বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কেন শুরু হয়েছিল? সাম্রাজ্যবাদ, জাতীয়তাবাদ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও ইউরোপের জোটব্যবস্থার ইতিহাস

Series: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস ও বদলে যাওয়া পৃথিবী

  • Author: Admin
  • August 27, 2026
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কেন শুরু হয়েছিল? সাম্রাজ্যবাদ, জাতীয়তাবাদ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও ইউরোপের জোটব্যবস্থার ইতিহাস
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কেন শুরু হয়েছিল?

বিশ শতকের শুরুতে ইউরোপকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারত, মহাদেশটি মানবসভ্যতার এক অসাধারণ সমৃদ্ধ যুগ অতিক্রম করছে। শিল্পবিপ্লবের প্রভাবে উৎপাদন বেড়েছে, রেলপথ ও টেলিগ্রাফ দূরত্ব কমিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিস্তৃত হয়েছে এবং লন্ডন, প্যারিস, বার্লিন ও ভিয়েনার মতো শহর আধুনিকতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। অথচ এই সমৃদ্ধির আড়ালেই ইউরোপ ধীরে ধীরে এমন একটি রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যবস্থায় আটকে যাচ্ছিল, যেখানে একটি বড় সংকট পুরো মহাদেশকে যুদ্ধে টেনে নেওয়ার ক্ষমতা রাখত। ১৯১৪ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তাই কোনো একটি হত্যাকাণ্ডের আকস্মিক ফল ছিল না; কয়েক দশক ধরে জমে ওঠা সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জাতীয়তাবাদ, সামরিকীকরণ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং পরস্পরবিরোধী জোটব্যবস্থার সম্মিলিত বিস্ফোরণ ছিল এটি।

এই সংকটের পেছনের ইউরোপকে বুঝতে হলে ১৮৭১ সালের দিকে তাকাতে হয়। ফ্রাঙ্কো-প্রুশীয় যুদ্ধে ফ্রান্সকে পরাজিত করে প্রুশিয়ার নেতৃত্বে জার্মানির একীকরণ ইউরোপের ক্ষমতার ভারসাম্য নাটকীয়ভাবে বদলে দেয়। নতুন জার্মান সাম্রাজ্য ছিল জনসংখ্যা, শিল্প, বিজ্ঞান ও সামরিক শক্তিতে অত্যন্ত শক্তিশালী। যুদ্ধে পরাজিত ফ্রান্সকে আলসাস ও লোরেনের বড় অংশ জার্মানির কাছে ছেড়ে দিতে হয়। এই অপমান ফরাসি সমাজে জার্মানিবিরোধী ক্ষোভ সৃষ্টি করে এবং হারানো অঞ্চল ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘদিন টিকে থাকে। একই সময়ে জার্মানির দ্রুত শিল্পায়ন ব্রিটেনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

জার্মান চ্যান্সেলর অটো ফন বিসমার্ক বুঝেছিলেন যে নতুন সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য ফ্রান্সকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখা জরুরি। তাঁর সময়ে জার্মানি ইউরোপের বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে জটিল সম্পর্ক বজায় রেখে বড় যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ১৮৯০ সালে বিসমার্ক ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার পর সম্রাট দ্বিতীয় ভিলহেল্মের অধীনে জার্মান পররাষ্ট্রনীতি আরও উচ্চাভিলাষী হয়ে ওঠে। জার্মানি শুধু ইউরোপের প্রধান স্থলশক্তি হয়ে থাকতে চায়নি; বিশ্বরাজনীতি, উপনিবেশ এবং সমুদ্রেও ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সমকক্ষ শক্তি হওয়ার চেষ্টা শুরু করেছিল। এই নীতিকে সাধারণভাবে ভেল্টপলিটিক বা বিশ্বনীতি বলা হয়।

এখানেই সাম্রাজ্যবাদ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম গভীর কারণ হয়ে ওঠে। উনিশ শতকের শেষভাগে আফ্রিকা ও এশিয়ায় উপনিবেশ দখলের প্রতিযোগিতা তীব্র হয়ে উঠেছিল। ব্রিটেনের ছিল বিশাল বৈশ্বিক সাম্রাজ্য, ফ্রান্সও আফ্রিকা ও এশিয়ায় বিপুল অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করত। তুলনামূলকভাবে দেরিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া জার্মানি মনে করত, বিশ্বের উপনিবেশ ও সম্পদের ভাগাভাগিতে তাকে যথেষ্ট অংশ দেওয়া হয়নি। ফলে জার্মানির বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পুরোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষের ক্ষেত্র তৈরি করে।

