বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

সূর্যের মৃত্যু কীভাবে ঘটবে এবং তখন পৃথিবীর কী পরিণতি হবে? নক্ষত্রের শেষ জীবনের বিস্ময়কর ভবিষ্যৎ

  • Author: Admin
  • August 29, 2026
সূর্যের মৃত্যু কীভাবে ঘটবে এবং তখন পৃথিবীর কী পরিণতি হবে? নক্ষত্রের শেষ জীবনের বিস্ময়কর ভবিষ্যৎ
সূর্যের শেষ জীবনে পৃথিবীর সম্ভাব্য পরিণতি

সূর্যকে আমরা প্রতিদিন একই রকম দেখলেও এটি চিরস্থায়ী নয়। পৃথিবীর সমস্ত পরিচিত জীবনের প্রধান শক্তির উৎস এই নক্ষত্রেরও জন্ম হয়েছে, এটি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং একদিন এর বর্তমান জীবনের সমাপ্তি ঘটবে। তবে সূর্যের মৃত্যু কোনো আকস্মিক বিস্ফোরণ হবে না। এটি এমন একটি মহাজাগতিক পরিবর্তন, যা কয়েকশ কোটি বছর ধরে একের পর এক পর্যায় অতিক্রম করবে। সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সূর্য ক্রমে আরও উজ্জ্বল হবে, পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে, মহাসাগর হারিয়ে যাবে, পরে সূর্য বিশাল লাল দানবে পরিণত হবে এবং শেষ পর্যন্ত তার বাইরের স্তরগুলো মহাশূন্যে ছড়িয়ে দিয়ে একটি ক্ষুদ্র শ্বেত বামন হিসেবে থেকে যাবে।

সূর্যের বর্তমান বয়স প্রায় চারশ ষাট কোটি বছর। এটি এখন তার জীবনের তুলনামূলক স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে। সূর্যের কেন্দ্রে প্রচণ্ড চাপ ও প্রায় দেড় কোটি ডিগ্রি তাপমাত্রার পরিবেশে হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াস যুক্ত হয়ে হিলিয়াম তৈরি করছে। এই প্রক্রিয়ায় সামান্য পরিমাণ ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। সেই শক্তিই ধীরে ধীরে সূর্যের ভেতর দিয়ে বাইরে আসে এবং শেষ পর্যন্ত আলো ও তাপ হিসেবে মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে।

এই কেন্দ্রীয় পারমাণবিক সংযোজন শুধু সূর্যকে আলো দেয় না, সূর্যকে স্থিতিশীলও রাখে। সূর্যের বিপুল ভর তার সমস্ত পদার্থকে মহাকর্ষের কারণে কেন্দ্রের দিকে টেনে সংকুচিত করতে চায়। অন্যদিকে কেন্দ্রের উচ্চ তাপমাত্রা ও শক্তি থেকে তৈরি চাপ বাইরের দিকে কাজ করে। ভেতরের দিকে মহাকর্ষীয় সংকোচন এবং বাইরের দিকে চাপের এই ভারসাম্যের কারণেই সূর্য বর্তমানে স্থিতিশীল।

কিন্তু সূর্যের কেন্দ্রে হাইড্রোজেনের পরিমাণ অসীম নয়। প্রতি মুহূর্তে বিপুল পরিমাণ হাইড্রোজেন হিলিয়ামে রূপান্তরিত হচ্ছে। ফলে সময়ের সঙ্গে কেন্দ্রে হিলিয়ামের পরিমাণ বাড়ছে এবং হাইড্রোজেন কমছে। হিসাব অনুযায়ী সূর্য আরও প্রায় পাঁচশ কোটি বছর বর্তমান প্রধান জীবনপর্যায়ে থাকতে পারে। তবে তার অর্থ এই নয় যে পৃথিবী আরও পাঁচশ কোটি বছর বর্তমানের মতো বাসযোগ্য থাকবে।

বরং পৃথিবীর জন্য বিপদ শুরু হবে অনেক আগেই। সূর্যের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর কেন্দ্রের গঠন পরিবর্তিত হয়। কেন্দ্রে হিলিয়াম জমতে থাকলে কেন্দ্র আরও ঘন ও উত্তপ্ত হয়। এর ফলে হাইড্রোজেন সংযোজনের সামগ্রিক হার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় এবং সূর্যের দীপ্তিও বাড়তে থাকে। সূর্য জন্মের সময় বর্তমানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম উজ্জ্বল ছিল এবং ভবিষ্যতে এটি আরও উজ্জ্বল হবে।

