বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

রাজিয়া সুলতানা: দিল্লির সিংহাসনে বসা প্রথম ও একমাত্র নারী সুলতানের ইতিহাস

Series: ইতিহাস বদলে দেওয়া নারীরা

  • Author: Admin
  • August 17, 2026
রাজিয়া সুলতানা: দিল্লির সিংহাসনে বসা প্রথম ও একমাত্র নারী সুলতানের ইতিহাস
রাজিয়া সুলতানা

তেরো শতকের দিল্লি ছিল এমন এক রাজনৈতিক জগৎ, যেখানে ক্ষমতা নির্ভর করত সামরিক শক্তি, তুর্কি অভিজাতদের সমর্থন, রাজদরবারের ষড়যন্ত্র এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার ওপর। এই কঠোর পুরুষপ্রধান পরিবেশে একজন নারীর পক্ষে স্বাধীনভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করা প্রায় অকল্পনীয় ছিল। অথচ সেই দিল্লিতেই ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেছিলেন রাজিয়া, যিনি ইতিহাসে রাজিয়া সুলতানা নামে বেশি পরিচিত। তিনি শুধু কোনো সুলতানের স্ত্রী বা রাজমাতা হিসেবে ক্ষমতা ব্যবহার করেননি; তিনি নিজেই দিল্লি সালতানাতের সার্বভৌম শাসক হয়েছিলেন।

রাজিয়া ছিলেন দিল্লির শক্তিশালী সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুতমিশের কন্যা। ইলতুতমিশ মামলুক বা দাস রাজবংশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাসক এবং দিল্লি সালতানাতকে সুসংগঠিত রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রধান নির্মাতাদের একজন। তার শাসনামলে দিল্লির রাজনৈতিক কর্তৃত্ব উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়।

রাজিয়ার জন্মের সঠিক সাল নিশ্চিতভাবে জানা যায় না, তবে ধারণা করা হয় তিনি ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম দশকের দিকে জন্মেছিলেন। রাজপরিবারের অন্য নারীদের তুলনায় তিনি ব্যতিক্রমী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ লাভ করেছিলেন। তিনি প্রশাসন, রাজনীতি, ধর্মীয় শিক্ষা এবং সামরিক বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ঘোড়ায় চড়া এবং শাসনসংক্রান্ত কার্যক্রমেও তার দক্ষতা ছিল।

ইলতুতমিশ খুব দ্রুত বুঝতে পেরেছিলেন যে তার কন্যার মধ্যে শাসকের গুণ রয়েছে।

একবার ইলতুতমিশ সামরিক অভিযানে রাজধানীর বাইরে গেলে রাজিয়াকে দিল্লির প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। সেই সময় তিনি দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন এবং রাজধানীর জনগণ ও প্রশাসনের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলেন। এই অভিজ্ঞতা ইলতুতমিশকে তার সক্ষমতা সম্পর্কে আরও নিশ্চিত করে।

ইলতুতমিশের একজন যোগ্য পুত্র নাসিরুদ্দিন মাহমুদ অল্প বয়সে মারা গেলে উত্তরাধিকারের প্রশ্ন জটিল হয়ে ওঠে। তার অন্যান্য পুত্রদের মধ্যে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা দেখতে পাননি। ফলে প্রচলিত সামাজিক রীতিকে অগ্রাহ্য করে ইলতুতমিশ রাজিয়াকে নিজের উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করেছিলেন বলে মধ্যযুগীয় ইতিহাসকার মিনহাজ-ই-সিরাজের বিবরণ থেকে জানা যায়।

এই সিদ্ধান্ত ছিল যুগান্তকারী। মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে নারী শাসকের নজির সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল না, কিন্তু দিল্লির তুর্কি সামরিক অভিজাত সমাজে একজন নারীকে সর্বোচ্চ শাসক হিসেবে গ্রহণ করা ছিল অত্যন্ত কঠিন।

১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে ইলতুতমিশ মারা গেলে তার মনোনীত উত্তরসূরি রাজিয়া সঙ্গে সঙ্গে সিংহাসনে বসতে পারেননি। ক্ষমতাশালী তুর্কি অভিজাতরা একজন নারীকে শাসক হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করে। তারা ইলতুতমিশের পুত্র রুকনুদ্দিন ফিরোজকে সিংহাসনে বসায়।

কিন্তু রুকনুদ্দিন প্রশাসনে অযোগ্য প্রমাণিত হন। বাস্তবে তার মা শাহ তুরকান রাষ্ট্রের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন এবং বিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে শুরু করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দিল্লিতে তাদের বিরুদ্ধে প্রবল অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।

