বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

উ জেতিয়ান: চীনের ইতিহাসের একমাত্র নারী সম্রাট কীভাবে ক্ষমতার শীর্ষে উঠেছিলেন?

Series: ইতিহাস বদলে দেওয়া নারীরা

  • Author: Admin
  • August 17, 2026
উ জেতিয়ান: চীনের ইতিহাসের একমাত্র নারী সম্রাট কীভাবে ক্ষমতার শীর্ষে উঠেছিলেন?
উ জেতিয়ান

চীনের দীর্ঘ সাম্রাজ্যিক ইতিহাসে অসংখ্য সম্রাট সিংহাসনে বসেছেন। শক্তিশালী রাজবংশ গড়ে উঠেছে, পতন হয়েছে, শিশু সম্রাট থেকে শুরু করে দুর্ধর্ষ সামরিক শাসক পর্যন্ত নানা ধরনের ব্যক্তি ‘স্বর্গপুত্র’ হিসেবে সাম্রাজ্য পরিচালনা করেছেন। কিন্তু দুই হাজার বছরের বেশি সময়ের সেই ইতিহাসে মাত্র একজন নারী প্রচলিত সম্রাজ্ঞী বা রাজমাতা হিসেবে নয়, নিজের নামে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সম্রাট’ উপাধি গ্রহণ করে চীন শাসন করেছিলেন। তিনি উ জেতিয়ান।

উ জেতিয়ানের জন্ম ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে, তাং রাজবংশের শুরুর যুগে। তার জন্মনাম সাধারণত উ ঝাও বা উ মেই নামে বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়। তার বাবা উ শিয়ুয়ে কাঠ ব্যবসার মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করেছিলেন এবং তাং রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট গাওজুর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। পরিবারটি অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হলেও চীনের পুরোনো অভিজাত বংশগুলোর সমমর্যাদার ছিল না।

এই পারিবারিক অবস্থান উ জেতিয়ানের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি এমন পরিবেশে বড় হন যেখানে একজন নারীর জন্য অস্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা, ইতিহাস, সাহিত্য ও রাজনৈতিক বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ ছিল বলে ধারণা করা হয়। পরবর্তী জীবনে রাজদরবারের জটিল প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে যে দক্ষতা তিনি দেখিয়েছিলেন, তা তার উচ্চ বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার পরিচয় বহন করে।

প্রায় ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে, কিশোরী অবস্থায় উ জেতিয়ান সম্রাট তাইজংয়ের রাজদরবারে প্রবেশ করেন। তাকে সম্রাটের নিম্নস্তরের উপপত্নীদের একজন করা হয়। বিশাল রাজপ্রাসাদে শত শত নারী বিভিন্ন মর্যাদায় অবস্থান করতেন। সেখানে একজন অপেক্ষাকৃত নিম্নপদস্থ উপপত্নীর পক্ষে রাজনৈতিক গুরুত্ব অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন ছিল।

তাইজংয়ের জীবদ্দশায় উ জেতিয়ান উল্লেখযোগ্য ক্ষমতায় পৌঁছাতে পারেননি। কিন্তু রাজপ্রাসাদের এই সময়টি তাকে সাম্রাজ্যিক ক্ষমতার প্রকৃতি কাছ থেকে পর্যবেক্ষণের সুযোগ দিয়েছিল। তিনি দেখেছিলেন কীভাবে আমলাতন্ত্র কাজ করে, কীভাবে রাজপরিবারের সদস্যরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং কীভাবে সম্রাটকে ঘিরে ব্যক্তিগত সম্পর্কও রাষ্ট্রীয় রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

৬৪৯ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট তাইজং মারা গেলে উ জেতিয়ানের জীবনে প্রথম বড় বিপর্যয় আসে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, মৃত সম্রাটের যেসব উপপত্নীর সন্তান ছিল না, তাদের অনেককে বৌদ্ধ মঠে পাঠানো হতো। উ জেতিয়ানকেও একটি মঠে পাঠানো হয় এবং তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক জীবন কার্যত শেষ হয়ে গেছে বলেই মনে হওয়ার কথা।

কিন্তু এখানেই তার গল্পের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায় শুরু হয়।

তাইজংয়ের ছেলে সম্রাট গাওজং ইতোমধ্যে উ জেতিয়ানকে চিনতেন। তাদের সম্পর্ক ঠিক কখন শুরু হয়েছিল তা নিয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে অস্পষ্টতা রয়েছে, কিন্তু গাওজং সম্রাট হওয়ার পর উ জেতিয়ান আবার রাজপ্রাসাদে ফিরে আসেন। এটি ছিল অস্বাভাবিক ঘটনা, কারণ তিনি পূর্বে গাওজংয়ের বাবার উপপত্নী ছিলেন।

