বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

রোবসপিয়েরের পতন ও থার্মিডোরীয় প্রতিক্রিয়া: সন্ত্রাসের রাজত্বের অবসান

সিরিজ: ফরাসি বিপ্লব

রোবসপিয়েরের পতন ও থার্মিডোরীয় প্রতিক্রিয়া: সন্ত্রাসের রাজত্বের অবসান
রোবসপিয়েরের পতনে দমনের কাঠামো বদলাল, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিশোধ থামল না।

প্রজাতন্ত্র রক্ষার জন্য তৈরি দমনব্যবস্থা যখন বিপ্লবের নেতাদেরও অনিরাপদ করে তুলেছিল, তখন আত্মরক্ষার ভয়ই নতুন রাজনৈতিক জোটের ভিত্তি হয়ে ওঠে। ১৭৯৪ সালের জুলাইয়ে রোবসপিয়েরের বিরুদ্ধে একত্র হওয়া প্রতিনিধিদের সবার উদ্দেশ্য এক ছিল না। কেউ নির্বিচার বিচার নিয়ে উদ্বিগ্ন, কেউ তাঁর নৈতিক অভিযোগে নিজের ভবিষ্যৎ দেখছিলেন, আবার কেউ কমিটিগুলোর ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে চাইছিলেন। রোবসপিয়েরের পতন তাই শুধু একজন নেতার পরাজয় নয়; বিপ্লবী সরকারের অভ্যন্তরীণ জোট ভেঙে যাওয়ার ফল।

ফরাসি বিপ্লবী বর্ষপঞ্জির দ্বিতীয় বছরের ৯ থার্মিডোর ছিল ২৭ জুলাই ১৭৯৪। এই তারিখের নামেই পরবর্তী পরিবর্তন পরিচিত হয় থার্মিডোরীয় প্রতিক্রিয়া হিসেবে। তবে সেদিন সকালেই সবাই সন্ত্রাসের রাজত্ব বিলোপের অভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে সভায় আসেননি। রোবসপিয়েরকে সরানোর পর কোন প্রতিষ্ঠান থাকবে, দমন কতটা কমবে কিংবা জনতার ভূমিকা কী হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর তৈরি হয় পরবর্তী মাসগুলোতে। তাৎক্ষণিক ক্ষমতার সংঘর্ষ এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিবর্তনকে আলাদা করে দেখা জরুরি।

রোবসপিয়েরের দুর্বলতার পেছনে ছিল জননিরাপত্তা কমিটি ও সাধারণ নিরাপত্তা কমিটির বিরোধ। পুলিশি কর্তৃত্ব, গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক তদারকি নিয়ে সদস্যদের মধ্যে অবিশ্বাস বেড়েছিল। বিয়ো-ভারেন, কলো দেরবোয়া, ভাদিয়ে ও অন্য প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক খারাপ হয়। রোবসপিয়ের রাষ্ট্রের একক সর্বময় শাসক ছিলেন না; শক্তিশালী সহকর্মীদের বিরোধিতা এবং কনভেনশনের সমর্থন হারালে তাঁর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বাধীন ব্যবস্থা ছিল না। জুলাইয়ে সেই সীমাবদ্ধতাই নির্ণায়ক হয়ে ওঠে।

২২ প্রেরিয়ালের আইনের পরে প্যারিসে মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছিল। বিচারপ্রক্রিয়ায় আত্মপক্ষসমর্থনের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় প্রতিনিধিরা আশঙ্কা করতে থাকেন, পরবর্তী অভিযুক্ত তাঁরা নিজেরাও হতে পারেন। দান্তোঁ ও দেমুলাঁর মৃত্যুদণ্ড ইতিমধ্যে দেখিয়েছিল, বিপ্লবী খ্যাতি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়। অন্যদিকে ফ্ল্যরুসের সামরিক বিজয় বিদেশি আক্রমণের তাৎক্ষণিক আশঙ্কা কমিয়েছিল। জরুরি অবস্থার নামে আরও কঠোর দমন চালানোর যুক্তি তাই আগের মতো অনায়াসে গ্রহণযোগ্য থাকছিল না।

রাজধানীর জনতার সঙ্গে সরকারের সম্পর্কও দুর্বল হয়েছিল। এবেরপন্থীদের দমন, স্থানীয় রাজনৈতিক তৎপরতার ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং মজুরি নিয়ন্ত্রণ শ্রমজীবী সমর্থকদের একাংশকে অসন্তুষ্ট করেছিল। খাদ্যসংকট ও মূল্যবৃদ্ধির সমস্যাও শেষ হয়নি। রোবসপিয়েরের সমর্থকেরা সংগঠিত থাকলেও ১৭৯৩ সালের মতো সর্বব্যাপী গণআন্দোলন ডাকার পরিস্থিতি আর ছিল না। যে জনতার চাপ একসময় তাঁর রাজনৈতিক শক্তি বাড়িয়েছিল, সেই জনতাকে নিয়ন্ত্রণের নীতি সংকটের মুহূর্তে তাঁর সম্ভাব্য প্রতিরক্ষাকেও দুর্বল করে।

২৬ জুলাই, অর্থাৎ ৮ থার্মিডোরে রোবসপিয়ের কনভেনশনে দীর্ঘ বক্তৃতা দেন। তিনি ষড়যন্ত্র, দুর্নীতি এবং কমিটিগুলোর ত্রুটির অভিযোগ তোলেন, কিন্তু অভিযুক্ত সবাইকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেননি। এর ফলে বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতিনিধি নিজেদের হুমকির মুখে মনে করেন। বক্তৃতা প্রথমে অনুকূল প্রতিক্রিয়া পেলেও পরে বিরোধিতা বাড়ে। সেদিন রাতে জ্যাকোবিন ক্লাবে তাঁর বক্তব্য সমর্থিত হয়, কিন্তু কনভেনশনের প্রতিপক্ষদের সঙ্গে আপসের সুযোগ আরও সংকুচিত হয়ে যায়।

পরদিন সাঁ-জুস্ত বক্তৃতা শুরু করলে তাঁকে বাধা দেওয়া হয়। তালিয়াঁ, বিয়ো-ভারেন এবং অন্য বিরোধীরা রোবসপিয়ের ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। রোবসপিয়েরও নিজের বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি; সভায় তাঁর কণ্ঠ বারবার বাধাপ্রাপ্ত হয়। অবশেষে কনভেনশন তাঁকে, তাঁর ভাই অগুস্তাঁকে, সাঁ-জুস্ত, কুতোঁ ও ল্য বাসকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয়। সিদ্ধান্তটি কার্যকর হয়েছিল কারণ তাঁর বিভিন্ন প্রতিপক্ষের সঙ্গে কনভেনশনের মধ্যবর্তী প্রতিনিধিরাও তখন বিচ্ছেদে সম্মত হয়েছিলেন।

গ্রেপ্তার অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুর নিষ্পত্তি করেনি। প্যারিস কমিউন অভিযুক্ত নেতাদের পক্ষে অবস্থান নেয়। কারাগারগুলোতে আটক কার্যকর করা নিয়ে বাধা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, এবং তাঁরা পরে নগরভবনে সমবেত হন। জাতীয় রক্ষীবাহিনীর কমান্ডার আঁরিও সমর্থন সংগঠিত করার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি সাময়িকভাবে দ্বৈত কর্তৃত্বের রূপ নেয়: কনভেনশন জাতীয় বৈধতা দাবি করছে, আর কমিউন রাজধানীর বিপ্লবী সংগঠনকে প্রতিরোধে আহ্বান জানাচ্ছে।

কিন্তু প্যারিসের সেকশনগুলো একযোগে সাড়া দেয়নি। কেউ অপেক্ষা করে, কেউ কনভেনশনকে সমর্থন জানায়, আবার কেউ সীমিতসংখ্যক লোক পাঠায়। কনভেনশন বিদ্রোহী নেতাদের আইনবহির্ভূত ঘোষণা করলে তাঁদের সাহায্য করাও প্রাণঘাতী ঝুঁকিতে পরিণত হয়। দীর্ঘ অপেক্ষা, অস্পষ্ট নির্দেশ এবং রাজনৈতিক দ্বিধায় নগরভবনের সামনে জমায়েত দুর্বল হতে থাকে। গভীর রাতে কনভেনশনপন্থী বাহিনী সেখানে প্রবেশ করে। রোবসপিয়েরকে রক্ষার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় মূলত পর্যাপ্ত সংগঠিত সমর্থন ও কার্যকর নেতৃত্বের অভাবে।