প্রায় একশ কোটি বছরের মধ্যে সূর্যের ক্রমবর্ধমান উজ্জ্বলতা পৃথিবীর জলবায়ুর জন্য মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। সঠিক সময় পৃথিবীর ভবিষ্যৎ বায়ুমণ্ডল, মেঘ, কার্বনচক্র এবং অন্যান্য জটিল প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করলেও দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল অত্যন্ত কঠোর। বেশি সৌরশক্তি পৃথিবীর পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়াবে এবং মহাসাগর থেকে বাষ্পীভবন ত্বরান্বিত করবে।

পৃথিবী উষ্ণ হতে থাকলে বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়বে। জলীয় বাষ্প নিজেই শক্তিশালী উষ্ণতা-ধারণকারী গ্যাস। ফলে বেশি তাপ থেকে বেশি জলীয় বাষ্প, আবার বেশি জলীয় বাষ্প থেকে আরও বেশি তাপ আটকে যাওয়ার একটি প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। একপর্যায়ে পৃথিবী এমন অবস্থায় পৌঁছাতে পারে যেখানে বিশাল পরিমাণ পানি বায়ুমণ্ডলে উঠে যাবে এবং গ্রহটির দীর্ঘমেয়াদি জলচক্র ভেঙে পড়বে।

বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে পৌঁছানো পানির অণু সূর্যের অতিবেগুনি বিকিরণে ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে বিভক্ত হতে পারে। অত্যন্ত হালকা হাইড্রোজেন ধীরে ধীরে মহাশূন্যে পালিয়ে যাবে। অর্থাৎ পৃথিবী শুধু মহাসাগরের পানি বাষ্পে পরিণত করবে না, দীর্ঘ সময়ে সেই পানির একটি অংশ স্থায়ীভাবেই হারিয়ে ফেলবে।

এর আগেও জীবমণ্ডলে বড় পরিবর্তন ঘটবে। বর্ধিত তাপমাত্রা এবং কার্বনচক্রের পরিবর্তনের কারণে বায়ুমণ্ডলে উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজনীয় কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা কমে যেতে পারে। প্রথমে জটিল উদ্ভিদ, পরে আরও সহনশীল আলোকসংশ্লেষী জীব সমস্যায় পড়বে। খাদ্যজাল ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণিজগতও বিলুপ্তির দিকে যাবে। শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর কিছু কঠিন পরিবেশে অণুজীব টিকে থাকতে পারলেও ক্রমবর্ধমান সৌর বিকিরণ তাদের জন্যও সীমা তৈরি করবে।

অর্থাৎ সূর্য যখন সত্যিকার অর্থে মৃত্যুর কাছাকাছিও পৌঁছায়নি, তার বহু আগেই পৃথিবী মানুষের তো বটেই, অধিকাংশ জীবনের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে যেতে পারে। সূর্যের লাল দানব পর্যায় পর্যন্ত পৃথিবীর বর্তমান জীবমণ্ডল টিকে থাকবে—এমন কোনো বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা নেই।

প্রায় পাঁচশ কোটি বছর পরে সূর্যের কেন্দ্রের ব্যবহারযোগ্য হাইড্রোজেন এতটাই কমে যাবে যে সেখানে বর্তমান ধরনের হাইড্রোজেন সংযোজন আর প্রধান শক্তির উৎস হিসেবে চলতে পারবে না। তখন হিলিয়ামসমৃদ্ধ কেন্দ্র নিজের মহাকর্ষে সংকুচিত হতে শুরু করবে। সংকোচনের ফলে কেন্দ্রের তাপমাত্রা আরও বাড়বে। একই সময়ে কেন্দ্রের চারপাশের একটি স্তরে হাইড্রোজেনের সংযোজন অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠবে।