মরক্কো সংকট এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রকৃতি স্পষ্ট করে। ১৯০৫ সালে সম্রাট দ্বিতীয় ভিলহেল্ম মরক্কোর ট্যাঞ্জিয়ার সফর করে মরক্কোর স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন জানান, যার উদ্দেশ্য ছিল সেখানে ফরাসি প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করা এবং ফ্রান্স-ব্রিটেনের সদ্য ঘনিষ্ঠ হওয়া সম্পর্ক পরীক্ষা করা। কিন্তু ফল হয় অনেকটাই উল্টো। ১৯০৬ সালের আলহেসিরাস সম্মেলনে জার্মানি প্রত্যাশিত কূটনৈতিক সাফল্য পায়নি। ১৯১১ সালে আগাদির সংকটে জার্মানি প্যান্থার নামের গানবোট মরক্কোর আগাদির বন্দরে পাঠালে আবার উত্তেজনা ছড়ায়। এই সংকটগুলো সরাসরি বিশ্বযুদ্ধ শুরু করেনি, কিন্তু ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যে সন্দেহকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায় যেখানে প্রতিপক্ষের প্রতিটি পদক্ষেপকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখা শুরু হয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় জাতীয়তাবাদ। উনিশ শতকের জাতীয়তাবাদ ইতালি ও জার্মানির একীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, কিন্তু বিশ শতকের শুরুতে এর একটি বিপজ্জনক রূপও দেখা দেয়। ফ্রান্সে জার্মানির বিরুদ্ধে প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা, জার্মানিতে শক্তিশালী সাম্রাজ্যের গৌরব, রাশিয়ায় স্লাভ জনগোষ্ঠীর রক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার ধারণা এবং বলকানে সার্ব জাতীয়তাবাদ—সব মিলিয়ে ইউরোপের আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে ক্রমশ আবেগপ্রবণ ও সংঘাতমুখী করে তোলে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয় বলকান অঞ্চলে। দুর্বল হয়ে পড়া অটোমান সাম্রাজ্য ইউরোপীয় ভূখণ্ডে তার নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকায় সেখানে সার্বিয়া, বুলগেরিয়া, গ্রিস, রোমানিয়া ও অন্যান্য জাতীয় শক্তির আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে সার্বিয়া দক্ষিণ স্লাভ জনগোষ্ঠীকে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক কাঠামোর অধীনে একত্র করার স্বপ্ন দেখছিল। অন্যদিকে বহু জাতিগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি আশঙ্কা করছিল, সার্ব জাতীয়তাবাদের বিস্তার তার নিজের সাম্রাজ্যের দক্ষিণ স্লাভ জনগণের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদ উসকে দিতে পারে।

১৯০৮ সালে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করলে সার্বিয়ায় প্রবল ক্ষোভ দেখা দেয়। অঞ্চলটিতে উল্লেখযোগ্য সার্ব জনগোষ্ঠী ছিল এবং সার্ব জাতীয়তাবাদীরা এটিকে তাদের বৃহত্তর জাতীয় প্রকল্পের অংশ হিসেবে দেখত। রাশিয়া নিজেকে স্লাভ জনগণের পৃষ্ঠপোষক মনে করত এবং সার্বিয়ার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। ফলে বলকানের স্থানীয় বিরোধ ক্রমেই অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও রাশিয়ার মতো বৃহৎ শক্তির মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়। ১৯১২ ও ১৯১৩ সালের বলকান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে এবং সার্বিয়ার শক্তিবৃদ্ধি ভিয়েনার উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়।

