বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

বিগ ব্যাংয়ের আগে কী ছিল? মহাবিশ্বের জন্মের আগের রহস্য নিয়ে বিজ্ঞানের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন

  • Author: Admin
  • August 27, 2026
বিগ ব্যাংয়ের আগে কী ছিল? মহাবিশ্বের জন্মের আগের রহস্য নিয়ে বিজ্ঞানের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন
বিগ ব্যাংয়ের আগে কী ছিল?

“বিগ ব্যাংয়ের আগে কী ছিল?”—প্রশ্নটি শুনতে খুব স্বাভাবিক। আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় প্রত্যেক ঘটনারই একটি আগের অবস্থা থাকে। একটি বাড়ি নির্মাণের আগে সেখানে হয়তো খালি জমি ছিল, একটি নক্ষত্র জন্মানোর আগে ছিল গ্যাস ও ধূলির মেঘ, আর পৃথিবী গঠনের আগেও সৌরজগতের অন্য একটি অবস্থা ছিল। তাই মহাবিশ্বের সূচনার কথা শুনলেই স্বাভাবিকভাবে মনে হয়, তারও আগে নিশ্চয় কিছু ছিল। কিন্তু এখানেই সমস্যাটি অসাধারণ গভীর হয়ে ওঠে। আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞানে এমন সম্ভাবনাও রয়েছে যে বিগ ব্যাংয়ের “আগে” বলতে আদৌ কোনো সময় ছিল না। যদি সময় নিজেই মহাবিশ্বের সঙ্গে উদ্ভূত হয়ে থাকে, তাহলে বিগ ব্যাংয়ের আগে কী ঘটেছিল জিজ্ঞাসা করা এমন একটি প্রশ্ন হয়ে যেতে পারে, যার মধ্যে আমাদের পরিচিত সময়ের ধারণাটিই ভুলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।

প্রথমেই একটি বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা পরিষ্কার করা জরুরি। বিগ ব্যাংকে সাধারণ বিস্ফোরণের মতো কল্পনা করা ঠিক নয়। কোনো বিশাল অন্ধকার শূন্যস্থানের একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে পদার্থের গোলা বিস্ফোরিত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল—আধুনিক বিগ ব্যাং ধারণা এমন কথা বলে না। বরং আমরা যে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ করি, তার অতীতে গেলে দেখা যায় স্থান নিজেই ক্রমশ অধিক ঘন, উত্তপ্ত ও সংকুচিত অবস্থায় ছিল। মহাবিশ্ব প্রসারিত হওয়ার অর্থ ছায়াপথগুলো আগে থেকে থাকা কোনো শূন্য পাত্রের মধ্যে উড়ে যাচ্ছে—এমন নয়; বরং বৃহৎ মাত্রায় তাদের মধ্যবর্তী স্থান প্রসারিত হচ্ছে।

বর্তমানে মহাবিশ্বের বয়স আনুমানিক তেরো শত আশি কোটি বছর। দূরবর্তী ছায়াপথের আলো, মহাবিশ্বের প্রসারণ এবং মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণের মতো পর্যবেক্ষণ থেকে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের ইতিহাসকে অনেক দূর অতীত পর্যন্ত অনুসরণ করতে পারেন। সময়কে উল্টো দিকে নিয়ে গেলে পদার্থ ক্রমশ ঘন ও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আরও পেছনে গেলে পরমাণু থাকতে পারে না, তারও আগে পরমাণুর কেন্দ্রক স্থিতিশীলভাবে গঠিত ছিল না, আরও আগে পদার্থ ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত মৌলিক কণার অবস্থায়। কিন্তু যতই সূচনার কাছাকাছি যাওয়া হয়, ততই আমাদের বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা প্রকট হয়ে ওঠে।

