ডিরেক্টরি শাসন ও নেপোলিয়নের উত্থান: ১৭৯৯ সালের অভ্যুত্থানের পটভূমি
সিরিজ: ফরাসি বিপ্লব
নির্বাচিত শাসনের সংকট সামলাতে সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরতাই খুলে দিল সামরিক ক্ষমতা দখলের পথ।
সন্ত্রাসের কেন্দ্রীভূত সরকার ভাঙার পর ফ্রান্সের নেতারা আশা করেছিলেন, ক্ষমতা ভাগ করে দিলে স্বৈরাচার এবং গণঅভ্যুত্থান—দুই বিপদই ঠেকানো যাবে। সেই প্রত্যাশা থেকেই ১৭৯৫ সালে ডিরেক্টরি শাসনের জন্ম। কিন্তু নতুন ব্যবস্থা এমন একটি দেশে চালু হয়েছিল, যেখানে যুদ্ধ চলছিল, মুদ্রার মূল্য ভেঙে পড়ছিল এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা পরস্পরের বৈধতা মানতে প্রস্তুত ছিলেন না। প্রজাতন্ত্র রক্ষার জন্য তৈরি সরকার ক্রমে সেনাবাহিনীর সাহায্যে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতে থাকে; সেই নির্ভরতাই নেপোলিয়নের ক্ষমতা দখলের সুযোগ তৈরি করে।
তৃতীয় বছরের সংবিধানে আইনসভাকে দুটি কক্ষে ভাগ করা হয়: পাঁচশোর পরিষদ আইন প্রস্তাব করবে, প্রবীণদের পরিষদ তা অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করবে। নির্বাহী ক্ষমতা দেওয়া হয় পাঁচজন ডিরেক্টরের হাতে। নিয়মিত আংশিক নবায়নের মাধ্যমে ক্ষমতা বদলের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু আইনসভা সাধারণভাবে নির্বাহী বিভাগকে বরখাস্ত করতে পারত না, আবার ডিরেক্টররাও আইনসভা ভেঙে দিতে পারতেন না। ফলে বিরোধ তীব্র হলে সাংবিধানিক সমাধানের পথ সীমিত ছিল। কর ও সম্পত্তির শর্ত রাজনৈতিক অংশগ্রহণকেও সংকুচিত রাখে।
নতুন ব্যবস্থার জন্মের সময়ই নির্বাচন নিয়ে অবিশ্বাস প্রকাশ পায়। কনভেনশন সিদ্ধান্ত নেয়, নতুন আইনসভার দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য বিদায়ী কনভেনশন থেকেই আসবেন। উদ্দেশ্য ছিল রাজতন্ত্রপন্থীদের নির্বাচনী সাফল্য ঠেকানো এবং প্রজাতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। কিন্তু বিরোধীরা একে ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল বলে মনে করেন। ৫ অক্টোবর ১৭৯৫, অর্থাৎ ১৩ ভঁদেমিয়েরে প্যারিসে সরকারবিরোধী বিদ্রোহ হয়। বিদ্রোহ দমনে কামান ব্যবহারে তরুণ জেনারেল নেপোলিয়ন বোনাপার্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
এই ঘটনার পর নেপোলিয়ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে কার্যকর সামরিক রক্ষক হিসেবে পরিচিত হন। তবে ডিরেক্টরির প্রধান সমস্যা কেবল রাজতন্ত্রপন্থী বিরোধিতা ছিল না। আসিনিয়া কাগুজে মুদ্রার বিপুল অবমূল্যায়নে বেতনভোগী, শ্রমজীবী এবং নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিকল্প কাগুজে মুদ্রার উদ্যোগও ব্যর্থ হয়। বাজারে পণ্য থাকলেও কেনার সামর্থ্য কমে যাওয়া এবং সরকারি অর্থের অনিশ্চয়তা প্রশাসন দুর্বল করে। বিপ্লব রাজনৈতিক সমতা ঘোষণা করলেও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা সাধারণ মানুষের কাছে তার অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছিল।
