বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

সুলতান সুলেমানের স্বর্ণযুগ: বেলগ্রেড, রোডস ও মোহাচ জয়ে অটোমান সাম্রাজ্যের শিখরে আরোহণ

সিরিজ: অটোমান সাম্রাজ্য: উত্থান, স্বর্ণযুগ ও পতনের ইতিহাস

সুলতান সুলেমানের স্বর্ণযুগ: বেলগ্রেড, রোডস ও মোহাচ জয়ে অটোমান সাম্রাজ্যের শিখরে আরোহণ
সুলেমানের বিজয়ে অটোমান শক্তির শিখরে আরোহণ

১৫২০ সালে প্রথম সেলিমের মৃত্যুর পর তার পুত্র সুলেমান যখন অটোমান সিংহাসনে বসেন, তখন তিনি এমন একটি সাম্রাজ্য উত্তরাধিকারসূত্রে পান যার শক্তির ভিত্তি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বিস্তৃত। বলকান ও আনাতোলিয়ার পাশাপাশি সিরিয়া, মিশর ও হিজাজ এখন অটোমান শাসনের অন্তর্ভুক্ত। কায়রোর সম্পদ, পূর্ব ভূমধ্যসাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর, মক্কা-মদিনার ওপর রাজনৈতিক সুরক্ষা এবং শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সামরিক ব্যবস্থা তরুণ সুলতানের হাতে বিপুল সামর্থ্য এনে দিয়েছিল। কিন্তু সুলেমান শুধু পিতার সাম্রাজ্য রক্ষা করেননি; কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি সেটিকে ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরের অন্যতম প্রভাবশালী সামরিক-রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেন।

ইউরোপে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট নামে। অটোমান ঐতিহ্যে তার আরেকটি বিখ্যাত পরিচয় কানুনি সুলতান সুলেমান—আইনপ্রণেতা সুলেমান। তার দীর্ঘ শাসনকাল ১৫২০ থেকে ১৫৬৬ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই প্রায় অর্ধশতাব্দীকে প্রায়ই অটোমান সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগের কেন্দ্রীয় অধ্যায় হিসেবে দেখা হয়। তবে এই স্বর্ণযুগের ভিত্তি শুধু রাজপ্রাসাদ, শিল্প বা স্থাপত্যে ছিল না। এর পেছনে ছিল দক্ষ প্রশাসন, বিপুল রাজস্ব, সংগঠিত সেনাবাহিনী, কার্যকর রসদব্যবস্থা এবং একের পর এক কৌশলগত সামরিক সাফল্য।

সিংহাসনে বসার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সুলেমান ইউরোপীয় সীমান্তের একটি পুরোনো সমস্যার দিকে মনোযোগ দেন—বেলগ্রেড। দানিয়ুব ও সাভা নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত এই দুর্গনগর মধ্য ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান দ্বার ছিল। দ্বিতীয় মেহমেদ ১৪৫৬ সালে বেলগ্রেড দখলের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ফলে শহরটি শুধু সামরিকভাবে নয়, অটোমান রাজবংশের মর্যাদার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল।

১৫২১ সালে সুলেমান বেলগ্রেডের বিরুদ্ধে বিশাল অভিযান পরিচালনা করেন। অটোমানরা শুধু দুর্গের সামনে সৈন্য এনে আক্রমণ করেনি; তারা আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে শহরটিকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করে। দানিয়ুব ও সাভা নদীর জলপথ, স্থলবাহিনী এবং ভারী কামানের সমন্বিত ব্যবহার অবরোধকে কার্যকর করে তোলে।

দীর্ঘ প্রতিরোধের পর ১৫২১ সালের আগস্টে বেলগ্রেড অটোমানদের হাতে পড়ে। এই বিজয়ের কৌশলগত তাৎপর্য ছিল অসাধারণ। দক্ষিণ দিক থেকে হাঙ্গেরির প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান দুর্গ হারিয়ে যায় এবং মধ্য দানিয়ুব অঞ্চলের দিকে অটোমান অগ্রযাত্রার পথ অনেক বেশি উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।

বেলগ্রেড বিজয় সুলেমানের শাসনের প্রথম বড় ঘোষণা ছিল। মাত্র এক বছর পর তিনি আরেকটি কঠিন লক্ষ্য বেছে নেন—রোডস দ্বীপ। পূর্ব ভূমধ্যসাগরের এই দ্বীপটি নাইটস হসপিটালার বা সেন্ট জনের নাইটদের শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল। তারা অত্যন্ত সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান করত এবং অটোমান সামুদ্রিক যোগাযোগের জন্য দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা সৃষ্টি করছিল।