সাধারণ আপেক্ষিকতার সমীকরণ ব্যবহার করে মহাবিশ্বকে অতীতের দিকে অনুসরণ করলে এক পর্যায়ে এমন একটি অবস্থার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যেখানে ঘনত্ব ও স্থানকালের বক্রতা সীমাহীন হয়ে যায়। একে সাধারণভাবে আদি অনন্যতা বলা হয়। একসময় এই অনন্যতাকেই মহাবিশ্বের প্রকৃত সূচনা হিসেবে খুব সরলভাবে উপস্থাপন করা হতো। কিন্তু বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গিতে অনন্যতাকে বাস্তব কোনো অসীম ঘনত্বের বিন্দু হিসেবে ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়। বরং এটি ইঙ্গিত করতে পারে যে সেখানে পৌঁছে সাধারণ আপেক্ষিকতার ব্যবহারযোগ্যতা শেষ হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ সমীকরণ অসীম মান দেখাচ্ছে বলে প্রকৃতিতেও অবশ্যই একটি অসীম ঘনত্বের বিন্দু ছিল—এ সিদ্ধান্ত অনিবার্য নয়।

সমস্যাটির কেন্দ্রে রয়েছে দুটি অত্যন্ত সফল কিন্তু এখনো অসম্পূর্ণভাবে সংযুক্ত বৈজ্ঞানিক কাঠামো। সাধারণ আপেক্ষিকতা বৃহৎ মাত্রায় মহাকর্ষ, নক্ষত্র, কৃষ্ণগহ্বর এবং মহাবিশ্বের বিবর্তন ব্যাখ্যা করতে অসাধারণ সফল। অন্যদিকে অতিক্ষুদ্র মাত্রায় কণা ও শক্তির আচরণ ব্যাখ্যা করে কোয়ান্টাম তত্ত্ব। মহাবিশ্বের একেবারে প্রথম মুহূর্তে আকার, শক্তি ও ঘনত্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল বলে ধারণা করা হয়, যেখানে একই সঙ্গে মহাকর্ষ এবং কোয়ান্টাম আচরণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু আমাদের কাছে এখনো পরীক্ষায় নিশ্চিত একটি পূর্ণাঙ্গ কোয়ান্টাম মহাকর্ষ তত্ত্ব নেই। ফলে মহাবিশ্বের একেবারে সূচনায় কী ঘটেছিল, সেই প্রশ্নে বর্তমান বিজ্ঞান একটি মৌলিক সীমায় পৌঁছে যায়।

এই সীমার সঙ্গে জড়িত একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র সময়মাত্রা হলো প্ল্যাঙ্ক সময়। বিগ ব্যাংয়ের পর আনুমানিক এক সেকেন্ডের একের পর তেতাল্লিশটি শূন্য বসালে যে ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ পাওয়া যায়, তার কাছাকাছি সময়কে প্ল্যাঙ্ক সময় বলা হয়। এর আগের মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব দিয়ে নিশ্চিত বর্ণনা দেওয়া যায় না। এর অর্থ এই নয় যে বিজ্ঞান নিশ্চিতভাবে জানে প্ল্যাঙ্ক সময়ের আগে কিছুই ছিল না। বরং এর অর্থ হলো, সেখানে আমাদের বর্তমান পরীক্ষিত তত্ত্বগুলো আর যথেষ্ট নয়।

এখানেই “আগে” শব্দটির অর্থ নিয়ে আরও গভীর সমস্যা দেখা দেয়। সাধারণ আপেক্ষিকতায় স্থান ও সময় আলাদা কোনো চিরস্থায়ী মঞ্চ নয়, যার ওপর মহাবিশ্বের ঘটনা ঘটে। স্থান ও সময় একত্রে স্থানকাল, এবং পদার্থ ও শক্তির সঙ্গে এর গঠনও পরিবর্তিত হয়। তাই মহাবিশ্বের উৎপত্তি যদি স্থানকালেরও উৎপত্তি হয়ে থাকে, তাহলে মহাবিশ্ব সৃষ্টির আগে একটি ঘড়ি টিকটিক করছিল—এমন ধারণা ভুল হতে পারে। সেখানে “আগে” ও “পরে”র প্রচলিত সম্পর্কই হয়তো ছিল না।

