বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মহাকাশে শব্দ শোনা যায় না কেন? শূন্যতার নীরবতার পেছনের বিজ্ঞান

  • Author: Admin
  • August 19, 2026
মহাকাশে শব্দ শোনা যায় না কেন? শূন্যতার নীরবতার পেছনের বিজ্ঞান
মহাকাশে শব্দ শোনা যায় না কেন?

মহাকাশ নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রে আমরা প্রায়ই বিশাল বিস্ফোরণের সঙ্গে প্রচণ্ড শব্দ শুনি। মহাকাশযান ধ্বংস হলে বিকট আওয়াজ হয়, দুটি যান সংঘর্ষ করলে ধাতব গর্জন শোনা যায়, আবার কোনো নক্ষত্র বিস্ফোরিত হলে চারদিকে যেন বজ্রপাতের মতো শব্দ ছড়িয়ে পড়ে। দৃশ্যগুলো উত্তেজনাপূর্ণ হলেও বাস্তব মহাকাশের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে আমরা যে অর্থে শব্দ শুনি, মহাকাশের প্রায় শূন্য পরিবেশে সেই শব্দ আমাদের কানে পৌঁছাতে পারে না। কারণ শব্দ নিজে স্বাধীনভাবে ছুটে চলতে পারে এমন কোনো বস্তু নয়; এটি পদার্থের কণার মধ্যে সঞ্চারিত একটি যান্ত্রিক তরঙ্গ।

এই বিষয়টি বোঝার জন্য প্রথমে শব্দ কী, সেটিই পরিষ্কার হওয়া দরকার। কোনো বস্তু কম্পিত হলে তার আশপাশের মাধ্যমের কণাগুলোও আন্দোলিত হয়। যেমন একটি ঘণ্টায় আঘাত করলে ঘণ্টার ধাতব অংশ দ্রুত সামনে-পেছনে কাঁপতে থাকে। এই কম্পন ঘণ্টার পাশের বায়ুকণাগুলোকে ধাক্কা দেয়। একটি কণা তার পাশের কণাকে প্রভাবিত করে, সেটি আবার পরের কণাকে প্রভাবিত করে। এভাবে কম্পনের শক্তি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। সেই তরঙ্গ আমাদের কানে পৌঁছালে কানের পর্দা কেঁপে ওঠে এবং মস্তিষ্ক সেই সংকেতকে শব্দ হিসেবে উপলব্ধি করে।

অর্থাৎ শব্দ চলার জন্য দুটি বিষয় অপরিহার্য—একটি কম্পনের উৎস এবং অন্যটি সেই কম্পন বহন করার মতো পদার্থের মাধ্যম। মাধ্যমটি বায়ু হতে পারে, পানি হতে পারে, আবার কঠিন পদার্থও হতে পারে। পৃথিবীতে আমরা সাধারণত বায়ুর মাধ্যমে শব্দ শুনি বলে অনেক সময় মনে করি শব্দ যেন নিজেই বাতাসের মধ্য দিয়ে চলে। প্রকৃতপক্ষে বায়ু শুধু শব্দ বহনের মাধ্যম। বায়ুর অণুগুলোর পারস্পরিক আন্দোলনের মাধ্যমেই শব্দের শক্তি আমাদের কানে এসে পৌঁছায়।

কেউ কথা বললে তার স্বরযন্ত্রের কম্পন আশপাশের বায়ুতে পর্যায়ক্রমিক চাপের পরিবর্তন সৃষ্টি করে। কোথাও বায়ুকণা সাময়িকভাবে কাছাকাছি চলে আসে, আবার কোথাও তুলনামূলকভাবে দূরে সরে যায়। এই সংকোচন ও প্রসারণ ক্রমাগত সামনে অগ্রসর হতে থাকে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শব্দ চলার সময় কোনো নির্দিষ্ট বায়ুকণা বক্তার মুখ থেকে বেরিয়ে শ্রোতার কান পর্যন্ত চলে আসে না। কণাগুলো মূলত নিজেদের সাম্যাবস্থার আশপাশে সামনে-পেছনে আন্দোলিত হয় এবং শক্তি পাশের কণায় স্থানান্তর করে।

এই কারণেই শূন্যতা শব্দের জন্য এত বড় বাধা। মহাকাশকে পুরোপুরি পদার্থহীন বলা সঠিক নয়। সেখানে অতি অল্প ঘনত্বে পরমাণু, আয়ন, ইলেকট্রন, ধূলিকণা এবং বিভিন্ন ধরনের প্লাজমা রয়েছে। কিন্তু গ্রহগুলোর মধ্যবর্তী বিশাল অঞ্চলে এসব কণার ঘনত্ব পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের তুলনায় এত কম যে সাধারণ শব্দতরঙ্গ কার্যকরভাবে বহন করার মতো ধারাবাহিক মাধ্যম সেখানে থাকে না। একটি কণার কম্পন সহজে পরবর্তী কণার কাছে পৌঁছাতে না পারলে পরিচিত অর্থে শব্দও ছড়াতে পারে না।

