বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ইহুদি ঘেটো: পোল্যান্ড দখল থেকে ওয়ারশ ঘেটো, অনাহার ও নির্বাসনের ভয়াবহ ইতিহাস

Series: হলোকাস্ট: নাৎসি গণহত্যা ও মানব ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়

  • Author: Admin
  • August 27, 2026
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ইহুদি ঘেটো: পোল্যান্ড দখল থেকে ওয়ারশ ঘেটো, অনাহার ও নির্বাসনের ভয়াবহ ইতিহাস
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ইহুদি ঘেটো

১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জার্মান বাহিনী পোল্যান্ড আক্রমণ করার মধ্য দিয়ে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা ঘটে। যুদ্ধের সামরিক ইতিহাসে এই আক্রমণ জার্মানির দ্রুতগতির অভিযান, বিমান হামলা ও সাঁজোয়া বাহিনীর অগ্রযাত্রার জন্য পরিচিত হলেও হলোকাস্টের ইতিহাসে এর তাৎপর্য আরও গভীর। পোল্যান্ড দখলের ফলে নাৎসি জার্মানির নিয়ন্ত্রণে এমন একটি ভূখণ্ড আসে যেখানে প্রায় ৩৩ লাখ ইহুদি বসবাস করতেন—যুদ্ধপূর্ব ইউরোপের বৃহত্তম ইহুদি জনগোষ্ঠীগুলোর একটি। ফলে নাৎসি ইহুদিবিদ্বেষ আর শুধু জার্মান ইহুদিদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার নীতি হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকল না; দখলকৃত পূর্ব ইউরোপে তা ক্রমশ ব্যাপক বন্দিত্ব, জোরপূর্বক শ্রম, অনাহার, নির্বাসন এবং শেষ পর্যন্ত পরিকল্পিত হত্যার দিকে অগ্রসর হলো।

জার্মান বাহিনী পশ্চিম ও মধ্য পোল্যান্ডের বিশাল অঞ্চল দখল করার পর দেশটির একাংশ সরাসরি জার্মান রাইখের সঙ্গে যুক্ত করা হয় এবং অবশিষ্ট কেন্দ্রীয় ও দক্ষিণাঞ্চলের একটি বড় অংশকে জেনারেল গভর্নমেন্ট নামে জার্মান-নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনিক অঞ্চলে পরিণত করা হয়। হান্স ফ্রাঙ্ক এই অঞ্চলের গভর্নর-জেনারেল হন। পোলিশ সমাজের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব ধ্বংস করার পাশাপাশি নাৎসি কর্তৃপক্ষ ইহুদি জনগোষ্ঠীকে দ্রুত আলাদা ও নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা নিতে থাকে। তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা, চলাফেরা সীমিত করা, জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করা এবং প্রকাশ্যে অপমান করার ঘটনা ক্রমশ সাধারণ হয়ে ওঠে।

১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরের শেষদিকে এসএস কর্মকর্তা রাইনহার্ড হাইড্রিখের নির্দেশনায় দখলকৃত অঞ্চলের ইহুদিদের বড় শহর ও রেলপথসংলগ্ন নির্দিষ্ট এলাকায় কেন্দ্রীভূত করার পরিকল্পনা সামনে আসে। এখান থেকেই নাৎসি দখলদারিত্বের অন্যতম কুখ্যাত প্রতিষ্ঠান—ইহুদি ঘেটো—ব্যাপক আকার ধারণ করতে শুরু করে। মধ্যযুগীয় ইউরোপেও ইহুদিদের নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাসে বাধ্য করার ইতিহাস ছিল, কিন্তু নাৎসি ঘেটোগুলো ছিল আধুনিক রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের অংশ। এগুলো ছিল এমন বদ্ধ এলাকা যেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষকে জোর করে গাদাগাদি করে রাখা, তাদের সম্পদ ও স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া এবং প্রশাসনিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো।

প্রথম বড় ঘেটোগুলোর একটি ১৯৪০ সালের প্রথম দিকে লজ শহরে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী কয়েক বছরে দখলকৃত পোল্যান্ড এবং পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলে শত শত ঘেটো সৃষ্টি করা হয়। কোথাও কাঁটাতারের বেড়া, কোথাও দেয়াল, আবার কোথাও কঠোর প্রশাসনিক সীমারেখা দিয়ে এগুলো বাইরের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। ইহুদিদের নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে অল্প সময়ের মধ্যে নির্ধারিত এলাকায় চলে যেতে বাধ্য করা হতো। অধিকাংশ পরিবার তাদের সম্পদের সামান্য অংশ সঙ্গে নিতে পারত। একসময় যারা নিজেদের শহরে শিক্ষক, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, কারিগর বা সাধারণ নাগরিক হিসেবে জীবন কাটিয়েছিলেন, তারা হঠাৎ নিজেদেরই শহরের একটি বদ্ধ অঞ্চলে বন্দি জনগোষ্ঠীতে পরিণত হন।