এই সংকটই রাজিয়ার জন্য সুযোগ তৈরি করে।

ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, রাজিয়া দিল্লির সাধারণ মানুষের কাছে সরাসরি আবেদন করেন এবং নিজের পিতার মনোনীত উত্তরাধিকারী হিসেবে সমর্থন চান। রুকনুদ্দিনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং ১২৩৬ সালের শেষদিকে রাজিয়া দিল্লির সিংহাসনে বসেন।

এখান থেকেই শুরু হয় ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যযুগীয় ইতিহাসের সবচেয়ে অস্বাভাবিক শাসনগুলোর একটি।

রাজিয়াকে সাধারণত ‘রাজিয়া সুলতানা’ বলা হলেও সমসাময়িক রাজনৈতিক অর্থে তিনি নিজেকে কেবল কোনো পুরুষ শাসকের নারী সঙ্গীর উপাধিতে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। তিনি ‘সুলতান’ হিসেবে স্বাধীন সার্বভৌম শাসকের মর্যাদা দাবি করেছিলেন। অর্থাৎ তার রাজনৈতিক পরিচয়ের মূল ভিত্তি ছিল নিজস্ব শাসনক্ষমতা।

রাজদরবারে তিনি প্রচলিত নারীনির্ভর অন্তঃপুরজীবনের সীমা অতিক্রম করেন। বিভিন্ন বিবরণে বলা হয়, তিনি প্রকাশ্যে দরবার করতেন, প্রশাসনিক সভায় অংশ নিতেন এবং এমন পোশাক পরতেন যা তাকে একজন কার্যকর শাসক হিসেবে জনসমক্ষে চলাফেরার সুযোগ দিত।

এটি কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ ছিল না। তার সামনে একটি বাস্তব রাজনৈতিক সমস্যা ছিল—তাকে বারবার প্রমাণ করতে হচ্ছিল যে একজন নারী হয়েও তিনি সেনাবাহিনী, প্রশাসন এবং রাজদরবার পরিচালনা করতে সক্ষম।

রাজিয়া প্রশাসনে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন এবং শক্তিশালী তুর্কি অভিজাতদের একচেটিয়া প্রভাব কমানোর উদ্যোগ নেন। ইলতুতমিশের সময়ে গড়ে ওঠা উচ্চপদস্থ তুর্কি দাস-অভিজাতদের একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী ছিল, যাদের সাধারণভাবে চিহালগানি বা চল্লিশজন অভিজাতের গোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তারা সুলতানের ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলেও নিজেদের স্বার্থ ও মর্যাদা রক্ষায় অত্যন্ত সক্রিয় ছিল।

রাজিয়ার জন্য এই অভিজাতরাই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সমস্যা হয়ে ওঠে।

তিনি চেষ্টা করেছিলেন ক্ষমতা শুধু পুরোনো তুর্কি অভিজাত পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও আনুগত্যের ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের উন্নীত করতে। এই নীতির সবচেয়ে বিতর্কিত উদাহরণ ছিলেন জামালউদ্দিন ইয়াকুত, যিনি আবিসিনীয় বা হাবশি বংশোদ্ভূত কর্মকর্তা ছিলেন এবং রাজকীয় অশ্বশালার গুরুত্বপূর্ণ পদে উন্নীত হন।

তুর্কি অভিজাতরা ইয়াকুতের উত্থানকে ভালোভাবে নেয়নি। কারণ তাদের চোখে একজন অ-তুর্কি ব্যক্তির দ্রুত পদোন্নতি তাদের রাজনৈতিক একচেটিয়া অবস্থানের জন্য হুমকি ছিল।

পরবর্তী ইতিহাস ও লোককাহিনিতে রাজিয়া ও ইয়াকুতের মধ্যে প্রেমের সম্পর্কের গল্প প্রচলিত হয়েছে। কিন্তু তাদের মধ্যে রোমান্টিক সম্পর্ক ছিল—এমন নির্ভরযোগ্য সমসাময়িক প্রমাণ নেই। বরং এই অভিযোগ রাজনৈতিক অপপ্রচার এবং রাজিয়ার চরিত্র দুর্বল করার প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে।

