বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ভিয়েনা অবরোধ ১৫২৯: ইউরোপের গভীরে পৌঁছেও সুলেমানের অটোমান বাহিনী কেন ব্যর্থ হয়েছিল?

সিরিজ: অটোমান সাম্রাজ্য: উত্থান, স্বর্ণযুগ ও পতনের ইতিহাস

ভিয়েনা অবরোধ ১৫২৯: ইউরোপের গভীরে পৌঁছেও সুলেমানের অটোমান বাহিনী কেন ব্যর্থ হয়েছিল?
১৫২৯: ভিয়েনার প্রাচীরে থেমে গেল অটোমান অভিযান

১৫২৬ সালের মোহাচের যুদ্ধে হাঙ্গেরীয় রাজা দ্বিতীয় লুইয়ের বাহিনীকে বিধ্বস্ত করার পর সুলতান সুলেমানের সামনে মধ্য ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র যেন হঠাৎ খুলে গিয়েছিল। হাঙ্গেরির রাজা নিহত, কেন্দ্রীয় রাজকীয় কর্তৃত্ব ভেঙে পড়েছে এবং সিংহাসন নিয়ে শুরু হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। মাত্র তিন বছর পর, ১৫২৯ সালের সেপ্টেম্বরে অটোমান বাহিনী ভিয়েনার প্রাচীরে উপস্থিত হয়। ইস্তাম্বুল থেকে এত দূরে মধ্য ইউরোপের একটি প্রধান নগরের সামনে অটোমান সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ছিল সুলেমানের সামরিক শক্তির অসাধারণ প্রদর্শন। কিন্তু বেলগ্রেড, রোডস ও মোহাচে সফল হওয়া একই সুলতান এবার ভিয়েনা দখল করতে পারলেন না।

ভিয়েনা অবরোধকে বোঝার জন্য ১৫২৬ সালের মোহাচের পর হাঙ্গেরিতে কী ঘটেছিল, সেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মোহাচের পরাজয়ের সময় রাজা দ্বিতীয় লুই মারা যাওয়ায় হাঙ্গেরির সিংহাসন উত্তরাধিকার সংকটে পড়ে। হাঙ্গেরীয় অভিজাতদের একটি অংশ ট্রান্সিলভানিয়ার শক্তিশালী অভিজাত ইয়ানোশ জাপোলিয়াকে রাজা নির্বাচন করে। অন্য অংশ সমর্থন দেয় অস্ট্রিয়ার হাবসবুর্গ আর্চডিউক ফার্দিনান্দকে, যিনি মৃত রাজা লুইয়ের ভগ্নিপতি এবং হাবসবুর্গ রাজবংশের সদস্য ছিলেন।

ফলে মোহাচের পর অটোমান ও হাবসবুর্গদের মধ্যে সংঘর্ষ শুধু সীমান্ত নিয়ে ছিল না; হাঙ্গেরির বৈধ শাসক কে হবে, সেই প্রশ্নও বৃহত্তর আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিণত হয়। ফার্দিনান্দ বোহেমিয়ার মুকুট লাভের পাশাপাশি হাঙ্গেরিরও দাবি করেন এবং ১৫২৭–১৫২৮ সালে তার বাহিনী জাপোলিয়ার বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। জাপোলিয়া শেষ পর্যন্ত সুলেমানের সাহায্য চান।

সুলেমানের কাছে এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তিনি জাপোলিয়াকে সমর্থন করে হাঙ্গেরিতে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা বজায় রাখতে পারতেন, যা সরাসরি হাবসবুর্গ নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে না। একই সঙ্গে ফার্দিনান্দের অগ্রগতি অটোমানদের কাছে মোহাচের বিজয়ের ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করার সমতুল্য ছিল। ১৫২৯ সালের অভিযান তাই শুধু “ভিয়েনা জয়ের অভিযান” হিসেবে শুরু হয়েছিল—এমন ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়; এর তাৎক্ষণিক লক্ষ্যগুলোর একটি ছিল হাঙ্গেরিতে জাপোলিয়ার অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং হাবসবুর্গ প্রভাবকে পিছিয়ে দেওয়া।

সুলেমান বিশাল বাহিনী নিয়ে ইস্তাম্বুল থেকে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু অভিযানের শুরু থেকেই প্রকৃতি তার পরিকল্পনাকে কঠিন করে তোলে। ১৫২৯ সালের বসন্ত ও গ্রীষ্মে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত বলকান ও হাঙ্গেরির পথগুলোকে কাদায় পরিণত করে। নদীগুলো ফুলে ওঠে, সেতু ও রাস্তার অবস্থা খারাপ হয় এবং ভারী সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