ধরা যাক, একজন নভোচারী মহাকাশযানের বাইরে অবস্থান করছেন এবং তার কাছেই আরেকটি মহাকাশযানের কোনো অংশ বিস্ফোরিত হলো। বিস্ফোরণের সময় বিপুল শক্তি মুক্ত হতে পারে, ধ্বংসাবশেষ ছিটকে যেতে পারে, আলো দেখা যেতে পারে এবং উত্তপ্ত গ্যাস বেরিয়ে আসতে পারে। কিন্তু নভোচারী যদি বিস্ফোরণের সঙ্গে সরাসরি কোনো পদার্থের মাধ্যমে যুক্ত না থাকেন, তাহলে পৃথিবীর মতো বিস্ফোরণের বিকট শব্দ তার কানে পৌঁছাবে না। বিস্ফোরণ ঘটলেই শব্দ সর্বত্র পৌঁছাবে—এ ধারণাটি পৃথিবীর ঘন বায়ুমণ্ডলের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি।

এখানে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে—যদি শব্দ শূন্যতার মধ্য দিয়ে যেতে না পারে, তাহলে আলো কীভাবে পারে? কারণ আলো এবং শব্দ মৌলিকভাবে ভিন্ন ধরনের তরঙ্গ। শব্দ হলো যান্ত্রিক তরঙ্গ। এর বিস্তারের জন্য পদার্থের কণা প্রয়োজন। অন্যদিকে দৃশ্যমান আলোসহ বেতার তরঙ্গ, অবলোহিত বিকিরণ, অতিবেগুনি রশ্মি, এক্স-রশ্মি ও গামা রশ্মি তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণের বিভিন্ন রূপ। তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ শূন্যতার মধ্য দিয়েও চলতে পারে। তাই সূর্য থেকে আলো প্রায় পনেরো কোটি কিলোমিটার মহাশূন্য অতিক্রম করে পৃথিবীতে পৌঁছায়, কিন্তু সূর্যের অভ্যন্তরের প্রচণ্ড অস্থিরতার শব্দ একইভাবে আমাদের কানে এসে পৌঁছায় না।

এই পার্থক্যের একটি চমৎকার উদাহরণ সূর্য নিজেই। সূর্য কোনো শান্ত অগ্নিগোলক নয়। এর অভ্যন্তরে অবিশ্বাস্য তাপমাত্রা ও চাপের মধ্যে পারমাণবিক সংযোজন চলছে। পৃষ্ঠ ও বায়ুমণ্ডলে প্লাজমার প্রবল আন্দোলন, অগ্ন্যুৎপাত, পদার্থের বিশাল প্রবাহ এবং শক্তিশালী চৌম্বকীয় ঘটনা ঘটে। যদি পৃথিবীর মতো ঘন কোনো মাধ্যম সূর্য থেকে পৃথিবী পর্যন্ত বিস্তৃত থাকত এবং সেই মাধ্যম কার্যকরভাবে শব্দ বহন করতে পারত, তাহলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। বাস্তবে মাঝখানের প্রায় শূন্য মহাকাশ সেই যান্ত্রিক কম্পনকে আমাদের কানে পৌঁছাতে দেয় না।

তবে এর অর্থ এই নয় যে মহাকাশের কোথাও কোনো ধরনের শব্দতরঙ্গই থাকতে পারে না। মহাবিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যথেষ্ট ঘন গ্যাস বা প্লাজমা রয়েছে। নক্ষত্রের ভেতরে, গ্রহের বায়ুমণ্ডলে, গ্যাসের বিশাল মেঘে কিংবা উত্তপ্ত প্লাজমার অঞ্চলে চাপের তরঙ্গ সৃষ্টি ও বিস্তার লাভ করতে পারে। অর্থাৎ “মহাকাশে শব্দ নেই” কথাটি সাধারণ ব্যাখ্যা হিসেবে কার্যকর হলেও বৈজ্ঞানিকভাবে আরও নির্ভুল বক্তব্য হলো—মহাকাশের প্রায় শূন্য অঞ্চলে মানুষের পরিচিত শ্রাব্য শব্দ কার্যকরভাবে সঞ্চারিত হতে পারে না।