এই বিষয়টি বোঝাতে পৃথিবীর ভৌগোলিক উদাহরণ প্রায়ই ব্যবহার করা হয়। কেউ যদি জিজ্ঞাসা করেন, উত্তর মেরুর আরও উত্তরে কী আছে, তাহলে প্রশ্নটির ভাষা স্বাভাবিক হলেও একটি নির্দিষ্ট সীমার পর “উত্তর” দিকটির আর আগের অর্থ থাকে না। একইভাবে সময় যদি মহাবিশ্বের কোনো প্রাথমিক সীমা থেকে শুরু হয়ে থাকে, তবে সেই সীমার “আগে” জিজ্ঞাসা করাও হয়তো একই ধরনের ধারণাগত সমস্যা। তবে এটি শুধু একটি ব্যাখ্যামূলক তুলনা; এর দ্বারা প্রমাণিত হয় না যে বিগ ব্যাংয়ের আগে অবশ্যই কিছু ছিল না।

অন্যদিকে আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞানের কিছু ধারণা বলছে, বিগ ব্যাং আমাদের মহাবিশ্বের উত্তপ্ত ও ঘন পর্যায়ের সূচনা হলেও সেটি সমস্ত বাস্তবতার চূড়ান্ত সূচনা নাও হতে পারে। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যবেক্ষণ দ্বারা আমরা উত্তপ্ত প্রাথমিক মহাবিশ্বের পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ পেয়েছি, কিন্তু তার ঠিক আগে কী ঘটেছিল তা একই মাত্রার নিশ্চয়তায় জানা যায়নি।

এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো মহাজাগতিক স্ফীতি। এই ধারণা অনুযায়ী অত্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে মহাবিশ্ব অতি অল্প সময়ের মধ্যে অবিশ্বাস্য দ্রুত হারে প্রসারিত হয়েছিল। এই প্রসারণ সাধারণ কোনো বস্তু আলোর চেয়ে দ্রুত ছুটে যাওয়ার ঘটনা নয়; বরং স্থান নিজেই দ্রুত প্রসারিত হয়েছিল। মহাজাগতিক স্ফীতির ধারণা মহাবিশ্বের বৃহৎ মাত্রার সমসত্ত্বতা, জ্যামিতি এবং ক্ষুদ্র প্রাথমিক বিচ্যুতি থেকে পরবর্তী ছায়াপথ গঠনের মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে।

যদি স্ফীতি ঘটে থাকে, তাহলে আমরা প্রচলিত অর্থে যাকে উত্তপ্ত বিগ ব্যাং বলি, সেটি স্ফীতির সমাপ্তির পরের একটি পর্যায় হতে পারে। স্ফীতি শেষ হওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট শক্তি কণা ও বিকিরণে রূপান্তরিত হয়ে মহাবিশ্বকে অত্যন্ত উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। এই দৃষ্টিতে উত্তপ্ত বিগ ব্যাংয়ের আগে একটি স্ফীতিশীল অবস্থা ছিল বলা সম্ভব। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই নতুন প্রশ্ন আসে—স্ফীতির আগে কী ছিল? স্ফীতি কীভাবে শুরু হলো? সেটিও কি কোনো আরও পুরোনো অবস্থার ফল?

কিছু স্ফীতি-ভিত্তিক ধারণায় মহাবিশ্বের কিছু অঞ্চলে স্ফীতি শেষ হলেও অন্য অঞ্চলে তা চলতে পারে। এর ফলে একের পর এক পৃথক মহাজাগতিক অঞ্চল সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়। আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্ব তখন আরও বৃহৎ এক বাস্তবতার একটি অঞ্চল হতে পারে। এ ধরনের ধারণা থেকে বহু-মহাবিশ্বের সম্ভাবনাও উঠে আসে। কিন্তু এই পর্যায়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকা জরুরি। বহু-মহাবিশ্ব একটি আকর্ষণীয় তাত্ত্বিক সম্ভাবনা হলেও আমাদের মহাবিশ্বের বাইরের অন্য মহাবিশ্ব সরাসরি পর্যবেক্ষিত হয়নি।

