বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

অপারেশন বারবারোসা ও আইনজাট্‌সগ্রুপেন: বাবি ইয়ার থেকে সোভিয়েত ভূখণ্ডে হলোকাস্টের গণহত্যায় রূপান্তর

Series: হলোকাস্ট: নাৎসি গণহত্যা ও মানব ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়

  • Author: Admin
  • August 27, 2026
অপারেশন বারবারোসা ও আইনজাট্‌সগ্রুপেন: বাবি ইয়ার থেকে সোভিয়েত ভূখণ্ডে হলোকাস্টের গণহত্যায় রূপান্তর
অপারেশন বারবারোসা ও আইনজাট্‌সগ্রুপেন

১৯৪১ সালের ২২ জুন ভোরে নাৎসি জার্মানি এবং তার মিত্রবাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ইতিহাসের বৃহত্তম স্থল সামরিক অভিযানগুলোর একটি শুরু করে। এর সাংকেতিক নাম ছিল অপারেশন বারবারোসা। কয়েক হাজার ট্যাংক, কয়েক হাজার বিমান এবং প্রায় ৩০ লাখের বেশি জার্মান সৈন্যকে কেন্দ্র করে গঠিত বিশাল আক্রমণকারী বাহিনী বাল্টিক অঞ্চল থেকে কৃষ্ণসাগরের দিক পর্যন্ত বিস্তৃত এক দীর্ঘ ফ্রন্টে সোভিয়েত ভূখণ্ডে প্রবেশ করে। সামরিকভাবে এর লক্ষ্য ছিল দ্রুত সোভিয়েত রাষ্ট্রকে পরাজিত করা। কিন্তু নাৎসি নেতৃত্বের কাছে এই যুদ্ধ ছিল শুধু ভূখণ্ড জয়ের অভিযান নয়। এটি ছিল বর্ণবাদী ও আদর্শিক যুদ্ধ, যার সঙ্গে শুরু থেকেই ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, জনসংখ্যা পুনর্বিন্যাস এবং ইহুদিদের ধ্বংস করার নীতি গভীরভাবে যুক্ত ছিল।

পোল্যান্ডে ১৯৩৯ সালের আক্রমণের পর নাৎসি নিপীড়ন ইতোমধ্যে ঘেটো, সম্পত্তি দখল, জোরপূর্বক শ্রম এবং নির্বাসনের পর্যায়ে পৌঁছেছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ দিকে নিয়ে যায়। হিটলারের বিশ্বদৃষ্টিতে সোভিয়েত কমিউনিজম ও ইহুদিবিদ্বেষ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। নাৎসি প্রচারণা মিথ্যাভাবে বলশেভিক বিপ্লব ও সোভিয়েত রাষ্ট্রকে একটি কথিত ‘ইহুদি ষড়যন্ত্রের’ ফল হিসেবে উপস্থাপন করত। একই সঙ্গে পূর্ব ইউরোপের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডকে জার্মান জাতির ভবিষ্যৎ লেবেনসরাউম বা ‘জীবনধারণের স্থান’ হিসেবে কল্পনা করা হয়েছিল। এই পরিকল্পনার মধ্যে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক শোষণ, বহিষ্কার ও মৃত্যুর সম্ভাবনা অন্তর্নিহিত ছিল।

এই আদর্শিক যুদ্ধ পরিচালনার জন্য জার্মান সামরিক বাহিনীর অগ্রযাত্রার পেছনে পাঠানো হয় বিশেষ এসএস ও পুলিশ ইউনিট—আইনজাট্‌সগ্রুপেন। শব্দটির অর্থ আনুমানিকভাবে ‘অভিযান দল’। অপারেশন বারবারোসার জন্য চারটি প্রধান আইনজাট্‌সগ্রুপে—এ, বি, সি ও ডি—গঠন করা হয়েছিল। এগুলোর অধীনে আরও ছোট ইউনিট ছিল। মোট সদস্যসংখ্যা কয়েক হাজারের মতো হলেও তারা একা কাজ করত না। জার্মান অর্ডার পুলিশ, ওয়াফেন-এসএসের বিভিন্ন ইউনিট, সামরিক কর্তৃপক্ষ এবং বহু ক্ষেত্রে স্থানীয় সহযোগী বাহিনীর সহায়তায় তাদের হত্যাকাণ্ড পরিচালিত হতো।