এই পরিবর্তনের কারণে সূর্যের বাইরের স্তরগুলো প্রচণ্ডভাবে প্রসারিত হবে। পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বর্তমানের তুলনায় কমলেও মোট আকার ও দীপ্তি বিপুলভাবে বৃদ্ধি পাবে। সূর্য তখন লাল দানব নক্ষত্রে পরিণত হবে। বর্তমানের পরিচিত হলুদাভ সূর্যের পরিবর্তে সৌরজগতের কেন্দ্রে থাকবে এক বিশাল, ফুলে ওঠা লালচে নক্ষত্র।

লাল দানব পর্যায়ে সূর্যের ব্যাস বর্তমানের তুলনায় শতগুণের কাছাকাছি বা তারও বেশি হতে পারে। এর বাইরের আবরণ এত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে যে বুধ নিশ্চিতভাবেই ধ্বংস হবে এবং শুক্রও গ্রাস হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। পৃথিবীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল।

একদিকে সূর্য লাল দানবে পরিণত হওয়ার সময় প্রচুর ভর হারাবে। নক্ষত্রের ভর কমে গেলে তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণও দুর্বল হবে। ফলে পৃথিবীর কক্ষপথ বর্তমান অবস্থান থেকে কিছুটা বাইরে সরে যেতে পারে। প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এই কক্ষপথের সম্প্রসারণ পৃথিবীকে সূর্যের বাইরের আবরণ থেকে বাঁচিয়ে দিতে পারে।

কিন্তু সমস্যা হলো, পৃথিবী তখন বিশাল লাল দানবের খুব কাছাকাছি থাকবে। সূর্যের প্রসারিত আবরণের সঙ্গে পৃথিবীর মহাকর্ষীয় মিথস্ক্রিয়া, জোয়ারজনিত প্রভাব এবং বাইরের সৌর পদার্থের সঙ্গে ঘর্ষণ পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে শক্তি সরিয়ে নিতে পারে। ফলে পৃথিবী আবার সূর্যের দিকে সর্পিলভাবে এগিয়ে যেতে পারে। আধুনিক নাক্ষত্রিক বিবর্তনের অনেক হিসাব অনুযায়ী পৃথিবী শেষ পর্যন্ত লাল দানব সূর্যের মধ্যে গ্রাস হয়ে যাওয়ার উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা বহন করে। তবে সূর্যের ভবিষ্যৎ ভরক্ষয়ের সঠিক হারসহ বিভিন্ন অনিশ্চয়তার কারণে পৃথিবীর চূড়ান্ত কক্ষপথ নিয়ে কিছু বৈজ্ঞানিক অনিশ্চয়তা রয়েছে।

পৃথিবী যদি কোনোভাবে সরাসরি গ্রাস হওয়া থেকেও বেঁচে যায়, তাতেও পরিচিত পৃথিবীর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। এর বহু আগেই মহাসাগর বিলীন হবে, বায়ুমণ্ডল মারাত্মকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হবে এবং পৃষ্ঠের শিলা অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে গলতে শুরু করবে। বর্তমানের নীল পৃথিবী তখন হবে শুষ্ক, দগ্ধ, জীবহীন এবং সম্ভবত আংশিক গলিত একটি শিলাময় জগৎ।

লাল দানব পর্যায়ের ভেতরেও সূর্যের কেন্দ্রে নাটকীয় ঘটনা ঘটবে। সংকুচিত হিলিয়াম কেন্দ্রের তাপমাত্রা একসময় প্রায় দশ কোটি ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছালে হিলিয়ামের নিউক্লিয়াস সংযুক্ত হয়ে প্রধানত কার্বন ও অক্সিজেন তৈরি করতে শুরু করবে। সূর্যের মতো নক্ষত্রে এই হিলিয়াম সংযোজনের সূচনা অত্যন্ত দ্রুত একটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে ঘটতে পারে, যাকে হিলিয়াম ঝলক বলা হয়।

তবে এই ঘটনা সূর্যকে সুপারনোভার মতো বিস্ফোরিত করবে না। সূর্যের ভর সেই ধরনের মহাবিস্ফোরণের জন্য যথেষ্ট নয়। হিলিয়াম সংযোজন শুরু হওয়ার পর সূর্য কিছু সময়ের জন্য তুলনামূলক নতুন ভারসাম্যে পৌঁছাবে। কিন্তু কেন্দ্রের হিলিয়ামও একসময় শেষ হয়ে যাবে। তখন কেন্দ্রে মূলত কার্বন ও অক্সিজেন জমে থাকবে।

