বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

আমেরিগো ভেসপুচি: নতুন বিশ্বের পরিচয় ও আমেরিকা নামের ইতিহাস

সিরিজ: আবিষ্কারের যুগ: সমুদ্র অভিযান ও নতুন বিশ্বের সন্ধান

আমেরিগো ভেসপুচি: নতুন বিশ্বের পরিচয় ও আমেরিকা নামের ইতিহাস
সমুদ্রযাত্রার বিবরণ ও ছাপা মানচিত্রে পরিচিত হয়ে ওঠে ‘আমেরিকা’ নামটি।

কালিকটে পৌঁছে ভাস্কো দা গামা ইউরোপ থেকে ভারতের সমুদ্রপথ বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু একই সময়ে আটলান্টিকের পশ্চিম পারে কলম্বাসের পৌঁছানো ভূখণ্ডের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছিল। সেখানেও কি এশিয়ার কোনো প্রান্ত পাওয়া গেছে, নাকি ইউরোপীয়দের পরিচিত ভূগোলের বাইরে রয়েছে বিশাল আরেক ভূখণ্ড? ভারতে পৌঁছানোর পূর্বমুখী সাফল্যের পাশাপাশি পশ্চিমের ভূমিকে বোঝার এই চেষ্টা আবিষ্কারের যুগের মানচিত্র বদলে দেয়। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত হয়ে ওঠে আমেরিগো ভেসপুচির নাম।

কলম্বাস ১৪৯২ সালে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছে বিশ্বাস করেছিলেন, তিনি এশিয়ার কাছাকাছি এসেছেন। তাঁর পরবর্তী অভিযানেও এই ধারণা পুরোপুরি বদলায়নি। ১৪৯৮ সালে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল ও বিপুল মিঠাপানির প্রবাহের মুখোমুখি হয়ে তিনি বৃহৎ স্থলভাগের উপস্থিতি উপলব্ধি করেন। কিন্তু বড় ভূখণ্ড শনাক্ত করা এবং তাকে এশিয়া থেকে পৃথক মহাদেশ হিসেবে স্বীকার করা এক বিষয় ছিল না। নতুন তথ্যকে পুরোনো ভৌগোলিক ধারণার সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা চলতে থাকে।

এই পরিস্থিতিতে ইতালির ফ্লোরেন্সে জন্ম নেওয়া আমেরিগো ভেসপুচি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। প্রথম জীবনে তিনি বাণিজ্যিক কাজে যুক্ত ছিলেন; পরে সেভিয়ায় জাহাজ প্রস্তুত ও সামুদ্রিক উদ্যোগের পরিবেশে কাজ করেন। ফলে তাঁর অভিজ্ঞতা শুধু জাহাজের ডেকে সীমাবদ্ধ ছিল না। অর্থায়ন, রসদ এবং দূরদেশের বাণিজ্য সম্পর্কে ধারণাও ছিল। পরবর্তী সমুদ্রযাত্রা ও তাঁর নামে প্রচারিত বিবরণ তাঁকে ইউরোপীয় ভূগোলচর্চায় পরিচিত করে তোলে।

ভেসপুচির জীবনীতে শুরুতেই একটি সতর্কতা দরকার। তাঁর নামে প্রচারিত লেখায় একাধিক অভিযানের দাবি থাকলেও সব যাত্রার ঐতিহাসিক ভিত্তি সমান শক্ত নয়। বিশেষ করে ১৪৯৭ সালে যাত্রা করার দাবিটি বিতর্কিত। ১৪৯৯–১৫০০ এবং ১৫০১–১৫০২ সালের অভিযানের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা তুলনামূলকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য। তাই চারটি নিশ্চিত অভিযানের সরল তালিকা তৈরি করে তাঁকে কলম্বাসের আগে মূল ভূখণ্ডে পৌঁছানো ব্যক্তি হিসেবে দেখানো ঠিক নয়।

