বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

অ্যান্টিবায়োটিক কীভাবে ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে এবং ভাইরাসের বিরুদ্ধে কেন কাজ করে না?

  • Author: Admin
  • August 29, 2026
অ্যান্টিবায়োটিক কীভাবে ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে এবং ভাইরাসের বিরুদ্ধে কেন কাজ করে না?
অ্যান্টিবায়োটিক কীভাবে ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে

অ্যান্টিবায়োটিক আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এমন একটি আবিষ্কার, যা মানুষের মৃত্যুর কারণ ও গড় আয়ু—দুটোকেই গভীরভাবে বদলে দিয়েছে। একসময় সামান্য ক্ষত থেকে তৈরি সংক্রমণ, নিউমোনিয়া, যক্ষ্মা কিংবা অস্ত্রোপচারের পর ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ মানুষের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারত। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে এসব ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের অনেকগুলোকেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক সম্পর্কে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি সব ধরনের জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করে না। অ্যান্টিবায়োটিকের প্রধান লক্ষ্য ব্যাকটেরিয়া; ভাইরাসের বিরুদ্ধে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়। এর কারণ বুঝতে হলে প্রথমে ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের মৌলিক পার্থক্য এবং অ্যান্টিবায়োটিকের আক্রমণের লক্ষ্যগুলো বুঝতে হয়।

ব্যাকটেরিয়া হলো অতি ক্ষুদ্র এককোষী জীব। মানুষের কোষের তুলনায় এর গঠন অপেক্ষাকৃত সরল হলেও একটি ব্যাকটেরিয়া নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় অনেক কাজ নিজেই করতে পারে। তার নিজস্ব কোষঝিল্লি থাকে, অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকটেরিয়ার কোষপ্রাচীর থাকে, প্রোটিন তৈরির জন্য রাইবোসোম থাকে, বংশগত তথ্য বহনকারী ডিএনএ থাকে এবং শক্তি উৎপাদন ও রাসায়নিক বিক্রিয়া পরিচালনার নিজস্ব ব্যবস্থা থাকে। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে অনেক ব্যাকটেরিয়া নিজেই বৃদ্ধি পায় এবং বিভাজনের মাধ্যমে সংখ্যা বাড়াতে পারে।

অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতার মূল রহস্য এখানেই। ব্যাকটেরিয়ার এমন কিছু গঠন ও জৈবিক প্রক্রিয়া রয়েছে, যেগুলো মানুষের কোষের তুলনায় যথেষ্ট আলাদা। ফলে এমন ওষুধ তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, যা ব্যাকটেরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যবস্থাকে আঘাত করবে কিন্তু যথাযথ মাত্রায় মানুষের কোষের তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতি করবে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ লক্ষ্য হলো রোগীর শরীরকে বিষাক্ত করে জীবাণু মারা নয়; বরং জীবাণুর এমন দুর্বল জায়গায় আঘাত করা, যা মানুষের কোষে নেই অথবা উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন।

অ্যান্টিবায়োটিকের সবচেয়ে পরিচিত আক্রমণের লক্ষ্যগুলোর একটি হলো ব্যাকটেরিয়ার কোষপ্রাচীর। অনেক ব্যাকটেরিয়ার বাইরের দিকে শক্তিশালী একটি প্রাচীর থাকে, যার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পেপটিডোগ্লাইকান। এই প্রাচীর ব্যাকটেরিয়াকে নির্দিষ্ট আকৃতি দেয় এবং পরিবেশগত চাপের মধ্যেও কোষটিকে অক্ষত রাখতে সাহায্য করে। মানুষের কোষে এমন পেপটিডোগ্লাইকান কোষপ্রাচীর নেই। তাই এটি ওষুধের জন্য অসাধারণ একটি নির্বাচিত লক্ষ্য।

পেনিসিলিনজাতীয় এবং সংশ্লিষ্ট কিছু অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার নতুন কোষপ্রাচীর তৈরির গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বাধাগ্রস্ত করে। ব্যাকটেরিয়া যখন বৃদ্ধি পায় বা বিভাজিত হয়, তখন তাকে নতুন প্রাচীর নির্মাণ করতে হয়। অ্যান্টিবায়োটিক সেই নির্মাণব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ উৎসেচকের কাজ বন্ধ করে দিলে প্রাচীর দুর্বল হয়ে যায়। ব্যাকটেরিয়ার ভেতর ও বাইরের তরলচাপের ভারসাম্যের কারণে দুর্বল কোষটি শেষ পর্যন্ত ভেঙে যেতে পারে। তাই এখানে অ্যান্টিবায়োটিককে সরাসরি কোনো বিষ হিসেবে কল্পনা করার চেয়ে ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল নির্মাণ বন্ধ করে দেওয়া একটি রাসায়নিক অস্ত্র হিসেবে ভাবা অধিক যথার্থ।