অভিযানের সময় রোবসপিয়ের চোয়ালে গুলিবিদ্ধ হন। তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন, নাকি অন্য কারও গুলিতে আহত হন—এ নিয়ে বিবরণে মতভেদ আছে। ল্য বাস আত্মহত্যা করেন; অন্য সহযোগীরা আটক হন। ২৮ জুলাই, অর্থাৎ ১০ থার্মিডোরে, রোবসপিয়েরসহ বাইশজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। আইনবহির্ভূত ঘোষিত হওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ নতুন বিচার চালানো হয়নি; পরিচয় নিশ্চিত করার পর দণ্ড কার্যকর হয়। পরবর্তী দিনগুলোতেও কমিউনের বহু সমর্থককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

এ কারণে রোবসপিয়েরের মৃত্যু মানেই তাৎক্ষণিক মানবিক বিচারব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন ছিল না। তাঁর পতন কার্যকর করতেও বিপ্লবী জরুরি আইনের কঠোরতা ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে আগস্টে ২২ প্রেরিয়ালের আইন বাতিল হয়, ট্রাইব্যুনালের কাজ পুনর্গঠিত হয় এবং বন্দিদের মুক্তি দেওয়া শুরু হয়। কমিটিগুলোর ক্ষমতা সীমিত ও সদস্য পরিবর্তনের ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। সন্ত্রাসের রাজত্বের অবসান ছিল ধারাবাহিক প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন, শুধু গিলোটিনে একজন নেতার মৃত্যুর ঘটনা নয়।

পরবর্তী মাসগুলোতে রাজনৈতিক ভারসাম্য ডান দিকে সরে যায়। নভেম্বর ১৭৯৪-এ জ্যাকোবিন ক্লাব বন্ধ করা হয়। রাস্তার সংঘর্ষে জ্যাকোবিন সমর্থকেরা আক্রান্ত হন; প্রদেশের কিছু অঞ্চলে ১৭৯৫ সালে ‘শ্বেত সন্ত্রাস’ নামে পরিচিত প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ড ঘটে। সাবেক দমনকারীদের বিচারও হয়, কিন্তু সব সহিংসতা নিয়মিত আদালতের মাধ্যমে পরিচালিত হয়নি। রোবসপিয়েরের ওপর পূর্ববর্তী দমনের প্রধান দায় চাপিয়ে তাঁর সাবেক সহযোগীদের কেউ কেউ নিজেদের ভূমিকা আড়াল করার চেষ্টা করেন।

অর্থনৈতিক পরিবর্তন সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তি আনেনি। ১৭৯৪ সালের ডিসেম্বরে সর্বোচ্চ মূল্যব্যবস্থা তুলে দেওয়ার পর মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি দুর্ভোগ বাড়ায়। ১৭৯৫ সালের জেরমিনাল ও প্রেরিয়ালের গণআন্দোলনে মানুষ রুটি এবং ১৭৯৩ সালের সংবিধান কার্যকরের দাবি তোলে; আন্দোলন দমন করা হয়। থার্মিডোরীয় পরিবর্তন তাই রাজনৈতিক বন্দিদের অনেককে মুক্ত করলেও শ্রমজীবী জনতার প্রত্যক্ষ প্রভাব সংকুচিত করে। সন্ত্রাস কমানোর সঙ্গে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ বাড়ানো একই প্রক্রিয়ায় ঘটেনি।

রোবসপিয়েরের পতন প্রমাণ করেছিল, বিপ্লবী নৈতিকতার দাবি স্থায়ী আস্থা ও আইনি নিরাপত্তার বিকল্প হতে পারে না। কিন্তু তাঁর উত্তরসূরিরাও স্থিতিশীল শাসনের সহজ সমাধান পাননি। তাঁরা একদিকে রাজতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন, অন্যদিকে প্যারিসের গণঅভ্যুত্থান ঠেকাতে চেয়েছিলেন। এই দ্বৈত ভয় থেকেই ১৭৯৫ সালের নতুন সংবিধান এবং পাঁচ সদস্যের ডিরেক্টরির পথ তৈরি হয়। সন্ত্রাসের কেন্দ্রীভূত সরকার ভাঙার পর এবার পরীক্ষা হবে—বিভক্ত ক্ষমতা ও সম্পত্তিশালী নাগরিকদের প্রাধান্য কি বিপ্লবী ফ্রান্সকে স্থায়িত্ব দিতে পারে?