময় থেকেই তিনি উচ্চ ক্ষমতায় ছিলেন এবং দ্বিতীয় সেলিম ও তৃতীয় মুরাদের শাসনের প্রথম পর্যায়েও রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার মতো গ্র্যান্ড ভিজিয়ারদের উত্থান দেখায় যে অটোমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতা ক্রমশ একটি বৃহত্তর প্রশাসনিক অভিজাত শ্রেণির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিল।
দ্বিতীয় সেলিমের সময়েই ১৫৭১ সালে সাইপ্রাস অটোমানদের হাতে আসে, যদিও একই বছর লেপান্তোর নৌযুদ্ধে অটোমান নৌবহর বড় পরাজয়ের সম্মুখীন হয়। অল্প সময়ের মধ্যে নৌবহর পুনর্গঠন করা হয় এবং ১৫৭৪ সালে তিউনিস পুনর্দখল করা হয়। ফলে সুলেমানের মৃত্যুর পরই সাম্রাজ্য সামরিকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়েছিল—এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
তবে রাজনৈতিক কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটছিল। অটোমান রাজবংশের পুরোনো উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় রাজপুত্রদের সাধারণত প্রদেশে পাঠানো হতো। সেখানে তারা প্রশাসনের অভিজ্ঞতা অর্জন করত এবং সুলতানের মৃত্যুর পর যে রাজপুত্র দ্রুত রাজধানী ও সেনাবাহিনীর সমর্থন অর্জন করতে পারতেন, তিনি সিংহাসন দখল করতেন। এই ব্যবস্থা দক্ষ শাসক তৈরির সুযোগ দিলেও ভাইদের মধ্যে গৃহযুদ্ধের বিপুল ঝুঁকি সৃষ্টি করত।
দ্বিতীয় মেহমেদের সময় রাজবংশীয় ভ্রাতৃহত্যাকে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার যুক্তিতে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরবর্তী সুলতানরাও কখনো সিংহাসনে বসে নিজেদের ভাইদের হত্যা করিয়েছেন। সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণগুলোর একটি ঘটে ১৫৯৫ সালে তৃতীয় মেহমেদের সিংহাসনে আরোহণের সময়, যখন তার উনিশজন ভাইকে হত্যা করা হয় বলে অটোমান সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু এই পদ্ধতির বিরুদ্ধে প্রাসাদ ও সমাজে উদ্বেগ বাড়ছিল। সপ্তদশ শতাব্দীর শুরু থেকে উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় পরিবর্তন দেখা যায়। রাজপুত্রদের প্রদেশে পাঠানোর প্রথা ক্রমে বন্ধ হয়ে যায় এবং তারা তোপকাপি প্রাসাদের নিয়ন্ত্রিত অংশে অবস্থান করতে শুরু করেন। এই ব্যবস্থাকে পরবর্তী ইতিহাসে কাফেস, অর্থাৎ “খাঁচা” নামে পরিচিত করা হয়েছে।
কাফেসকে আক্ষরিক অর্থে সবসময় ছোট কারাগার হিসেবে কল্পনা করা ঠিক নয়। রাজপুত্ররা প্রাসাদের নির্দিষ্ট আবাসিক অংশে বাস করতেন, কিন্তু তাদের রাজনৈতিক যোগাযোগ ও স্বাধীনতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হতে পারত। এর ফলে ভ্রাতৃহত্যার প্রয়োজন কমলেও নতুন সমস্যা তৈরি হয়। ভবিষ্যৎ সুলতানদের অনেকেই প্রাদেশিক প্রশাসন বা সামরিক নেতৃত্বের বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়াই সিংহাসনে বসতে শুরু করেন।
একই সময়ে রাজপরিবারের নারীদের রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে সুলতানের মা বা ভালিদে সুলতান প্রাসাদের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত হতে পারেন। তাদের নিজস্ব কর্মচারী, অর্থনৈতিক সম্পদ, ওয়াকফ, বিবাহসম্পর্ক এবং প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক ছিল।
