মহাকাশে একজন নভোচারী মারা গেলে তার দেহের কী হবে? মৃত্যু, পচন ও দেহ ফিরিয়ে আনার বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা
- Author: Admin
- August 29, 2026
মহাকাশে মৃত্যুর পর দেহের রহস্যময় পরিণতি
মহাকাশে মানুষের মৃত্যু এখনো বিরল একটি ঘটনা, কিন্তু ভবিষ্যতে মানুষ যখন চাঁদে দীর্ঘ সময় থাকবে, মঙ্গলে বসতি স্থাপনের চেষ্টা করবে কিংবা পৃথিবী থেকে কোটি কোটি কিলোমিটার দূরের অভিযানে যাবে, তখন একটি অস্বস্তিকর অথচ অত্যন্ত বাস্তব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে—কোনো নভোচারী মহাকাশে মারা গেলে তার দেহের কী হবে? পৃথিবীতে মৃত্যুর পর একটি দেহকে হাসপাতাল, মর্গ, সমাধিস্থল বা দাহস্থলে নিয়ে যাওয়ার সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা রয়েছে। মহাকাশে এর কোনোটিই সহজভাবে সম্ভব নয়। সেখানে মৃতদেহ শুধু মানবিক ও আবেগগত বিষয় নয়; সেটি একই সঙ্গে জীবাণু, গ্যাস, গন্ধ, তরল, সংরক্ষণ, সীমিত জায়গা, সহযাত্রীদের মানসিক অবস্থা এবং পুরো মহাকাশযানের নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।
প্রথমেই একটি প্রচলিত ভুল ধারণা পরিষ্কার করা জরুরি। মহাকাশের শূন্যতায় কোনো মানুষ মারা গেলে তার দেহ সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হয়ে যাবে না। মানুষের ত্বক ও সংযোজক কলা শরীরকে যথেষ্ট দৃঢ়ভাবে ধরে রাখে। তবে চাপযুক্ত মহাকাশযানের বাইরে সুরক্ষিত পোশাক ছাড়া অবস্থান করলে শরীর অত্যন্ত দ্রুত মারাত্মক পরিস্থিতিতে পড়বে। চারপাশের চাপ প্রায় শূন্য হয়ে যাওয়ায় শরীরের কিছু তরলে বুদ্বুদ সৃষ্টি হতে পারে এবং নরম কলা ফুলে উঠতে পারে। ফুসফুসে বাতাস আটকে রেখে চাপ কমে গেলে ফুসফুসও গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু চলচ্চিত্রে দেখানো ধরনের তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণ বাস্তবসম্মত নয়।
শূন্যতার মধ্যে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক বিপদ হবে অক্সিজেনের অভাব। কোনো নভোচারীর মহাকাশ পোশাক সম্পূর্ণভাবে চাপ হারালে রক্তে থাকা অক্সিজেন দ্রুত কমতে শুরু করবে। অল্প সময়ের মধ্যেই মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবে কাজ করার ক্ষমতা হারাবে এবং মানুষ অচেতন হয়ে পড়বে। দ্রুত চাপ পুনরুদ্ধার ও উদ্ধার সম্ভব না হলে অক্সিজেনের ঘাটতি মস্তিষ্ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের অপরিবর্তনীয় ক্ষতি ঘটিয়ে মৃত্যু ঘটাতে পারে। অর্থাৎ মহাকাশের শূন্যতা মানুষকে প্রধানত অক্সিজেনহীনতা ও চাপের বিপজ্জনক পরিবর্তনের মাধ্যমে হত্যা করবে, শরীর বিস্ফোরিত করার মাধ্যমে নয়।
আরেকটি জনপ্রিয় ধারণা হলো, মহাকাশে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃতদেহ বরফের মতো জমে যাবে। এটিও পুরোপুরি সঠিক নয়। পৃথিবীতে ঠান্ডা বাতাস বা পানির সংস্পর্শে শরীর থেকে তাপ দ্রুত পরিবাহিত হয়। কিন্তু মহাকাশের শূন্যতায় চারপাশে প্রায় কোনো পদার্থই নেই যার কাছে সরাসরি তাপ চলে যেতে পারে। ফলে শরীর মূলত বিকিরণের মাধ্যমে তাপ হারাবে, যা তুলনামূলক ধীর প্রক্রিয়া। সরাসরি সূর্যের আলোয় থাকা অংশ আবার প্রচণ্ড বিকিরণ গ্রহণ করতে পারে। তাই মহাকাশে মৃতদেহের তাপমাত্রার পরিবর্তন নির্ভর করবে দেহটি কোথায় আছে, সূর্যালোক পাচ্ছে কি না এবং কোনো মহাকাশযান বা মহাকাশ পোশাকের ভেতরে আছে কি না—এসবের ওপর।
