বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

দিদেরো ও এনসাইক্লোপিডিয়া: আলোকায়নের জ্ঞান যেভাবে ইউরোপজুড়ে ছড়িয়েছিল

সিরিজ: আলোকায়নের যুগ (The Age of Enlightenment)

দিদেরো ও এনসাইক্লোপিডিয়া: আলোকায়নের জ্ঞান যেভাবে ইউরোপজুড়ে ছড়িয়েছিল
বই, কারুশিল্পের চিত্র ও স্যালনের আলোচনায় ছড়িয়ে পড়ে আলোকায়নের জ্ঞান।

রুশোর সামাজিক চুক্তি স্বাধীনতা ও সাম্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছিল, কিন্তু সেই প্রশ্ন সমাজে প্রভাব ফেলতে হলে মানুষের কাছে পৌঁছানো দরকার ছিল। বিচ্ছিন্ন পাণ্ডুলিপি কিংবা কয়েকজন দার্শনিকের কথোপকথন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ছিল জ্ঞান সংগ্রহ, প্রকাশ এবং আলোচনার বিস্তৃত ব্যবস্থা। অষ্টাদশ শতাব্দীর ফ্রান্সে দনি দিদেরোর এনসাইক্লোপিডিয়া এই কাজের এক অসাধারণ উদ্যোগ হয়ে ওঠে। আলোকায়ন শুধু নতুন ধারণার ইতিহাস নয়; সেই ধারণা তৈরি, ছাপানো, কেনাবেচা এবং আলোচনা করার ইতিহাসও। বইয়ের পাতা ও সামাজিক যোগাযোগ একসঙ্গে ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ বদলাতে থাকে।

১৭১৩ সালে লঁগ্র শহরে জন্ম নেওয়া দিদেরো প্যারিসে এসে অনুবাদ, সাহিত্যচর্চা ও লেখালেখির মাধ্যমে জীবিকা গড়ে তোলেন। যে প্রকল্পে তাঁর নাম স্থায়ী হয়ে থাকবে, সেটির শুরু হয়েছিল ইংরেজ লেখক এফ্রেইম চেম্বার্সের সাইক্লোপিডিয়া অনুবাদের পরিকল্পনা থেকে। কিন্তু দিদেরো ও গণিতবিদ জঁ ল্য রোঁ দালঁবেরের সম্পাদনায় কাজটি দ্রুত অনুবাদের সীমা ছাড়িয়ে যায়। লক্ষ্য হয় বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্প ও কারুশিল্পের জ্ঞানকে নতুনভাবে সংগঠিত করা। ১৭৫১ সালে প্রকাশিত প্রথম খণ্ড সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার দৃশ্যমান সূচনা।

গ্রন্থটির পূর্ণ নামেই বিজ্ঞান, শিল্পকলা ও কারুশিল্পের যুক্তিসংগত অভিধান তৈরির অভিপ্রায় ছিল। দালঁবেরের প্রারম্ভিক আলোচনায় মানবজ্ঞানকে স্মৃতি, যুক্তি ও কল্পনার মতো মানসিক ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত করে সাজানো হয়। এই বিন্যাস গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জ্ঞানের বিষয়গুলোকে প্রধানত মানবীয় অনুসন্ধানের সম্পর্কের মধ্যে স্থাপন করা হচ্ছিল। ধর্মতত্ত্বও আলোচনার একটি শাখা হিসেবে জায়গা পায়। কোন জ্ঞান কোথায় বসবে, সেই সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তই প্রচলিত বৌদ্ধিক শ্রেণিবিন্যাসকে প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি করেছিল।

১৭৫১ থেকে ১৭৭২ সালের মধ্যে মূল প্রকল্পের ১৭টি পাঠ্যখণ্ড ও ১১টি চিত্রখণ্ড প্রকাশিত হয়। এতে দর্শন ও রাজনীতির পাশাপাশি গণিত, চিকিৎসা, কৃষি, বস্ত্র উৎপাদন এবং বিভিন্ন যন্ত্রের আলোচনা ছিল। ভলতেয়ার, মন্টেস্কু ও রুশোর মতো পরিচিত ব্যক্তিদের অবদান থাকলেও কাজটি তাঁদের কয়েকজনের মধ্যে সীমিত ছিল না। বিপুলসংখ্যক নিবন্ধ লিখেছিলেন লুই দ্য জোকুর। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিল্পী এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞও যুক্ত ছিলেন। ফলে এনসাইক্লোপিডিয়া ছিল দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা, সম্পাদনা ও প্রকাশনার ফল।

এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল কারিগরি জ্ঞানকে মর্যাদা দেওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনায় হাতে-কলমে কাজের দক্ষতা প্রায়ই নিচু স্থান পেত। দিদেরোর প্রকল্পে তাঁত চালানো, ধাতু ঢালাই, কাগজ তৈরি বা অস্ত্রোপচারের যন্ত্র ব্যবহারের মতো বিষয়ও বিশদভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়। কর্মশালা থেকে তথ্য সংগ্রহ এবং কাজের ধাপ বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। এতে কারিগরের অভিজ্ঞতা লিখিত জ্ঞানের অংশ হয়ে ওঠে। জ্ঞান কেবল লাতিনভাষী পণ্ডিতের সম্পদ—এই সামাজিক ধারণার বিরুদ্ধে এটি একটি কার্যকর অবস্থান ছিল।

চিত্রখণ্ডগুলো এই লক্ষ্য পূরণে বিশেষ ভূমিকা রাখে। শুধু যন্ত্রের বাইরের চেহারা দেখিয়ে থামা হয়নি; যন্ত্রাংশ, উপকরণ এবং উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ও দেখানো হয়েছে। পাঠক একটি কর্মশালার বিন্যাস কিংবা কোনো প্রযুক্তির কার্যপদ্ধতি চোখে দেখে বুঝতে পারতেন। অবশ্য ছবি দেখেই সব দক্ষতা আয়ত্ত করা সম্ভব ছিল না; বাস্তব অনুশীলনের বিকল্প তৈরি হয়নি। তবু লিখিত ব্যাখ্যার সঙ্গে দৃশ্যমান প্রমাণ যুক্ত করে প্রযুক্তিগত জ্ঞান সংরক্ষণ ও তুলনা করার সুযোগ বহুগুণ বেড়েছিল।

এনসাইক্লোপিডিয়ার বর্ণানুক্রমিক বিন্যাসের পাশাপাশি আন্তঃনির্দেশ বা এক নিবন্ধ থেকে অন্য নিবন্ধে যাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। পাঠক একটি শব্দের ব্যাখ্যা পড়ে সংশ্লিষ্ট অন্য আলোচনায় পৌঁছাতে পারতেন। কখনো এই সংযোগ প্রচলিত বিশ্বাসের সঙ্গে সমালোচনামূলক আলোচনার সম্পর্ক তৈরি করত। এতে বইটি নিছক বিচ্ছিন্ন তথ্যের ভান্ডার থাকেনি; বিষয়গুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক বিচার করার উপায় হয়েছে। তবে সব নিবন্ধ একই মত প্রকাশ করত না। বিভিন্ন লেখকের অবস্থান, সতর্কতা এবং সম্পাদকীয় সমঝোতা মিলিয়ে এতে মতের বৈচিত্র্যও ছিল।

এমন প্রকল্প কর্তৃপক্ষের সন্দেহের মুখে পড়বে, সেটি অস্বাভাবিক ছিল না। ১৭৫২ সালে প্রকাশনা সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়; ১৭৫৯ সালে এর রাজকীয় প্রকাশনা-অনুমতি প্রত্যাহৃত হয় এবং পোপও গ্রন্থটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেন। ধর্ম, নৈতিকতা ও কর্তৃত্ব সম্পর্কে কিছু নিবন্ধ বিশেষ আপত্তির কারণ হয়েছিল। দালঁবের একপর্যায়ে সম্পাদকীয় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালেও দিদেরো কাজ চালিয়ে যান। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও প্রকাশনার কার্যক্রম পুরোপুরি শেষ হয়নি; গোপনীয়তা, পৃষ্ঠপোষকতা এবং প্রশাসনের ভেতরের সহায়তা প্রকল্পকে টিকিয়ে রাখে।

সেন্সরশিপ তাই কেবল লেখক ও রাষ্ট্রের সরাসরি সংঘর্ষ ছিল না। প্রকাশককে বিনিয়োগ বাঁচাতে হতো, কর্মকর্তাদের মধ্যেও মতভেদ ছিল এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কখনো সুরক্ষা দিতেন। বইবিষয়ক প্রশাসনের কর্মকর্তা মালজের্বের ভূমিকা এই জটিলতার উদাহরণ। আবার মুদ্রক-প্রকাশক আঁদ্রে ল্য ব্রেতোঁ দিদেরোর অজান্তে কিছু বক্তব্য বাদ দেন বা বদলে দেন, যাতে বিপদের আশঙ্কা কমে। বিষয়টি জানতে পেরে দিদেরো ক্ষুব্ধ হন। ছাপাখানা চিন্তার বাহন হলেও বাণিজ্যিক ভয় ও আত্মসেন্সরশিপের স্থানও ছিল।