সূর্যের ভর এত বেশি নয় যে তার কেন্দ্রে কার্বনকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে সংযুক্ত করে আরও ভারী মৌল তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা ও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই বৃহৎ নক্ষত্রের মতো সূর্য একের পর এক ভারী মৌল তৈরি করে লোহা পর্যন্ত পৌঁছাবে না। এখানেই সূর্যের সঙ্গে সুপারনোভা হওয়া বৃহৎ নক্ষত্রগুলোর ভবিষ্যতের মৌলিক পার্থক্য।

শেষ জীবনে সূর্য আবারও ব্যাপকভাবে ফুলে উঠবে এবং অত্যন্ত শক্তিশালী নাক্ষত্রিক বাতাসের মাধ্যমে বাইরের স্তরের পদার্থ মহাশূন্যে ছড়িয়ে দিতে থাকবে। কয়েকটি পর্যায়ে এই ভরক্ষয় এতটাই তীব্র হবে যে সূর্যের বাইরের আবরণের বড় অংশ নক্ষত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।

মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়া সেই গ্যাস সূর্যের উত্তপ্ত অবশিষ্ট কেন্দ্রের বিকিরণে আলোকিত হতে পারে। ফলে কেন্দ্রীয় মৃতপ্রায় নক্ষত্রকে ঘিরে তৈরি হবে বিস্তৃত উজ্জ্বল গ্যাসীয় আবরণ। জ্যোতির্বিজ্ঞানে এ ধরনের গঠনকে গ্রহীয় নীহারিকা বলা হয়। নামের মধ্যে গ্রহ থাকলেও এর সঙ্গে গ্রহ তৈরির সরাসরি সম্পর্ক নেই; ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণের কারণে এই নামটি প্রচলিত হয়েছে।

এই পর্যায়টি মহাজাগতিক সময়ের হিসাবে খুব দীর্ঘ নয়। ছড়িয়ে পড়া গ্যাস ক্রমে আরও দূরে চলে যাবে এবং আন্তঃনাক্ষত্রিক পরিবেশের সঙ্গে মিশে যাবে। সূর্যের যে অংশটি অবশিষ্ট থাকবে সেটি হবে মূলত কার্বন ও অক্সিজেনসমৃদ্ধ অত্যন্ত ঘন কেন্দ্র—একটি শ্বেত বামন

এই শ্বেত বামনের আকার পৃথিবীর কাছাকাছি হতে পারে, অথচ এর ভর সূর্যের বর্তমান ভরের একটি বড় অংশের সমান থাকবে। ফলে এর পদার্থের ঘনত্ব হবে অকল্পনীয়। সেখানে সাধারণ গ্যাসীয় চাপের পরিবর্তে কোয়ান্টাম প্রকৃতির ইলেকট্রনজনিত চাপ মহাকর্ষের বিরুদ্ধে অবশিষ্ট নক্ষত্রটিকে ধরে রাখবে।

শ্বেত বামনের ভেতরে আর সূর্যের বর্তমান কেন্দ্রের মতো স্থায়ী পারমাণবিক সংযোজন চলবে না। এটি প্রথমে অত্যন্ত উত্তপ্ত থাকবে এবং নিজের সঞ্চিত তাপ মহাশূন্যে বিকিরণ করবে। তারপর কোটি কোটি নয়, বরং অকল্পনীয় দীর্ঘ সময় ধরে এটি ক্রমে ঠান্ডা ও ম্লান হতে থাকবে।

তাত্ত্বিকভাবে পর্যাপ্ত সময় পেলে শ্বেত বামন শেষ পর্যন্ত এত ঠান্ডা হয়ে যেতে পারে যে তাকে কৃষ্ণ বামন বলা যাবে। কিন্তু মহাবিশ্বের বর্তমান বয়স সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। তাই মহাবিশ্বে এখনো প্রকৃত কৃষ্ণ বামন থাকার কথা নয়। সূর্যের ক্ষেত্রেও এই চূড়ান্ত শীতল অবস্থায় পৌঁছাতে বর্তমান মহাবিশ্বের বয়সের তুলনায় বহু গুণ দীর্ঘ সময় লাগবে।