এই ব্যবস্থার সবচেয়ে পরিচিত এবং বৃহত্তম উদাহরণ ছিল ওয়ারশ ঘেটো। ১৯৪০ সালের অক্টোবরে জার্মান কর্তৃপক্ষ ওয়ারশতে ঘেটো প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেয় এবং নভেম্বরের মাঝামাঝি এলাকাটি বাইরের শহর থেকে কার্যত সিল করে দেওয়া হয়। প্রায় ৩ মিটারের মতো উঁচু দেয়ালের ওপর কাঁটাতার বসিয়ে ঘেটোর সীমানা তৈরি করা হয়েছিল। অল্প একটি এলাকার মধ্যে কয়েক লাখ মানুষকে বসবাস করতে বাধ্য করা হয়। পরবর্তী সময়ে অন্য অঞ্চল থেকে আরও ইহুদিকে সেখানে পাঠানো হলে জনসংখ্যার চাপ আরও বেড়ে যায়।

ওয়ারশ শহরের মোট ভূখণ্ডের খুব সামান্য অংশে শহরের বিশাল ইহুদি জনগোষ্ঠীকে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছিল। একই ঘরে একাধিক পরিবার বসবাস করত; অনেক বাসস্থানে পর্যাপ্ত পানি, পয়োনিষ্কাশন কিংবা গরমের ব্যবস্থা ছিল না। রাস্তাগুলো সর্বদা জনাকীর্ণ থাকত। ঘেটোর দেয়াল শুধু মানুষকে আটকে রাখেনি; খাদ্য, ওষুধ, কর্মসংস্থান এবং স্বাভাবিক সামাজিক জীবনের প্রবাহও বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।

ঘেটোর অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের জন্য নাৎসিরা ইউডেনরাট বা ইহুদি কাউন্সিল গঠন করতে বাধ্য করেছিল। ওয়ারশতে এর নেতৃত্বে ছিলেন অ্যাডাম চেরনিয়াকভ। কাউন্সিলকে জনগণনা, আবাসন, শ্রমিক সরবরাহ, খাদ্য বণ্টনসহ বহু প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করতে হতো এবং একই সঙ্গে জার্মান কর্তৃপক্ষের নির্দেশ বাস্তবায়নের অসম্ভব চাপ বহন করতে হতো। এই ব্যবস্থার নির্মমতা ছিল যে নাৎসিরা নিজেদের নিপীড়নমূলক নির্দেশের কিছু প্রশাসনিক দায়িত্ব নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের ওপরই চাপিয়ে দিয়েছিল।

ঘেটোর সবচেয়ে ভয়াবহ বাস্তবতাগুলোর একটি ছিল পরিকল্পিত খাদ্যসংকট। সরকারি রেশন ব্যবস্থায় ইহুদিদের জন্য বরাদ্দ খাদ্যের পরিমাণ জীবনধারণের প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম ছিল। ফলে কালোবাজার ও গোপনে খাদ্য পাচার বহু মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান উপায় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোররা দেয়ালের ফাঁক, নর্দমা বা বিভিন্ন গোপন পথ ব্যবহার করে বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসত। ধরা পড়লে তাদের কঠোর শাস্তি, এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও ছিল।

অনাহারের সঙ্গে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে রোগ। অপুষ্টি, অতিরিক্ত জনসংখ্যা, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও নোংরা পরিবেশ টাইফাসসহ সংক্রামক রোগের বিস্তার ঘটায়। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা অত্যন্ত সীমিত ওষুধ ও সরঞ্জাম নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করতেন। ১৯৪২ সালের বড় নির্বাসন শুরু হওয়ার আগেই ওয়ারশ ঘেটোতে অনাহার ও রোগে কয়েক দশ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। রাস্তায় মৃতদেহ পড়ে থাকা এমন এক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছিল যা ঘেটোর বাসিন্দাদের প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করতে হতো।