যুদ্ধের সরবরাহব্যবস্থা এই সংকটের মধ্যে বিপুল মুনাফার সুযোগ তৈরি করে। সামরিক ঠিকাদার, মধ্যস্বত্বভোগী এবং প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের যোগসাজশ নিয়ে অভিযোগ বাড়ে। ডিরেক্টর পল বারাসের বিলাসিতা শাসকগোষ্ঠীর দুর্নীতির প্রতীক হয়ে ওঠে। তবে পুরো সময়কে শুধু অসৎ ব্যক্তিদের লুটপাট হিসেবে দেখলে ব্যাখ্যা অসম্পূর্ণ থাকে। দুর্বল রাজস্বব্যবস্থা, জরুরি সামরিক ব্যয় এবং অস্থিতিশীল মুদ্রা সরকারকে ঠিকাদারদের ওপর নির্ভরশীল করেছিল। ব্যক্তিগত দুর্নীতির সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা মিলেই রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয় করছিল।
ডিরেক্টরি বাম দিক থেকেও বিরোধিতার মুখে পড়ে। গ্রাক্কুস বাবুফ ও তাঁর সহযোগীদের সাম্যের ষড়যন্ত্র সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়। পরিকল্পনাটি ১৭৯৬ সালে দমন করা হয় এবং পরের বছর বাবুফের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। সরকার সম্পত্তির নিরাপত্তা রক্ষা করতে চেয়েছিল, কিন্তু একই সঙ্গে রাজতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনও ঠেকাতে হতো। এই দুই প্রতিপক্ষের মাঝখানে ডিরেক্টরি নিজেকে প্রজাতন্ত্রের একমাত্র গ্রহণযোগ্য রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করলেও ব্যাপক জনসমর্থনের স্থায়ী ভিত্তি গড়তে পারেনি।
১৭৯৭ সালের নির্বাচনে রাজতন্ত্রপন্থী ও তাঁদের ঘনিষ্ঠ প্রতিনিধিদের সাফল্য সরকারের সংকট বাড়ায়। ৪ সেপ্টেম্বর, অর্থাৎ ১৮ ফ্রুকতিদোরে তিন ডিরেক্টর সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় অভ্যুত্থান ঘটান। বহু নির্বাচনী ফল বাতিল হয়, প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের গ্রেপ্তার বা নির্বাসিত করা হয়। পরের বছর বামপন্থীদের সাফল্যের পরও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একাংশকে বাদ দেওয়া হয়। নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা ফলাফলের ওপর নির্ভর করতে থাকলে সাংবিধানিক শাসনের প্রতি আস্থা টিকে থাকা কঠিন।
অন্যদিকে সেনাবাহিনী দেশের বাইরে সাফল্য অর্জন করছিল। ১৭৯৬ সালে ইতালির সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব পাওয়ার পর নেপোলিয়ন দ্রুত পিয়েমন্ত-সার্দিনিয়া এবং অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য বিজয় পান। মান্তুয়ার পতন ও পরবর্তী অগ্রযাত্রা তাঁকে জাতীয় বীর করে তোলে। ১৭৯৭ সালের কাম্পো ফর্মিও চুক্তিতে তিনি কূটনৈতিক ভূমিকাও নেন। দখল করা অঞ্চল থেকে অর্থ ও সরবরাহ সংগ্রহ যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে সাহায্য করে, কিন্তু একই সঙ্গে বিজয়ী সেনাপতিদের স্বাধীন প্রভাব বাড়ায়।
নেপোলিয়ন নিজের সাফল্য প্রচারেও দক্ষ ছিলেন। সামরিক বুলেটিন ও সংবাদপত্রে তাঁকে সাহসী, দ্রুত সিদ্ধান্তগ্রহণকারী এবং জাতির স্বার্থরক্ষাকারী নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। বাস্তবে ইতালির বিজয়ে সৈন্য, অধস্তন কর্মকর্তা এবং প্রতিপক্ষের দুর্বলতারও ভূমিকা ছিল। কিন্তু প্রচারে বিজয় ব্যক্তিগত নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়। প্যারিসের বিতর্কিত রাজনীতিকদের বিপরীতে সফল সেনাপতি কার্যকর শাসনের সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে জনমনে স্থান করে নেন। সেনাবাহিনীর আনুগত্যও ক্রমে ব্যক্তিগত নেতৃত্বের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