১৪৯৯ সালে স্প্যানিশ পৃষ্ঠপোষকতার অভিযানে তিনি আলোনসো দে ওহেদার সঙ্গে আটলান্টিক অতিক্রম করেন। এই অভিযানের কার্যক্রম দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর উপকূল সম্পর্কে ইউরোপীয় তথ্য বাড়ায়। দ্বীপের পর দ্বীপের বদলে দীর্ঘ তীররেখা, নদীর মোহনা এবং বিস্তৃত স্থলভাগের সাক্ষাৎ পুরোনো প্রশ্নকে জোরালো করে। তবে এই পর্যবেক্ষণ থেকে সবাই সঙ্গে সঙ্গে পৃথক মহাদেশের সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি। একই উপকূলকে কেউ এশিয়ার অংশ, কেউ অজানা দক্ষিণাঞ্চল হিসেবে কল্পনা করছিলেন।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হয় ১৫০১–১৫০২ সালের পর্তুগিজ অভিযান, যাতে ভেসপুচি অংশ নেন। ব্রাজিলের উপকূল ধরে দক্ষিণে অগ্রসর হওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর সঙ্গে যুক্ত নতুন বিশ্বের ধারণায় বড় ভূমিকা রাখে। বহর ঠিক কত দক্ষিণে গিয়েছিল, সে বিষয়ে বিবরণ ও আধুনিক ব্যাখ্যায় মতভেদ রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ দক্ষিণমুখী তীররেখা পর্যবেক্ষণ ইউরোপীয়দের সামনে একটি সমস্যা হাজির করেছিল: এত বিস্তৃত স্থলভাগকে পরিচিত এশীয় ভূগোলে কোথায় বসানো হবে?

আকাশের পরিবর্তনও অভিযাত্রীদের অভিজ্ঞতায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দক্ষিণে যাওয়ার সঙ্গে উত্তর আকাশের পরিচিত নক্ষত্রের অবস্থান বদলাত, আর নতুন নক্ষত্রমণ্ডল দৃশ্যমান হতো। তবে দক্ষিণ আকাশ দেখা নিজে থেকে পৃথক মহাদেশের প্রমাণ নয়। অক্ষাংশ, উপকূলের বিস্তার, দূরত্বের হিসাব এবং অন্যান্য অভিযানের তথ্য মিলিয়ে ব্যাখ্যা তৈরি হচ্ছিল। নতুন বিশ্বের ধারণা ছিল বহু পর্যবেক্ষণের সমন্বয়, কোনো এক মুহূর্তের নাটকীয় উপলব্ধি নয়।

ভেসপুচির সঙ্গে যুক্ত সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রকাশনাগুলোর একটি ছিল ‘মুন্দুস নোভুস’, অর্থাৎ ‘নতুন বিশ্ব’। ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ায় মুদ্রিত এই বিবরণে আটলান্টিকের ওপারের ভূমিকে ইউরোপীয়দের পরিচিত জগতের বাইরে এক বিস্তৃত ভূখণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। পাঠকদের কাছে বিষয়টি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। নতুন স্থানের প্রকৃতি, মানুষের জীবন এবং সমুদ্রযাত্রার অভিজ্ঞতা নিয়ে আগ্রহ মুদ্রিত বিবরণটির প্রচারে সহায়তা করে।

তবে এসব লেখাকে সম্পাদনাহীন ব্যক্তিগত দিনপঞ্জি ধরে নেওয়া যাবে না। ভেসপুচির নামে প্রচারিত চিঠি ও বিবরণে অনুবাদ, সম্পাদনা এবং প্রকাশনার ভূমিকা ছিল। কিছু তথ্যের সত্যতা ও রচনার প্রকৃতি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আদিবাসীদের জীবন নিয়ে চাঞ্চল্যকর বর্ণনাও ইউরোপীয় পাঠকের প্রত্যাশা অনুযায়ী সাজানো হয়ে থাকতে পারে। ভেসপুচি কী দেখেছিলেন এবং তাঁর নামে পাঠকেরা কী পড়েছিলেন—এই দুইয়ের পার্থক্য ইতিহাস বোঝার জন্য জরুরি।

সেই পাঠকদের মধ্যে ছিলেন মধ্য ইউরোপের ভূগোলবিদ ও মানবতাবাদী পণ্ডিতেরা। লরেন অঞ্চলের সাঁ-দিয়ে শহরে নতুন ভৌগোলিক তথ্য নিয়ে কাজ করছিলেন মার্টিন ভাল্ডসেম্যুলার, মাতিয়াস রিংমান এবং তাঁদের সহযোগীরা। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল প্রাচীন ভূগোলের কাঠামোর সঙ্গে সাম্প্রতিক সমুদ্রযাত্রার সংবাদ মিলিয়ে পৃথিবীর সংশোধিত পরিচয় তৈরি করা। ভেসপুচির নামে প্রচারিত বিবরণ সেখানে বিশেষ গুরুত্ব পায়।

১৫০৭ সালে প্রকাশিত ‘কসমোগ্রাফিয়ে ইন্ত্রোদুকৎসিও’ নামের ভূগোলবিষয়ক পুস্তিকায় নতুন ভূখণ্ডের জন্য নাম প্রস্তাব করা হয়। যুক্তি ছিল, ইউরোপ ও এশিয়ার মতো অন্য ভূভাগের নামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমেরিগোর নাম থেকেও একটি স্ত্রীলিঙ্গ নাম তৈরি করা যায়। তাঁর নামের লাতিন রূপ আমেরিকুস থেকে আসে ‘আমেরিকা’। অর্থাৎ ভেসপুচি নিজে দাঁড়িয়ে মহাদেশের নাম ঘোষণা করেননি; ইউরোপের পণ্ডিত ও মানচিত্রকারেরা তাঁর সম্মানে নামটি প্রস্তাব করেন।