সুলেমানের স্ত্রী হুররেম সুলতানের সময় থেকেই রাজপরিবারের নারীদের রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে নুরবানু সুলতান, সাফিয়ে সুলতান এবং বিশেষ করে কোসেম সুলতান অটোমান রাজনীতিতে গভীর প্রভাব বিস্তার করেন। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগের এই সময়কে পরে কখনো “নারীদের সালতানাত” বলা হয়েছে।
কিন্তু এই শব্দটি সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা দরকার। এটি এমন ধারণা তৈরি করতে পারে যেন অটোমান রাষ্ট্র হঠাৎ “হারেমের নারীদের হাতে” চলে গিয়েছিল। বাস্তবে রাজপরিবারের নারীরা একটি বৃহত্তর ক্ষমতার নেটওয়ার্কের অংশ ছিলেন, যেখানে সুলতান, গ্র্যান্ড ভিজিয়ার, জানিসারি, উলামা, প্রাসাদীয় কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা করত।
বিশেষ করে কোনো সুলতান অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে তার মায়ের ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পেত। কোসেম সুলতান তার পুত্র চতুর্থ মুরাদ ও ইব্রাহিম এবং পরে নাতি চতুর্থ মেহমেদের সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন। কিছু সময় তিনি কার্যত রিজেন্ট হিসেবেও ক্ষমতা পরিচালনা করেন।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে জানিসারিদের রাজনৈতিক ভূমিকার উত্থান ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। জানিসারি বাহিনী মূলত সুলতানের কেন্দ্রীয় বেতনভুক্ত পদাতিক বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চরিত্র বদলাতে থাকে। দেবশিরমে আর জানিসারি নিয়োগের একমাত্র পথ থাকেনি, এবং বাহিনীর সদস্যরা ইস্তাম্বুলের ব্যবসা, কারুশিল্প ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে শুরু করে।
একই সঙ্গে যুদ্ধের ধরন বদলাচ্ছিল। আগ্নেয়াস্ত্রধারী পদাতিকের প্রয়োজন বাড়ছিল এবং কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনীর আকারও বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ফলে জানিসারিদের সংখ্যা ও রাজনৈতিক গুরুত্ব দুটোই বাড়ে। তারা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের সৈন্য নয়; রাজধানীর একটি সংগঠিত শক্তিতে পরিণত হয়।
অর্থনৈতিক সমস্যাও এই রাজনৈতিক অস্থিরতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ষোড়শ শতাব্দীর শেষদিকে ভূমধ্যসাগরীয় ও ইউরোপীয় অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি বড় সমস্যা হয়ে ওঠে। আমেরিকা থেকে ইউরোপে বিপুল রৌপ্য প্রবাহসহ বিভিন্ন কারণে মুদ্রার মূল্য ও পণ্যের দাম পরিবর্তিত হচ্ছিল। অটোমান সরকারও রাজস্ব ও সামরিক ব্যয়ের চাপ সামলাতে মুদ্রার ধাতব মান পরিবর্তন বা অবমূল্যায়নের পথে যায়।
বেতনভুক্ত জানিসারিদের জন্য এটি ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। তাদের বেতনের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে অসন্তোষ বাড়ত। ১৫৮৯ সালের বেইলারবেই ঘটনা এই উত্তেজনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। নিম্নমানের মুদ্রায় বেতন পাওয়ার অভিযোগে জানিসারি ও অন্যান্য সৈন্য বিদ্রোহ করে এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের শাস্তির দাবি জানায়।
এটি ভবিষ্যতের একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। সুলতানের সেনাবাহিনীর একটি অংশ এখন বুঝতে পারছিল যে সংগঠিত চাপের মাধ্যমে মন্ত্রী অপসারণ, অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় এবং এমনকি রাজনীতির গতিপথও প্রভাবিত করা সম্ভব।