অন্য একদল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার প্রোটিন তৈরির ব্যবস্থা আক্রমণ করে। জীবিত কোষের প্রায় প্রতিটি কাজেই প্রোটিন অপরিহার্য। বিভিন্ন উৎসেচক, গঠনমূলক উপাদান এবং বিপাকীয় ব্যবস্থার জন্য নতুন প্রোটিন তৈরি করতে হয়। ব্যাকটেরিয়া এই কাজ করে রাইবোসোম নামের ক্ষুদ্র আণবিক যন্ত্রের মাধ্যমে। মানুষের কোষেও রাইবোসোম রয়েছে, কিন্তু ব্যাকটেরিয়ার রাইবোসোমের গঠন মানুষের কোষের রাইবোসোম থেকে যথেষ্ট আলাদা।

এই পার্থক্য কাজে লাগিয়ে কিছু অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার রাইবোসোমের নির্দিষ্ট অংশে যুক্ত হয়। ফলে জিনে থাকা নির্দেশনা থেকে সঠিকভাবে প্রোটিন তৈরি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কোনো কোনো ওষুধ নতুন প্রোটিনের শৃঙ্খল তৈরি বন্ধ করে দেয়, আবার কোনোটি নির্দেশনা পাঠের নির্ভুলতা নষ্ট করতে পারে। ফলাফল হলো ব্যাকটেরিয়া তার স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন আর যথাযথভাবে তৈরি করতে পারে না। পরিস্থিতি অনুসারে এতে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি থেমে যায় অথবা সেটি মারা যায়।

অ্যান্টিবায়োটিকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ ও বংশবৃদ্ধির ব্যবস্থা। ব্যাকটেরিয়া বিভাজনের আগে তার বংশগত উপাদান অনুলিপি করে। এই প্রক্রিয়ায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উৎসেচক কাজ করে। কিছু অ্যান্টিবায়োটিক এসব উৎসেচকের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ সঠিকভাবে অনুলিপি বা রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হয় না এবং তার বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হয়।

আবার কিছু অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার আরএনএ তৈরির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করে। ডিএনএতে সংরক্ষিত তথ্য সরাসরি অধিকাংশ কোষীয় কাজ পরিচালনা করে না; প্রথমে সেই তথ্যের নির্দিষ্ট অংশ থেকে আরএনএ তৈরি হয় এবং পরে সেই নির্দেশনার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় প্রোটিন উৎপন্ন হয়। কোনো ওষুধ যদি ব্যাকটেরিয়ার এই তথ্য স্থানান্তরের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বন্ধ করে দেয়, তাহলে জীবাণুটি কার্যত তার জিনগত নির্দেশনা ব্যবহার করার ক্ষমতা হারায়।

আরেক ধরনের আক্রমণ হয় ব্যাকটেরিয়ার বিপাকীয় প্রক্রিয়ায়। কিছু ব্যাকটেরিয়াকে বেঁচে থাকা ও বংশবৃদ্ধির জন্য নির্দিষ্ট জৈব পদার্থ নিজের শরীরেই তৈরি করতে হয়। ফলিক অম্ল তৈরির পথ এর একটি পরিচিত উদাহরণ। মানুষের শরীর খাদ্য থেকে প্রয়োজনীয় ফলেট গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু বহু ব্যাকটেরিয়াকে সংশ্লিষ্ট যৌগ নিজেই তৈরি করতে হয়। কিছু অ্যান্টিবায়োটিক এই রাসায়নিক উৎপাদনপথের নির্দিষ্ট উৎসেচক বন্ধ করে দেয়। ফলে ব্যাকটেরিয়া ডিএনএসহ গুরুত্বপূর্ণ অণু তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানের সংকটে পড়ে এবং তার বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।

