বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ফ্রেডেরিক্সবর্গ ক্যাসেল: ডেনমার্কের রেনেসাঁ প্রাসাদ ও রাজ্যাভিষেকের ইতিহাস

সিরিজ: বিশ্বের কিংবদন্তি দুর্গ ও প্রাসাদ

ফ্রেডেরিক্সবর্গ ক্যাসেল: ডেনমার্কের রেনেসাঁ প্রাসাদ ও রাজ্যাভিষেকের ইতিহাস
ফ্রেডেরিক্সবর্গ ক্যাসেল

ডেনমার্কের হিলেরোড শহরে হ্রদের পানির ওপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা ফ্রেডেরিক্সবর্গ ক্যাসেলকে প্রথম দেখায় রূপকথার প্রাসাদ মনে হতে পারে। লাল ইটের দেয়াল, বেলেপাথরের অলংকরণ, সবুজাভ তামার ছাদ এবং অসংখ্য চূড়া মিলিয়ে এটি উত্তর ইউরোপের রেনেসাঁ স্থাপত্যের এক অসাধারণ নিদর্শন। কিন্তু এর সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে রাজকীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, ধর্মীয় অভিষেক এবং ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ইতিহাস। ফ্রেডেরিক্সবর্গ ছিল এমন এক মঞ্চ, যেখানে ডেনিশ রাজারা স্থাপত্য ও আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে নিজেদের ক্ষমতাকে দৃশ্যমান করে তুলেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেই রাজপ্রাসাদই জাতীয় ইতিহাস সংরক্ষণের কেন্দ্রে পরিণত হয়।

ফ্রেডেরিক্সবর্গের অবস্থান রাজধানী কোপেনহেগেনের উত্তরে, জিল্যান্ড দ্বীপের উত্তরাঞ্চলে। হ্রদের তিনটি ছোট দ্বীপ ব্যবহার করে প্রাসাদটির বিভিন্ন অংশ গড়ে তোলা হয়। সেতু, প্রবেশপথ ও ধারাবাহিক প্রাঙ্গণের মধ্য দিয়ে মূল ভবনের দিকে এগোতে হয়। এই বিন্যাস দর্শনার্থীকে ধীরে ধীরে রাজকীয় পরিসরে প্রবেশ করায়। পানিবেষ্টিত অবস্থান কিছুটা বিচ্ছিন্নতা ও নিরাপত্তা দিলেও বর্তমান প্রাসাদটি মূলত সামরিক অবরোধ মোকাবিলার দুর্গ নয়। এর পরিকল্পনায় বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল রাজপরিবারের আবাসন, দরবারের কার্যক্রম এবং বিদেশি প্রতিনিধিদের সামনে রাজশক্তির মর্যাদা প্রদর্শন।

এই স্থানের রাজকীয় ইতিহাস শুরু হয় ষোড়শ শতকে। রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক ১৫৬০ সালে জমিটি অধিগ্রহণ করেন এবং এখানে নিজের নামে একটি প্রাসাদ গড়ে তোলেন। তবে আজ যে বিশাল স্থাপনাটি দেখা যায়, তার প্রধান রূপকার তাঁর পুত্র চতুর্থ ক্রিশ্চিয়ান। ১৫৭৭ সালে এই স্থানেই তাঁর জন্ম হয়েছিল। ফলে ফ্রেডেরিক্সবর্গের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কও ছিল গভীর। সপ্তদশ শতকের প্রথম দুই দশকে তিনি পুরোনো স্থাপনার বড় অংশ সরিয়ে আরও উচ্চাভিলাষী একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন। নতুন ফ্রেডেরিক্সবর্গ হয়ে ওঠে তাঁর নির্মাণপ্রিয়তা এবং ডেনমার্ককে শক্তিশালী ইউরোপীয় রাজ্য হিসেবে তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ।

প্রাসাদের স্থাপত্যে ডাচ রেনেসাঁর প্রভাব স্পষ্ট। লাল ইটের পটভূমিতে হালকা রঙের পাথরের জানালার ঘের, কারুকার্যময় সম্মুখভাগ এবং অলংকৃত চূড়া চোখে পড়ে। নির্মাণের সঙ্গে হান্স ভান স্টেনভিনকেল পরিবারের স্থপতিদের নাম যুক্ত। এখানে ইতালীয় রেনেসাঁর অনুপাত ও শৃঙ্খলার ধারণা উত্তর ইউরোপের ইটনির্ভর নির্মাণরীতির সঙ্গে মিশেছে। বাইরে থেকে ভবনটি একত্রিত মনে হলেও এর বিভিন্ন অংশে রাজকীয় বাসস্থান, প্রশাসনিক কাজ এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আলাদা পরিসর ছিল। স্থাপত্যের প্রতিটি প্রধান অংশ দরবারের সামাজিক স্তরবিন্যাস ও রাজার কেন্দ্রীয় অবস্থানকে জোরালো করত।