১৭৯৮ সালের মিসর অভিযান এই খ্যাতিকে বাড়ালেও তার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে। স্থলে প্রাথমিক সাফল্যের পর নীলনদের যুদ্ধে ব্রিটিশ নৌবাহিনী ফরাসি নৌবহর ধ্বংস করে। সিরিয়া অভিযানেও আক্রে দখল করা যায়নি; রোগ ও সরবরাহসংকট পরিস্থিতি কঠিন করে তোলে। মিসরে বৈজ্ঞানিক গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সামরিক উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি। ১৭৯৯ সালে নেপোলিয়ন সেনাবাহিনীর দায়িত্ব ক্লেবেরের হাতে রেখে ফ্রান্সে ফেরেন। প্রচার ও অসম্পূর্ণ সংবাদ তাঁর প্রত্যাবর্তনকে ব্যর্থ সেনাপতির বদলে সম্ভাব্য উদ্ধারকর্তার আগমন হিসেবে গ্রহণ করতে সাহায্য করে।
তত দিনে দ্বিতীয় জোটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ফ্রান্স নতুন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ইতালির বহু অর্জন হারিয়ে যায়; দেশে সৈন্যসংগ্রহ ও অর্থসংকট বিরোধ বাড়ায়। বছরের শেষদিকে সামরিক পরিস্থিতির কিছু উন্নতি হলেও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ফেরেনি। ডিরেক্টর ইমানুয়েল-জোসেফ সিয়েস সংবিধান বদলাতে চাইছিলেন এবং তার জন্য সামরিক সহযোগী খুঁজছিলেন। নেপোলিয়ন একা শূন্য থেকে অভ্যুত্থান তৈরি করেননি; সাংবিধানিক পরিবর্তনকামী বেসামরিক ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে তাঁর সামরিক ক্ষমতার সমঝোতা হয়েছিল।
৯ নভেম্বর ১৭৯৯, অর্থাৎ ১৮ ব্রুমেয়ারে কথিত জ্যাকোবিন ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা দেখিয়ে আইনসভাকে সাঁ-ক্লুতে সরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নেপোলিয়ন প্যারিস অঞ্চলের সামরিক কর্তৃত্ব পান। সিয়েস ও রজে দুকো পদত্যাগ করেন; বারাসকেও পদত্যাগে রাজি করানো হয়, অন্য দুই ডিরেক্টরকে নিষ্ক্রিয় করা হয়। পরদিন পরিষদে নেপোলিয়নের হস্তক্ষেপ বাধার মুখে পড়ে। পরিস্থিতি সামলাতে তাঁর ভাই লুসিয়াঁ ভূমিকা রাখেন এবং সৈন্যরা পাঁচশোর পরিষদ ছত্রভঙ্গ করে। পরে অবশিষ্ট অনুগত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নতুন ব্যবস্থার অনুমোদন আদায় করা হয়।
ডিরেক্টরির পরিবর্তে অস্থায়ী কনসুলেট প্রতিষ্ঠিত হয়; পরবর্তী সংবিধানে প্রথম কনসাল নেপোলিয়নের হাতে প্রধান ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়। দুর্নীতি ডিরেক্টরিকে দুর্বল করেছিল, কিন্তু তার পতনের গভীর কারণ ছিল রাজনৈতিক বিরোধকে সাংবিধানিকভাবে সামলাতে ব্যর্থতা এবং বারবার সেনাবাহিনীকে বিচারকের আসনে বসানো। বহু মানুষ স্থিতিশীলতার আশায় পরিবর্তন মেনে নেন। বিপ্লবের সামাজিক অর্জনের বড় অংশ টিকে থাকলেও নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। ফ্রান্স এবার এমন এক শাসকের হাতে প্রবেশ করল, যিনি বিপ্লবের উত্তরাধিকার রক্ষা করার দাবি করেই ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন।
ষোড়শ লুই ও মেরি আঁতোয়ানেতের মৃত্যুদণ্ড: বিচার ও গিলোটিনের ইতিহাস
ফরাসি বিপ্লবের যুদ্ধ ও রাজতন্ত্রের পতন: ১৭৯২ সালে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা
ফরাসি বিপ্লবে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র: গির্জার সংস্কার, ভারেন ও ১৭৯১ সালের সংবিধান
গ্রেট ব্লু হোল: বেলিজের সমুদ্রে বিশাল নীল গর্তটি কীভাবে তৈরি হয়েছিল?
অ্যাঞ্জেল ফলস: পৃথিবীর সর্বোচ্চ জলপ্রপাতের পানি এত উঁচু থেকে নামে কীভাবে?
তাকলামাকান মরুভূমি: বালুর সমুদ্রের নিচে হারানো নগর ও প্রাচীন মানুষের ইতিহাস