প্রথমদিকে তাদের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকর্তা, সোভিয়েত রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি এবং নিরাপত্তার জন্য কথিত হুমকি হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের নির্মূল করা ছিল। কিন্তু আক্রমণের অল্প সময়ের মধ্যেই হত্যার পরিধি দ্রুত বিস্তৃত হয়। ইহুদি পুরুষদের গণহত্যা থেকে অভিযান ক্রমে পুরো ইহুদি সম্প্রদায়—নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ পরিবারগুলোর সম্পূর্ণ অংশকে হত্যা করার দিকে অগ্রসর হয়। ১৯৪১ সালের গ্রীষ্ম ও শরৎকালে এই পরিবর্তন হলোকাস্টের ইতিহাসে একটি মৌলিক মোড় তৈরি করে।

বাল্টিক অঞ্চল, বেলারুশ, ইউক্রেন এবং রাশিয়ার দখলকৃত এলাকায় জার্মান বাহিনী অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শহর ও গ্রামের ইহুদিদের নিবন্ধিত করা, পরিচয়চিহ্ন বহনে বাধ্য করা এবং নির্দিষ্ট স্থানে সমবেত করার নির্দেশ দেওয়া হতো। কখনো বলা হতো তাদের স্থানান্তর করা হবে, কখনো শ্রমের জন্য নিবন্ধন করতে হবে। মানুষকে সঙ্গে সীমিত পোশাক, মূল্যবান সামগ্রী বা ব্যক্তিগত জিনিসপত্র নিতে বলা হতো। এতে অনেকের মনে এমন ধারণা তৈরি হতো যে তারা হয়তো অন্য কোথাও পুনর্বাসিত হতে যাচ্ছে।

বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে তাদের শহরের বাইরে বন, পরিত্যক্ত খনি, সামরিক এলাকার কাছাকাছি স্থান অথবা প্রাকৃতিক খাদ ও গিরিখাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে তাদের সম্পদ ও পোশাক জমা দিতে বাধ্য করা হতো এবং এরপর দলবদ্ধভাবে গুলি করে হত্যা করা হতো। মৃতদেহ আগে থেকে তৈরি গর্ত, অ্যান্টি-ট্যাংক খাদ বা প্রাকৃতিক গিরিখাতে ফেলে দেওয়া হতো। হত্যাকাণ্ডগুলো ছিল প্রকাশ্য যুদ্ধক্ষেত্রের আকস্মিক সহিংসতা নয়; বহু ক্ষেত্রে তালিকা তৈরি, সমাবেশের নির্দেশ, পরিবহন, পাহারা, সম্পত্তি সংগ্রহ এবং মৃতদেহ গোপন করার মতো একাধিক প্রশাসনিক ধাপের সমন্বয়ে পরিচালিত পরিকল্পিত অভিযান।

লিথুয়ানিয়ায় ১৯৪১ সালের গ্রীষ্ম থেকেই হত্যাকাণ্ড দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভিলনিয়াসের কাছে পোনারি এলাকায় হাজার হাজার ইহুদিসহ বহু মানুষকে হত্যা করা হয়। লাটভিয়াতেও একই ধরনের হত্যাযজ্ঞ ঘটে। রিগার কাছে রুমবুলা বনে ১৯৪১ সালের শেষদিকে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক লাটভীয় ইহুদিকে হত্যা করা হয়। বেলারুশের মিনস্কসহ বহু শহরে ঘেটো প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নিয়মিত গণহত্যা চলতে থাকে। ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলেও শহর দখলের অল্প সময়ের মধ্যে ইহুদি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।