আরেকটি আকর্ষণীয় সম্ভাবনা হলো চক্রাকার মহাবিশ্ব। এই শ্রেণির ধারণায় মহাবিশ্বের ইতিহাস একবারের সূচনা ও অনন্ত প্রসারণের পরিবর্তে একাধিক পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যেতে পারে। কোনো পর্যায়ে মহাবিশ্ব সংকুচিত হতে পারে, অত্যন্ত ঘন অবস্থায় পৌঁছে আবার প্রসারণ শুরু করতে পারে। সেই ক্ষেত্রে আমাদের বিগ ব্যাং সম্পূর্ণ অস্তিত্বের জন্ম না হয়ে পূর্ববর্তী মহাজাগতিক পর্যায় থেকে নতুন পর্যায়ে পরিবর্তনের ঘটনা হতে পারে।

এই ধরনের একটি ধারণাকে প্রায়ই মহাজাগতিক প্রত্যাবর্তন হিসেবে কল্পনা করা হয়। প্রচলিত অনন্যতার পরিবর্তে মহাবিশ্ব অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও ঘন অবস্থায় পৌঁছে ধ্বংস না হয়ে আবার প্রসারিত হতে পারে। কোয়ান্টাম মহাকর্ষের কিছু তাত্ত্বিক কাঠামোতে এমন সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। যদি প্রকৃতিতে সত্যিই এমন কিছু ঘটে থাকে, তবে আমাদের মহাবিশ্বের আগে একটি সংকুচিত মহাবিশ্ব থাকতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এটি প্রতিষ্ঠিত পর্যবেক্ষণমূলক সত্য নয়।

আরও কিছু তত্ত্বে মহাবিশ্বের জন্মকে প্রচলিত অর্থে কোনো নির্দিষ্ট “প্রথম মুহূর্ত” দিয়ে ব্যাখ্যা না করে সময়ের প্রকৃতিই প্রাথমিক পর্যায়ে ভিন্ন ছিল বলে বিবেচনা করা হয়। অত্যন্ত প্রাথমিক অবস্থায় আমাদের পরিচিত সময় এবং স্থানের পার্থক্য অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে। তখন মহাবিশ্বের শুরু কোনো ধারালো প্রান্তের মতো না হয়ে মসৃণ জ্যামিতিক অবস্থার মতো হতে পারে। এই ধরনের ধারণায় “তার এক মুহূর্ত আগে কী ছিল?” প্রশ্নটির অর্থ হারিয়ে যেতে পারে, কারণ সেখানে প্রচলিত সময়রেখাই আর কার্যকর নয়।

কোয়ান্টাম মহাকাশবিজ্ঞানের কিছু ব্যাখ্যায় আবার মহাবিশ্বের উৎপত্তির সঙ্গে কোয়ান্টাম অবস্থা যুক্ত করা হয়। জনপ্রিয় আলোচনায় কখনো বলা হয় মহাবিশ্ব “শূন্য থেকে” সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু এখানে “শূন্য” শব্দটি অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর। দৈনন্দিন ভাষায় শূন্য বলতে আমরা একেবারে কিছু না থাকা বুঝি। পদার্থবিজ্ঞানের কোয়ান্টাম শূন্যতা কিন্তু সম্পূর্ণ দার্শনিক শূন্যতা নয়। সেখানে ক্ষেত্র, নিয়ম এবং কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। তাই “মহাবিশ্ব কিছুই না থেকে সৃষ্টি হয়েছে” কথাটি শুনলেই সেটিকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করা উচিত নয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বিগ ব্যাংয়ের আগে কিছু ঘটে থাকলে তার কোনো চিহ্ন কি বর্তমান মহাবিশ্বে রয়ে যেতে পারে? বিজ্ঞানীদের জন্য এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। একটি তত্ত্ব গাণিতিকভাবে সুন্দর হলেই যথেষ্ট নয়; সেটি এমন পূর্বাভাস দিলে বেশি মূল্যবান হয় যা পর্যবেক্ষণের সঙ্গে তুলনা করা যায়। প্রাথমিক মহাবিশ্বের তথ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভাণ্ডার হলো মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ। মহাবিশ্বের বয়স যখন প্রায় তিন লক্ষ আশি হাজার বছর, তখন পদার্থ এতটা ঠান্ডা হয়েছিল যে আলো তুলনামূলক স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারে। সেই প্রাচীন আলোর ক্ষীণ অবশেষ আজও সমগ্র আকাশে দেখা যায়।