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে শব্দের গতি নির্দিষ্ট একটি অপরিবর্তনীয় সংখ্যা নয়। মাধ্যমের প্রকৃতি, ঘনত্ব, স্থিতিস্থাপকতা এবং তাপমাত্রার ওপর এর গতি নির্ভর করে। সাধারণ কক্ষতাপমাত্রার কাছাকাছি অবস্থায় বায়ুতে শব্দ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিনশ চল্লিশ মিটারের কিছু বেশি পথ অতিক্রম করতে পারে। পানিতে শব্দ আরও দ্রুত চলে এবং অনেক কঠিন পদার্থে তার গতি আরও বেশি হতে পারে। কারণ সেখানে কণাগুলোর পারস্পরিক যান্ত্রিক সম্পর্ক বায়ুর তুলনায় ভিন্ন।

এ কারণেই পানির নিচে শব্দ শোনা যায়। তিমি ও ডলফিন দীর্ঘ দূরত্বে শব্দ ব্যবহার করে যোগাযোগ করতে পারে। একইভাবে কোনো কঠিন ধাতব কাঠামোর এক পাশে আঘাত করলে তার কম্পন কাঠামোর মধ্য দিয়ে অন্য পাশে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ শব্দের জন্য বায়ুই একমাত্র মাধ্যম নয়। প্রয়োজন শুধু এমন পদার্থ, যার মধ্য দিয়ে যান্ত্রিক কম্পন এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে সঞ্চারিত হতে পারে।

মহাকাশচারীদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। একজন নভোচারী মহাকাশযানের বাইরে থাকলেও নিজের পোশাকের ভেতরের শব্দ শুনতে পারেন। কারণ মহাকাশ পোশাকের ভেতরে নিয়ন্ত্রিত গ্যাসীয় পরিবেশ থাকে। তিনি কথা বললে সেই গ্যাসের মধ্য দিয়ে শব্দ তার মাইক্রোফোন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এরপর যোগাযোগব্যবস্থা সেই শব্দকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে এবং বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে অন্য নভোচারী বা মহাকাশযানে পাঠায়।

অন্য নভোচারীর যন্ত্র সেই বেতার সংকেত গ্রহণ করে আবার শব্দে রূপান্তর করে। ফলে দুজন নভোচারী মহাশূন্যে ভেসে থেকেও পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। কিন্তু তাদের কণ্ঠস্বর সরাসরি শূন্য মহাকাশ পেরিয়ে একজনের মুখ থেকে অন্যজনের কানে যায় না। যোগাযোগটি ঘটে বেতার তরঙ্গের সাহায্যে, সরাসরি শব্দতরঙ্গের সাহায্যে নয়।

আরও মজার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যদি দুই নভোচারী কোনোভাবে একই কঠিন কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকেন। একজন যদি সেই কাঠামোতে আঘাত করেন, কম্পন কঠিন পদার্থের মধ্য দিয়ে অন্যজনের কাছে পৌঁছাতে পারে। তখন তিনি সেই কম্পনের কিছু অংশ অনুভব বা শুনতে পারেন। কারণ এখানে শূন্য মহাকাশ নয়, কঠিন কাঠামোটিই শব্দ বহনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।

মহাকাশযানের ভেতরের পরিস্থিতি আবার পৃথিবীর মতো অনেকটাই স্বাভাবিক। সেখানে বাতাস রয়েছে বলে নভোচারীরা একে অপরের কথা শুনতে পারেন, যন্ত্রপাতির শব্দ শুনতে পারেন এবং কোনো ত্রুটি হলে অস্বাভাবিক আওয়াজও শনাক্ত করতে পারেন। কিন্তু সেই মহাকাশযানের বাইরের অংশে কোনো বস্তু আঘাত করলে শব্দটি কীভাবে শোনা যাবে, তা নির্ভর করবে আঘাতের কম্পন মহাকাশযানের কাঠামোর মধ্য দিয়ে ভেতরে পৌঁছাতে পারছে কি না। বাইরে কোনো বায়ু না থাকলেও ধাতব কাঠামো কম্পন বহন করতে পারে।

এখানেই চলচ্চিত্রের মহাকাশ আর বাস্তব মহাকাশের সবচেয়ে দৃশ্যমান পার্থক্যগুলোর একটি। বাস্তব মহাশূন্যে দূরের দুটি মহাকাশযানের সংঘর্ষ দেখলে পর্যবেক্ষক আলো দেখতে পারেন, ধ্বংসাবশেষ ছিটকে যেতে দেখতে পারেন, কিন্তু শূন্যতার মধ্য দিয়ে সেই সংঘর্ষের গর্জন শুনবেন না। চলচ্চিত্র নির্মাতারা ইচ্ছাকৃতভাবে শব্দ যোগ করেন, কারণ শব্দ দৃশ্যের আবেগ, বিপদ ও নাটকীয়তা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সম্পূর্ণ নীরব বিস্ফোরণ বাস্তবসম্মত হলেও দর্শকের কাছে অনেক সময় কম নাটকীয় মনে হতে পারে।