এখানেই ভিয়েনা অভিযানের অন্যতম মৌলিক সমস্যা স্পষ্ট হয়। একটি সেনাবাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে যত শক্তিশালীই হোক, হাজার হাজার সৈন্য, ঘোড়া, কামান, গোলাবারুদ ও খাদ্য শত শত কিলোমিটার দূরে নিয়ে যেতে না পারলে সেই শক্তি ব্যবহার করা যায় না। ষোড়শ শতাব্দীর সামরিক অভিযানে রসদ ছিল বিজয়ের অন্যতম প্রধান নির্ধারক।

অটোমান সামরিক ব্যবস্থা দীর্ঘ অভিযানে দক্ষ ছিল। ইস্তাম্বুল থেকে বলকান হয়ে দানিয়ুব অঞ্চলের দিকে তাদের প্রতিষ্ঠিত পথ, দুর্গ, সরবরাহকেন্দ্র এবং প্রশাসনিক নেটওয়ার্ক ছিল। কিন্তু ভিয়েনা এই ব্যবস্থার বহুদূরের প্রান্তে অবস্থিত। যত উত্তরে অগ্রসর হতে হয়েছে, তত দীর্ঘ হয়েছে যোগাযোগপথ এবং তত বেশি বেড়েছে খাদ্য ও সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়ার সমস্যা।

খারাপ আবহাওয়ার কারণে অটোমানদের কিছু ভারী কামান ও অবরোধ সরঞ্জাম পিছনে ফেলে আসতে হয়েছিল বা সময়মতো সামনে আনা সম্ভব হয়নি। এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ১৪৫৩ সালে কনস্টান্টিনোপল কিংবা ১৫২২ সালে রোডসের মতো শক্তিশালী দুর্গ জয়ের ক্ষেত্রে ভারী কামান অটোমান অবরোধব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। ভিয়েনায় তারা সেই মাত্রার ভারী গোলন্দাজ শক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারেনি।

তবু অভিযান থামেনি। সুলেমানের বাহিনী হাঙ্গেরিতে প্রবেশ করে এবং বুদা আবার জাপোলিয়ার নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর অটোমান বাহিনী আরও পশ্চিমে এগিয়ে যায়। সেপ্টেম্বরের শেষদিকে তারা ভিয়েনার কাছে পৌঁছে যায়।

ভিয়েনা তখন আজকের মতো বিশাল নগর ছিল না, কিন্তু এটি ছিল হাবসবুর্গ অস্ট্রিয়ার রাজনৈতিক ও কৌশলগত কেন্দ্র। শহরের মধ্যযুগীয় প্রাচীর আধুনিকতম দুর্গব্যবস্থার সমতুল্য না হলেও অবরোধের আগে দ্রুত প্রতিরক্ষা জোরদার করা হয়। পুরোনো বা দুর্বল স্থাপনা ভেঙে ফেলা, মাটির বাঁধ তৈরি, প্রাচীর শক্তিশালী করা এবং সম্ভাব্য আক্রমণস্থলে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা গড়ে তোলার কাজ চলে।

শহরের সামরিক প্রতিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন অভিজ্ঞ সেনানায়ক নিকলাস গ্রাফ সালম এবং ভিলহেল্ম ফন রোগেনডর্ফ। তাদের অধীনে জার্মান ল্যান্ডস্কনেখট, স্প্যানিশ আগ্নেয়াস্ত্রধারী সৈন্য এবং স্থানীয় প্রতিরক্ষাকারীরা অবস্থান নেয়। সৈন্যসংখ্যা অটোমান বাহিনীর তুলনায় অনেক কম হলেও তাদের একটি বিশাল সুবিধা ছিল—তাদের শুধু একটি সীমিত দুর্গাঞ্চল ধরে রাখতে হবে, আর অটোমানদের সেই প্রতিরক্ষা ভেঙে শহরে ঢুকতে হবে।

সুলেমান ২৭ সেপ্টেম্বরের দিকে ভিয়েনার সামনে পৌঁছান এবং দ্রুত অবরোধ শুরু হয়। ভারী কামানের ঘাটতির কারণে অটোমানরা প্রাচীর ধ্বংসের জন্য তাদের আরেকটি দক্ষতার ওপর বেশি নির্ভর করে—সুড়ঙ্গ খনন ও মাইন বিস্ফোরণ।