রোডসের গুরুত্ব বুঝতে হলে এর অবস্থান দেখতে হয়। দ্বীপটি আনাতোলিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের খুব কাছে এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর অবস্থিত। অটোমানদের কাছে এটি ছিল নিজেদের সাম্রাজ্যের উপকূলের সামনে অবস্থানকারী একটি শক্তিশালী শত্রু দুর্গ।

দ্বিতীয় মেহমেদ ১৪৮০ সালে রোডস দখলের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। সুলেমান এবার অনেক বড় প্রস্তুতি নেন। ১৫২২ সালে বিশাল অটোমান স্থলবাহিনী ও নৌবহর রোডসকে ঘিরে ফেলে। কামান দিয়ে দুর্গের দেয়ালে গোলাবর্ষণ, পরিখা খনন, সুড়ঙ্গ তৈরি এবং ধারাবাহিক আক্রমণের মাধ্যমে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল করার চেষ্টা চলে।

হসপিটালার নাইটরা প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। রোডসের দুর্গ ছিল ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থাগুলোর একটি এবং এর রক্ষাকারীরা অবরোধযুদ্ধে অভিজ্ঞ ছিল। অটোমানদেরও বড় ক্ষতি হয়। ফলে রোডস বিজয় কোনো সহজ বা দ্রুত অভিযান ছিল না।

কয়েক মাসের অবরোধের পর প্রতিরক্ষাকারীদের পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত আলোচনা শুরু হয় এবং ১৫২২ সালের ডিসেম্বরের শেষদিকে রোডস আত্মসমর্পণ করে। সুলেমান নাইটদের দ্বীপ ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ দেন। তারা পরে মাল্টায় নতুন ঘাঁটি স্থাপন করবে এবং ভবিষ্যতে আবার অটোমানদের বড় প্রতিপক্ষ হয়ে উঠবে।

রোডস বিজয়ের ফলে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে অটোমানদের কৌশলগত অবস্থান অনেক শক্তিশালী হয়। ইস্তাম্বুল, আনাতোলিয়া, সিরিয়া ও মিশরের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগের ওপর একটি বড় হুমকি দূর হয়। একই সঙ্গে সুলেমান এমন একটি দুর্গ জয় করেন, যেটি তার প্রপিতামহ দ্বিতীয় মেহমেদও দখল করতে পারেননি।

কিন্তু সুলেমানের সবচেয়ে নাটকীয় প্রাথমিক বিজয় তখনও আসেনি। বেলগ্রেডের পতনের পর হাঙ্গেরি রাজ্য অটোমানদের সামনে অনেক বেশি উন্মুক্ত হয়ে পড়েছিল। একই সময়ে হাঙ্গেরির অভ্যন্তরে অভিজাতদের বিভাজন, রাজকীয় কর্তৃত্বের দুর্বলতা এবং বৃহৎ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা ক্রমেই প্রকট হচ্ছিল।

অটোমান ও হাঙ্গেরীয় সংঘর্ষের পেছনে শুধু সীমান্ত দখলের প্রশ্ন ছিল না। হাঙ্গেরি মধ্য ইউরোপের শক্তির ভারসাম্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পেছনেই ছিল হাবসবার্গ রাজবংশের বিস্তৃত রাজনৈতিক জগৎ। ফলে হাঙ্গেরিতে অটোমান অগ্রযাত্রা ভবিষ্যতে সুলেমানকে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী রাজবংশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘর্ষে নিয়ে যাবে।

১৫২৬ সালে সুলেমান আবার বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে উত্তরের দিকে যাত্রা করেন। বেলগ্রেড ইতোমধ্যে অটোমানদের হাতে থাকায় তাদের জন্য দানিয়ুব অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা আগের তুলনায় সহজ হয়েছিল। অটোমান বাহিনীর সঙ্গে ছিল জানিসারি পদাতিক, তিমারভিত্তিক সিপাহি অশ্বারোহী, কামান, আগ্নেয়াস্ত্রধারী সৈন্য এবং বিশাল রসদব্যবস্থা।