রাজিয়ার বিরুদ্ধে বিরোধিতা শুধু তার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে হয়নি। তার নারী পরিচয়ও বিরোধীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অস্ত্র ছিল। একজন পুরুষ শাসক যেভাবে স্বাধীনভাবে কর্মকর্তা নির্বাচন, সৈন্য পরিচালনা বা জনসমক্ষে উপস্থিত হতে পারতেন, রাজিয়ার একই কাজকে অনেক অভিজাত সামাজিক শৃঙ্খলার লঙ্ঘন হিসেবে দেখত।

তার বিরুদ্ধে লড়াই তাই শুধু কে দিল্লির সিংহাসন নিয়ন্ত্রণ করবে—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ ছিল না; একজন নারী আদৌ স্বাধীন সুলতান হতে পারেন কি না, সেটিও ছিল সেই সংঘাতের কেন্দ্রে।

তার শাসনকালে বিভিন্ন প্রাদেশিক গভর্নর ও অভিজাত বিদ্রোহ করেন। রাজিয়া সামরিক অভিযান পরিচালনা করে অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এতে বোঝা যায়, তিনি কেবল রাজপ্রাসাদের ভেতর থেকে শাসন করতেন না; প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বও গ্রহণ করতেন।

কিন্তু সবচেয়ে গুরুতর সংকট সৃষ্টি করেন ভাটিন্ডার গভর্নর মালিক ইখতিয়ারউদ্দিন আলতুনিয়া

১২৪০ খ্রিস্টাব্দে আলতুনিয়া বিদ্রোহ করলে রাজিয়া নিজেই সেনাবাহিনী নিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযান করেন। এই অভিযানের সময় রাজিয়ার বাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ইয়াকুত নিহত হন এবং রাজিয়া পরাজিত হয়ে আলতুনিয়ার হাতে বন্দি হন।

এদিকে দিল্লির ক্ষমতাশালী অভিজাতরা সুযোগটি কাজে লাগায়। তারা রাজিয়ার ভাই মুইজউদ্দিন বাহরাম শাহকে সিংহাসনে বসায়।

রাজিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ তখন প্রায় শেষ হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু তিনি আবারও পরিস্থিতি পাল্টানোর চেষ্টা করেন।

বন্দিত্বের সময় রাজিয়া ও আলতুনিয়ার মধ্যে সমঝোতা হয় এবং পরে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই বিয়ে রাজনৈতিক জোট হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আলতুনিয়া বুঝতে পেরেছিলেন যে দিল্লির নতুন ক্ষমতার কাঠামোতে তার নিজের অবস্থানও নিরাপদ নয়। ফলে রাজিয়াকে আবার সিংহাসনে ফিরিয়ে আনা তাদের যৌথ স্বার্থে পরিণত হয়।

রাজিয়া ও আলতুনিয়া সেনাবাহিনী সংগঠিত করে দিল্লির দিকে অগ্রসর হন।

কিন্তু তাদের বাহিনী বাহরাম শাহের পক্ষে থাকা শক্তির তুলনায় দুর্বল ছিল। দিল্লির কাছাকাছি সংঘর্ষে তারা পরাজিত হন এবং পিছু হটতে বাধ্য হন।

এর পরপরই রাজিয়ার জীবনের শেষ অধ্যায় শুরু হয়।

১২৪০ সালের অক্টোবরে রাজিয়া ও আলতুনিয়া নিহত হন। তাদের মৃত্যুর সঠিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। প্রচলিত একটি বিবরণ অনুযায়ী, পরাজয়ের পর তারা কাইথালের কাছে স্থানীয় আক্রমণকারীদের হাতে নিহত হন। অন্য বর্ণনায় ভিন্ন পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে। ফলে তাদের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট ঘটনাক্রম পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।

তবে নিশ্চিত বিষয় হলো, মাত্র প্রায় চার বছরের শাসনের পর রাজিয়ার সিংহাসন ও জীবন—দুটিই শেষ হয়ে যায়।

তার শাসনকাল দীর্ঘ ছিল না, কিন্তু তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অসাধারণ।

রাজিয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল কেবল বাইরের শত্রু নয়; তার শাসনের ভিত্তিই ছিল দুর্বল। দিল্লি সালতানাত তখন এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে সুলতানকে শক্তিশালী সামরিক অভিজাতদের সঙ্গে ক্রমাগত ভারসাম্য বজায় রাখতে হতো। রাজিয়া সেই অভিজাতদের ক্ষমতা সীমিত করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু একই সঙ্গে তাদের সামরিক সমর্থনের ওপরও নির্ভরশীল ছিলেন।