রাজপ্রাসাদে ফিরে উ জেতিয়ান দ্রুত সম্রাটের বিশেষ অনুগ্রহ অর্জন করেন। কিন্তু তার সামনে তখনও একটি বড় বাধা ছিল—গাওজংয়ের প্রধান স্ত্রী সম্রাজ্ঞী ওয়াং এবং শক্তিশালী উপপত্নী কনসোর্ট শিয়াও। রাজদরবারের নারীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধীরে ধীরে ক্ষমতার সংঘর্ষে পরিণত হয়।

উ জেতিয়ানের একটি শিশুকন্যার রহস্যজনক মৃত্যু এই সংঘর্ষের সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনাগুলোর একটি। পরবর্তী ঐতিহাসিক বিবরণে অভিযোগ করা হয়, উ জেতিয়ান নিজেই শিশুটিকে হত্যা করে সম্রাজ্ঞী ওয়াংকে দোষী করেছিলেন। কিন্তু এই অভিযোগ নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়, এবং উ জেতিয়ানের বিরুদ্ধে লেখা পরবর্তী শত্রুভাবাপন্ন সূত্রগুলোর প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি।

শেষ পর্যন্ত সম্রাজ্ঞী ওয়াং এবং কনসোর্ট শিয়াও ক্ষমতা হারান। ৬৫৫ খ্রিস্টাব্দে উ জেতিয়ান আনুষ্ঠানিকভাবে গাওজংয়ের সম্রাজ্ঞী হন। এটি ছিল তার উত্থানের গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কিন্তু তিনি কেবল সম্রাটের প্রধান স্ত্রী হয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না।

গাওজংয়ের শারীরিক অসুস্থতা বাড়তে থাকলে উ জেতিয়ান ক্রমশ রাষ্ট্র পরিচালনায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন। সম্রাট মাথাব্যথা ও দৃষ্টিসংক্রান্ত গুরুতর সমস্যায় ভুগতেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। ফলে সরকারি নথি, কর্মকর্তাদের প্রতিবেদন এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সম্রাজ্ঞীর ভূমিকা বাড়তে থাকে।

এক পর্যায়ে সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীকে একসঙ্গে ‘দুই সাধু’ বা দ্বৈত শাসনক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দেখা হতে থাকে। উ জেতিয়ান পর্দার আড়াল থেকে সভার কার্যক্রম শুনতেন, প্রশাসনিক বিষয়ে মতামত দিতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগে প্রভাব বিস্তার করতেন। চীনের পুরুষপ্রধান কনফুসীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটি ছিল অত্যন্ত ব্যতিক্রমী।

৬৮৩ খ্রিস্টাব্দে গাওজং মারা গেলে তাদের ছেলে ঝোংজং সম্রাট হন। কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা তখনও উ জেতিয়ানের হাতে ছিল। নতুন সম্রাট নিজের স্ত্রীর পরিবারের ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করলে উ জেতিয়ান দ্রুত তাকে অপসারণ করেন। এরপর আরেক ছেলে রুইজংকে সিংহাসনে বসানো হয়।

কাগজে-কলমে রুইজং সম্রাট হলেও রাষ্ট্রের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ছিল তার মায়ের হাতে।

এই সময় উ জেতিয়ান নিজের বিরোধীদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা নেন। তাং রাজপরিবারের সদস্য, পুরোনো অভিজাত পরিবার এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে যারা তার ক্ষমতার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারতেন, তাদের অনেককে অপসারণ করা হয়। তার শাসনের সঙ্গে গোপন পুলিশ, গুপ্ত অভিযোগ, তদন্ত, কারাবাস এবং রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযানের ইতিহাসও জড়িয়ে আছে।

৬৮৪ খ্রিস্টাব্দে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হলেও তা ব্যর্থ হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি ধীরে ধীরে এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করেন যেখানে তার ব্যক্তিগত শাসনের পথে বড় বাধাগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে।

কিন্তু শুধু ভয় দেখিয়ে চীনের সম্রাট হওয়া সম্ভব ছিল না। তাকে নিজের শাসনের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতে হতো।

চীনা রাজনৈতিক ঐতিহ্যে সম্রাটকে ‘স্বর্গের ম্যান্ডেট’ বা স্বর্গীয় অনুমোদনপ্রাপ্ত শাসক হিসেবে দেখা হতো। নারী হিসেবে সম্রাট হওয়ার ধারণা কনফুসীয় সামাজিক ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। উ জেতিয়ান তাই বৌদ্ধধর্মকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে রাজনৈতিক বৈধতার উৎস হিসেবে ব্যবহার করেন।