এই বিকিরণের তাপমাত্রায় অত্যন্ত ক্ষুদ্র তারতম্য রয়েছে। পরবর্তীকালে এই ক্ষুদ্র ঘনত্বের পার্থক্য থেকেই মহাকর্ষের প্রভাবে ছায়াপথ ও বৃহৎ মহাজাগতিক কাঠামো গড়ে ওঠে। প্রাথমিক মহাবিশ্বের বিভিন্ন তত্ত্ব এই তারতম্যের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন পূর্বাভাস দিতে পারে। তাই আরও নিখুঁত পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতে স্ফীতি, কোয়ান্টাম প্রক্রিয়া বা বিগ ব্যাংয়ের পূর্ববর্তী সম্ভাব্য পর্যায় সম্পর্কে কিছু তত্ত্বকে শক্তিশালী কিংবা দুর্বল করতে পারে।

প্রাথমিক মহাবিশ্বের আরেক সম্ভাব্য বার্তাবাহক হলো আদিম মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। স্থানকালের অত্যন্ত প্রাথমিক অস্থিরতা যদি নির্দিষ্ট ধরনের মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তৈরি করে থাকে, তবে তার পরোক্ষ চিহ্ন মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ অথবা ভবিষ্যতের অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যবেক্ষণে ধরা পড়তে পারে। এমন সংকেত আবিষ্কৃত হলে মহাবিশ্বের এমন এক যুগ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া সম্ভব হতে পারে, যেখানে সাধারণ আলো দিয়ে সরাসরি দেখা অসম্ভব।

তবে একটি মৌলিক পর্যবেক্ষণগত বাধাও রয়েছে। আমরা যত দূরের কোনো বস্তু দেখি, তত অতীতের আলো দেখি, কারণ আলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে সময় নেয়। কিন্তু মহাবিশ্বের একেবারে প্রাথমিক উত্তপ্ত পর্যায়ে পদার্থ ও বিকিরণ এমনভাবে পরস্পরের সঙ্গে ক্রিয়া করত যে আলো স্বাধীনভাবে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে পারত না। ফলে সাধারণ দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে বিগ ব্যাংয়ের মুহূর্ত পর্যন্ত সরাসরি তাকানো সম্ভব নয়। বিজ্ঞানীদের তাই পরবর্তী মহাবিশ্বে রেখে যাওয়া পরোক্ষ ছাপ বিশ্লেষণ করতে হয়।

“বিগ ব্যাংয়ের আগে কী ছিল?” প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আরেকটি দার্শনিক ফাঁদ এড়ানো জরুরি। কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব এখনো উত্তর দিতে পারেনি বলেই সেখানে ইচ্ছামতো যেকোনো ব্যাখ্যা বসিয়ে দেওয়া যায় না। আবার বর্তমান বিজ্ঞান উত্তর জানে না বলে প্রশ্নটির বৈজ্ঞানিক মূল্যও কমে যায় না। বিজ্ঞানের শক্তি অনেকাংশেই এখানে—কোথায় পর্যবেক্ষণ শেষ হচ্ছে, কোথায় প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব শেষ হচ্ছে এবং কোথা থেকে অনুমান শুরু হচ্ছে, সেই সীমারেখা পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করা।

বর্তমানে আমরা যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি যে দৃশ্যমান মহাবিশ্ব অতীতে অত্যন্ত উত্তপ্ত ও ঘন ছিল এবং সময়ের সঙ্গে প্রসারিত ও শীতল হয়েছে। প্রাথমিক মহাবিশ্বে হালকা মৌলের সৃষ্টি, মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ এবং বৃহৎ মাত্রার প্রসারণ এই সামগ্রিক চিত্রের সঙ্গে শক্তিশালীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু এই সাফল্যের অর্থ এই নয় যে বিজ্ঞান মহাবিশ্বের চূড়ান্ত প্রথম মুহূর্ত পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