মৃত্যু যদি আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্রের মতো চাপ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের মধ্যে ঘটে, তাহলে পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন হবে। সেখানে বাতাস, অক্সিজেন, নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা এবং পৃথিবীর কাছাকাছি চাপ রয়েছে। ফলে মৃত্যুর পর মানবদেহে পৃথিবীর মতোই অনেক জৈবিক পরিবর্তন শুরু হবে। রক্তসঞ্চালন বন্ধ হবে, কোষগুলো অক্সিজেন পাবে না, কোষীয় গঠন ভাঙতে শুরু করবে এবং শরীরের নিজস্ব উৎসেচক কোষ ও কলাকে ধীরে ধীরে ভেঙে ফেলবে। একই সঙ্গে অন্ত্র ও অন্যান্য স্থানে থাকা অণুজীবও মৃত কলা ভাঙার প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে।
তবে পৃথিবীতে মৃতদেহ যেভাবে পচে, মহাকাশযানে ঠিক একই গতিতে বা একইভাবে পচবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। পৃথিবীতে পচনের ওপর তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, অক্সিজেন, জীবাণু, পোকামাকড় এবং পরিবেশের অসংখ্য উপাদান প্রভাব ফেলে। মহাকাশযান একটি অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও তুলনামূলক বিচ্ছিন্ন পরিবেশ। সেখানে পোকামাকড়ের ভূমিকা থাকবে না, কিন্তু মানুষের শরীরের নিজস্ব অণুজীব থেকে যাবে। ফলে অভ্যন্তরীণ পচন একেবারে থেমে যাবে না। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে শরীর জীবাণুমুক্ত কোনো বস্তুতে পরিণত হয় না।
মৃতদেহ পচতে শুরু করলে বিভিন্ন গ্যাস তৈরি হতে পারে এবং শরীর ফুলে উঠতে পারে। পৃথিবীতে এসব গ্যাস সহজেই আশপাশের পরিবেশে ছড়িয়ে যায়। কিন্তু একটি মহাকাশযান মূলত একটি বন্ধ বায়ু পুনঃচলাচল ব্যবস্থা। সেখানে প্রতিটি গন্ধ, জলীয় বাষ্প, জীবাণু ও বায়ুবাহিত পদার্থ নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ। মৃতদেহ দীর্ঘ সময় খোলা অবস্থায় রাখলে শুধু দুর্গন্ধ নয়, জীবাণু ও জৈব পদার্থের কারণে মহাকাশযানের পরিচ্ছন্ন পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তাই কোনো নভোচারীর মৃত্যু ঘটলে দেহ দ্রুত বিচ্ছিন্ন ও সুরক্ষিতভাবে আবদ্ধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পেশির রাসায়নিক পরিবর্তনের কারণে দেহ শক্ত হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াও ঘটতে পারে। পৃথিবীতে যাকে মৃত্যুর পর দেহের স্বাভাবিক শক্ত হয়ে যাওয়া হিসেবে দেখা যায়, সেটি মূলত কোষের শক্তি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফল। মাধ্যাকর্ষণ না থাকলেও কোষের এই মৌলিক রাসায়নিক প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে না। তবে মাধ্যাকর্ষণহীন অবস্থায় রক্ত ও অন্যান্য তরলের বণ্টন পৃথিবীর মতো হবে না। পৃথিবীতে মৃত্যুর পর মাধ্যাকর্ষণের কারণে রক্ত শরীরের নিচের দিকে জমা হয়। মহাকাশের অতি ক্ষুদ্র মাধ্যাকর্ষণ পরিবেশে এই পরিবর্তনের ধরন ভিন্ন হতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, মৃতদেহ কোথায় রাখা হবে। পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা কোনো মহাকাশ কেন্দ্রে মৃত্যু ঘটলে পৃথিবীতে ফিরে আসা তুলনামূলকভাবে সম্ভব। পরিস্থিতি, যানবাহনের সক্ষমতা এবং অভিযানের পরিকল্পনা অনুযায়ী দেহকে সুরক্ষিত অবস্থায় পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা যেতে পারে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে যেকোনো মুহূর্তে একটি মহাকাশযান পাঠিয়ে মৃতদেহ নিয়ে আসা যাবে। উৎক্ষেপণ, কক্ষপথ, অবতরণ, যানবাহনের আসন ও ধারণক্ষমতা—সবকিছু পরিকল্পিত ব্যবস্থার অংশ। জরুরি প্রত্যাবর্তনের সুযোগ থাকলেও সেটি প্রযুক্তিগত ও পরিচালনাগতভাবে জটিল।