প্রাসাদের বহিরাঙ্গনের উল্লেখযোগ্য উপাদান নেপচুন ফোয়ারা। সমুদ্রদেবতা নেপচুনের উপস্থিতি ডেনমার্কের সামুদ্রিক ক্ষমতার দাবির সঙ্গে যুক্ত ছিল। চতুর্থ ক্রিশ্চিয়ানের সময় নৌবাণিজ্য, প্রণালি নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে এই ফোয়ারা নিছক সাজসজ্জা ছিল না; এটি ছিল রাজনৈতিক প্রতীক। ১৬৫৯ সালে সুইডিশ বাহিনী মূল ভাস্কর্যগুলো যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে নিয়ে যায়। বর্তমানে দেখা ফোয়ারাটি পরবর্তী পুনর্নির্মাণের ফল। এর ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়, ইউরোপীয় রাজাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয় প্রায়ই তাঁদের প্রাসাদের শিল্পসম্পদেও স্থায়ী চিহ্ন রেখে যেত।

ফ্রেডেরিক্সবর্গের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ স্থানগুলোর একটি হলো প্রাসাদের চ্যাপেল। ১৬১৭ সালে উদ্বোধন করা এই উপাসনালয়ে সোনালি অলংকরণ, খোদাই করা কাঠের কাজ এবং সমৃদ্ধ ধর্মীয় শিল্পের সমাবেশ ঘটেছে। রাজপরিবারের জন্য নির্ধারিত স্থানও এখানে তাঁদের বিশেষ মর্যাদা প্রকাশ করত। চ্যাপেলের বিখ্যাত কম্পেনিয়ুস অর্গানটি বিশেষ আকর্ষণ, যার নির্মাণে ধাতব পাইপের পরিবর্তে কাঠের পাইপ ব্যবহৃত হয়েছে। সংগীত, ধর্মীয় আচরণ ও দৃষ্টিনন্দন অলংকরণ একসঙ্গে এমন পরিবেশ তৈরি করত, যেখানে রাজাকে সাধারণ মানুষের ঊর্ধ্বে স্থাপিত এক শাসক হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব হতো।

তবে ফ্রেডেরিক্সবর্গের রাজ্যাভিষেকের ইতিহাস বুঝতে রাজমুকুট পরানো এবং পবিত্র তেল দিয়ে অভিষিক্ত করার পার্থক্য জানা জরুরি। ১৬৬০ সালে ডেনমার্কে বংশানুক্রমিক নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর শাসকের বৈধতা প্রকাশের পুরোনো পদ্ধতি বদলে যায়। আগে রাজা নির্বাচনের সঙ্গে অভিজাতদের রাজনৈতিক ভূমিকা যুক্ত ছিল। নতুন ব্যবস্থায় রাজশক্তিকে বংশগত এবং ঈশ্বরপ্রদত্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে আনুষ্ঠানিকতার কেন্দ্রে আসে ধর্মীয় অভিষেক। এই অনুষ্ঠানে বিশপের কাছ থেকে রাজা নতুন করে শাসনক্ষমতা গ্রহণ করছেন—এমন ধারণার পরিবর্তে তাঁর আগে থেকেই বিদ্যমান রাজকীয় অধিকারের পবিত্রতা তুলে ধরা হয়।

১৬৭১ থেকে ১৮৪০ সালের মধ্যে ডেনমার্কের একাধিক রাজার অভিষেক ফ্রেডেরিক্সবর্গের চ্যাপেলে অনুষ্ঠিত হয়। পঞ্চম ক্রিশ্চিয়ানের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই ধারার শেষ রাজা ছিলেন অষ্টম ক্রিশ্চিয়ান। রাজা মুকুট ও রাজকীয় প্রতীকসহ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতেন; ধর্মীয় প্রার্থনা এবং তেল দিয়ে অভিষেক তাঁর অবস্থানকে পবিত্র মর্যাদা দিত। চ্যাপেলটি তাই উপাসনালয়ের পাশাপাশি নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের রাজনৈতিক দর্শন প্রকাশের স্থানও ছিল। অভিজাত, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতি সেই বার্তাকে দরবারের বাইরেও ছড়িয়ে দিত। ১৮৪৯ সালের সাংবিধানিক পরিবর্তনের পর এই রাজকীয় অভিষেকের ধারা আর অব্যাহত থাকেনি।

প্রাসাদের ইতিহাসে কূটনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। ১৭২০ সালের ফ্রেডেরিক্সবর্গ চুক্তি ডেনমার্ক-নরওয়ে ও সুইডেনের মধ্যে মহা উত্তর যুদ্ধের সংঘাতের অবসান ঘটায়। এই ঘটনা দেখায়, রাজপ্রাসাদে উৎসব ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছাড়াও ইউরোপীয় শক্তির সম্পর্ক নির্ধারণের কাজ চলত। তবে সময়ের সঙ্গে রাজপরিবারের নিয়মিত আবাস হিসেবে ফ্রেডেরিক্সবর্গের গুরুত্ব কমে আসে। অন্য প্রাসাদ দরবারের দৈনন্দিন জীবনে বেশি প্রাধান্য পায়। তবু এখানকার চ্যাপেল, ঐতিহাসিক কক্ষ এবং রাজকীয় স্মৃতি একে ডেনিশ রাজতন্ত্রের প্রতীকী মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ধরে রাখে।