সাম্রাজ্যের সমস্যাগুলো শুধু ইস্তাম্বুলে সীমাবদ্ধ ছিল না। ষোড়শ শতাব্দীর শেষ ও সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে আনাতোলিয়ায় ব্যাপক জেলালি বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। এর পেছনে ছিল করের চাপ, যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব, গ্রামীণ অস্থিরতা, সশস্ত্র বেকার সৈন্য, স্থানীয় ক্ষমতার সংঘর্ষ এবং প্রশাসনিক পরিবর্তনসহ বহু কারণ।
বিশেষ করে ১৫৯৩–১৬০৬ সালের দীর্ঘ হাবসবুর্গ যুদ্ধ এবং একই সময়ের সামরিক চাপ রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে দুর্বল করে। বিপুলসংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্রধারী সৈন্য যুদ্ধ শেষে কাজ হারিয়ে আনাতোলিয়ায় ফিরে গেলে তাদের একটি অংশ সশস্ত্র গোষ্ঠীতে যোগ দেয়। গ্রাম লুণ্ঠন, কৃষকের স্থানচ্যুতি এবং স্থানীয় প্রশাসনের ভাঙন আনাতোলিয়ার বহু অঞ্চলে গুরুতর সংকট সৃষ্টি করে।
এই জেলালি বিদ্রোহগুলোকে শুধু “কৃষক বিদ্রোহ” বলা যথেষ্ট নয়। বিদ্রোহী নেতাদের মধ্যে সাবেক সৈনিক, প্রাদেশিক কর্মকর্তা ও স্থানীয় ক্ষমতাবান ব্যক্তিও ছিলেন। কোনো কোনো বিদ্রোহী এত বড় বাহিনী গড়ে তুলেছিল যে কেন্দ্রীয় সরকারকে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে হয়।
সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে রাজবংশীয় রাজনীতিও নতুন সংকটে পড়ে। প্রথম আহমেদ ১৬০৩ সালে সিংহাসনে বসার পর তার ভাই মুস্তাফাকে সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করেননি। পরবর্তীতে ১৬১৭ সালে আহমেদের মৃত্যুর পর তার পুত্রের পরিবর্তে ভাই প্রথম মুস্তাফা সুলতান হন। এটি অটোমান উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়—রাজবংশের বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষ সদস্যের উত্তরাধিকার বা একবেরিয়েত নীতি ধীরে ধীরে গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
এর ফলে রক্তক্ষয়ী রাজপুত্র-যুদ্ধ ও ভ্রাতৃহত্যা কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। কিন্তু একই সঙ্গে প্রাসাদের ভেতরে থাকা রাজপুত্রদের ওপর বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়ে। কে সুলতান হবে এবং কে সুলতানের নামে ক্ষমতা চালাবে—এই দুটি প্রশ্ন ক্রমেই আলাদা হয়ে উঠতে থাকে।
এই সমস্যার সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ ছিলেন দ্বিতীয় ওসমান। ১৬১৮ সালে অল্প বয়সে সিংহাসনে বসা ওসমান জানিসারিদের ওপর ক্রমশ অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠেন। ১৬২১ সালের খোতিন অভিযানে পোলিশ-লিথুয়ানীয় কমনওয়েলথের বিরুদ্ধে প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ার পর তিনি সেনাবাহিনীর দুর্বলতা নিয়ে আরও ক্ষুব্ধ হন।
সমসাময়িক ও পরবর্তী সূত্র অনুযায়ী, ওসমান জানিসারি ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এবং সম্ভবত বিকল্প সামরিক শক্তি গড়ার কথা ভাবছিলেন। তার প্রকৃত পরিকল্পনা কতদূর গিয়েছিল তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু জানিসারিদের মধ্যে সন্দেহ জন্মেছিল যে তরুণ সুলতান তাদের বিশেষ অবস্থান ভেঙে দিতে চান।
১৬২২ সালে পরিস্থিতি বিস্ফোরিত হয়। জানিসারি ও তাদের সহযোগীরা বিদ্রোহ করে। দ্বিতীয় ওসমানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং পরে তাকে হত্যা করা হয়। একজন অটোমান সুলতান নিজের রাজধানীতে নিজের সৈন্যদের হাতে ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হওয়া ছিল রাজবংশের ইতিহাসে ভয়াবহ রাজনৈতিক ধাক্কা।