একই বছরে ভাল্ডসেম্যুলারের বিশাল বিশ্বমানচিত্রে নামটি মুদ্রিত হয়। সেখানে দক্ষিণ আমেরিকার ভূখণ্ডের ওপর ‘আমেরিকা’ লেখা ছিল, বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নয়। মানচিত্রটি পশ্চিমের ভূখণ্ডকে এশিয়া থেকে পৃথকভাবে দেখায়। কিন্তু এতে আধুনিক মানচিত্রের মতো পূর্ণাঙ্গ জরিপ ছিল না। পর্যবেক্ষিত উপকূল, ভ্রমণবিবরণ ও অনুমান মিলিয়ে এমন ভূগোল দেখানো হয়েছিল, যার বহু অংশ তখনও ইউরোপীয়দের অজানা।

মানচিত্রে পশ্চিমের সমুদ্র দেখানো মানেই নির্মাতারা তখন প্রশান্ত মহাসাগরের সম্পূর্ণ তথ্য জানতেন, এমন নয়। বরং নতুন স্থলভাগকে পৃথক দেখানোর ধারণা মানচিত্রে দৃশ্যমান করা হয়েছিল। পরে ১৫১৩ সালে ভাস্কো নুনিয়েস দে বালবোয়ার পানামা অতিক্রম করে অপর সমুদ্র দেখা এবং মাগেলানের বহরের যাত্রা ভূগোল সম্পর্কে আরও তথ্য দেয়। এশিয়া ও আমেরিকার সম্পর্ক বোঝার প্রক্রিয়া তাই ১৫০৭ সালেই শেষ হয়নি।

নামটির প্রসার সম্ভব হয় মুদ্রণপ্রযুক্তির কারণে। হাতে আঁকা একটি মানচিত্রের তুলনায় ছাপা মানচিত্র ও পুস্তিকা বহু পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারত। অন্য মানচিত্রকারেরা সেগুলো থেকে তথ্য ও নাম গ্রহণ করতেন। ভাল্ডসেম্যুলারের পরবর্তী কাজেই নামটির ব্যবহার বদলালেও অন্যদের মানচিত্রে তা টিকে যায়। ১৫৩৮ সালে জেরার্ডাস মার্কেটরের বিশ্বমানচিত্রে উত্তর ও দক্ষিণ উভয় ভূখণ্ডে নামটির ব্যবহার এর বিস্তৃত গ্রহণযোগ্যতার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

তাহলে কলম্বাসের নামে মহাদেশের নাম হলো না কেন? কারণ নামকরণ শুধু আগে পৌঁছানোর পুরস্কার ছিল না। কোন বিবরণ প্রভাবশালী পাঠকের হাতে গেল, কে নতুন ভূখণ্ডের ব্যাখ্যার সঙ্গে যুক্ত হলেন এবং কোন নাম ছাপায় ছড়াল—এসবও নির্ধারক। ভেসপুচি পরিকল্পিতভাবে কলম্বাসের কৃতিত্ব চুরি করে নিজের নামে মহাদেশ নামিয়েছিলেন—এমন সরল অভিযোগের শক্ত ভিত্তি নেই। ‘আমেরিকা’ নামের সাফল্যে সমুদ্রযাত্রার পাশাপাশি প্রকাশনার ইতিহাসও কাজ করেছে।

সবশেষে ‘নতুন বিশ্ব’ কথাটিও ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় বহন করে। সেই ভূখণ্ডের অধিবাসীদের কাছে তাঁদের দেশ নতুন ছিল না; নিজেদের ভাষায় স্থান ও অঞ্চলের নামও ছিল। ইউরোপীয় মানচিত্রে নতুন পরিচয় তৈরি হওয়ার সঙ্গে উপনিবেশিক দাবিও বাড়ছিল। ভেসপুচির বিবরণ ও ভাল্ডসেম্যুলারের মানচিত্র ভূগোল বদলালেও প্রশ্ন রয়ে গেল: এই বিশাল ভূখণ্ডের পাশ দিয়ে কি পশ্চিমের সমুদ্রে যাওয়ার পথ রয়েছে? সেই সন্ধানই অভিযাত্রীদের আমেরিকার আরও দক্ষিণে নিয়ে যাবে।