অটোমান প্রকৌশলীরা প্রাচীরের নিচে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে বিস্ফোরক স্থাপন করার চেষ্টা করে। পরিকল্পনা ছিল বিস্ফোরণের মাধ্যমে প্রাচীরের অংশ ধসিয়ে ফাঁক তৈরি করা, এরপর সেই পথে পদাতিক বাহিনীকে আক্রমণে পাঠানো। এই কৌশল অটোমানরা অন্যান্য অবরোধেও সফলভাবে ব্যবহার করেছিল।

কিন্তু ভিয়েনার প্রতিরক্ষাকারীরাও দ্রুত এর জবাব দেয়। তারা পাল্টা সুড়ঙ্গ বা কাউন্টার-মাইনিং শুরু করে। মাটির নিচে অটোমান খননের শব্দ শনাক্ত করার চেষ্টা করা হতো এবং সম্ভাব্য সুড়ঙ্গের দিকে পাল্টা পথ খোঁড়া হতো। কোথাও বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করা হয়, কোথাও মাটির নিচেই দুই পক্ষের সংঘর্ষ ঘটে।

অটোমানরা কয়েকটি স্থানে বিস্ফোরণের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু প্রতিটি ফাঁকই বিজয়ের পথ হয়ে ওঠেনি। ভিয়েনার রক্ষাকারীরা দ্রুত অস্থায়ী প্রতিরক্ষা তৈরি করে এবং সংকীর্ণ ভাঙা অংশগুলোকে প্রাণঘাতী প্রতিরোধস্থলে পরিণত করে।

অবরোধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুলেমানের সমস্যা বাড়তে থাকে। সেপ্টেম্বরের শেষদিকে শুরু হওয়া অভিযান অক্টোবরের দিকে এগোচ্ছে। মধ্য ইউরোপের শীত আসন্ন। সৈন্যরা দীর্ঘ যাত্রায় ক্লান্ত, ঘোড়ার অবস্থা খারাপ, খাদ্য ও পশুখাদ্যের সরবরাহ সীমিত এবং বৃষ্টিতে শিবিরের পরিবেশ দুর্বিষহ।

অন্যদিকে সময় ভিয়েনার পক্ষেই কাজ করছিল। প্রতিদিন শহর টিকে থাকার অর্থ ছিল অটোমান বাহিনীর জন্য আরও খাদ্য ব্যয়, আরও অসুস্থতা, আরও ক্লান্তি এবং আরও খারাপ আবহাওয়ার ঝুঁকি। সুলেমান এমন অবস্থায় পড়েছিলেন যেখানে শুধু শহরের প্রতিরক্ষা নয়, ক্যালেন্ডারের বিরুদ্ধেও তাকে যুদ্ধ করতে হচ্ছিল।

অক্টোবরের মাঝামাঝি অটোমান নেতৃত্ব বুঝতে পারে যে দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হবে। একটি বড় চূড়ান্ত আক্রমণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। মাইন বিস্ফোরণের মাধ্যমে তৈরি ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো ব্যবহার করে জানিসারি ও অন্যান্য সৈন্যকে প্রাচীর ভেদ করার চেষ্টা করতে হয়।

১৪ অক্টোবরের বড় আক্রমণও সফল হয়নি। ভিয়েনার রক্ষাকারীরা ভাঙা প্রাচীর ও অস্থায়ী প্রতিরক্ষাস্থল ধরে রাখে। সংকীর্ণ প্রবেশপথে অটোমানদের সংখ্যাগত সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। প্রচণ্ড প্রতিরোধে আক্রমণ ব্যর্থ হয় এবং উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়।

এরপর সুলেমান অবরোধ তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অক্টোবরের মাঝামাঝি অটোমান বাহিনী প্রত্যাবর্তন শুরু করে। খারাপ আবহাওয়া ফেরার পথকেও কঠিন করে তোলে। ভিয়েনা অটোমানদের হাতে পড়েনি।

কিন্তু এই ব্যর্থতাকে “অটোমানরা ইউরোপ জয় করতে এসে ভিয়েনায় পরাজিত হয়ে চিরতরে ফিরে গেল”—এভাবে দেখলে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারিয়ে যায়। ১৫২৯ সালের পরও সুলেমান মধ্য ইউরোপের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং হাঙ্গেরি নিয়ে অটোমান-হাবসবুর্গ সংঘর্ষ বহু দশক চলতে থাকে।