এই ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে সুলতানের ক্ষমতা তাত্ত্বিকভাবে সর্বোচ্চ হলেও বাস্তবে সাম্রাজ্যের সংগঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। জানিসারিরা এখন শুধু রাজদরবারের সৈন্য নয়; সুলতানকেও রাজনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ করার সক্ষম শক্তি।
পরবর্তী দশকে এই অস্থিরতার মধ্যেই চতুর্থ মুরাদ সিংহাসনে আসেন। ১৬২৩ সালে তিনি মাত্র এগারো বছর বয়সে সুলতান হন। প্রথম দিকে তার মা কোসেম সুলতান ও প্রাসাদের বিভিন্ন গোষ্ঠী প্রশাসনে বড় ভূমিকা পালন করে। রাজধানীতে জানিসারি ও সিপাহিদের চাপও প্রবল ছিল।
১৬৩২ সালে সৈন্যদের একটি বিদ্রোহ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে তারা সুলতানের সামনে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের শাস্তির দাবি জানায়। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুরাদ পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেন। চতুর্থ মুরাদ ব্যক্তিগতভাবে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত কঠোর নীতি গ্রহণ করেন।
তিনি বিদ্রোহী সামরিক গোষ্ঠী ও সন্দেহভাজন প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে কঠোর দমন চালান। ইস্তাম্বুলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন এবং প্রশাসনের ওপর ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ বাড়ান। তার শাসনের কঠোরতা কখনো নির্মম পর্যায়ে পৌঁছেছিল, কিন্তু এর ফলে অন্তত সাময়িকভাবে রাজধানীতে সুলতানি কর্তৃত্ব শক্তিশালী হয়।
মুরাদ শুধু প্রাসাদে বসে ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেননি। সাফাভিদের বিরুদ্ধে তিনি ব্যক্তিগতভাবে সামরিক অভিযানে নেতৃত্ব দেন। ১৬৩৮ সালে বাগদাদ পুনর্দখল তার শাসনের অন্যতম বড় সামরিক সাফল্য। পরের বছর ১৬৩৯ সালের কাসর-ই শিরিন বা জুহাব চুক্তি অটোমান ও সাফাভি সাম্রাজ্যের মধ্যে সীমান্তের একটি দীর্ঘস্থায়ী কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সপ্তদশ শতাব্দীর অটোমান ইতিহাসকে যদি শুধু বিদ্রোহ ও দুর্বলতার গল্প হিসেবে দেখা হয়, তাহলে বাগদাদ পুনর্দখলের মতো বড় সামরিক সাফল্য ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই রাষ্ট্রে প্রাসাদীয় সংকট, জানিসারি বিদ্রোহ এবং কার্যকর সাম্রাজ্যিক যুদ্ধ—সব একসঙ্গে ঘটতে পারত।
চতুর্থ মুরাদের ১৬৪০ সালে মৃত্যুর পর তার ভাই ইব্রাহিম সিংহাসনে বসেন। দীর্ঘদিন কাফেসে থাকার অভিজ্ঞতা এবং রাজবংশের অনিশ্চিত পরিবেশ তার শাসনের ওপর প্রভাব ফেলেছিল বলে মনে করা হয়, যদিও পরবর্তী যুগের অতিরঞ্জিত কাহিনি থেকে প্রকৃত ইতিহাস আলাদা করা জরুরি।
ইব্রাহিমের সময় প্রাসাদীয় গোষ্ঠী, সামরিক বাহিনী এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব আবার বাড়ে। ১৬৪৮ সালে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং পরে হত্যা করা হয়। তার অল্পবয়সী পুত্র চতুর্থ মেহমেদ সুলতান হলে আবারও রিজেন্সি ও প্রাসাদ রাজনীতির গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।