এই রাজনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি ইউরোপে চলছিল বিশাল অস্ত্র প্রতিযোগিতা। স্থলবাহিনীর ক্ষেত্রে জার্মানি, ফ্রান্স ও রাশিয়াসহ প্রধান শক্তিগুলো বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ, রিজার্ভ বাহিনী, রেলভিত্তিক দ্রুত সেনা পরিবহন এবং ভারী কামানের সক্ষমতা বৃদ্ধি করছিল। যুদ্ধের পরিকল্পনা এত বিস্তারিত হয়ে উঠেছিল যে সংকট দেখা দিলে রাজনৈতিক নেতাদের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ও সংকুচিত হয়ে আসত। লক্ষ লক্ষ সৈন্যকে দ্রুত সমাবেশ করার পরিকল্পনা ছিল; এক রাষ্ট্র সেনা সমাবেশ শুরু করলে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছে অপেক্ষা করাও বিপজ্জনক বলে মনে হতো।

ব্রিটেন ও জার্মানির নৌ-অস্ত্র প্রতিযোগিতা ছিল আরও দৃশ্যমান। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক যোগাযোগ সমুদ্রশক্তির ওপর নির্ভর করত। জার্মানি যখন অ্যাডমিরাল আলফ্রেড ফন টিরপিৎসের পরিকল্পনায় বিশাল নৌবহর নির্মাণ শুরু করে, ব্রিটিশরা এটিকে সরাসরি কৌশলগত হুমকি হিসেবে দেখে। ১৯০৬ সালে ব্রিটেন বিপ্লবাত্মক যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস ড্রেডনট চালু করলে পুরোনো যুদ্ধজাহাজগুলোর তুলনামূলক মূল্য অনেকটাই কমে যায় এবং নতুন ধরনের যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। জার্মানি পাল্টা ড্রেডনট নির্মাণ করলে দুই দেশের পারস্পরিক অবিশ্বাস আরও গভীর হয়। যে ব্রিটেন একসময় জার্মানিকে সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে দেখতে পারত, নৌ প্রতিযোগিতা সেই জার্মানিকেই ক্রমে প্রধান নিরাপত্তা-হুমকিগুলোর একটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

আরেকটি নির্ধারক উপাদান ছিল ইউরোপের জোটব্যবস্থা। ১৮৮২ সালে জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও ইতালির মধ্যে ট্রিপল অ্যালায়েন্স গড়ে ওঠে। অন্যদিকে ১৮৯৪ সালে ফ্রান্স ও রাশিয়ার জোট, ১৯০৪ সালের ব্রিটেন-ফ্রান্স এন্তন্ত কর্দিয়াল এবং ১৯০৭ সালের ব্রিটেন-রাশিয়া সমঝোতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে ট্রিপল এন্তন্ত-এর কাঠামো তৈরি হয়। সব চুক্তির বাধ্যবাধকতা এক রকম ছিল না, এবং ইউরোপ নিছক দুটি স্বয়ংক্রিয় সামরিক যন্ত্রে বিভক্ত ছিল—এমন ধারণাও অতিসরলীকরণ। তবু বাস্তবে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিবলয় গড়ে উঠেছিল, যা সংকটের সময় স্থানীয় সংঘাতকে আন্তর্জাতিক সংঘাতে রূপান্তরের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

জার্মানির জন্য বিশেষ উদ্বেগ ছিল পশ্চিমে ফ্রান্স এবং পূর্বে রাশিয়ার উপস্থিতি। দুই দিক থেকে সম্ভাব্য যুদ্ধের আশঙ্কা জার্মান সামরিক পরিকল্পনায় গভীর প্রভাব ফেলে। জার্মান পরিকল্পনাকারীরা মনে করতেন, রাশিয়ার বিশাল সেনাবাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত হতে তুলনামূলক বেশি সময় নেবে; তাই দুই ফ্রন্টে যুদ্ধ হলে প্রথমে পশ্চিমে দ্রুত ফ্রান্সকে পরাজিত করে পরে পূর্বে রাশিয়ার বিরুদ্ধে শক্তি কেন্দ্রীভূত করতে হবে। এই ধারণার সঙ্গে যুক্ত ছিল বেলজিয়ামের মধ্য দিয়ে ফ্রান্সে দ্রুত আক্রমণের পরিকল্পনা, যা পরবর্তীকালে যুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটেনের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সমস্যা ছিল শুধু অস্ত্রের পরিমাণে নয়, ইউরোপীয় নেতৃত্বের একটি অংশের চিন্তায় যুদ্ধ ক্রমে রাজনৈতিকভাবে কল্পনাযোগ্য হয়ে উঠেছিল। অনেক সামরিক কর্মকর্তা বিশ্বাস করতেন, ভবিষ্যৎ যুদ্ধ অনিবার্য হলে প্রতিপক্ষ আরও শক্তিশালী হওয়ার আগেই যুদ্ধ করা সুবিধাজনক হতে পারে। একই সঙ্গে রেলপথনির্ভর সেনা সমাবেশের সময়সূচি এত কঠোর ছিল যে একবার পূর্ণ সামরিক প্রস্তুতি শুরু হলে তা থামানো রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে পড়ত। ফলে কূটনৈতিক সংকট ও সামরিক পরিকল্পনা একে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করার বদলে কখনো কখনো আরও ত্বরান্বিত করছিল।