দেহ সংরক্ষণের জন্য স্বাভাবিকভাবেই ঠান্ডা পরিবেশের কথা মনে হতে পারে। কিন্তু মহাকাশযানের সাধারণ খাদ্য সংরক্ষণের শীতলীকরণ ব্যবস্থা মানুষের সম্পূর্ণ মৃতদেহ রাখার জন্য তৈরি নয়। একটি পূর্ণবয়স্ক মানুষের দেহের আকার ও ভর যথেষ্ট বড়। সেই সঙ্গে দেহকে এমনভাবে আবদ্ধ করতে হবে যাতে কোনো জৈব তরল, গন্ধ বা অণুজীব মহাকাশযানের পরিবেশে ছড়িয়ে না পড়ে। ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের জন্য তাই বিশেষ মৃতদেহ সংরক্ষণব্যবস্থা নিয়ে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন হতে পারে।
সমস্যাটি পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে গেলে আরও কঠিন হয়ে ওঠে। চাঁদের কোনো ঘাঁটিতে একজন নভোচারীর মৃত্যু ঘটলে পৃথিবীতে দেহ ফিরিয়ে আনা প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব হতে পারে, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব নাও হতে পারে। পৃথিবী ও চাঁদের দূরত্ব তুলনামূলকভাবে কম হলেও প্রত্যাবর্তনের জন্য উপযুক্ত যান, জ্বালানি এবং অভিযানের সুযোগ প্রয়োজন। একটি মৃত্যু পুরো অভিযানের পরিকল্পনা বদলে দিতে পারে, বিশেষ করে যদি মৃত ব্যক্তি এমন কোনো বিশেষ দায়িত্বে থাকেন যা অন্য সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে নিতে হয়।
মঙ্গলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অন্য মাত্রার। পৃথিবী ও মঙ্গলের অবস্থান অনুযায়ী তাদের মধ্যকার দূরত্ব কয়েক কোটি থেকে কয়েকশ কোটি কিলোমিটারের মধ্যে পরিবর্তিত হয়। সেখানে যাত্রা সাধারণত বহু মাসের। কোনো নভোচারী মঙ্গলগামী যাত্রার মাঝপথে মারা গেলে দেহ দ্রুত পৃথিবীতে পাঠানোর বাস্তব সুযোগ থাকবে না। বাকি সদস্যদের সম্ভবত মৃতদেহের সঙ্গে একই মহাকাশযানে আরও কয়েক মাস থাকতে হবে। তখন দেহ সংরক্ষণ শুধু স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, সীমিত জায়গা এবং ক্রুদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও গুরুতর বিষয় হয়ে উঠবে।
এ ধরনের দীর্ঘ অভিযানে মৃতদেহকে বিশেষ বায়ুরোধী আবরণে রেখে নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষণের ধারণা ব্যবহারযোগ্য হতে পারে। ভবিষ্যতে এমন ব্যবস্থাও তৈরি হতে পারে যেখানে দেহের জলীয় অংশ কমিয়ে সেটিকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় রাখা সম্ভব হবে। কিন্তু এসব ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা ও গবেষণা থাকলেও বাস্তব মহাকাশ অভিযানে মানুষের মৃতদেহ ব্যবস্থাপনার জন্য সব পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য কোনো একক প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি এখনো নেই। অভিযানের গন্তব্য, সময়কাল, যানবাহনের নকশা এবং মৃত্যুর পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত ভিন্ন হতে পারে।
এখানে আরেকটি প্রশ্ন আসে—মৃতদেহ কি মহাকাশে ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে? বাইরে থেকে এটি সহজ সমাধান মনে হলেও বাস্তবে বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। পৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথে একটি মৃতদেহ ছেড়ে দিলে সেটিও একটি কক্ষপথীয় বস্তুতে পরিণত হবে। তার গতিপথ অন্য মহাকাশযান বা উপগ্রহের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। আবার কোনো বস্তুকে ইচ্ছামতো মহাকাশে ফেলে দেওয়ার বিষয়টির সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহাকাশ কার্যক্রম, নিরাপত্তা, দূষণ এবং মর্যাদাপূর্ণ মৃতদেহ ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন জড়িত। ফলে মৃত নভোচারীকে কেবল মহাকাশে ভাসিয়ে দেওয়া বাস্তবসম্মত সাধারণ সমাধান নয়।