এই সময় কোসেম সুলতান ও চতুর্থ মেহমেদের মা তুরহান সুলতানের মধ্যে প্রভাবের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। ১৬৫১ সালে কোসেম সুলতান নিহত হন। ঘটনাটি প্রমাণ করে যে রাজপরিবারের নারীদের ক্ষমতা ছিল বাস্তব, কিন্তু সেই ক্ষমতা ছিল একই সঙ্গে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
রাজধানীর সামরিক অস্থিরতাও চলতে থাকে। ১৬৫৬ সালের চিনার ঘটনা বা ভাকা-ই ভাকভাকিয়্যে-তে বিদ্রোহী সৈন্যরা বহু কর্মকর্তা ও প্রাসাদ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড দাবি করে। ইস্তাম্বুলের রাজনৈতিক পরিবেশ আবারও দেখিয়ে দেয় যে কেন্দ্রীয় প্রশাসন গুরুতর সংকটে রয়েছে।
কিন্তু একই বছর অটোমান ইতিহাসে আরেকটি বড় পরিবর্তন আসে। কোপ্রুলু মেহমেদ পাশাকে গ্র্যান্ড ভিজিয়ার করা হয়। তিনি বিস্তৃত কর্তৃত্ব পাওয়ার শর্তে পদ গ্রহণ করেন এবং দ্রুত প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।
কোপ্রুলু মেহমেদ পাশা এবং পরে তার পুত্র কোপ্রুলু ফাজিল আহমেদ পাশা-সহ একই পরিবারের একাধিক গ্র্যান্ড ভিজিয়ার সাম্রাজ্যের প্রশাসন ও সামরিক শক্তি পুনরুজ্জীবিত করেন। এই সময়কে কখনো কোপ্রুলু যুগ বলা হয়।
তাদের অধীনে দুর্নীতিগ্রস্ত বা অকার্যকর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, রাজস্ব সংগ্রহ জোরদার করা হয় এবং সামরিক অভিযান পুনরায় কার্যকর করা হয়। ভেনিসের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ক্রিট যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত অটোমান বিজয়ে শেষ হয় এবং ১৬৬৯ সালে কান্দিয়া পতনের মাধ্যমে ক্রিটের অধিকাংশ অঞ্চলে অটোমান কর্তৃত্ব সুসংহত হয়।
এই পুনরুদ্ধার একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য প্রকাশ করে। সুলেমানের পর অটোমান সাম্রাজ্য এমন কোনো সোজা রেখায় চলেনি যেখানে প্রতিটি দশক আগের চেয়ে দুর্বল হয়েছে। বরং সংকটের পর পুনর্গঠন, কেন্দ্রীকরণের পর বিকেন্দ্রীকরণ এবং দুর্বল নেতৃত্বের পর শক্তিশালী প্রশাসনের পর্যায় বারবার এসেছে।
জানিসারিদের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। তাদের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিঃসন্দেহে অটোমান সরকারের জন্য গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু তারা কেবল “অকার্যকর বিদ্রোহী সৈন্যে” পরিণত হয়েছিল—এমন ধারণাও অতিরঞ্জিত। জানিসারি বাহিনী দীর্ঘ সময় সামরিক কাজে ব্যবহৃত হয়েছে এবং তাদের পরিবর্তন বৃহত্তর সামরিক, অর্থনৈতিক ও নগর সামাজিক পরিবর্তনের অংশ ছিল।
তিমারভিত্তিক অশ্বারোহী বাহিনীর তুলনায় নগদ বেতনভুক্ত আগ্নেয়াস্ত্রধারী সৈন্যের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছিল। দীর্ঘ যুদ্ধ পরিচালনা করতে আরও বেশি নগদ অর্থ দরকার হচ্ছিল। ফলে রাষ্ট্রের করব্যবস্থাও পরিবর্তিত হয় এবং ইলতিজাম বা কর ইজারা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই আর্থিক পরিবর্তনের ফলে প্রদেশে নতুন ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। স্থানীয় অভিজাত, করসংগ্রাহক ও প্রশাসনিক মধ্যস্থতাকারীরা ক্রমে বেশি প্রভাব অর্জন করে। অর্থাৎ সুলেমানের পর পরিবর্তন শুধু তোপকাপি প্রাসাদের ভেতরে ঘটেনি; রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি ও কেন্দ্র-প্রদেশ সম্পর্কও পুনর্গঠিত হচ্ছিল।