সব অ্যান্টিবায়োটিক আবার একইভাবে ব্যাকটেরিয়া হত্যা করে না। কিছু অ্যান্টিবায়োটিককে এমনভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়, যেগুলো সরাসরি ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলতে পারে। অন্যদিকে কিছু ওষুধ প্রধানত ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ও বংশবৃদ্ধি থামিয়ে দেয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে রোগীর রোগপ্রতিরোধব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অ্যান্টিবায়োটিক শত্রুর সংখ্যা বাড়ার পথ বন্ধ করে দিলে শ্বেত রক্তকণিকা এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অবশিষ্ট ব্যাকটেরিয়া অপসারণ করতে পারে। তাই অ্যান্টিবায়োটিক ও মানুষের রোগপ্রতিরোধব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।

এখানেই ভাইরাসের ক্ষেত্রে মৌলিক সমস্যা দেখা দেয়। ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার ক্ষুদ্র সংস্করণ নয়। ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস জীববৈজ্ঞানিকভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সত্তা। সাধারণ একটি ভাইরাসে মূলত বংশগত উপাদান—ডিএনএ অথবা আরএনএ—এবং তাকে ঘিরে থাকা প্রোটিনের আবরণ থাকে। অনেক ভাইরাসের বাইরের দিকে অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় আবরণও থাকতে পারে। কিন্তু ভাইরাসের ব্যাকটেরিয়ার মতো স্বাধীন পূর্ণাঙ্গ কোষীয় ব্যবস্থা নেই।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভাইরাস সাধারণত নিজের শক্তিতে স্বাধীনভাবে বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। তাকে একটি জীবিত পোষক কোষে প্রবেশ করতে হয়। মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটানো ভাইরাস মানুষের নির্দিষ্ট কোষে প্রবেশ করার পর সেই কোষের নিজস্ব জৈবিক যন্ত্রপাতিকে ব্যবহার করে নতুন ভাইরাস তৈরি করায়। অর্থাৎ ভাইরাস অনেকটা এমন এক ক্ষুদ্র জিনগত নির্দেশনার প্যাকেট, যা কোষের ভেতরে ঢুকে কোষটির উৎপাদনব্যবস্থাকে নিজের প্রতিলিপি তৈরির কাজে লাগায়।

এই কারণেই ব্যাকটেরিয়ার কোষপ্রাচীর লক্ষ্যকারী অ্যান্টিবায়োটিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর নয়। ভাইরাসের পেপটিডোগ্লাইকান কোষপ্রাচীরই নেই। যে কাঠামোকে লক্ষ্য করে ওষুধটি কাজ করার কথা, ভাইরাসে সেই লক্ষ্য অনুপস্থিত। ফলে পেনিসিলিনজাতীয় ওষুধ দিয়ে সাধারণ ভাইরাসের সংক্রমণ সারানোর চেষ্টা অনেকটা এমন একটি তালায় চাবি ব্যবহারের মতো, যেখানে সেই ধরনের তালাই নেই।

একই সমস্যা ব্যাকটেরিয়ার রাইবোসোম লক্ষ্যকারী অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রেও ঘটে। ভাইরাসের নিজস্ব কার্যকর প্রোটিন তৈরির রাইবোসোম নেই। ভাইরাস মানুষের কোষে প্রবেশ করে সেই কোষের রাইবোসোম ব্যবহার করে নিজের প্রোটিন তৈরি করায়। তাই ব্যাকটেরিয়ার বিশেষ রাইবোসোম লক্ষ্য করে তৈরি ওষুধের সামনে ভাইরাসে আক্রমণ করার মতো একই লক্ষ্য থাকে না। আর মানুষের রাইবোসোম নির্বিচারে বন্ধ করে দিলে ভাইরাসের পাশাপাশি মানুষের সুস্থ কোষও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ব্যাকটেরিয়ার বিপাকীয় পথ লক্ষ্যকারী অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। ভাইরাসের স্বাধীন বিপাকীয় ব্যবস্থা অত্যন্ত সীমিত বা অনুপস্থিত। তার নিজের খাবার হজম, শক্তি উৎপাদন এবং অসংখ্য জৈব অণু তৈরির জন্য ব্যাকটেরিয়ার মতো স্বয়ংসম্পূর্ণ রাসায়নিক কারখানা নেই। সে পোষক কোষের ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ফলে ব্যাকটেরিয়ার নির্দিষ্ট বিপাকীয় পথ বন্ধ করে দেওয়া ওষুধ ভাইরাসকে একইভাবে আঘাত করতে পারে না।