হাঙ্গেরির তরুণ রাজা দ্বিতীয় লুই অটোমানদের প্রতিরোধে বাহিনী সংগ্রহ করেন। কিন্তু হাঙ্গেরীয় সেনাবাহিনী পূর্ণ শক্তিতে সংগঠিত হওয়ার আগেই দ্রুত সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যায়। দুই পক্ষ মুখোমুখি হয় ১৫২৬ সালের ২৯ আগস্ট মোহাচের সমভূমিতে।

মোহাচের যুদ্ধ ছিল তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত কিন্তু ভয়াবহ পরিণতিসম্পন্ন। হাঙ্গেরীয় বাহিনী শক্তিশালী অশ্বারোহী আক্রমণের মাধ্যমে অটোমান কেন্দ্র ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করে। প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের আক্রমণ কিছুটা চাপ সৃষ্টি করলেও অটোমান বাহিনীর গভীর বিন্যাস, জানিসারি আগ্নেয়াস্ত্র এবং কামানের সামনে সেই গতি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।

অটোমানরা পরিকল্পিতভাবে হাঙ্গেরীয় আক্রমণকে নিজেদের প্রতিরক্ষা গভীরতার মধ্যে টেনে এনে পাল্টা আঘাত করে। যুদ্ধক্ষেত্রে হাঙ্গেরীয় বাহিনীর সংগঠন দ্রুত ভেঙে পড়ে। বিপুলসংখ্যক সৈন্য ও অভিজাত নিহত হন।

সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিপর্যয় ঘটে যখন রাজা দ্বিতীয় লুই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পশ্চাদপসরণের সময় মারা যান। তার কোনো বৈধ পুত্র উত্তরাধিকারী ছিল না। ফলে মোহাচের সামরিক পরাজয় সঙ্গে সঙ্গে হাঙ্গেরির রাজবংশীয় ও রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়।

মোহাচ শুধু একটি যুদ্ধের পরাজয় ছিল না; এটি মধ্যযুগীয় স্বাধীন হাঙ্গেরি রাজ্যের পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার পতনের সূচনা করে। সুলেমান এরপর বুদায় প্রবেশ করেন। তবে ১৫২৬ সালেই পুরো হাঙ্গেরিকে সরাসরি অটোমান প্রদেশে পরিণত করা হয়নি। বরং রাজসিংহাসন নিয়ে নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়।

একদিকে হাঙ্গেরীয় অভিজাতদের একটি অংশ ইয়ানোশ জাপোলিয়াকে রাজা হিসেবে সমর্থন করে। অন্যদিকে হাবসবার্গ আর্চডিউক ফার্দিনান্দও হাঙ্গেরির সিংহাসনের দাবি করেন। এই দ্বন্দ্ব সুলেমানের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করে। জাপোলিয়াকে সমর্থন করে অটোমানরা হাঙ্গেরির রাজনীতিতে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়।

এখান থেকেই অটোমান-হাবসবার্গ প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি নতুন যুগ শুরু হয়। বেলগ্রেড ছিল মধ্য ইউরোপের দরজা, আর মোহাচ সেই দরজার ভেতরের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে দিয়েছিল। কয়েক বছরের মধ্যেই সুলেমানের বাহিনী ভিয়েনার সামনে উপস্থিত হবে।

১৫২৯ সালে সুলেমান ভিয়েনা অবরোধ করেন, যদিও শহরটি দখল করতে পারেননি। দীর্ঘ যাত্রা, প্রতিকূল আবহাওয়া, ভারী কামান পরিবহনের সমস্যা, রসদসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা অটোমানদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সুলেমানের ইউরোপীয় অভিযানের ইতিহাস শুধু একের পর এক বিজয়ের সরল গল্প ছিল না।

এই সীমাবদ্ধতা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ “অটোমান স্বর্ণযুগ” বলতে কোনো অপ্রতিরোধ্য সাম্রাজ্য বোঝায় না। সুলেমানের অটোমানরা অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল, কিন্তু তাদেরও ভূগোল, রসদ, দুর্গপ্রতিরক্ষা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হতো। ভিয়েনা তার একটি বড় উদাহরণ।

সুলেমানের শক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল ভূমধ্যসাগর। প্রথম সেলিমের মিশর বিজয়ের পর অটোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে উত্তর আফ্রিকা ও লোহিত সাগরের রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সুলেমানের সময় খায়র আদ-দীন বারবারোসা অটোমান নৌশক্তির অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন।