রাজপরিবারের কাঠামোও স্থায়ীভাবে বদলে যায়। রাজপুত্রদের প্রদেশে পাঠিয়ে শাসনের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পুরোনো ব্যবস্থা বিলুপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তোপকাপি প্রাসাদ রাজবংশীয় রাজনীতির আরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। সুলতানের মা, স্ত্রী বা প্রিয় সঙ্গিনী, প্রধান কৃষ্ণাঙ্গ খোজা কর্মকর্তা, দরবারের কর্মচারী এবং উচ্চপদস্থ উজিরদের মধ্যে সম্পর্ক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে থাকে।
এখানে “হারেম” শব্দটিকেও জনপ্রিয় কল্পকাহিনি থেকে আলাদা করে বোঝা জরুরি। অটোমান সাম্রাজ্যিক হারেম শুধু বিলাসিতা ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্থান ছিল না; এটি ছিল রাজবংশের পরিবার, উত্তরাধিকার এবং পৃষ্ঠপোষকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। রাজপুত্রের জন্ম, তার মায়ের অবস্থান এবং প্রাসাদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারত।
একইভাবে গ্র্যান্ড ভিজিয়ারের পদও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শক্তিশালী সুলতানের অধীনে গ্র্যান্ড ভিজিয়ার ছিলেন প্রধান প্রতিনিধি; অপেক্ষাকৃত কম সক্রিয় বা অপ্রাপ্তবয়স্ক সুলতানের সময় তিনি কার্যত সাম্রাজ্যের দৈনন্দিন প্রশাসনের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিতে পরিণত হতে পারতেন। কোপ্রুলুদের সময় এই প্রবণতা বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়।
ফলে সপ্তদশ শতাব্দীর অটোমান রাষ্ট্রকে “দুর্বল সুলতানদের কারণে পতনশীল সাম্রাজ্য” হিসেবে দেখার পরিবর্তে ক্ষমতার পুনর্বণ্টনের রাষ্ট্র হিসেবে দেখা বেশি যথাযথ। সুলতানের সর্বোচ্চ বৈধতা বজায় ছিল, কিন্তু বাস্তব শাসন ক্রমে আরও বেশি প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে ভাগ হয়ে যাচ্ছিল।
এতে অবশ্য বিপদও ছিল। কোনো একটি গোষ্ঠী অতিরিক্ত শক্তিশালী হলে ভারসাম্য নষ্ট হতে পারত। জানিসারি বিদ্রোহ, প্রাসাদীয় ষড়যন্ত্র, দ্রুত গ্র্যান্ড ভিজিয়ার পরিবর্তন এবং সুলতান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঘটনা প্রশাসনের ধারাবাহিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করত। কিন্তু অটোমান ব্যবস্থার আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য ছিল—এত গুরুতর রাজনৈতিক সংকটের পরও রাষ্ট্রের মূল প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার পুনর্গঠিত হতে পেরেছে।
সুলেমানের পরের শতাব্দী তাই অটোমান ইতিহাসে শুধু অবক্ষয়ের অধ্যায় নয়; এটি ছিল রূপান্তরের যুগ। পুরোনো সীমান্তযোদ্ধা সাম্রাজ্য ইতোমধ্যে বিশাল স্থায়ী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। সেই রাষ্ট্রকে চালাতে নতুন ধরনের রাজস্ব, আরও বড় বেতনভুক্ত সেনাবাহিনী, শক্তিশালী আমলাতন্ত্র এবং প্রাদেশিক মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন হচ্ছিল।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘর্ষ অনিবার্য ছিল। যে জানিসারি একসময় সুলতানের কেন্দ্রীয় ক্ষমতার প্রধান অস্ত্র ছিল, সেই বাহিনী এখন নিজস্ব স্বার্থসম্পন্ন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। যে প্রাসাদ একসময় সুলতানের ব্যক্তিগত আবাস ছিল, সেটি এখন রাজবংশ, আমলা, সামরিক গোষ্ঠী ও পৃষ্ঠপোষকতার জটিল রাজনৈতিক কেন্দ্র। আর যে গ্র্যান্ড ভিজিয়ার একসময় প্রধান সহকারী ছিলেন, তিনি কখনো কখনো সাম্রাজ্যের বাস্তব সরকারপ্রধানের মতো ক্ষমতা ব্যবহার করছেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পরিবর্তন সত্ত্বেও অটোমান সাম্রাজ্য সপ্তদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এখনও ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র ছিল। তার বাহিনী বাগদাদ পুনর্দখল করেছে, ক্রিট জয় করেছে এবং মধ্য ইউরোপে বড় অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামরিক শক্তি একই সময়ে সহাবস্থান করেছিল।
