বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের বিস্তার: প্রোটেস্ট্যান্ট দমন, নিষিদ্ধ বই ও ঔপনিবেশিক বিচার

সিরিজ: স্প্যানিশ ইনকুইজিশন: ধর্মীয় নিপীড়ন ও বিচার

স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের বিস্তার: প্রোটেস্ট্যান্ট দমন, নিষিদ্ধ বই ও ঔপনিবেশিক বিচার
স্পেনের বইয়ের বাজার থেকে আমেরিকার উপনিবেশ—বিশ্বাস ও চিন্তার ওপর নজরদারি।

বিশ্বাসকে অপরাধের বিষয় বানালে ব্যক্তির বিবেকের স্বাধীনতা কীভাবে অনিরাপদ হয়, ইনকুইজিশনের বিচারপদ্ধতিতে আমরা তা দেখেছি। কিন্তু আদালতের নজর শুধু অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি বা পারিবারিক আচারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কে কোন বই পড়ছেন, ধর্মগ্রন্থের কী ব্যাখ্যা করছেন এবং সমুদ্রপথে কোন ধারণা স্পেনে প্রবেশ করছে—এসবও তদন্তের বিষয় হয়ে ওঠে। ষোড়শ শতকে ইনকুইজিশন ধর্মান্তরিতদের বিশ্বাস যাচাইয়ের প্রতিষ্ঠান থেকে আরও বিস্তৃত ধর্মীয় ও বৌদ্ধিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় পরিণত হয়। আমেরিকায় স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণ সেই ব্যবস্থাকে আটলান্টিকের অপর পাশেও নিয়ে যায়।

১৫১৭ সালে মার্টিন লুথারের উদ্যোগে শুরু হওয়া সংস্কার আন্দোলন ইউরোপের খ্রিস্টীয় ঐক্য ভেঙে দেয়। স্পেনের শাসকেরা এই পরিবর্তনকে ধর্মীয় সত্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রশ্ন হিসেবেও দেখেন। তবে স্পেনে প্রথম থেকেই বিশাল সংগঠিত প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলন ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়, ধর্মযাজকদের আলোচনা, বিদেশে অবস্থান এবং আমদানি করা গ্রন্থের মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্কারমূলক ধারণা প্রবেশ করেছিল। এরাসমীয় মানবতাবাদ, ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতা ও প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদও এক জিনিস ছিল না। কর্তৃপক্ষের সন্দেহে কখনো এসবের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ত।

১৫৫৭–১৫৫৮ সালে সেভিল ও ভাইয়াদোলিদে ধর্মীয় ভিন্নমতাবলম্বী গোষ্ঠী আবিষ্কার পরিস্থিতি বদলে দেয়। সেভিলে হুলিয়ান এর্নান্দেসের মাধ্যমে আনা প্রোটেস্ট্যান্ট বই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়। সান ইসিদ্রো দেল কাম্পো মঠের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন সন্ন্যাসীও সংস্কারপন্থী ধারণা গ্রহণ করেন; কেউ পালিয়ে যান। ভাইয়াদোলিদে আগুস্তিন দে কাসায়াসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত হয়। আদালতের ব্যবহৃত “লুথারীয়” পরিচয় সব অভিযুক্তের বিশ্বাসের নির্ভুল বিবরণ ছিল না; ভিন্ন ধরনের ধর্মীয় আপত্তিকেও কখনো একই শ্রেণিতে রাখা হয়েছে।

১৫৫৯ সালে দুই শহরেই প্রকাশ্য অটো-দা-ফে ও কঠোর দণ্ডের মাধ্যমে এসব গোষ্ঠী দমন করা হয়। জীবিত অভিযুক্তদের পাশাপাশি মৃত বা পলাতকদের বিরুদ্ধেও রায় দেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় ফিলিপের দরবারে ঘটনাগুলোকে বিদেশি ধর্মদ্রোহের বিপজ্জনক অনুপ্রবেশ হিসেবে দেখা হয়। একই বছর তোলেদোর আর্চবিশপ বার্তোলোমে দে কারানসার গ্রেপ্তার দেখায়, উচ্চ ধর্মীয় পদও সন্দেহ থেকে রক্ষা করত না। তবে তাঁর দীর্ঘ ও জটিল মামলাকে সরলভাবে একজন প্রমাণিত প্রোটেস্ট্যান্টের বিচার বলা যায় না; ধর্মতাত্ত্বিক বিরোধ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও এতে জড়িত ছিল।