আলজিয়ার্সকে কেন্দ্র করে বারবারোসার শক্তি অটোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং তিনি পরে অটোমান নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল হন। ১৫৩৮ সালের প্রেভেজার যুদ্ধে তার নেতৃত্বে অটোমান নৌবহর আন্দ্রেয়া দোরিয়ার নেতৃত্বাধীন খ্রিষ্টান জোটের নৌবহরের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ বিজয় অর্জন করে। এর ফলে পূর্ব ও মধ্য ভূমধ্যসাগরে অটোমান নৌশক্তির মর্যাদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।

একই সময়ে সুলেমান পূর্ব সীমান্তেও যুদ্ধ পরিচালনা করেন। সাফাভি ইরানের সঙ্গে অটোমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা তার পিতা সেলিমের সময় থেকে চলছিল। সুলেমানের অভিযানের ফলে বাগদাদ ১৫৩৪ সালে অটোমানদের হাতে আসে এবং ইরাকের ওপর অটোমান কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি হয়।

বাগদাদ দখলের অর্থ ছিল শুধু একটি বিখ্যাত নগর অর্জন নয়। এর মাধ্যমে অটোমান সাম্রাজ্য পারস্য উপসাগরের দিকে কৌশলগতভাবে এগিয়ে যায় এবং মেসোপটেমিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও যোগাযোগপথের ওপর প্রভাব বাড়ায়। পশ্চিমে হাবসবার্গ, পূর্বে সাফাভি এবং দক্ষিণে ভারত মহাসাগরীয় শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক—সুলেমানের সাম্রাজ্য সত্যিকার অর্থেই বহুমুখী ভূরাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছিল।

তবে সুলেমানের স্বর্ণযুগ শুধু সামরিক বিজয়ের ফল ছিল না। তার কানুনি উপাধি তার আইন ও প্রশাসনিক ভূমিকার দিকে ইঙ্গিত করে। অটোমান রাষ্ট্রে ইসলামি শরিয়ার পাশাপাশি সুলতানি কানুন দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবহৃত হচ্ছিল। সুলেমানের সময় ভূমি, কর, প্রশাসন ও ফৌজদারি ব্যবস্থার বিভিন্ন বিধানকে আরও সুসংবদ্ধ করার প্রচেষ্টা চলে।

তার দীর্ঘ শাসনামলে কেন্দ্রীয় প্রশাসনও উচ্চ মাত্রার পরিণতি অর্জন করে। দরবার, দিওয়ান, প্রাদেশিক প্রশাসন, তিমার ব্যবস্থা, রাজস্ব সংগ্রহ এবং সামরিক সংগঠন—সব মিলিয়ে অটোমান রাষ্ট্র বিপুল ভূখণ্ড পরিচালনার সক্ষম একটি জটিল আমলাতান্ত্রিক সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছিল।

এই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন পারগালি ইব্রাহিম পাশা, যিনি দীর্ঘ সময় সুলেমানের গ্র্যান্ড ভিজিয়ার হিসেবে কাজ করেন। সামরিক অভিযান থেকে কূটনীতি পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যদিও ১৫৩৬ সালে সুলেমানের নির্দেশে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়, তার কর্মজীবন অটোমান দরবারে সুলতানের অধীন উচ্চপদস্থ প্রশাসকদের বিপুল ক্ষমতা এবং একই সঙ্গে তাদের অনিশ্চিত অবস্থানের উদাহরণ।

সুলেমানের যুগে অটোমান কূটনীতিও ইউরোপীয় শক্তির ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। হাবসবার্গ সম্রাট পঞ্চম চার্লসের শক্তি মোকাবিলায় ফরাসি রাজা প্রথম ফ্রাঁসোয়ার সঙ্গে অটোমান যোগাযোগ ও সহযোগিতা গড়ে ওঠে। একজন মুসলিম সুলতান ও ক্যাথলিক ফরাসি রাজতন্ত্রের এই সহযোগিতা দেখিয়ে দেয় যে ষোড়শ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ধর্মীয় বিভাজনের পাশাপাশি রাষ্ট্রের স্বার্থ ও শক্তির ভারসাম্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্য ক্ষেত্রেও সুলেমানের যুগ অসাধারণ। এই সময়ে অটোমান স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বদের একজন মিমার সিনান তার দীর্ঘ কর্মজীবন শুরু করেন এবং সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে মসজিদ, সেতু, জলব্যবস্থা, মাদ্রাসা ও জনকল্যাণমূলক স্থাপনা নির্মাণ করেন। ইস্তাম্বুলের সুলেমানিয়ে মসজিদ কমপ্লেক্স সুলেমানের সাম্রাজ্যিক মর্যাদা এবং অটোমান স্থাপত্যের পরিণত রূপের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে।