তবু ঘেটোর জীবন শুধু মৃত্যু ও নিষ্ক্রিয়তার ইতিহাস ছিল না। চরম পরিস্থিতির মধ্যেও মানুষ শিক্ষা, ধর্মীয় জীবন, সংস্কৃতি ও পারস্পরিক সহায়তা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল। গোপনে বিদ্যালয় পরিচালিত হতো, ধর্মীয় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতো, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চলত এবং অসহায় মানুষের জন্য কমিউনিটি রান্নাঘর ও সাহায্যব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। চিকিৎসকরা রোগীদের চিকিৎসা করতেন, শিক্ষকরা শিশুদের পড়াতেন এবং লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা লিখে রাখতেন। মানুষকে অমানবিক অবস্থায় নামিয়ে আনার চেষ্টা চললেও নিজেদের মানুষ হিসেবে ধরে রাখার সংগ্রাম ঘেটোর প্রতিদিনের জীবনের অংশ ছিল।

এই ইতিহাস সংরক্ষণের অন্যতম অসাধারণ প্রচেষ্টা ছিল ইতিহাসবিদ ইমানুয়েল রিঙ্গেলব্লুমের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গোপন আর্কাইভ। ‘ওনেগ শাবাত’ নামে পরিচিত এই উদ্যোগের সদস্যরা ডায়েরি, সরকারি নির্দেশ, শিশুদের লেখা, পোস্টার, সংবাদ, চিঠি এবং দৈনন্দিন জীবনের অসংখ্য দলিল সংগ্রহ করেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে তাদের সঙ্গে যা ঘটছে, ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে তার সাক্ষ্য জানানো জরুরি। নথিগুলোর বড় অংশ পরে ধাতব বাক্স ও দুধের পাত্রে ভরে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। যুদ্ধের পর এর একটি অংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

ঘেটোর বাসিন্দাদের জোরপূর্বক শ্রমেও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হতো। জার্মান যুদ্ধ অর্থনীতির জন্য পোশাক, সামরিক সরঞ্জাম এবং অন্যান্য পণ্য তৈরির কারখানা ও কর্মশালায় মানুষকে অত্যন্ত কম পারিশ্রমিকে কিংবা কার্যত বাধ্যতামূলকভাবে কাজ করতে হতো। অনেকের মনে আশা ছিল, কাজের জন্য ‘প্রয়োজনীয়’ হিসেবে বিবেচিত হলে হয়তো তারা নির্বাসন থেকে বাঁচতে পারবেন। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাবলি দেখিয়েছিল যে শ্রমক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছিল না।

১৯৪১ সালের জুনে জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করার পর হলোকাস্টের প্রকৃতি আরও ভয়াবহভাবে পরিবর্তিত হয়। জার্মান বাহিনীর পেছনে অগ্রসরমান বিশেষ হত্যাকারী ইউনিট আইনজাটসগ্রুপেন এবং তাদের সহযোগীরা পূর্ব ইউরোপে ইহুদিদের গণগুলি করে হত্যা করতে শুরু করে। ১৯৪১ সালের শেষ ও ১৯৪২ সালের মধ্যে নাৎসি নেতৃত্ব ইউরোপের ইহুদিদের ব্যাপকভাবে হত্যা করার একটি মহাদেশব্যাপী ব্যবস্থা কার্যকর করতে থাকে। ঘেটোগুলো তখন আর কেবল বিচ্ছিন্নকরণ ও শোষণের স্থান ছিল না; অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো নির্মূল কেন্দ্রে পাঠানোর পূর্ববর্তী বন্দিশালায় পরিণত হয়।

১৯৪২ সালে দখলকৃত পোল্যান্ডের ইহুদিদের হত্যার জন্য অপারেশন রাইনহার্ড কার্যকর করা হয়। বেলজেক, সোবিবোর এবং ট্রেবলিঙ্কার মতো নির্মূল কেন্দ্র এই হত্যাযজ্ঞের প্রধান অংশ হয়ে ওঠে। এসব স্থানের উদ্দেশ্য সাধারণ বন্দিশিবিরের মতো দীর্ঘমেয়াদি বন্দিত্ব ছিল না; সেখানে পাঠানো মানুষের বিপুল অংশকে পৌঁছানোর অল্প সময়ের মধ্যেই হত্যা করার জন্য অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছিল।

ওয়ারশ ঘেটোর জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায় শুরু হয় ১৯৪২ সালের ২২ জুলাই। জার্মান কর্তৃপক্ষ ব্যাপক নির্বাসন অভিযান শুরু করে। ইহুদিদের বলা হতো তাদের ‘পূর্বদিকে পুনর্বাসন’ করা হবে, কিন্তু প্রকৃত গন্তব্য ছিল প্রধানত ট্রেবলিঙ্কা নির্মূল কেন্দ্র। মানুষকে ওয়ারশ ঘেটোর উমশলাগপ্লাৎস নামের সমাবেশস্থলে নিয়ে যাওয়া হতো এবং সেখান থেকে মালবাহী ট্রেনে তুলে দেওয়া হতো।