এই দীর্ঘ ইতিহাসে সবচেয়ে বিপর্যয়কর দিন আসে ১৮৫৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর। সপ্তম ফ্রেডেরিকের অবস্থানকালে প্রাসাদে আগুন লাগে এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শীতের সময় ভবন গরম রাখার ব্যবস্থার সঙ্গে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত যুক্ত ছিল। আগুনে মূল প্রাসাদের ছাদ, বহু কক্ষ এবং মূল্যবান অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা ধ্বংস হয়। তবে চ্যাপেল এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ রক্ষা পায়। তাই আজকের প্রাসাদ দেখতে গেলে মনে রাখা দরকার, এর সমস্ত কক্ষ সপ্তদশ শতক থেকে অপরিবর্তিত অবস্থায় টিকে নেই। বহু অংশ পরবর্তী পুনর্গঠন ও ঐতিহাসিক পুনর্সজ্জার ফল।

অগ্নিকাণ্ডের পর ফ্রেডেরিক্সবর্গকে পুনরুদ্ধার করার উদ্যোগ জাতীয় গুরুত্ব পায়। রাজতন্ত্রের পুরোনো স্মারক সংরক্ষণ তখন ডেনমার্কের অতীতকে নতুনভাবে বোঝার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হয়ে ওঠে। কার্লসবার্গের প্রতিষ্ঠাতা শিল্পপতি জে. সি. ইয়াকবসেন এই কাজে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তাঁর উদ্যোগ ও আর্থিক সহায়তায় প্রাসাদে জাতীয় ইতিহাসের জাদুঘর প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়; ১৮৭৮ সাল এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। পুরোনো রাজকীয় বাসভবনকে শুধু আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে দেশের ইতিহাস জনসাধারণের সামনে তুলে ধরার একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হয়।

এই জাদুঘরের বিশেষত্ব হলো প্রতিকৃতি, ইতিহাসভিত্তিক চিত্রকর্ম, আসবাব এবং সজ্জিত কক্ষের মাধ্যমে অতীতকে উপস্থাপন করা। রাজা-রানির পাশাপাশি রাজনীতিবিদ, শিল্পী ও অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তির উপস্থিতি ডেনমার্কের ইতিহাসকে বিস্তৃত পরিসর দেয়। পুনর্নির্মিত বিশাল হলগুলো রাজদরবারের জাঁকজমক অনুভব করতে সাহায্য করে। তবে ঐতিহাসিক ঘটনার অনেক চিত্র পরবর্তী যুগে আঁকা; সেগুলোকে ঘটনার প্রত্যক্ষ দৃশ্য হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। একটি জাতি নিজের অতীতকে কীভাবে স্মরণ করতে চেয়েছে, এই ছবিগুলো সেই ইতিহাসও প্রকাশ করে।

ফ্রেডেরিক্সবর্গের বাগানেও সময়ের পরিবর্তন পড়া যায়। অষ্টাদশ শতকে গড়ে ওঠা বারোক বাগানের অক্ষভিত্তিক বিন্যাস, ছাঁটা গাছপালা এবং জ্যামিতিক নকশা প্রকৃতির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণের ধারণা প্রকাশ করে। পরবর্তী সংস্কার ও পুনরুদ্ধারে সেই ঐতিহাসিক পরিকল্পনা আবার দৃশ্যমান করা হয়েছে। ফলে প্রাসাদের চারপাশের পরিবেশও এক যুগের স্থির ছবি নয়। রেনেসাঁ ভবন, বারোক বাগান এবং পরবর্তী সংরক্ষণপ্রচেষ্টা মিলে এখানে বহু সময়ের সাক্ষ্য পাশাপাশি অবস্থান করছে।

ফ্রেডেরিক্সবর্গের আকর্ষণ শেষ পর্যন্ত তার সৌন্দর্যের চেয়েও বিস্তৃত। এখানে চতুর্থ ক্রিশ্চিয়ানের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নিরঙ্কুশ রাজাদের পবিত্র অভিষেক, সুইডিশ যুদ্ধের ক্ষত এবং অগ্নিকাণ্ডের পর পুনরুত্থান একই ইতিহাসের অংশ। যে প্রাসাদ একসময় রাজবংশের মহিমা ঘোষণা করত, সেটিই পরে একটি জাতির স্মৃতি সংরক্ষণের আশ্রয় হয়ে ওঠে। হ্রদের পানিতে প্রতিফলিত এর টাওয়ারগুলো তাই কেবল রাজকীয় অতীতের প্রতীক নয়; ধ্বংসের পর মানুষ কীভাবে ইতিহাসকে নতুন অর্থে ফিরিয়ে আনে, তারও দৃশ্যমান সাক্ষ্য।