তবে বিজ্ঞানীরা যখন বলেন কোনো গ্রহ, নক্ষত্র বা কৃষ্ণগহ্বরের “শব্দ” শোনানো হয়েছে, তখন বিষয়টি কিছুটা আলাদা। মহাকাশ পর্যবেক্ষণযন্ত্র বিভিন্ন ধরনের তড়িৎচুম্বকীয় সংকেত, প্লাজমার পরিবর্তন, চাপের তরঙ্গ বা অন্য ভৌত তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। এসব তথ্যের কম্পাঙ্ক মানুষের শ্রবণসীমার মধ্যে নাও থাকতে পারে। বিজ্ঞানীরা কখনো সেই তথ্যকে মানুষের শ্রবণযোগ্য কম্পাঙ্কে রূপান্তর করেন। এই প্রক্রিয়ায় মহাজাগতিক তথ্যকে শব্দ হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়।

অতএব কোনো কৃষ্ণগহ্বরের “শব্দ” শুনলেই ধরে নেওয়া ঠিক নয় যে একটি মাইক্রোফোন শূন্য মহাকাশে রেখে সরাসরি সেই আওয়াজ ধারণ করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ করা ভৌত পরিবর্তনকে পরে মানুষের শোনার উপযোগী শব্দে রূপ দেওয়া হয়। আবার কোনো গ্যাসপূর্ণ অঞ্চলে বাস্তব চাপতরঙ্গও থাকতে পারে, কিন্তু সেটিকে মানুষের শ্রবণসীমায় আনার জন্য তথ্য প্রক্রিয়াকরণের প্রয়োজন হতে পারে।

মানুষের শ্রবণব্যবস্থারও একটি সীমা রয়েছে। সাধারণভাবে সুস্থ তরুণ মানুষের কান প্রায় বিশ থেকে বিশ হাজার কম্পন-প্রতি-সেকেন্ডের মধ্যবর্তী শব্দ শনাক্ত করতে পারে, যদিও বয়স ও ব্যক্তিভেদে এই সীমা পরিবর্তিত হয়। এর নিচের কম্পাঙ্ককে আমরা সরাসরি স্বাভাবিক শব্দ হিসেবে শুনতে পারি না, আবার এর অনেক ওপরের কম্পাঙ্কও আমাদের শ্রবণক্ষমতার বাইরে। ফলে কোনো মাধ্যমে চাপতরঙ্গ উপস্থিত থাকলেই সেটি মানুষের কাছে শ্রাব্য হবে—এমন নয়।

শূন্যতার একটি বিখ্যাত পরীক্ষামূলক উদাহরণ ঘণ্টা ও বায়ুশূন্য পাত্রের সাহায্যে বোঝানো যায়। একটি ঘণ্টাকে স্বচ্ছ পাত্রের ভেতরে রেখে বাজানো হলে প্রথমে তার শব্দ শোনা যায়। এরপর পাত্রের ভেতর থেকে ক্রমাগত বায়ু সরিয়ে নেওয়া হলে ঘণ্টাটি দৃশ্যত কাঁপতে থাকে, কিন্তু বাইরে শোনা শব্দ ক্রমে দুর্বল হয়ে যায়। যত বেশি বায়ু অপসারণ করা হয়, শব্দ বহনের জন্য তত কম কণা অবশিষ্ট থাকে। আদর্শ সম্পূর্ণ শূন্যতা তৈরি করা কঠিন হলেও পরীক্ষাটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে শব্দের বিস্তারের জন্য মাধ্যমের উপস্থিতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে আরেকটি সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে। শব্দ চলার জন্য শুধু কিছু বিচ্ছিন্ন কণা থাকলেই যথেষ্ট নয়; কণাগুলোর মধ্যে এমন পারস্পরিক ক্রিয়া থাকতে হবে যাতে একটি অঞ্চলের চাপের পরিবর্তন ধারাবাহিকভাবে অন্য অঞ্চলে পৌঁছাতে পারে। অত্যন্ত পাতলা গ্যাসে কণাগুলোর মধ্যকার গড় দূরত্ব অনেক বেড়ে যায় এবং সংঘর্ষের হার কমে যায়। ফলে পৃথিবীর বায়ুর মতো পরিচিত শব্দতরঙ্গ সেখানে কার্যকরভাবে আচরণ করতে পারে না।