তবে এই পুনর্গঠিত অটোমান ব্যবস্থাকে শিগগিরই আরও কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। মধ্য ইউরোপে হাবসবুর্গদের শক্তি বাড়ছিল, রাশিয়া ধীরে ধীরে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছিল এবং ইউরোপীয় যুদ্ধপ্রযুক্তি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন ঘটছিল। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে এই চাপের সবচেয়ে নাটকীয় প্রকাশ ঘটবে ১৬৮৩ সালের দ্বিতীয় ভিয়েনা অবরোধ এবং তার পরবর্তী যুদ্ধে।
সুতরাং ১৫৬৬ সালে সুলেমানের মৃত্যুকে অটোমান সাম্রাজ্যের আকস্মিক পতনের সূচনা বলা যথার্থ নয়। বরং তার পরের শতাব্দীতে ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছে, রাজবংশীয় উত্তরাধিকার বদলেছে, জানিসারিদের চরিত্র বদলেছে, রাজপরিবারের নারীদের রাজনৈতিক ভূমিকা বেড়েছে, গ্র্যান্ড ভিজিয়ারদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক-সামরিক কাঠামো নতুন বাস্তবতার সঙ্গে অভিযোজিত হয়েছে।
এই পরিবর্তন কখনো সহিংস, কখনো বিশৃঙ্খল এবং কখনো অত্যন্ত সফল ছিল। দ্বিতীয় ওসমানের হত্যাকাণ্ড সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক দুর্বলতা প্রকাশ করেছিল; চতুর্থ মুরাদের কঠোর শাসন কেন্দ্রীয় ক্ষমতার পুনরুত্থান দেখিয়েছিল; কোসেম সুলতানের জীবন ও মৃত্যু প্রাসাদীয় রাজনীতির গভীরতা প্রকাশ করেছিল; আর কোপ্রুলুদের উত্থান প্রমাণ করেছিল যে সংকটে পড়লেও অটোমান প্রশাসন এখনও নিজেকে পুনর্গঠনের ক্ষমতা রাখত।
সুলেমানের পর অটোমান সাম্রাজ্য তাই শুধু “পতনশীল” হয়নি—এটি বদলে গিয়েছিল। ব্যক্তিগতভাবে যুদ্ধ পরিচালনাকারী বিজেতা সুলতানের যুগ থেকে সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে এমন একটি জটিল রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করে যেখানে সুলতান, রাজপরিবার, গ্র্যান্ড ভিজিয়ার, জানিসারি, উলামা, আমলা এবং প্রাদেশিক শক্তিগুলো একে অপরের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগ, প্রতিযোগিতা ও দরকষাকষি করত। এই নতুন ব্যবস্থা সাম্রাজ্যের জন্য নতুন সংকট সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু একই সঙ্গে পরিবর্তিত বিশ্বের মধ্যে অটোমান রাষ্ট্রকে আরও কয়েক শতাব্দী টিকে থাকার পথও তৈরি করেছিল।
প্যারিসে ভাইকিং আক্রমণ ও নরম্যান্ডির জন্ম: রোলো থেকে নরম্যান শক্তির উত্থানের ইতিহাস
আলফ্রেড দ্য গ্রেট বনাম ভাইকিং: এডিংটনের যুদ্ধ, গুথরুম ও ডেনল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
গ্রেট হিথেন আর্মি: বিশাল ভাইকিং বাহিনী কীভাবে ইংল্যান্ডের রাজ্যগুলো একে একে দখল করেছিল?
ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড ও ফ্রান্সে ভাইকিং অভিযান: লুটপাট থেকে স্থায়ী বসতি ও রাজ্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
ভাইকিং লংশিপ ও নৌযাত্রা: যে প্রযুক্তি নর্স যোদ্ধাদের ইউরোপের আতঙ্কে পরিণত করেছিল
লিন্ডিসফার্ন আক্রমণ ৭৯৩: যে ভয়াবহ হামলা ইউরোপে ভাইকিং যুগের সূচনা করেছিল