এই হত্যাযজ্ঞের সবচেয়ে কুখ্যাত উদাহরণগুলোর একটি ঘটে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে। জার্মান বাহিনী ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৪১ কিয়েভ দখল করে। কয়েক দিন পর শহরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, যার জন্য নাৎসি কর্তৃপক্ষ ইহুদিদের সমষ্টিগতভাবে দায়ী করার সুযোগ নেয়। ২৮ সেপ্টেম্বর কিয়েভে একটি নির্দেশ প্রচার করা হয় যাতে শহরের ইহুদিদের পরদিন সকালে নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হতে বলা হয়। তাদের নথিপত্র, টাকা, মূল্যবান সামগ্রী ও পোশাক সঙ্গে আনতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

অনেকেই সম্ভবত ধারণা করেছিলেন তাদের অন্য কোথাও পাঠানো হবে। ১৯৪১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর হাজার হাজার মানুষ নির্ধারিত স্থানে উপস্থিত হন। সেখান থেকে জার্মান বাহিনী ও সহযোগী ইউনিট তাদের শহরের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত বাবি ইয়ার নামের একটি গভীর প্রাকৃতিক গিরিখাতের দিকে নিয়ে যায়। পৌঁছানোর পর মানুষকে ছোট ছোট দলে বিভক্ত করা হয়, তাদের ব্যক্তিগত সামগ্রী ও পোশাক কেড়ে নেওয়া হয় এবং গিরিখাতের দিকে পাঠানো হয়।

২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বর মাত্র দুই দিনে ৩৩,৭৭১ জন ইহুদিকে বাবি ইয়ারে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল—হত্যাকারী ইউনিটের নিজস্ব প্রতিবেদনে এই সংখ্যাই নথিভুক্ত করা হয়। ভুক্তভোগীদের মধ্যে নারী, শিশু ও বৃদ্ধও ছিলেন। বাবি ইয়ার পরবর্তী সময়েও হত্যাস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়; সেখানে রোমা জনগোষ্ঠীর সদস্য, সোভিয়েত যুদ্ধবন্দি এবং নাৎসিদের অন্যান্য শিকারকেও হত্যা করা হয়।

বাবি ইয়ার দেখিয়ে দিয়েছিল যে একটি বড় ইউরোপীয় শহরের প্রায় সমগ্র ইহুদি জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশকে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে সংগঠিত প্রশাসনিক ও পুলিশি অভিযানের মাধ্যমে হত্যা করা সম্ভব হয়ে উঠেছে। হত্যাকাণ্ডের আকার, গতি এবং সংগঠন ১৯৪১ সালের মধ্যে নাৎসি নীতির ভয়াবহ রূপান্তরকে স্পষ্ট করে।

আইনজাট্‌সগ্রুপেনের কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য জার্মান নেতৃত্বের কাছে নিয়মিত পাঠানো হতো। বিভিন্ন ইউনিট তাদের অভিযান, গ্রেপ্তার এবং হত্যার সংখ্যা উল্লেখ করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করত। এই নথিগুলো গুরুত্বপূর্ণ কারণ এগুলো প্রমাণ করে যে গণহত্যা বিচ্ছিন্ন কিছু অধস্তন কর্মকর্তার অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড ছিল না। হত্যার পরিসংখ্যান পর্যন্ত প্রশাসনিক প্রতিবেদনের অংশ হয়ে উঠেছিল। মানুষের মৃত্যু নাৎসি আমলাতন্ত্রে সংখ্যায় রূপান্তরিত হচ্ছিল।

তবে হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া অঞ্চলভেদে ভিন্ন ছিল এবং আইনজাট্‌সগ্রুপেন একমাত্র হত্যাকারী বাহিনী ছিল না। অর্ডার পুলিশ ব্যাটালিয়ন, এসএস ইউনিট এবং অন্যান্য জার্মান বাহিনী বহু গণহত্যায় অংশ নেয়। কিছু এলাকায় স্থানীয় সহযোগী ও সহায়ক পুলিশও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই সঙ্গে দখলকৃত সমাজের আচরণও একরকম ছিল না—কেউ সহযোগিতা করেছে, কেউ লুটপাটে অংশ নিয়েছে, কেউ নিষ্ক্রিয় থেকেছে, আবার কিছু মানুষ নিজের জীবন বিপন্ন করে ইহুদিদের লুকিয়ে রাখা বা পালাতে সাহায্য করেছে।