১৫৩২ সালে সুলেমান আবার একটি বিশাল বাহিনী নিয়ে হাবসবুর্গ ভূখণ্ডের দিকে অগ্রসর হন। কিন্তু এবারও ভিয়েনায় আরেকটি পূর্ণাঙ্গ অবরোধ সংঘটিত হয়নি। কোসেগ বা গুনসের ছোট দুর্গের দীর্ঘ প্রতিরোধ, অভিযানের বিলম্ব এবং বৃহত্তর কৌশলগত পরিস্থিতির কারণে অটোমান বাহিনী শেষ পর্যন্ত ফিরে যায়।

হাঙ্গেরির প্রশ্নও নিষ্পত্তি হয়নি। জাপোলিয়া ১৫৪০ সালে মারা গেলে নতুন উত্তরাধিকার সংকট সৃষ্টি হয়। হাবসবুর্গরা আবার বুদা দখলের চেষ্টা করলে সুলেমান হস্তক্ষেপ করেন। ১৫৪১ সালে অটোমানরা বুদার ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং মধ্য হাঙ্গেরির বড় অংশ অটোমান প্রদেশে পরিণত হয়।

এর ফলে ঐতিহাসিক হাঙ্গেরীয় রাজ্যের ভূখণ্ড কার্যত তিনটি রাজনৈতিক অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে যায়। মধ্যভাগ অটোমান শাসনে আসে, পশ্চিম ও উত্তরাংশ হাবসবুর্গদের নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং পূর্বে ট্রান্সিলভানিয়াকেন্দ্রিক একটি অটোমান-সমর্থিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ভিয়েনা দখল না করেও অটোমানরা মধ্য ইউরোপের গভীরে স্থায়ী রাজনৈতিক উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করেছিল।

তাহলে ১৫২৯ সালে ভিয়েনা কেন জয় করা গেল না? এর উত্তর কোনো একক কারণের মধ্যে নেই।

প্রথমত, দূরত্ব ও রসদ ছিল মৌলিক সমস্যা। ইস্তাম্বুল থেকে ভিয়েনা পর্যন্ত বিশাল বাহিনী পরিচালনা করতে কয়েক মাস প্রয়োজন হতো। অভিযান যত দূরে যেত, সরবরাহব্যবস্থা তত বেশি চাপের মুখে পড়ত।

দ্বিতীয়ত, ১৫২৯ সালের অস্বাভাবিক খারাপ আবহাওয়া অগ্রযাত্রা বিলম্বিত করে এবং ভারী কামান ও সরঞ্জাম পরিবহনে মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করে। ফলে অটোমানরা ভিয়েনার সামনে পৌঁছালেও আদর্শ অবরোধবাহিনী হিসেবে পৌঁছাতে পারেনি।

তৃতীয়ত, ভারী অবরোধ কামানের সীমাবদ্ধতা শহরের প্রাচীর দ্রুত ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। অটোমানদের মাইনিংয়ের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়, আর প্রতিরক্ষাকারীরা তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়।

চতুর্থত, ভিয়েনার প্রতিরক্ষা ছিল দৃঢ় ও সক্রিয়। শহরের সৈন্যরা শুধু প্রাচীরের আড়ালে অপেক্ষা করেনি; তারা মাইন শনাক্ত করেছে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রাচীর মেরামত করেছে এবং প্রতিটি ভাঙা অংশে নতুন প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।

পঞ্চমত, সময় অটোমানদের বিরুদ্ধে ছিল। সেপ্টেম্বরের শেষদিকে ভিয়েনায় পৌঁছে মধ্য ইউরোপীয় শীত শুরু হওয়ার আগে দীর্ঘ অবরোধ চালানোর সুযোগ খুব সীমিত ছিল। সুলেমান যদি কয়েক মাস ধরে সেখানে থেকে যেতেন, তাহলে খাদ্য, রোগ, ঘোড়া এবং আবহাওয়ার সমস্যা পুরো বাহিনীকে বিপন্ন করতে পারত।

এ কারণেই ১৫২৯ সালের ভিয়েনা অভিযানকে সুলেমানের সামরিক দক্ষতার আকস্মিক পতন হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বরং এটি ষোড়শ শতাব্দীর সাম্রাজ্যিক যুদ্ধের একটি মৌলিক সত্য প্রকাশ করে—একটি সাম্রাজ্যের সামরিক ক্ষমতার সীমা শুধু তার সৈন্যসংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; দূরত্ব, রাস্তা, নদী, ঋতু, খাদ্য, পশুখাদ্য, কামান পরিবহন এবং অবরোধের সময়সীমাও সেই সীমা নির্ধারণ করে।

একই সঙ্গে ভিয়েনাকে অটোমান সম্প্রসারণের স্থায়ী ও চূড়ান্ত সীমারেখা বলা হলেও বিষয়টি আরও জটিল। অটোমানরা ভিয়েনা নিতে পারেনি, কিন্তু পরবর্তী দশকে বুদা ও মধ্য হাঙ্গেরি সরাসরি দখল করে মধ্য ইউরোপে দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্যিক সীমান্ত তৈরি করে। হাবসবুর্গ ও অটোমানদের মধ্যে এই সীমান্ত পরবর্তী দেড় শতাব্দীর ইউরোপীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান সংঘর্ষক্ষেত্রে পরিণত হবে।

১৫২৯ সালের অবরোধের আরেকটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব হলো এটি অটোমান ও হাবসবুর্গ—দুটি বিশাল সাম্রাজ্যিক ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদি মুখোমুখি অবস্থানে নিয়ে আসে। সুলেমানের পশ্চিমা প্রতিদ্বন্দ্বী শুধু ফার্দিনান্দ ছিলেন না। ফার্দিনান্দের ভাই পঞ্চম চার্লস একই সময়ে পবিত্র রোমান সম্রাট এবং ইউরোপ ও আটলান্টিকজুড়ে বিস্তৃত হাবসবুর্গ শক্তির প্রধান ব্যক্তিত্ব। ফলে হাঙ্গেরির সংঘর্ষ বৃহত্তর ইউরোপীয় শক্তির ভারসাম্যের অংশ হয়ে যায়।

এই বাস্তবতাই ফ্রান্সের সঙ্গে অটোমান সম্পর্ককেও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। হাবসবুর্গ শক্তিতে ঘেরা ফরাসি রাজতন্ত্র সুলেমানের সাম্রাজ্যকে সম্ভাব্য কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখতে শুরু করে। অটোমান-হাবসবুর্গ প্রতিদ্বন্দ্বিতা এভাবে ইউরোপের কূটনৈতিক ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।

সুলেমানের জন্য ভিয়েনা তাই একই সঙ্গে ব্যর্থতা এবং শক্তির প্রদর্শন। তিনি শহরটি দখল করতে পারেননি—এটি স্পষ্ট সামরিক ব্যর্থতা। কিন্তু এটিও সত্য যে একটি ইস্তাম্বুলকেন্দ্রিক সাম্রাজ্য ১৫২৯ সালে হাবসবুর্গ অস্ট্রিয়ার রাজধানীর প্রাচীরে বিশাল বাহিনী নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল। মাত্র কয়েক প্রজন্ম আগে যে অটোমান রাষ্ট্র বলকানে নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখার জন্য লড়ছিল, এখন সেটিই মধ্য ইউরোপের ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণকারী প্রধান শক্তিগুলোর একটি।

ভিয়েনার প্রাচীরের সামনে সুলেমানের থেমে যাওয়া তাই অটোমান স্বর্ণযুগের বিপরীত কোনো গল্প নয়। বরং এটি সেই স্বর্ণযুগের বাস্তব সীমাবদ্ধতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণগুলোর একটি। অটোমান রাষ্ট্র বেলগ্রেড দখল করতে পারত, মোহাচে হাঙ্গেরীয় সেনাবাহিনী ধ্বংস করতে পারত এবং পরে বুদা শাসন করতে পারত; কিন্তু একই সামরিক ব্যবস্থাকে আরও দূরে নিয়ে গিয়ে ভিয়েনার মতো সুরক্ষিত নগর দীর্ঘদিন অবরোধ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার সমস্যা ছিল।

আর এখানেই ১৫২৯ সালের ভিয়েনা অবরোধের প্রকৃত ঐতিহাসিক তাৎপর্য। অটোমান বাহিনী ভিয়েনায় ব্যর্থ হয়েছিল কোনো একটি নাটকীয় যুদ্ধ বা একক প্রতিপক্ষের কারণে নয়; বরং আবহাওয়া, দীর্ঘ সরবরাহপথ, ভারী কামানের ঘাটতি, সীমিত সময়, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা এবং সক্রিয় পাল্টা ব্যবস্থার সম্মিলিত প্রভাবে। সুলেমান ভিয়েনা জয় করতে পারেননি, কিন্তু তার বাহিনী সেখানে পৌঁছানোর ঘটনাটিই প্রমাণ করেছিল যে ষোড়শ শতাব্দীর ইউরোপে অটোমান সাম্রাজ্য আর প্রান্তিক কোনো শক্তি নয়—এটি হাবসবুর্গদের সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এক মহাদেশীয় সাম্রাজ্য, যার ক্ষমতার প্রভাব মধ্য ইউরোপের হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল।


আপনার পছন্দ হতে পারে