সুলেমান নিজেও কবিতা লিখতেন এবং শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। অটোমান দরবারে পাণ্ডুলিপি অলংকরণ, ধাতুশিল্প, বস্ত্র, সিরামিক, ক্যালিগ্রাফি এবং সাহিত্য বিকশিত হয়। ফলে তার স্বর্ণযুগের ধারণা শুধু ভূখণ্ডের আয়তন বা যুদ্ধজয়ের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; সামরিক শক্তি, প্রশাসনিক পরিণতি, আইন, স্থাপত্য, শিল্প এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা—সবকিছুর সমন্বয়েই এই যুগ বিশেষ হয়ে ওঠে।

তবে বেলগ্রেড, রোডস ও মোহাচের মধ্যে সুলেমানের প্রথম দিকের সাম্রাজ্যিক উত্থানের ধারাটি সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। বেলগ্রেড জয় মধ্য ইউরোপের প্রবেশপথ খুলে দেয়, রোডস বিজয় পূর্ব ভূমধ্যসাগরের নিরাপত্তা শক্তিশালী করে এবং মোহাচ হাঙ্গেরির পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোকে ভেঙে মধ্য ইউরোপে অটোমান-হাবসবার্গ প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন যুগ সৃষ্টি করে।

এই তিনটি বিজয় আবার অটোমান সামরিক ব্যবস্থার বিভিন্ন শক্তিও প্রকাশ করে। বেলগ্রেডে নদী, কামান ও স্থলবাহিনীর সমন্বয়; রোডসে দীর্ঘ ও জটিল অবরোধ পরিচালনার সক্ষমতা; আর মোহাচে উন্মুক্ত যুদ্ধক্ষেত্রে সংগঠিত পদাতিক, আগ্নেয়াস্ত্র, কামান ও অশ্বারোহী বাহিনীর কার্যকর সমন্বয় দেখা যায়। অটোমান শক্তির মূল রহস্য কোনো একক অস্ত্র বা বাহিনীতে ছিল না—ছিল বিভিন্ন সামরিক উপাদানকে একটি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের অধীনে সংগঠিত করার ক্ষমতায়।

সুলেমানের রাজত্ব শেষ পর্যন্ত ১৫৬৬ সাল পর্যন্ত চলবে এবং তার শেষ বছরেও তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে থাকবেন। কিন্তু ১৫২০-এর দশকের প্রথম কয়েক বছরেই তার সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ দিক অনেকটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ১৫২১ সালে বেলগ্রেড, ১৫২২ সালে রোডস এবং ১৫২৬ সালে মোহাচ—মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে এই তিনটি বিজয় অটোমানদের সামরিক ও রাজনৈতিক মর্যাদাকে নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দেয়।

প্রথম সেলিম অটোমান সাম্রাজ্যের সীমানাকে সিরিয়া, মিশর ও হিজাজ পর্যন্ত বিস্তৃত করে তার ভূরাজনৈতিক চরিত্র বদলে দিয়েছিলেন। তার পুত্র সুলেমান সেই বিপুল সম্পদ ও শক্তিকে ব্যবহার করে সাম্রাজ্যকে ইউরোপ, ভূমধ্যসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে যান। তার সময়ে ইস্তাম্বুল এমন এক সাম্রাজ্যের রাজধানী হয়ে ওঠে, যার সিদ্ধান্ত ভিয়েনা থেকে বাগদাদ এবং ভূমধ্যসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলের রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারত।

এই কারণেই সুলেমানের যুগকে অটোমান ইতিহাসের শিখর হিসেবে দেখা হয়। এটি নিছক সবচেয়ে বেশি ভূখণ্ড দখলের সময় ছিল না; বরং এমন একটি সময়, যখন সাম্রাজ্যের সামরিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক শক্তি, অর্থনৈতিক সম্পদ, আইনব্যবস্থা, কূটনৈতিক প্রভাব এবং সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস একই সঙ্গে অসাধারণ উচ্চতায় পৌঁছেছিল। আর সেই স্বর্ণযুগের প্রথম বিস্ফোরক অধ্যায় লিখেছিল তিনটি নাম—বেলগ্রেড, রোডস এবং মোহাচ।


আপনার পছন্দ হতে পারে