তার সমর্থকেরা এমন বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ও ভবিষ্যদ্বাণীর ব্যাখ্যা প্রচার করেন, যেখানে একজন নারী শাসকের আবির্ভাবের ধারণা ব্যবহার করা সম্ভব ছিল। বিশেষভাবে মৈত্রেয় বুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত রাজনৈতিক প্রতীক তার শাসনের বৈধতা নির্মাণে ব্যবহৃত হয়। তিনি বৌদ্ধ মঠ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষকতা করেন।

৬৯০ খ্রিস্টাব্দে উ জেতিয়ান শেষ পর্যন্ত নিজের ছেলে রুইজংকে সরিয়ে নিজেই সম্রাট ঘোষণা করেন। তিনি তাং রাজবংশ সাময়িকভাবে স্থগিত করে নিজের ঝৌ রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন।

এই মুহূর্তটি চীনের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

তিনি শুধু ‘সম্রাজ্ঞী’ উপাধি নেননি। তিনি পুরুষ শাসকদের জন্য ব্যবহৃত সর্বোচ্চ সাম্রাজ্যিক কর্তৃত্ব নিজের নামে গ্রহণ করেছিলেন। উ জেতিয়ান আর সম্রাটের স্ত্রী, বিধবা বা সম্রাটের মা নন—তিনি নিজেই ছিলেন সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ শাসক।

তার রাজধানীর রাজনৈতিক গুরুত্বও পরিবর্তিত হয়। লুওয়াংকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন এবং একে তার ক্ষমতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন। প্রশাসনে পুরোনো অভিজাত পরিবারের একচেটিয়া প্রভাব কমিয়ে নতুন প্রতিভাবান কর্মকর্তাদের সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন।

তার শাসনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল সাম্রাজ্যিক পরীক্ষাব্যবস্থা ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্রের প্রসার। পরীক্ষাব্যবস্থা তার আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল, তাই এটিকে তার আবিষ্কার বলা ভুল। কিন্তু তিনি পরীক্ষার মাধ্যমে কর্মকর্তা নিয়োগের পরিধি বাড়াতে সাহায্য করেন এবং এমন ব্যক্তিদের প্রশাসনে উন্নীত করেন যারা ঐতিহ্যবাহী অভিজাত বংশের সদস্য ছিলেন না।

এটি একই সঙ্গে রাজনৈতিক কৌশলও ছিল। পুরোনো অভিজাতদের ওপর নির্ভর না করে নিজের কাছে ঋণী নতুন কর্মকর্তাদের উত্থান ঘটিয়ে উ জেতিয়ান নিজস্ব ক্ষমতার ভিত্তি শক্তিশালী করেছিলেন।

তার শাসনামলে কৃষি, প্রশাসন এবং জনজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্থানীয় কর্মকর্তাদের কার্যকারিতা মূল্যায়ন, কৃষি উৎপাদন উৎসাহিত করা এবং সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যোগ্য ব্যক্তিদের প্রশাসনে আনার চেষ্টা তার শাসনকে শুধু প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের ইতিহাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না।

সামরিক ক্ষেত্রেও তার সময় গুরুত্বপূর্ণ। তাং-ঝৌ রাষ্ট্র মধ্য এশিয়া ও সীমান্ত অঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিল। তিব্বতি সাম্রাজ্য, তুর্কি শক্তি এবং অন্যান্য প্রতিবেশীর সঙ্গে সংঘর্ষ চলতে থাকে। কিছু অঞ্চল হারানো হলেও পরবর্তী অভিযানে চীনা প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা সফল হয়।

উ জেতিয়ানের ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতার অন্যতম দৃশ্যমান নিদর্শন পাওয়া যায় লংমেন গুহামন্দিরে। সেখানে বিশাল বৌদ্ধ ভাস্কর্য নির্মাণের সঙ্গে তার শাসনকালের পৃষ্ঠপোষকতার সম্পর্ক রয়েছে। ধর্ম, শিল্প এবং রাজকীয় ক্ষমতাকে তিনি এমনভাবে যুক্ত করেছিলেন যাতে তার শাসন শুধু রাজনৈতিক নয়, প্রতীকী ও আধ্যাত্মিক বৈধতাও লাভ করে।

তবে তার শাসনের অন্ধকার দিক উপেক্ষা করা যায় না। ক্ষমতায় ওঠার পথে এবং ক্ষমতা ধরে রাখতে তিনি অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। বিরোধীদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড, নির্বাসন ও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। তার গোপন পুলিশব্যবস্থা বিশেষভাবে কুখ্যাত হয়ে ওঠে।

কিন্তু এখানেও ঐতিহাসিক সূত্র মূল্যায়নে সতর্কতা জরুরি। উ জেতিয়ানের ইতিহাসের বড় অংশ পরবর্তী কনফুসীয় পুরুষ ইতিহাসবিদদের হাতে লেখা, যাদের কাছে একজন নারীর সম্রাট হওয়াই ছিল প্রচলিত রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার লঙ্ঘন। ফলে তার নিষ্ঠুরতা নিয়ে অনেক অভিযোগ সত্য হলেও নারী শাসক হিসেবে তার বিরুদ্ধে নৈতিক আক্রমণ যে অতিরঞ্জিত হয়েছে, সেই সম্ভাবনাও ইতিহাসবিদরা বিবেচনা করেন।

তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও পরবর্তী ইতিহাসে প্রচুর কেলেঙ্কারিমূলক গল্প রয়েছে। বৃদ্ধ বয়সে ঝাং ভাইদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা বিশেষভাবে আলোচিত হয়। কিন্তু পুরুষ সম্রাটদের অসংখ্য উপপত্নী থাকা যেখানে স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হতো, সেখানে একজন নারী শাসকের ব্যক্তিগত সম্পর্ককে রাজনৈতিক চরিত্রহরণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না।

অবশেষে বয়স তার ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। ৭০৫ খ্রিস্টাব্দে, তিনি প্রায় আশি বছর বয়সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে রাজদরবারে অভ্যুত্থান ঘটে। ঝাং ভাইদের হত্যা করা হয় এবং উ জেতিয়ানকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। তার ছেলে ঝোংজং পুনরায় সম্রাট হন এবং তাং রাজবংশ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

একই বছরের শেষদিকে উ জেতিয়ান মারা যান।

তার মৃত্যুর পর একটি অসাধারণ বিষয় ইতিহাসে রয়ে যায়। তার সমাধির কাছে স্থাপিত বিখ্যাত ‘শব্দহীন শিলালিপি’ বা Blank Stele-তে তার কৃতিত্বের দীর্ঘ প্রশস্তি খোদাই করা হয়নি। কেন সেটি ফাঁকা রাখা হয়েছিল তা নিশ্চিত নয়। পরবর্তী যুগে এটি যেন তার বিতর্কিত উত্তরাধিকারের প্রতীকে পরিণত হয়েছে—তার বিচার ইতিহাস নিজেই করবে।

উ জেতিয়ানের জীবনকে শুধু নিষ্ঠুর ক্ষমতালোভী নারীর গল্প হিসেবে দেখলে যেমন ইতিহাস অসম্পূর্ণ থাকে, তেমনি তাকে নিখুঁত নারীবাদী নায়িকা হিসেবে উপস্থাপন করাও কালানুক্রমিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি ছিলেন অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী, রাজনৈতিকভাবে দক্ষ, নির্মম প্রয়োজনে কঠোর এবং প্রশাসনিক প্রতিভা চিনতে সক্ষম একজন সাম্রাজ্যিক শাসক।

সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো তার ক্ষমতায় ওঠার পথ। একজন কিশোরী উপপত্নী হিসেবে রাজপ্রাসাদে প্রবেশ, সম্রাটের মৃত্যুর পর মঠে নির্বাসিত জীবন, আবার প্রাসাদে প্রত্যাবর্তন, সম্রাজ্ঞী হওয়া, অসুস্থ স্বামীর পাশে কার্যত সহশাসক হওয়া, নিজের ছেলেদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং অবশেষে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা—উ জেতিয়ানের রাজনৈতিক যাত্রার তুলনা বিশ্ব ইতিহাসেও খুব কম পাওয়া যায়।

তিনি এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার সর্বোচ্চ আসন দখল করেছিলেন, যে ব্যবস্থার সামাজিক দর্শনই নারীর হাতে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রক্ষমতার ধারণাকে প্রায় অস্বীকার করত। এই কারণেই ৬৯০ সালে উ জেতিয়ানের সম্রাট হিসেবে অভিষেক শুধু একজন নারীর ব্যক্তিগত বিজয় ছিল না; এটি ছিল চীনের সাম্রাজ্যিক ইতিহাসের সবচেয়ে অস্বাভাবিক ক্ষমতার পালাবদলগুলোর একটি।

তার প্রতিষ্ঠিত ঝৌ রাজবংশ মাত্র পনেরো বছর স্থায়ী হয়েছিল এবং মৃত্যুর পর তাং রাজবংশ আবার ফিরে আসে। কিন্তু উ জেতিয়ান আর কখনো ইতিহাস থেকে মুছে যাননি। তার আগে চীনে শক্তিশালী সম্রাজ্ঞী ছিলেন, তার পরেও বহু সম্রাজ্ঞী ও রাজমাতা বিপুল ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন—কিন্তু নিজের নামে সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ উপাধি গ্রহণ করে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্রাট হওয়ার নজির আর কোনো নারী সৃষ্টি করতে পারেননি। সেই অনন্য অবস্থানই উ জেতিয়ানকে চীনের ইতিহাসে শুধু একজন ক্ষমতাধর নারী নয়, বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম ব্যতিক্রমী শাসকে পরিণত করেছে।