সামরিক বাহিনীর সঙ্গে গণহত্যাকারী ইউনিটগুলোর সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। বহু ক্ষেত্রে জার্মান সেনাবাহিনী নিরাপত্তা, পরিবহন, বন্দি হস্তান্তর কিংবা অন্যান্য সহায়তা দিয়েছিল। নাৎসি নেতৃত্ব পূর্বাঞ্চলের যুদ্ধকে প্রচলিত সামরিক নিয়মের বাইরে একটি আদর্শিক সংঘর্ষ হিসেবে পরিচালনা করতে চেয়েছিল। সোভিয়েত রাজনৈতিক কর্মকর্তাদের হত্যার নির্দেশ এবং যুদ্ধবন্দিদের প্রতি নির্মম আচরণ একই বৃহত্তর বর্ণবাদী যুদ্ধনীতির অংশ ছিল। লাখ লাখ সোভিয়েত যুদ্ধবন্দিও অনাহার, রোগ, গুলি ও অমানবিক বন্দিত্বের কারণে প্রাণ হারান।

১৯৪১ সালের দ্বিতীয়ার্ধে গণগুলি এত ব্যাপক আকার ধারণ করে যে হত্যাকারীদের ওপর এর মানসিক প্রভাব নিয়েও এসএস নেতৃত্ব উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। একের পর এক নারী, শিশু ও পুরুষকে কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা শুধু সময়সাপেক্ষই ছিল না, হত্যাকারীদের কিছু সদস্যের মধ্যে মানসিক চাপও সৃষ্টি করছিল। নাৎসিরা তাই হত্যাকে আরও কার্যকর, দ্রুত এবং হত্যাকারীদের সঙ্গে ভুক্তভোগীদের সরাসরি সংস্পর্শ কমিয়ে পরিচালনার পদ্ধতি খুঁজতে থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে গ্যাস ভ্যান ব্যবহারসহ বিভিন্ন হত্যাপদ্ধতি সম্প্রসারিত হয়। বন্ধ ট্রাকের ভেতরে মানুষকে আটকে ইঞ্জিনের বিষাক্ত নিষ্কাশন গ্যাস ব্যবহার করে হত্যা করার পদ্ধতি কিছু অঞ্চলে প্রয়োগ করা হয়। এর পাশাপাশি দখলকৃত পোল্যান্ডে স্থায়ী নির্মূল কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা এগিয়ে যেতে থাকে। ১৯৪১ সালের শেষ এবং ১৯৪২ সালের মধ্যে চেল্মনো, বেলজেক, সোবিবোর, ট্রেবলিঙ্কা এবং পরে আউশভিৎস-বিরকেনাউয়ের মতো স্থানে ব্যাপক হত্যার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

অপারেশন বারবারোসার সঙ্গে শুরু হওয়া গণহত্যাকে অনেক ইতিহাসবিদ ‘হলোকাস্ট বাই বুলেটস’ বা গুলির মাধ্যমে সংঘটিত হলোকাস্টের কেন্দ্রীয় পর্যায় হিসেবে বর্ণনা করেন। কারণ নির্মূল শিবিরে গ্যাস চেম্বার ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগেই পূর্ব ইউরোপের মাঠ, বন, খাদ ও গিরিখাতে বিপুলসংখ্যক ইহুদিকে হত্যা করা হয়েছিল। বাবি ইয়ার ছিল এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলোর একটি, কিন্তু এমন হত্যাস্থল ছিল অসংখ্য।

এই সময়ে হত্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল সম্পূর্ণ সম্প্রদায় নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা। একটি শহরের ইহুদিদের সমবেত করা হতো, তাদের বাড়িঘর ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হতো, তারপর পরিবারসহ হত্যা করা হতো। ফলে কোনো এলাকার শতাব্দীপ্রাচীন ইহুদি সম্প্রদায় কয়েক দিনের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে যেতে পারত। এটি আর শুধু রাজনৈতিক বিরোধী বা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের লক্ষ্য করে পরিচালিত সন্ত্রাস ছিল না; শিশু পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তু হওয়া প্রমাণ করেছিল যে উদ্দেশ্য ক্রমেই একটি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ধ্বংসের দিকে চলে গেছে।

গণহত্যার পর সম্পত্তি লুট ও পুনর্বণ্টনের ব্যবস্থাও চলত। ভুক্তভোগীদের টাকা, গয়না, পোশাক এবং অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহ করা হতো। বাড়িঘর অন্যদের দখলে চলে যেত। অর্থাৎ হত্যার সঙ্গে অর্থনৈতিক লুণ্ঠনও যুক্ত ছিল। নাৎসি নিপীড়নব্যবস্থা মানুষের নাগরিক পরিচয় কেড়ে নেওয়া থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত তাদের জীবন এবং সম্পদ উভয়ই দখল করার পর্যায়ে পৌঁছেছিল।

যুদ্ধের শেষদিকে নাৎসিরা পূর্বাঞ্চলের গণহত্যার প্রমাণ মুছে ফেলার চেষ্টাও করে। কিছু গণকবর পুনরায় খোলা হয় এবং বিশেষ বন্দি শ্রমিকদলকে মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলতে বাধ্য করা হয়। বাবি ইয়ারসহ বিভিন্ন হত্যাস্থলে এই প্রমাণ ধ্বংসের অভিযান চালানো হয়। কিন্তু নাৎসিদের নিজস্ব প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য, জীবিতদের বিবরণ, যুদ্ধোত্তর তদন্ত এবং প্রত্নতাত্ত্বিক ও নথিগত প্রমাণের বিশাল ভাণ্ডার হত্যাকাণ্ডের ইতিহাসকে সংরক্ষণ করেছে।

অপারেশন বারবারোসা তাই হলোকাস্টের ইতিহাসে একটি মৌলিক সীমারেখা। ১৯৩৩ সালে জার্মান ইহুদিদের চাকরি ও নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে যে নিপীড়ন শুরু হয়েছিল, ১৯৩৮ সালের ক্রিস্টালনাখটে তা সংগঠিত সহিংসতায় পৌঁছায়, পোল্যান্ডে ঘেটোর মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষকে বন্দি ও বিচ্ছিন্ন করা হয়, আর ১৯৪১ সালে সোভিয়েত ভূখণ্ডে সেই নীতি পরিবারসহ ব্যাপক হত্যায় রূপ নেয়। বাবি ইয়ারের গিরিখাত এই রূপান্তরের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রতীকগুলোর একটি—যেখানে রাষ্ট্রনির্দেশিত বর্ণবাদ, সামরিক দখল, আমলাতান্ত্রিক সংগঠন এবং হত্যাকারী বাহিনী একত্রিত হয়ে মাত্র দুই দিনে ৩৩ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করেছিল।

এরপর নাৎসি গণহত্যা আরও শিল্পায়িত ও মহাদেশব্যাপী রূপ নেবে। রেলপথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ইহুদিদের নির্মূল কেন্দ্রে পাঠানো হবে এবং গ্যাস চেম্বারকে ব্যাপক হত্যার প্রধান প্রযুক্তিগুলোর একটিতে পরিণত করা হবে। কিন্তু সেই পরবর্তী অধ্যায় বোঝার জন্য ১৯৪১ সালের পূর্বাঞ্চলীয় গণগুলি স্মরণ করা অপরিহার্য। হলোকাস্টের লক্ষ লক্ষ শিকার কোনো গ্যাস চেম্বারে নয়, বরং নিজেদের শহর ও গ্রামের কাছাকাছি বন, মাঠ, খাদ এবং গণকবরের পাশে দাঁড়িয়ে নিহত হয়েছিলেন। অপারেশন বারবারোসা ও আইনজাট্‌সগ্রুপেনের ইতিহাস তাই দেখায়, হলোকাস্টের গণহত্যামূলক পর্যায় নির্মূল শিবির দিয়ে শুরু হয়নি; তার আগেই পূর্ব ইউরোপের মাটিতে গুলির মাধ্যমে সমগ্র ইহুদি সম্প্রদায় নিশ্চিহ্ন করার অভিযান শুরু হয়ে গিয়েছিল।