মুদ্রণযন্ত্র অবশ্য অষ্টাদশ শতাব্দীর আবিষ্কার নয়। ইউরোপে চলনশীল ধাতব অক্ষরে মুদ্রণের প্রসার শুরু হয়েছিল পঞ্চদশ শতাব্দীতে। আলোকায়নের যুগে পরিবর্তন আসে প্রকাশনার পরিমাণ, পাঠকসমাজ, বিতরণব্যবস্থা ও আলোচনার ঘনত্বে। মুদ্রাক্ষর সাজানো কর্মী, প্রুফ সংশোধক, খোদাইশিল্পী, কাগজ প্রস্তুতকারক ও বই বাঁধাইকারীর সম্মিলিত শ্রম ছাড়া এনসাইক্লোপিডিয়া সম্ভব হতো না। বই বিক্রেতা ও পরিবহনকারীরা সেই শ্রমের ফল বিভিন্ন শহরে পৌঁছে দিতেন। ধারণার বিস্তার ছিল বস্তুগত উৎপাদন ও ব্যবসার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

এই বই সবার নাগালের মধ্যে ছিল না। মূল সংস্করণ ছিল বড়, ব্যয়বহুল এবং প্রধানত সচ্ছল গ্রাহকদের উপযোগী। অভিজাত, কর্মকর্তা, পেশাজীবী ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে এর পাঠক পাওয়া যায়। পরে বিভিন্ন আকারের সংস্করণ ও পুনর্মুদ্রণ বিস্তার বাড়ায়। পাঠাগার, পাঠচক্র এবং অন্যের সংগ্রহ ব্যবহার করেও মানুষ বইয়ের সংস্পর্শে আসত। কিন্তু সাক্ষরতার সীমা ও দারিদ্র্য রয়ে যায়। এনসাইক্লোপিডিয়া প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপের সাধারণ মানুষ সমানভাবে আলোকায়নের পাঠক হয়ে গিয়েছিল—এমন দাবি তাই ইতিহাসসম্মত নয়।

প্যারিসের স্যালনগুলো বইয়ের ধারণাকে কথোপকথনের বিষয় করে তুলত। এগুলো ছিল ব্যক্তিগত গৃহে আয়োজিত নিয়মিত সামাজিক-বুদ্ধিবৃত্তিক সমাবেশ, যেখানে সাহিত্য পাঠ, মতবিনিময় ও পরিচয় গড়ে উঠত। মাদাম জফ্রাঁ, মাদাম দ্যুফাঁ এবং জুলি দ্য লেসপিনাসের মতো আয়োজকেরা অতিথি নির্বাচন ও আলোচনার পরিবেশ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। নারী আয়োজকের ভূমিকা শুধু আতিথেয়তায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁরা যোগাযোগ, পৃষ্ঠপোষকতা ও লেখকের পরিচিতি তৈরির ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতেন। তবে স্যালনের গুরুত্ব নারীর সামগ্রিক সামাজিক সমতার প্রমাণ নয়।

স্যালনও সর্বজনীন বিতর্কসভা ছিল না; প্রবেশ নির্ভর করত পরিচয়, মর্যাদা ও আচরণবিধির ওপর। তবু সেখানে লেখক, অভিজাত, বিদেশি অতিথি ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের যোগাযোগ নতুন রচনার প্রচারে সাহায্য করত। সাময়িকপত্র, ব্যক্তিগত চিঠি এবং আন্তর্দেশীয় বইবাজার সেই আলোচনাকে দূরে নিয়ে যেত। ফরাসি ভাষার আন্তর্জাতিক মর্যাদাও বিস্তারে সহায়ক ছিল। এনসাইক্লোপিডিয়া সরাসরি বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম হয়ে ওঠেনি, কিন্তু অনুসন্ধান, তুলনা ও ব্যবহারিক জ্ঞানের মূল্য প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে ভাবনাকে প্রসারিত করেছিল।

দিদেরোর উদ্যোগ তাই শুধু বহু খণ্ডের একটি অভিধান প্রকাশের ঘটনা নয়। এটি দেখিয়েছিল, জ্ঞান সংগঠিত করার পদ্ধতি বদলালে সমাজে কর্তৃত্ব বিচার করার পদ্ধতিও বদলাতে পারে। কারিগরের দক্ষতা, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক প্রশ্ন একই পাঠজগতে প্রবেশ করেছিল। সেন্সরশিপ, অর্থনৈতিক সীমা ও সামাজিক বাছাই সত্ত্বেও পাঠকের সামনে তুলনা করার উপকরণ বাড়ছিল। এই বিস্তৃত জ্ঞানচর্চা পরবর্তী পর্যায়ে আরও কঠিন প্রশ্ন সামনে আনবে: যুক্তি ও স্বাধীনতার দাবি যদি সর্বজনীন হয়, তবে নারী, দরিদ্র এবং উপনিবেশের অধীন মানুষের ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ কোথায়?