বই নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ইনকুইজিশন একমাত্র কর্তৃপক্ষ ছিল না। মুদ্রণের আগের রাজকীয় অনুমোদন এবং প্রকাশিত বইয়ের ওপর ইনকুইজিশনের নিষেধাজ্ঞা ছিল সম্পর্কিত কিন্তু পৃথক ব্যবস্থা। মুদ্রণ, আমদানি ও বিক্রির নিয়মে রাজকীয় পরিষদ, স্থানীয় কর্মকর্তা এবং ধর্মীয় পরীক্ষকেরা ভূমিকা রাখতেন। ফলে একজন লেখককে শুধু আদালতের সম্ভাব্য বিচার নয়, প্রকাশনার অনুমতি ও বাজারে প্রবেশের বাধাও বিবেচনা করতে হতো। ইনকুইজিশনের নজরদারি কার্যকর হতো এই বৃহত্তর প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে, যার সব অংশ একই প্রতিষ্ঠানের অধীন ছিল না।

ইনকুইজিটর জেনারেল ফের্নান্দো দে ভালদেসের নামে প্রকাশিত ১৫৫৯ সালের নিষিদ্ধ বইয়ের তালিকা এই ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তার আগে স্পেনে নিষিদ্ধ গ্রন্থের তালিকা ব্যবহৃত হয়েছে; তাই এটিকে বই নিয়ন্ত্রণের একেবারে সূচনা বলা ভুল। তবে নতুন তালিকায় কাস্তিলীয় ভাষার ধর্মীয় বইয়ের ওপর নজরদারি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। সন্দেহভাজন অনুবাদ, প্রার্থনাগ্রন্থ ও আধ্যাত্মিক রচনাও নিষেধাজ্ঞায় পড়তে পারত। শুধু প্রোটেস্ট্যান্ট লেখকের নাম থাকলেই বই নিষিদ্ধ হতো, এমন নয়; ক্যাথলিক লেখকের কোনো নির্দিষ্ট রচনাও আপত্তিকর বিবেচিত হতে পারত।

সব নিষিদ্ধ বই ধ্বংস করা হতো না। কিছু গ্রন্থ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকত, অন্যগুলোর আপত্তিকর অংশ মুছে বা বাদ দিয়ে পড়ার অনুমতি দেওয়া যেত। এই সংশোধনমূলক পদ্ধতিকে এক্সপুরগেশন বলা হয়। গাসপার দে কিরোগার অধীনে ১৫৮৩ সালের নিষিদ্ধ গ্রন্থতালিকা এবং ১৫৮৪ সালের সংশোধনযোগ্য অংশের তালিকা এর সুস্পষ্ট উদাহরণ। বইয়ের নির্দিষ্ট পঙ্‌ক্তি কালি দিয়ে ঢেকে দেওয়া কিংবা অনুচ্ছেদ বাদ দেওয়ার মাধ্যমে পাঠক কী জানতে পারবেন, তার সীমা বইয়ের পাতাতেই নির্ধারিত হতো। বিশেষ অনুমতিপ্রাপ্ত পাঠকদের জন্য ব্যতিক্রমও ছিল।

এই নিয়ন্ত্রণের প্রভাব ছিল বাস্তব, কিন্তু সর্বক্ষমতাশালী নয়। বই গোপনে আমদানি হতো, ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকত এবং নিষিদ্ধ ধারণাও ছড়াত। বিশাল সাম্রাজ্যে প্রতিটি পাঠক বা গ্রন্থ পরীক্ষা করার সামর্থ্য ইনকুইজিশনের ছিল না। তবু সম্ভাব্য অভিযোগ লেখক, মুদ্রাকর ও বইবিক্রেতাকে আত্মনিয়ন্ত্রণে উৎসাহিত করত। বিদেশে পড়াশোনার ওপর রাজকীয় বিধিনিষেধও জ্ঞানচর্চার পরিবেশ সংকুচিত করে। তবে স্পেনের বিজ্ঞান বা বৌদ্ধিক বিকাশের সব সমস্যাকে একমাত্র ইনকুইজিশনের ফল বলা অতিসরল; অর্থনীতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আমেরিকায় স্থায়ী ইনকুইজিশন আদালত প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই বিশপ ও অনুমোদিত ধর্মযাজকেরা বিশ্বাসসংক্রান্ত বিচার করতেন। পরে লিমায় ১৫৭০ সালে, মেক্সিকো সিটিতে ১৫৭১ সালে এবং কার্তাহেনা দে ইন্দিয়াসে ১৬১০ সালে স্থায়ী আদালত চালু হয়। এগুলো আজকের তিনটি দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তাদের বিচারিক অঞ্চল অনেক বিস্তৃত ছিল। দূরবর্তী শহর ও বন্দরে কমিশনার এবং সহযোগীদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হতো। মেক্সিকোর আদালতের পরিসরে ফিলিপাইনও অন্তর্ভুক্ত ছিল—যা সাম্রাজ্যের প্রশান্ত মহাসাগরীয় সংযোগ বোঝায়।