মঙ্গলের মতো অন্য কোনো গ্রহে দেহ সমাহিত করার ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। মানবদেহের মধ্যে বিপুলসংখ্যক অণুজীব থাকে। অন্য গ্রহের মাটিতে একটি মানবদেহ সমাহিত করলে পৃথিবীর জীবাণু সেখানে প্রবেশ করতে পারে। ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা যদি সেই এলাকায় জীবনের কোনো চিহ্ন আবিষ্কার করেন, তখন প্রশ্ন উঠতে পারে—সেটি সত্যিই মঙ্গলের নিজস্ব জীবনের প্রমাণ, নাকি মানুষের সঙ্গে পৃথিবী থেকে যাওয়া দূষণ? তাই গ্রহ সুরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে মৃতদেহও একটি সম্ভাব্য জৈব দূষণের উৎস।
মৃত্যু যদি মহাকাশযানের বাইরে ঘটে এবং দেহটি মহাকাশ পোশাকের ভেতরেই থাকে, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভিন্ন হবে। পোশাক অক্ষত ও চাপযুক্ত থাকলে সেটি সাময়িকভাবে একটি ক্ষুদ্র বন্ধ পরিবেশের মতো কাজ করতে পারে। কিন্তু জীবনরক্ষা ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেলে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং বায়ুর রাসায়নিক গঠন পরিবর্তিত হবে। শরীরের নিজস্ব অণুজীবও কাজ করতে থাকবে। আর যদি পোশাকের চাপ সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়, তাহলে নিম্নচাপ ও শূন্যতার কারণে দেহের জলীয় উপাদানের আচরণ বদলে যাবে এবং সময়ের সঙ্গে দেহ অত্যন্ত শুষ্ক অবস্থার দিকে যেতে পারে।
কোনো মৃতদেহ যদি মহাকাশযানের বাইরে দীর্ঘদিন সম্পূর্ণ শূন্যতার মধ্যে থেকে যায়, পৃথিবীর মতো স্বাভাবিক পচন সেখানে সম্ভব হবে না। কারণ প্রচলিত পচনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ অনুপস্থিত। দেহের পানি ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে এবং একধরনের প্রাকৃতিক শুষ্ক সংরক্ষণের মতো অবস্থা তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেই দেহ অপরিবর্তিত থাকবে না। সূর্যের অতিবেগুনি বিকিরণ, মহাজাগতিক বিকিরণ এবং তীব্র তাপমাত্রাগত পরিবর্তন দীর্ঘ সময় ধরে জৈব অণু ও কলাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ফলে মহাকাশে দেহ সংরক্ষিত হওয়া মানে সেটি চিরকাল মৃত্যুর মুহূর্তের মতো অক্ষত থাকবে—এ ধারণাও ভুল।
যদি দেহটি পৃথিবীর কক্ষপথে থাকে এবং যথেষ্ট নিচু কক্ষপথে প্রবেশ করে, তবে বায়ুমণ্ডলের অতি পাতলা উপরের স্তরের কারণে তার কক্ষপথ ধীরে ধীরে নিচে নামতে পারে। শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর ঘন বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলে অত্যন্ত উচ্চ গতির কারণে সৃষ্ট প্রবল উত্তাপ ও বায়ুগতীয় চাপ দেহ ও মহাকাশ পোশাককে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়া একটি মানবদেহ স্বাভাবিক অবস্থায় মাটিতে পৌঁছাবে—এমন সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।
অন্যদিকে কোনো দেহ যদি পৃথিবী বা অন্য গ্রহের সঙ্গে সংঘর্ষ না করে সূর্যকে কেন্দ্র করে স্থিতিশীল পথে চলে যায়, তাহলে তাত্ত্বিকভাবে সেটি অত্যন্ত দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকতে পারে। তবে সূর্যের বিকিরণ, মহাজাগতিক রশ্মি এবং ক্ষুদ্র মহাজাগতিক কণার আঘাত ধীরে ধীরে এর উপাদান পরিবর্তন করবে। মহাকাশে বাতাস ও বৃষ্টির মতো ক্ষয়কারী পরিবেশ নেই, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে সেখানে কোনো ক্ষয় নেই। শুধু সেই ক্ষয়ের প্রকৃতি পৃথিবীর তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা।
মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করাও গুরুত্বপূর্ণ হবে। যদি কোনো নভোচারী দুর্ঘটনায় মারা যান, তবে সেটি মহাকাশযানের অন্য সদস্যদের জন্যও একই বিপদের সংকেত হতে পারে। বিষাক্ত গ্যাস, অগ্নিকাণ্ড, বিকিরণ, চাপের ত্রুটি, যন্ত্রপাতির ব্যর্থতা কিংবা সংক্রমণ—মৃত্যুর কারণ যদি পুরো ক্রুকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে, তাহলে প্রথম কাজ মৃতদেহ ব্যবস্থাপনা নয়; বরং জীবিত সদস্যদের রক্ষা করা। ফলে দেহ সরানোর আগে মৃত্যুর কারণ এবং সংশ্লিষ্ট পরিবেশগত ঝুঁকি শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এর পাশাপাশি রয়েছে ফরেনসিক বা মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের প্রশ্ন। পৃথিবীতে অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটলে চিকিৎসক ও তদন্তকারীরা দেহ পরীক্ষা করতে পারেন। কিন্তু পৃথিবী থেকে কোটি কোটি কিলোমিটার দূরে কোনো অভিযানে পূর্ণাঙ্গ ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা থাকার সম্ভাবনা খুব কম। সেখানে সহযাত্রীদের ছবি, চিকিৎসা তথ্য, শারীরিক নমুনা এবং যন্ত্রের সংগৃহীত তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। ভবিষ্যতের মঙ্গল অভিযানে তাই ক্রুদের চিকিৎসা প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মৃত্যুর পর প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক তথ্য কীভাবে সংগ্রহ করতে হবে, সেটিও পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠতে পারে।
মৃত সহযাত্রীর উপস্থিতি জীবিত নভোচারীদের ওপর গভীর মানসিক প্রভাব ফেলতে পারে। পৃথিবীতে প্রিয়জনের মৃত্যু ঘটলে মানুষ পরিবার, বন্ধু ও সামাজিক সহায়তা পায়। কিন্তু মঙ্গলগামী মহাকাশযানের ভেতরে কয়েকজন মানুষ একটি অত্যন্ত ছোট জায়গায় মাসের পর মাস বসবাস করবে। তাদের একজন মারা গেলে অন্যদের একই সঙ্গে শোক সামলাতে হবে, অভিযানের কাজ চালিয়ে যেতে হবে এবং সম্ভবত মৃত সহযাত্রীর দেহও সংরক্ষণ করতে হবে। মহাকাশে মৃত্যু তাই শুধু একটি চিকিৎসাবিষয়ক ঘটনা নয়; এটি একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও পরিচালনাগত সংকট।
এখানে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিষয়ও উপেক্ষা করা যায় না। পৃথিবীর বিভিন্ন সমাজে মৃত্যুর পর দেহ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন রীতি রয়েছে—কবর দেওয়া, দাহ করা কিংবা অন্য ধরনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। মহাকাশে এসব রীতি হুবহু অনুসরণ করা সম্ভব নাও হতে পারে। ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক অভিযানে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের মানুষ একসঙ্গে গেলে মৃত্যুর আগে প্রত্যেক নভোচারীর ব্যক্তিগত ইচ্ছা নথিভুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে ব্যক্তিগত ইচ্ছার পাশাপাশি ক্রুদের নিরাপত্তা এবং অভিযানের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাও বিবেচনা করতে হবে।
দাহ করার বিষয়টিও মহাকাশযানের মধ্যে সহজ সমাধান নয়। মানবদেহ সম্পূর্ণ দাহ করতে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রা এবং বিশেষ ব্যবস্থা দরকার। একটি ছোট মহাকাশযানে এমন প্রক্রিয়া পরিচালনা করা বিপজ্জনক এবং বিপুল শক্তির অপচয় হতে পারে। আগুন নিজেই মহাকাশযানের অন্যতম ভয়ংকর ঝুঁকি। তাই পৃথিবীর প্রচলিত শ্মশানের মতো ব্যবস্থা সাধারণ মহাকাশযানে রাখা বাস্তবসম্মত নয়।
দেহকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে পুনঃপ্রবেশের সময়ও বিশেষ ব্যবস্থা দরকার হবে। মহাকাশযানের ভেতরে প্রতিটি বস্তুকে নিরাপদভাবে স্থির করে রাখতে হয়, কারণ অবতরণের সময় প্রবল ত্বরণ ও কম্পন সৃষ্টি হতে পারে। মৃতদেহও এর ব্যতিক্রম নয়। সেটিকে এমনভাবে সুরক্ষিত রাখতে হবে যাতে অবতরণের সময় সেটি ক্রু বা যন্ত্রপাতির জন্য বিপদ সৃষ্টি না করে। পৃথিবীতে পৌঁছানোর পর চিকিৎসা, ফরেনসিক পরীক্ষা এবং পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়াও শুরু হবে।
মানুষ যত দিন পৃথিবীর কাছাকাছি মহাকাশে সীমাবদ্ধ ছিল, তত দিন এই সমস্যার অনেকটাই জরুরি পরিকল্পনার পর্যায়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু স্থায়ী চন্দ্রঘাঁটি, দীর্ঘমেয়াদি মঙ্গল অভিযান এবং আরও দূরের মানব অভিযানের ক্ষেত্রে মৃত্যুকে পরিকল্পনার বাইরে রাখা যাবে না। খাদ্য, অক্সিজেন, পানি ও চিকিৎসাব্যবস্থার মতোই কোনো ক্রু সদস্য মারা গেলে কী করা হবে, দেহ কোথায় রাখা হবে, কতদিন সংরক্ষণ করা যাবে, কীভাবে জীবাণু নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং কখন পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা হবে—এসবের জন্য বিস্তারিত ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, মহাকাশে মৃত্যুর পর দেহের কোনো একক পরিণতি নেই। চাপযুক্ত মহাকাশ কেন্দ্রে মৃত্যু হলে দেহে পৃথিবীর মতো অনেক পচনপ্রক্রিয়া চলবে। শূন্যতায় উন্মুক্ত হলে পানি হারানো, নিম্নচাপ এবং বিকিরণের কারণে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবর্তন ঘটবে। চাঁদে মৃত্যু হলে দেহ ফিরিয়ে আনা কঠিন হলেও সম্ভব হতে পারে। মঙ্গল অভিযানে মৃত্যু ঘটলে দেহ মাসের পর মাস সংরক্ষণ করতে হতে পারে। আর গভীর মহাকাশে কোনো দেহ হারিয়ে গেলে সেটি দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যকে কেন্দ্র করে চলতে পারে।
মানবসভ্যতা মহাকাশে যাওয়ার সময় সঙ্গে করে শুধু প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক কৌতূহল নিয়ে যাচ্ছে না; নিয়ে যাচ্ছে মানুষের জীবনের সম্পূর্ণ বাস্তবতাও। জন্ম, অসুস্থতা, বার্ধক্য এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যু—পৃথিবীর বাইরে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চাইলে একদিন এসবকিছুরই ব্যবস্থা করতে হবে। তাই মহাকাশে একজন নভোচারীর মৃত্যু নিয়ে প্রশ্নটি যতটা ভয়ংকর শোনায়, বাস্তবে এটি ভবিষ্যতের মানব মহাকাশ অভিযানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈজ্ঞানিক, চিকিৎসাগত, নৈতিক ও প্রকৌশলগত সমস্যা। পৃথিবীতে মৃত্যু আমাদের পরিচিত প্রাকৃতিক পরিবেশের অংশ; মহাকাশে সেই একই মৃত্যু পরিণত হয় জীবনরক্ষা ব্যবস্থা, জীবাণুবিজ্ঞান, কক্ষপথ, বিকিরণ, মনোবিজ্ঞান এবং কোটি কোটি কিলোমিটার দূরত্বের এক জটিল সমীকরণে।
আলো থেকেও দ্রুত কিছু কি মহাবিশ্বে থাকতে পারে? আইনস্টাইনের সীমা, মহাকাশের প্রসারণ ও কোয়ান্টাম রহস্য
বৃহস্পতি গ্রহের গ্রেট রেড স্পট: শত শত বছর ধরে চলা বিশাল ঝড়ের রহস্য
মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে কী রয়েছে? স্যাজিটারিয়াস এ* ও রহস্যময় গ্যালাক্টিক কেন্দ্রের ভেতরের জগৎ
মহাকাশে শব্দ শোনা যায় না কেন? শূন্যতার নীরবতার পেছনের বিজ্ঞান
শনির বলয় কী দিয়ে তৈরি এবং একদিন কি সত্যিই হারিয়ে যাবে? বরফ, ধূলিকণা ও মহাজাগতিক রহস্যের বিজ্ঞান
মহাবিশ্বের বয়স কত? বিজ্ঞানীরা কীভাবে ১৩.৮ বিলিয়ন বছরের হিসাব বের করলেন?