সূর্যের মৃত্যু শুধু পৃথিবীর নয়, পুরো সৌরজগতের বর্তমান বিন্যাসকেই বদলে দেবে। সূর্য যখন ভর হারাবে, তখন মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুনের মতো টিকে যাওয়া গ্রহগুলোর কক্ষপথ আরও দূরে সরে যেতে পারে। তাদের ওপর সূর্যের আলো ও তাপের প্রকৃতিও নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হবে। লাল দানব পর্যায়ে বর্তমানে বরফে আচ্ছাদিত কিছু দূরবর্তী জগৎ সাময়িকভাবে উষ্ণ হতে পারে।

কিন্তু এই সম্ভাব্য উষ্ণতা স্থায়ী হবে না। সূর্যের বাইরের স্তর হারিয়ে গেলে এবং শ্বেত বামন তৈরি হলে সৌরজগত আবার অন্ধকার ও শীতলতার দিকে যাবে। যে সৌরজগত একসময় উজ্জ্বল সূর্যকে কেন্দ্র করে প্রাণবন্ত ছিল, সেটি শেষ পর্যন্ত একটি ক্ষুদ্র, ম্লান নাক্ষত্রিক অবশেষকে ঘিরে থাকা শীতল জগৎগুলোর ব্যবস্থায় পরিণত হবে।

মানবজাতির দৃষ্টিকোণ থেকে অবশ্য পাঁচশ কোটি বছর প্রায় কল্পনার অতীত। এমনকি পৃথিবীর প্রাকৃতিক বাসযোগ্যতার অবসানও সূর্যের প্রকৃত মৃত্যুর অনেক আগে ঘটবে। যদি কোনো বুদ্ধিমান সভ্যতা এত দীর্ঘ সময় টিকে থাকে, তবে তাকে পৃথিবীর বাইরে আশ্রয় খুঁজতে হবে। প্রথম দিকে সৌরজগতের দূরবর্তী অঞ্চলে স্থানান্তর কিছু সময়ের সমাধান দিতে পারে, কিন্তু সূর্যের সম্পূর্ণ বিবর্তনের সময়সীমা বিবেচনা করলে শেষ পর্যন্ত অন্য নক্ষত্রের আশপাশে যাওয়াই দীর্ঘস্থায়ী পথ হতে পারে।

সূর্যের মৃত্যু তাই একটি দিনের ঘটনা নয়; এটি কয়েকশ কোটি বছরের দীর্ঘ নাক্ষত্রিক বিবর্তনের পরিণতি। প্রথমে সূর্যের উজ্জ্বলতা ধীরে ধীরে বাড়বে, পৃথিবীর জলবায়ু ভেঙে পড়বে, মহাসাগর হারিয়ে যাবে এবং জীবন বিলুপ্ত হবে। তারপর কেন্দ্রীয় হাইড্রোজেন ফুরিয়ে সূর্য লাল দানবে পরিণত হবে। বুধ ও শুক্র ধ্বংস হবে, আর পৃথিবী হয় সূর্যের মধ্যে গ্রাস হবে, নয়তো কোনোভাবে বাইরে থেকে গেলেও একটি দগ্ধ ও মৃত শিলাময় অবশেষে পরিণত হবে।

এরপর হিলিয়াম সংযোজন, ব্যাপক ভরক্ষয় এবং বাইরের স্তর মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে সূর্যের উজ্জ্বল নাক্ষত্রিক জীবনের সমাপ্তি ঘটবে। শেষে থাকবে পৃথিবীর আকারের কাছাকাছি একটি ঘন শ্বেত বামন এবং তার চারদিকে পরিবর্তিত, শীতল সৌরজগত। যে সূর্যের আলোয় পৃথিবীর সমুদ্র, বায়ুমণ্ডল ও জীবনের ইতিহাস গড়ে উঠেছে, সেই সূর্যই অত্যন্ত দূর ভবিষ্যতে পৃথিবীর বাসযোগ্যতার অবসানের প্রধান কারণ হয়ে উঠবে। নক্ষত্রের জন্ম ও মৃত্যুর মহাজাগতিক নিয়মে এটাই আমাদের সৌরজগতের অনিবার্য ভবিষ্যৎ।