এই বৈজ্ঞানিক সত্য মহাকাশ অনুসন্ধানের প্রযুক্তিতেও গুরুত্বপূর্ণ। মহাকাশযানের বাইরে কোনো যান্ত্রিক সমস্যা শনাক্ত করার জন্য সাধারণ মাইক্রোফোন সব ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না। প্রকৌশলীরা তাই কম্পন শনাক্তকারী যন্ত্র, চাপসংবেদক, তড়িৎচুম্বকীয় পর্যবেক্ষণব্যবস্থা এবং কাঠামোর সঙ্গে সংযুক্ত বিভিন্ন সংবেদক ব্যবহার করতে পারেন। অর্থাৎ মহাকাশে কোনো ঘটনা “শোনা”র চেয়ে তার সৃষ্টি করা কম্পন, বিকিরণ বা অন্যান্য ভৌত পরিবর্তন পরিমাপ করা অনেক বেশি কার্যকর।

মহাকাশের এই নীরবতা আসলে আমাদের মহাবিশ্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য বুঝতে সাহায্য করে। আমরা পৃথিবীতে জন্মেছি এমন এক ঘন বায়ুমণ্ডলের মধ্যে, যেখানে চারপাশের অসংখ্য ঘটনা মুহূর্তেই শব্দ তৈরি করে। বাতাসের প্রবাহ, মানুষের কথা, যানবাহন, বজ্রপাত, সমুদ্রের ঢেউ—সবকিছু আমাদের মনে এমন ধারণা তৈরি করে যে কোনো ঘটনা ঘটলেই তার একটি শব্দ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু শব্দ কোনো ঘটনার অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য নয়। শব্দ হলো সেই ঘটনার কম্পনকে একটি উপযুক্ত মাধ্যম আমাদের শ্রবণব্যবস্থার কাছে পৌঁছে দেওয়ার ফল।

এই কারণেই মহাকাশ একই সঙ্গে প্রচণ্ড সক্রিয় এবং গভীরভাবে নীরব হতে পারে। সেখানে নক্ষত্র জন্ম নিচ্ছে, নক্ষত্র ধ্বংস হচ্ছে, মহাকাশযান দ্রুতগতিতে ছুটছে, গ্রহাণু সংঘর্ষে জড়াচ্ছে এবং অসীম শক্তির মহাজাগতিক ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনা আলো, বিকিরণ, কণা ও শক্তির মাধ্যমে মহাবিশ্বকে প্রভাবিত করতে পারে, অথচ তাদের পাশে ভেসে থাকা একজন মানুষ শূন্যতার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মতো কোনো গর্জন শুনবেন না।

সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, মহাকাশ নীরব বলে সেখানে ঘটনা কম ঘটে না; বরং আমাদের কান সেই ঘটনাগুলোর সংবাদ পাওয়ার উপযুক্ত মাধ্যম পায় না। চোখ আলো গ্রহণ করতে পারে বলে আমরা দূরের নক্ষত্র দেখি, বেতার দূরবীক্ষণযন্ত্র তড়িৎচুম্বকীয় সংকেত শনাক্ত করতে পারে বলে অদৃশ্য মহাজাগতিক ঘটনাও পর্যবেক্ষণ করি। কিন্তু মানুষের কান যান্ত্রিক শব্দতরঙ্গের ওপর নির্ভরশীল, আর গ্রহ-নক্ষত্রের মধ্যবর্তী প্রায় শূন্য মহাকাশ সেই তরঙ্গ বহনের জন্য উপযুক্ত নয়।

তাই মহাকাশের নীরবতা কোনো রহস্যময় অলৌকিক ব্যাপার নয়; এটি শব্দের প্রকৃতির সরাসরি ফল। শব্দের জন্য দরকার কম্পন, সেই কম্পন বহনের জন্য দরকার পদার্থ, আর মহাকাশের বিশাল শূন্য অঞ্চলে সেই পদার্থের ঘনত্ব অত্যন্ত কম। ফলে সেখানে চোখের সামনে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটলেও আমরা আলো দেখতে পারি, কিন্তু পৃথিবীর মতো তার গর্জন শুনতে পারি না। মহাবিশ্ব তাই আমাদের চোখে হতে পারে আলো, বিস্ফোরণ ও গতির এক অসীম নাট্যমঞ্চ—কিন্তু মানুষের কানের কাছে তার বিশাল অংশই এক গভীর, অবিশ্বাস্য নীরবতা।