তার নারী পরিচয় এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। অনেক তুর্কি অভিজাত এমন একজন শাসককে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না যিনি তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছিলেন। ফলে প্রশাসনিক বিরোধিতা সহজেই লিঙ্গভিত্তিক বিরোধিতায় পরিণত হয়।

তবে রাজিয়াকে আধুনিক অর্থে নারী অধিকার আন্দোলনের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা ঐতিহাসিকভাবে যথাযথ নয়। তিনি নিজের যুগের একজন রাজবংশীয় শাসক ছিলেন এবং তার লক্ষ্য ছিল দিল্লি সালতানাতের ক্ষমতা নিজের হাতে ধরে রাখা। কিন্তু তার জীবন অনিচ্ছাকৃতভাবেই প্রমাণ করেছিল যে শাসনের দক্ষতা জন্মগতভাবে পুরুষের একচেটিয়া গুণ নয়।

মধ্যযুগীয় ইতিহাসকার মিনহাজ-ই-সিরাজ নিজেও রাজিয়ার প্রশাসনিক ও সামরিক গুণের প্রশংসা করেছিলেন। তিনি তাকে বিচক্ষণ, ন্যায়পরায়ণ, দানশীল এবং যোগ্য শাসক হিসেবে বর্ণনা করেন, যদিও একই সঙ্গে তার নারী হওয়াকে শাসনের জন্য সমস্যাজনক হিসেবে দেখেছিলেন। এই দ্বৈত মূল্যায়নই তৎকালীন সমাজের মানসিকতা স্পষ্ট করে।

রাজিয়ার দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন কম ছিল; সমস্যাটি ছিল সেই দক্ষতা একজন নারীর মধ্যে দেখা দিয়েছিল।

তার মৃত্যুর পর দিল্লির রাজনীতি আবার পুরুষ সুলতানদের নিয়ন্ত্রণে ফিরে যায়। মামলুক রাজবংশের পরবর্তী পর্যায়ে নাসিরুদ্দিন মাহমুদ এবং পরে গিয়াসউদ্দিন বলবনের মতো শক্তিশালী শাসক উঠে আসেন। কিন্তু রাজিয়ার মতো আর কোনো নারী দিল্লি সালতানাতের সুলতান হিসেবে সিংহাসনে বসতে পারেননি।

তার সমাধি নিয়েও ইতিহাসে কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে। দিল্লিতে রাজিয়া সুলতানের নামে পরিচিত একটি সমাধিস্থল রয়েছে, আবার কাইথালেও তার সমাধি বলে দাবি করা হয়। এই বিতর্ক যেন তার জীবনের অনেক ঘটনার মতোই ইতিহাস ও কিংবদন্তির মাঝামাঝি অবস্থান করে আছে।

রাজিয়া সুলতানের জীবন তাই কোনো সহজ রূপকথা নয়। তিনি রাজকন্যা ছিলেন, কিন্তু তার সিংহাসন নিশ্চিত ছিল না। বাবা তাকে উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, কিন্তু অভিজাতরা সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছিল। জনগণের সমর্থনে তিনি ক্ষমতায় ফিরেছিলেন, কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর তাকে এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছিল যার গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাকে কখনো পুরোপুরি গ্রহণ করেনি।

তার পতনের পেছনে প্রশাসনিক সংঘাত, তুর্কি অভিজাতদের ক্ষমতার লড়াই, প্রাদেশিক বিদ্রোহ এবং লিঙ্গভিত্তিক বিরোধিতা—সবগুলো কারণ একসঙ্গে কাজ করেছিল।

মাত্র কয়েক বছরের শাসন সত্ত্বেও রাজিয়া এমন এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন যা আট শতাব্দীরও বেশি সময় পর আজও আলোচিত। তিনি দেখিয়েছিলেন যে ত্রয়োদশ শতকের কঠোর সামরিক ও পুরুষপ্রধান রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেও একজন নারী সর্বোচ্চ ক্ষমতায় পৌঁছে কার্যকরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেন।

রাজিয়া সুলতানের ট্র্যাজেডি এই নয় যে তিনি একজন নারী হয়েও সুলতান হয়েছিলেন; বরং তিনি এমন একটি রাজনৈতিক যুগে সুলতান হয়েছিলেন, যে যুগ তার ক্ষমতা স্বীকার করার জন্য প্রস্তুত ছিল না। দিল্লির সিংহাসনে তার সময় সংক্ষিপ্ত হলেও সেই ব্যতিক্রমী চার বছরই তাকে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় নারী শাসকদের একজন করে রেখেছে।