এই বিস্ফোরক পরিস্থিতির মধ্যে ১৯১৪ সালের ২৮ জুন বসনিয়ার সারায়েভোতে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ এবং তাঁর স্ত্রী সোফিকে হত্যা করেন বসনীয় সার্ব জাতীয়তাবাদী গাভরিলো প্রিন্সিপ। হত্যাকাণ্ডটি ছিল তাৎক্ষণিক স্ফুলিঙ্গ, কিন্তু স্ফুলিঙ্গটি এমন এক ইউরোপে পড়েছিল যেখানে রাজনৈতিক বারুদ বহু বছর ধরেই জমা হচ্ছিল। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়াকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করতে চাইল; জার্মানি তার মিত্রকে শক্ত সমর্থন দিল; রাশিয়া সার্বিয়ার সম্পূর্ণ পরাজয় মেনে নিতে অনিচ্ছুক ছিল; ফ্রান্স রাশিয়ার মিত্র; আর জার্মানির পশ্চিমমুখী সামরিক পরিকল্পনা বেলজিয়াম ও শেষ পর্যন্ত ব্রিটেনকে সংঘাতের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

অতএব প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণকে শুধু সারায়েভোর হত্যাকাণ্ড দিয়ে ব্যাখ্যা করলে ইতিহাসের মূল কাঠামোটিই অদৃশ্য হয়ে যায়। সাম্রাজ্যবাদ ইউরোপীয় শক্তিগুলোকে বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত করেছিল; জাতীয়তাবাদ পারস্পরিক বিরোধকে আবেগ ও অস্তিত্বের প্রশ্নে রূপ দিয়েছিল; অস্ত্র প্রতিযোগিতা যুদ্ধ করার সক্ষমতা ও মানসিক প্রস্তুতি বাড়িয়েছিল; আর জোটব্যবস্থা একটি আঞ্চলিক সংঘাতকে মহাদেশীয় যুদ্ধে বিস্তৃত হওয়ার পথ তৈরি করেছিল। এর সঙ্গে বলকানের অস্থিতিশীলতা, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির নিরাপত্তা-সংকট, রাশিয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা, জার্মানির কৌশলগত উদ্বেগ এবং ফ্রান্স-ব্রিটেনের নিজস্ব নিরাপত্তা হিসাব যুক্ত হয়ে এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করেছিল, যেখানে ১৯১৪ সালের সংকট সামাল দেওয়ার সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হয়ে যায়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তাই একটি ঘটনার ইতিহাসের চেয়ে অনেক বেশি—এটি এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতার ইতিহাস, যেখানে শক্তির ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে রাষ্ট্রগুলো এত অস্ত্র, এত জোট এবং এত পারস্পরিক সন্দেহ তৈরি করেছিল যে শেষ পর্যন্ত সেই নিরাপত্তাব্যবস্থাই তাদের নিরাপত্তা ধ্বংস করে দেয়। ১৯১৪ সালের গ্রীষ্মে সারায়েভোর গুলির শব্দ সেই দীর্ঘ সংকটের সূচনা করেনি; বরং বহু বছর ধরে প্রস্তুত হয়ে থাকা ইউরোপীয় বিস্ফোরণের ট্রিগার টেনে দিয়েছিল।