এ কারণেই সর্দি, অধিকাংশ সাধারণ ভাইরাসজনিত গলাব্যথা, ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং অন্যান্য বহু ভাইরাসজনিত অসুস্থতায় অ্যান্টিবায়োটিক মূল ভাইরাসকে ধ্বংস করতে পারে না। তবে বিষয়টি এখানে কিছুটা সূক্ষ্ম। কোনো ব্যক্তি প্রথমে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর তার শরীরে দ্বিতীয় পর্যায়ের ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ তৈরি হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে, কোনো ভাইরাসজনিত শ্বাসতন্ত্রের অসুস্থতার পর কিছু রোগীর ব্যাকটেরিয়াজনিত নিউমোনিয়া দেখা দিতে পারে। তখন চিকিৎসক ব্যাকটেরিয়াজনিত জটিলতার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন। এতে কিন্তু মূল ভাইরাসের চিকিৎসা হচ্ছে না; ভাইরাসের সুযোগে তৈরি হওয়া ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের চিকিৎসা হচ্ছে।

ভাইরাসের বিরুদ্ধে তাই প্রয়োজন হয় ভিন্ন ধরনের ওষুধ, যেগুলোকে ভাইরাসবিরোধী ওষুধ বলা হয়। এসব ওষুধের লক্ষ্য ভাইরাসের জীবনচক্রের নির্দিষ্ট ধাপ। কোনো ওষুধ ভাইরাসকে কোষে প্রবেশ করতে বাধা দিতে পারে, কোনোটি ভাইরাসের বংশগত উপাদানের অনুলিপি তৈরির প্রক্রিয়া ব্যাহত করতে পারে, কোনোটি ভাইরাসের বিশেষ উৎসেচক বন্ধ করতে পারে, আবার কোনোটি নতুন ভাইরাস কণিকার পরিপক্বতা বা আক্রান্ত কোষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। অর্থাৎ ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর ওষুধ তৈরি করতে হলে ব্যাকটেরিয়ার লক্ষ্য নয়, ভাইরাসের নিজস্ব দুর্বলতা খুঁজে বের করতে হয়।

অ্যান্টিবায়োটিক ভাইরাসে কাজ না করলেও ভাইরাসজনিত রোগে অপ্রয়োজনীয়ভাবে এগুলো গ্রহণ করার একটি বড় ক্ষতি রয়েছে। সেটি হলো অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক্ষমতা। মানুষের শরীরের বিভিন্ন স্থানে বিপুলসংখ্যক ব্যাকটেরিয়া স্বাভাবিকভাবেই বসবাস করে। এদের অনেকেই ক্ষতিকর নয়, বরং অন্ত্রসহ বিভিন্ন অঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করলে ওষুধ ভাইরাসকে কিছু করতে না পারলেও শরীরের ব্যাকটেরিয়াগুলোকে নির্বাচনী চাপের মধ্যে ফেলে।

ব্যাকটেরিয়ার কোনো জনগোষ্ঠীতে স্বাভাবিক জিনগত পরিবর্তনের কারণে কিছু সদস্য নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে বেশি সহনশীল হতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিক সংবেদনশীল ব্যাকটেরিয়াগুলোকে সরিয়ে দিলে প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াগুলো বেঁচে থাকার বাড়তি সুযোগ পায়। তারা পরে বংশবৃদ্ধি করে সংখ্যায় বাড়তে পারে। ব্যাকটেরিয়া আবার কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যে প্রতিরোধক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত জিনগত উপাদান আদান-প্রদানও করতে পারে। এভাবে সময়ের সঙ্গে এমন ব্যাকটেরিয়া তৈরি ও ছড়িয়ে পড়তে পারে, যাদের বিরুদ্ধে আগে কার্যকর ওষুধ আর যথেষ্ট কাজ করে না।

এটি শুধু যে ব্যক্তি অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করছেন তাঁর সমস্যা নয়। প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া মানুষ থেকে মানুষে, চিকিৎসাকেন্দ্রে, পরিবেশে এবং বিভিন্ন পথে ছড়িয়ে বৃহত্তর জনস্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। একসময় সহজে চিকিৎসাযোগ্য কোনো সংক্রমণের জন্য তখন আরও শক্তিশালী, ব্যয়বহুল বা বেশি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্ত ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কার্যকর ওষুধের বিকল্প অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ে।