তাই বিগ ব্যাংয়ের আগে কী ছিল—এর সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক উত্তর বর্তমানে একক কোনো বাক্যে “কিছুই ছিল না” বা “আরেকটি মহাবিশ্ব ছিল” বলা নয়। বরং কয়েকটি সম্ভাবনা খোলা রয়েছে। সময় নিজেই বিগ ব্যাংয়ের সঙ্গে শুরু হয়ে থাকতে পারে; উত্তপ্ত বিগ ব্যাংয়ের আগে মহাজাগতিক স্ফীতি থাকতে পারে; আমাদের মহাবিশ্ব পূর্ববর্তী সংকোচন থেকে ফিরে আসতে পারে; অথবা স্থানকাল এমন কোনো কোয়ান্টাম অবস্থা থেকে উদ্ভূত হতে পারে যেখানে আমাদের পরিচিত ‘আগে’ ও ‘পরে’ ধারণাই প্রযোজ্য নয়। কোনটি প্রকৃতির সত্য বর্ণনা, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার সম্ভবত এটাই যে প্রশ্নটি শুধু মহাবিশ্বের অতীত সম্পর্কে নয়; এটি সময় আসলে কী, সেই প্রশ্নও তোলে। আমরা সময়কে এমন একটি প্রবাহ হিসেবে অনুভব করি যার মধ্যে ঘটনাগুলো ঘটে। কিন্তু আধুনিক মহাকর্ষতত্ত্ব দেখায়, সময় মহাবিশ্বের গঠন থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো স্বাধীন বস্তু নয়। আর কোয়ান্টাম মহাকর্ষের সন্ধান ইঙ্গিত দেয় যে আরও মৌলিক স্তরে স্থান ও সময় নিজেরাই উদ্ভূত বৈশিষ্ট্য হতে পারে। যদি তা সত্য হয়, তাহলে মহাবিশ্বের “শুরু” বোঝার জন্য আমাদের দৈনন্দিন কারণ, সময় ও অস্তিত্বের ধারণাও নতুনভাবে ভাবতে হতে পারে।

মানুষ হাজার বছর ধরে জানতে চেয়েছে আকাশ, পৃথিবী এবং শেষ পর্যন্ত সমস্ত অস্তিত্ব কোথা থেকে এসেছে। আধুনিক বিজ্ঞান সেই প্রশ্নকে কল্পকাহিনি থেকে সরিয়ে পর্যবেক্ষণ, গণিত ও পরীক্ষাযোগ্য ধারণার জগতে নিয়ে এসেছে। আমরা আজ মহাবিশ্বের ইতিহাসের বিশাল অংশ পুনর্গঠন করতে পারি, তার বয়স অনুমান করতে পারি, তার শৈশবের আলো পর্যবেক্ষণ করতে পারি এবং কোটি কোটি বছর আগের ছায়াপথ দেখতে পারি। অথচ যতই প্রথম মুহূর্তের দিকে এগোই, ততই একটি গভীর অজানা সীমান্ত সামনে আসে।

সম্ভবত ভবিষ্যতের কোনো কোয়ান্টাম মহাকর্ষ তত্ত্ব, আরও নিখুঁত মহাজাগতিক পর্যবেক্ষণ অথবা এখনো কল্পনাও করা হয়নি এমন কোনো আবিষ্কার এই রহস্যের একটি পরীক্ষাযোগ্য উত্তর দেবে। আবার এমনও হতে পারে যে “বিগ ব্যাংয়ের আগে” প্রশ্নটির প্রকৃত সমাধান হবে বুঝতে পারা যে প্রকৃতির মৌলিক স্তরে ‘আগে’ শব্দটির অর্থই আমাদের ধারণার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। আপাতত এটুকুই নিশ্চিত—মহাবিশ্বের জন্মের সীমান্তে পৌঁছে বিজ্ঞান শুধু মহাকাশের ইতিহাস নয়, স্থান, সময়, কারণ এবং বাস্তবতার প্রকৃতি সম্পর্কেও তার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর একটির মুখোমুখি হয়েছে।