নির্বাসনের জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক মানুষ সংগ্রহের নির্দেশ ইহুদি কাউন্সিলের ওপরও চাপিয়ে দেওয়া হয়। কাউন্সিলের প্রধান অ্যাডাম চেরনিয়াকভ যখন বুঝতে পারেন যে শিশুদেরও হস্তান্তরের দাবি করা হচ্ছে, তখন ১৯৪২ সালের ২৩ জুলাই তিনি আত্মহত্যা করেন। তার মৃত্যু ঘেটোর প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে আটকে পড়া মানুষের নৈতিক ও ব্যক্তিগত অসহায়তার এক মর্মান্তিক প্রতীক হয়ে আছে।

জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ১৯৪২ পর্যন্ত চলা এই বৃহৎ নির্বাসন অভিযানে প্রায় আড়াই লাখেরও বেশি ওয়ারশ ইহুদিকে ট্রেবলিঙ্কায় পাঠানো হয়, যেখানে অধিকাংশকেই অল্প সময়ের মধ্যে হত্যা করা হয়। আরও অনেকে অভিযানের সময় নিহত হন বা অন্যত্র পাঠানো হয়। কয়েক মাসের মধ্যে একসময় কয়েক লাখ মানুষের ঘনবসতিপূর্ণ ওয়ারশ ঘেটো তার অধিকাংশ বাসিন্দাকে হারায়।

এই পর্যায়ে অনেক বাসিন্দার কাছে ‘পুনর্বাসন’ কথাটির প্রকৃত অর্থ স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের সাক্ষ্য, গোপন তথ্য এবং নির্বাসিতদের আর ফিরে না আসার বাস্তবতা থেকে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে ট্রেনগুলো মানুষকে নতুন বসতিতে নয়, মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই উপলব্ধিই পরবর্তী সময়ে ওয়ারশ ঘেটোর অবশিষ্ট ইহুদিদের একটি অংশকে সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিতে উৎসাহিত করে, যার পরিণতি ঘটবে ১৯৪৩ সালের ঐতিহাসিক ওয়ারশ ঘেটো বিদ্রোহে।

ঘেটোর ইতিহাস তাই শুধু কাঁটাতারের ভেতরে বন্দিত্বের ইতিহাস নয়; এটি নাৎসি গণহত্যা ব্যবস্থার ক্রমবিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। প্রথমে মানুষকে নাগরিক সমাজ থেকে আলাদা করা হয়েছিল, এরপর তাদের সম্পত্তি ও জীবিকা কেড়ে নেওয়া হয়, তারপর নির্দিষ্ট এলাকায় বন্দি করে অনাহার, রোগ ও জোরপূর্বক শ্রমের মধ্যে রাখা হয় এবং শেষ পর্যন্ত রেলপথ ব্যবহার করে নির্মূল কেন্দ্রে পাঠানো হয়।

পোল্যান্ডের ঘেটোগুলো বিশেষভাবে দেখিয়ে দেয় কীভাবে আধুনিক রাষ্ট্রের প্রশাসন, জনগণনা, পরিচয়পত্র, পুলিশ, রেলব্যবস্থা, শ্রমনীতি এবং খাদ্যবণ্টনের মতো আপাত সাধারণ কাঠামোকেও গণনিপীড়নের যন্ত্রে পরিণত করা সম্ভব। ওয়ারশ ঘেটোর দেয়াল ছিল কেবল ইটের দেয়াল নয়—সেটি ছিল একটি রাষ্ট্রের পরিকল্পিতভাবে কিছু মানুষকে সমাজ, অধিকার, খাদ্য, স্বাধীনতা এবং শেষ পর্যন্ত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রতীক। অথচ সেই দেয়ালের ভেতরেও মানুষ সন্তানকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে, খাবার ভাগ করেছে, গোপনে শিক্ষা দিয়েছে, ইতিহাস লিখে রেখেছে এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধের পথ বেছে নিয়েছে। এই মানবিক প্রতিরোধ ও সাক্ষ্যই ওয়ারশ ঘেটোর ইতিহাসকে শুধু নাৎসি বর্বরতার দলিল নয়, বরং চরম নিপীড়নের মধ্যেও মানুষের মর্যাদা রক্ষার এক গভীর ঐতিহাসিক স্মারকে পরিণত করেছে।