অ্যান্টিবায়োটিকের অযথা ব্যবহার শরীরের স্বাভাবিক অণুজীবসমাজের ভারসাম্যও পরিবর্তন করতে পারে। মানুষের অন্ত্র, ত্বক, মুখ এবং শরীরের অন্যান্য অংশে বিপুলসংখ্যক উপকারী বা নিরীহ অণুজীব বসবাস করে। বিস্তৃত পরিসরে কাজ করা কোনো অ্যান্টিবায়োটিক রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি এই স্বাভাবিক ব্যাকটেরিয়ার অংশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ফলে ডায়রিয়া, নির্দিষ্ট অণুজীবের অতিবৃদ্ধি কিংবা অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিকের বমিভাব, অ্যালার্জিজনিত প্রতিক্রিয়া এবং ওষুধভেদে অন্যান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হতে পারে।

আরেকটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ শুরু করার পর উপসর্গ কমে গেলেই নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা, মাত্রা পরিবর্তন করা অথবা ভবিষ্যতের জন্য কিছু ওষুধ রেখে দেওয়া নিরাপদ। আবার অন্য কারও একই ধরনের উপসর্গ দেখলে নিজের অবশিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক তাকে দেওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ। একই ধরনের জ্বর, কাশি বা গলাব্যথার পেছনে সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণ থাকতে পারে। কোন অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন, আদৌ প্রয়োজন কি না, কত মাত্রায় এবং কতদিন ব্যবহার করতে হবে—এসব সিদ্ধান্ত রোগ, জীবাণু, রোগীর অবস্থা এবং চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে।

এমনকি সব ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধেও একটি অ্যান্টিবায়োটিক সমানভাবে কাজ করে না। ব্যাকটেরিয়ার কোষপ্রাচীরের গঠন, ওষুধ প্রবেশের ক্ষমতা, নির্দিষ্ট উৎসেচকের উপস্থিতি, প্রতিরোধী জিন এবং আরও অনেক বৈশিষ্ট্যের কারণে ওষুধের কার্যকারিতা পরিবর্তিত হয়। গুরুতর সংক্রমণের ক্ষেত্রে কোন ব্যাকটেরিয়া দায়ী এবং কোন অ্যান্টিবায়োটিক তার বিরুদ্ধে কার্যকর হতে পারে তা নির্ধারণের জন্য নমুনা পরীক্ষা ও ওষুধ-সংবেদনশীলতা যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অর্থাৎ “অ্যান্টিবায়োটিক” একটি একক সর্বজনীন জীবাণুনাশক নয়; এটি বিভিন্ন নির্দিষ্ট জৈবিক লক্ষ্যকে আক্রমণকারী বহু ধরনের ওষুধের সমষ্টি।

ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের পার্থক্যটি তাই শুধু পাঠ্যবইয়ের শ্রেণিবিন্যাস নয়; চিকিৎসার সঠিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রয়েছে এই পার্থক্য। ব্যাকটেরিয়ার নিজস্ব কোষীয় কাঠামো, রাইবোসোম, বিপাকীয় ব্যবস্থা এবং বংশবৃদ্ধির যন্ত্রপাতি থাকায় অ্যান্টিবায়োটিক সেগুলোর নির্দিষ্ট অংশকে লক্ষ্য করতে পারে। বিপরীতে ভাইরাস পোষক কোষের ভেতরে প্রবেশ করে সেই কোষের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে নিজের সংখ্যা বাড়ায় এবং ব্যাকটেরিয়ার বহু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য তার মধ্যে অনুপস্থিত।

অ্যান্টিবায়োটিকের সাফল্যের মূল কারণ তাই এর শক্তি নয়, বরং এর নির্ভুল লক্ষ্য নির্বাচন। একটি কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার এমন কোনো অপরিহার্য ব্যবস্থাকে আঘাত করে, যা মানুষের কোষে অনুপস্থিত অথবা যথেষ্ট ভিন্ন। ভাইরাসে সেই লক্ষ্যগুলো না থাকায় একই অস্ত্র সেখানে ব্যর্থ হয়। আর এই বৈজ্ঞানিক সত্যটি বোঝা অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার কমানো, প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার ঠেকানো এবং ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকগুলোকে সংরক্ষণ করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।


You may also like