ঔপনিবেশিক আদালতগুলোর প্রধান উদ্বেগের মধ্যে ছিল গোপন ইহুদি ধর্মাচারের অভিযোগ, প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ, ধর্মনিন্দা এবং ক্যাথলিক বিবাহবিধি লঙ্ঘন। অভিযুক্তদের মধ্যে ইউরোপীয় অভিবাসী, আমেরিকায় জন্ম নেওয়া স্প্যানিশ বংশোদ্ভূত মানুষ, আফ্রিকান বংশোদ্ভূত অধিবাসী এবং মিশ্র বংশের মানুষ ছিলেন। বিদেশি নাবিক বা ব্যবসায়ীর প্রোটেস্ট্যান্ট পরিচয় বিশেষ সন্দেহ তৈরি করতে পারত। পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত নতুন খ্রিস্টান ব্যবসায়ীরাও গোপনে ইহুদি ধর্ম পালনের অভিযোগে আক্রান্ত হন। তবে বিদেশি বা পর্তুগিজ পরিচয় নিজে অপরাধের প্রমাণ ছিল না, যদিও সামাজিক বিদ্বেষ তদন্তকে প্রভাবিত করত।

আদিবাসীদের অবস্থান আলাদা করে বোঝা জরুরি। মেক্সিকোতে প্রাথমিক পর্যায়ে বিশপ হুয়ান দে সুমারাগার কর্তৃত্বে তেস্কোকোর অভিজাত দন কার্লোসকে ১৫৩৯ সালে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়; এই ঘটনায় কর্তৃপক্ষের সমালোচনা হয়। পরে স্থায়ী ঔপনিবেশিক ইনকুইজিশন ব্যবস্থায় আদিবাসীরা সাধারণভাবে তার এখতিয়ারের বাইরে থাকেন। এর অর্থ তাঁরা ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে মুক্ত ছিলেন না। বিশপীয় আদালত, ধর্মপ্রচারক ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষ আদিবাসী বিশ্বাস ও আচার দমনে কাজ করেছে। বিশেষত আন্দীয় অঞ্চলের প্রতিমাপূজাবিরোধী অভিযানকে সরাসরি লিমার ইনকুইজিশনের বিচার বলে দেখানো বিভ্রান্তিকর।

ঔপনিবেশিক সমাজে জাদুবিদ্যা, চিকিৎসা ও অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার অভিযোগও আদালতে এসেছে। এখানে অভিযুক্তের ভাষা, সামাজিক মর্যাদা ও দাসত্বের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারও আত্মরক্ষার বক্তব্য অনুবাদ, ধর্মীয় শ্রেণিবিন্যাস এবং কর্মকর্তার অনুমানের মাধ্যমে নথিতে ঢুকত। মেক্সিকোতে লুইস দে কারভাহাল দ্য ইয়ঙ্গারের বিরুদ্ধে গোপন ইহুদি ধর্মাচারের বিচার এবং ১৫৯৬ সালে তাঁর মৃত্যুদণ্ড দেখায়, পারিবারিক বিশ্বাস সাম্রাজ্যিক আদালতের কাছে কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারত। তবে একটি আলোচিত মামলাকে সমগ্র ঔপনিবেশিক সমাজের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।

স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের বিস্তার তাই শুধু আদালতের সংখ্যা বাড়ার ইতিহাস নয়। এটি মানুষ, বই, বন্দর ও পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে ধর্মীয় আনুগত্য অনুসন্ধানের ইতিহাস। স্পেন ও উপনিবেশে একই নীতি ভিন্ন সামাজিক বাস্তবতার মুখে বদলেছে; স্থানীয় ক্ষমতা, দূরত্ব এবং মানুষের প্রতিরোধ তার কার্যকারিতা সীমিতও করেছে। তবু মৌলিক সমস্যাটি অক্ষুণ্ণ ছিল: যখন কোনো প্রতিষ্ঠান অনুমোদিত সত্যের সীমা নির্ধারণ করে, তখন পড়া, আলোচনা ও বিশ্বাসের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তও বিচারযোগ্য হয়ে ওঠে। সেই কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান প্রশ্নই পরবর্তী সময়ে ইনকুইজিশনের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলবে।