স্পেনের মুসলিম নিপীড়ন: গ্রানাডা বিজয় থেকে মরিস্কো বিতাড়ন
সিরিজ: স্প্যানিশ ইনকুইজিশন: ধর্মীয় নিপীড়ন ও বিচার
ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি থেকে জোরপূর্বক ধর্মান্তর ও মরিস্কো নির্বাসন।
বাপ্তিস্ম নেওয়ার পরও রাষ্ট্র যদি আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহ করে, তবে দৈনন্দিন জীবনের কোন আচরণ মানুষকে নিরাপদ রাখবে—ইহুদি ধর্মান্তরিতদের সামনে ওঠা এই প্রশ্ন পরে স্পেনের মুসলিম বংশোদ্ভূত খ্রিস্টানদের জীবনেও কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে। তবে দুই জনগোষ্ঠীর ইতিহাস একই সময়সূচিতে এগোয়নি। ১৪৯২ সালে ইহুদিদের দেশত্যাগের আদেশ দেওয়া হলেও গ্রানাডার মুসলিমদের জন্য তখন ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি ছিল। সেই প্রতিশ্রুতি থেকে বাধ্যতামূলক ধর্মান্তর, সাংস্কৃতিক দমন এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাসনে পৌঁছানোর ইতিহাস এক শতাব্দীরও বেশি সময়জুড়ে বিস্তৃত।
১৪৯১ সালের নভেম্বরে সম্পাদিত গ্রানাডার আত্মসমর্পণ চুক্তিতে মুসলিম অধিবাসীদের ধর্ম, মসজিদ, সম্পত্তি এবং নিজস্ব কিছু আইনগত প্রথা রক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। ১৪৯২ সালের ২ জানুয়ারি শহরটি ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলার হাতে আসে। কিন্তু সামরিক পরাজয় মানেই চুক্তি অনুযায়ী ইসলাম ত্যাগ করার বাধ্যবাধকতা ছিল না। খ্রিস্টান শাসনের অধীনে ইসলাম পালনকারী মানুষদের সাধারণভাবে মুদেখার বলা হতো। আইবেরিয়ার অন্য অঞ্চলেও এমন সম্প্রদায় আগে থেকেই ছিল। গ্রানাডার প্রথম পরিস্থিতি বুঝতে এই স্বীকৃত মুসলিম পরিচয়কে পরবর্তী মরিস্কো পরিচয় থেকে আলাদা রাখা জরুরি।
গ্রানাডার প্রথম আর্চবিশপ এর্নান্দো দে তালাভেরা ধর্মশিক্ষা, ভাষা শেখা ও প্রচারের মাধ্যমে ধর্মান্তরে উৎসাহ দেওয়ার পক্ষে ছিলেন। এই নীতিও সমান মর্যাদার বহুধর্মীয় সমাজ গড়ার পরিকল্পনা ছিল না; খ্রিস্টধর্মের বিস্তারই ছিল লক্ষ্য। তবে ১৪৯৯ সালে ফ্রান্সিসকো হিমেনেস দে সিসনেরোসের হস্তক্ষেপে চাপ অনেক বেড়ে যায়। আটক, ভীতি ও জবরদস্তির মধ্যে গণবাপ্তিস্ম ঘটে; আরবি ধর্মীয় গ্রন্থও ধ্বংস করা হয়। আত্মসমর্পণ চুক্তিতে সুরক্ষিত বিশ্বাসকে এবার কর্তৃপক্ষ পরিবর্তনযোগ্য বাধা হিসেবে দেখতে শুরু করল।
১৪৯৯ সালের ডিসেম্বরে গ্রানাডার আলবাইসিন মহল্লায় বিদ্রোহ শুরু হয় এবং পরে পার্বত্য অঞ্চলেও অস্থিরতা ছড়ায়। রাজকীয় কর্তৃপক্ষ বিদ্রোহকে চুক্তিভঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করে মুসলিমদের আগের সুরক্ষা খর্ব করার যুক্তি দাঁড় করায়। আত্মসমর্পণকারী সম্প্রদায়গুলোর ওপর বাপ্তিস্ম গ্রহণের চাপ বাড়ে। এই ঘটনাক্রমে কারণ ও প্রতিক্রিয়া গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়: ধর্মান্তরের জবরদস্তি বিদ্রোহ উসকে দিয়েছিল, অথচ সেই বিদ্রোহই আরও ব্যাপক জবরদস্তির অজুহাত হলো। চুক্তির অধিকার কার্যত নির্ভরশীল হয়ে পড়ল বিজয়ী শাসকের ব্যাখ্যার ওপর।
১৫০২ সালে কাস্তিলের মুসলিমদের খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ অথবা দেশত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। কাগজে দেশত্যাগের বিকল্প থাকলেও যাত্রাপথ, বয়স ও পারিবারিক অবস্থাসংক্রান্ত বিধিনিষেধ বহু মানুষের জন্য সেটিকে অত্যন্ত কঠিন করে তোলে। ফলে ব্যাপক ধর্মান্তর ঘটে। মুসলিম বংশোদ্ভূত এই খ্রিস্টান এবং তাঁদের উত্তরসূরিরা মরিস্কো নামে পরিচিত হন। ধর্মান্তর তাঁদের আইনি পরিচয় বদলালেও সমাজে সমান গ্রহণযোগ্যতা এনে দেয়নি। বরং খ্রিস্টান হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার পর পুরোনো বিশ্বাস পালনের অভিযোগে তাঁদের ইনকুইজিশনের তদন্তের আওতায় আনা সম্ভব হয়।
আরাগনের রাজমুকুটের ভূখণ্ডে একই পরিবর্তন আরও পরে ঘটে। ভ্যালেন্সিয়ায় ১৫২০-এর দশকের শুরুতে হেরমানিয়াস বিদ্রোহের সময় বিদ্রোহী দলগুলো বহু মুসলিমকে জোর করে বাপ্তিস্ম দেয়। পরে সেই বাপ্তিস্মের বৈধতা স্বীকার করা হয়। সম্রাট পঞ্চম চার্লসের শাসনে ১৫২৫–১৫২৬ সালের নির্দেশে আরাগনের অবশিষ্ট মুসলিমদেরও ধর্মান্তর বা প্রস্থানের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়। স্থানীয় জমিদারদের একাংশ মুসলিম কৃষকদের শ্রম ও খাজনার ওপর নির্ভর করতেন বলে কঠোর পরিবর্তনের বিরোধিতা করেছিলেন। ফলে ধর্মীয় নিপীড়নের পাশাপাশি রাজশক্তি, অভিজাত স্বার্থ ও কৃষিশ্রমের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
মরিস্কোদের সবাই একই বিশ্বাস বা জীবনযাপন অনুসরণ করতেন না। কেউ গোপনে ইসলাম পালন করতেন, কেউ আন্তরিক খ্রিস্টান ছিলেন, আবার অনেক পরিবারে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অভ্যাস মিশে গিয়েছিল। গ্রানাডা, ভ্যালেন্সিয়া, আরাগন ও কাস্তিলের ভাষা ও সামাজিক সম্পর্কেও পার্থক্য ছিল। অথচ কর্তৃপক্ষ প্রায়ই তাঁদের একটি অভিন্ন সন্দেহভাজন জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করত। নাম, খাদ্যাভ্যাস, গোসল, পোশাক কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠান তদন্তের সূত্র হতে পারত। সংস্কৃতির চিহ্নকে ধর্মদ্রোহের প্রমাণ ভাবার প্রবণতা ব্যক্তির প্রকৃত বিশ্বাস বোঝার সুযোগ সংকুচিত করেছিল।
ইনকুইজিশনের কার্যক্রমও সর্বত্র সমান ছিল না। কোথাও বিশেষ সমঝোতা বা সাময়িক ছাড় ছিল, কোথাও কঠোর তদন্ত চলেছে। একই সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষাদান ও স্থানীয় যাজকদের ভূমিকাও অঞ্চলভেদে ভিন্ন ছিল। তবে ভাষাগত দূরত্ব, দুর্বল শিক্ষাব্যবস্থা এবং জোরপূর্বক বাপ্তিস্মের অভিজ্ঞতার মধ্যে স্বেচ্ছায় বিশ্বাস পরিবর্তনের দাবি ছিল গভীরভাবে সমস্যাপূর্ণ। কিছু মরিস্কো আরবি হরফে কাস্তিলীয় বা অন্য রোমান্স ভাষায় লেখা আলখামিয়াদো সাহিত্য সংরক্ষণ করেন। এসব রচনা তাঁদের ধর্মীয় জ্ঞান, পারিবারিক স্মৃতি ও পরিচয় রক্ষার প্রচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
দ্বিতীয় ফিলিপের শাসনে গ্রানাডায় সাংস্কৃতিক দমন তীব্র হয়। ১৫৬৭ সালের বিধানে আরবি ভাষা, পোশাক এবং বিভিন্ন সামাজিক রীতির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। মরিস্কো প্রতিনিধি ফ্রান্সিসকো নুনিয়েস মুলেই যুক্তি দেন, স্থানীয় পোশাক বা ভাষা সবসময় ইসলামের চিহ্ন নয়; সেগুলো আঞ্চলিক সংস্কৃতিও হতে পারে। তাঁর আপত্তি কার্যকর হয়নি। ধর্মীয় আনুগত্যের পরীক্ষা এভাবে ভাষা ও দৈনন্দিন জীবন বদলে দেওয়ার অভিযানে পরিণত হয়। বহু মানুষের কাছে এটি শুধু বিশ্বাসের ওপর আঘাত নয়, পূর্বপুরুষের জীবনধারা মুছে দেওয়ার প্রচেষ্টা ছিল।
১৫৬৮ সালে আলপুহারাসে বড় বিদ্রোহ শুরু হয়। বিদ্রোহীদের নেতৃত্বে প্রথমে আবেন হুমেয়া এবং পরে আবেন আবো ছিলেন। সংঘাতে বিদ্রোহীদের হাতে খ্রিস্টান অধিবাসী ও ধর্মযাজকদের হত্যার ঘটনা ঘটে; রাজকীয় অভিযানে ব্যাপক দমন, ধ্বংস ও দাসত্বও দেখা যায়। দন হুয়ান দে অস্ট্রিয়ার নেতৃত্বাধীন বাহিনী বিদ্রোহ দমন করে। মূল প্রতিরোধ ১৫৭০ সালে ভেঙে পড়লেও সংঘাতের অবশিষ্ট অংশ পরের বছর পর্যন্ত চলে। এর পরিণতিতে গ্রানাডার বিপুলসংখ্যক মরিস্কোকে কাস্তিলের বিভিন্ন অঞ্চলে জোর করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
এই অভ্যন্তরীণ নির্বাসনের উদ্দেশ্য ছিল ঘনবসতিপূর্ণ সম্প্রদায় ভেঙে দেওয়া এবং সম্ভাব্য প্রতিরোধ দুর্বল করা। বাস্তবে তা পরিবার, কৃষিকাজ ও স্থানীয় সহায়তার সম্পর্ক ধ্বংস করে। অন্যদিকে ভূমধ্যসাগরে উসমানীয় শক্তি ও উত্তর আফ্রিকার জলদস্যু অভিযানের পটভূমিতে মরিস্কোদের নিরাপত্তাঝুঁকি হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ে। কিছু ব্যক্তির বাইরের শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ ছিল, কিন্তু তা দিয়ে সমগ্র জনগোষ্ঠীর বিশ্বাসঘাতকতা প্রমাণিত হয় না। নির্দিষ্ট ষড়যন্ত্রের আশঙ্কাকে বংশপরিচয়ভিত্তিক সামষ্টিক অপরাধে রূপান্তর করা হয়েছিল।
তৃতীয় ফিলিপের শাসনে এই সন্দেহ বহিষ্কারের নীতিতে পৌঁছায়। রাজদরবারে লের্মার ডিউক এবং ভ্যালেন্সিয়ার আর্চবিশপ হুয়ান দে রিবেরার মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সিদ্ধান্তের পক্ষে ভূমিকা রাখেন। ১৬০৯ সালের সেপ্টেম্বরে ভ্যালেন্সিয়ার মরিস্কোদের বহিষ্কারের নির্দেশ ঘোষণা করা হয়। পরে আরাগন, কাস্তিল ও অন্যান্য অঞ্চলে পর্যায়ক্রমে তা কার্যকর হয়। তাই ১৬০৯ সালের বিতাড়ন আসলে ১৬০৯–১৬১৪ সালের একটি ধারাবাহিক অভিযান, এক দিনে সমগ্র স্পেন থেকে মানুষ সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা নয়। আনুমানিক তিন লাখ মানুষ বহিষ্কৃত হন; সংখ্যা নিয়ে গবেষণাগত কিছু পার্থক্য রয়েছে।
বন্দর পর্যন্ত যাত্রা, সম্পত্তি নিষ্পত্তির সীমাবদ্ধতা, জাহাজভাড়া ও লুটপাট নির্বাসিতদের দুর্দশা বাড়ায়। সম্পত্তির নিয়ম অঞ্চলভেদে আলাদা ছিল; বিশেষত ভ্যালেন্সিয়ায় বহু স্থাবর সম্পদ স্থানীয় প্রভুদের হাতে যায়। কেউ প্রতিরোধ করেন, কেউ আত্মগোপন করেন, কেউ পরে ফিরে আসেন; ব্যতিক্রম ও অনুমতিপ্রাপ্ত অবস্থানও ছিল। অধিকাংশ নির্বাসিত উত্তর আফ্রিকায় পৌঁছান, অন্যরা বিভিন্ন পথে আশ্রয় নেন। নতুন সমাজে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা সর্বত্র একরকম ছিল না। স্পেনীয় ভাষা ও জীবনযাপনে অভ্যস্ত অনেকের জন্য তথাকথিত পূর্বপুরুষের ভূমিও ছিল অপরিচিত দেশ।
বহিষ্কার বিশেষ করে ভ্যালেন্সিয়া ও আরাগনের কিছু অঞ্চলে কৃষি, জনবসতি ও রাজস্বে দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয় আনে, যদিও স্পেনের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমস্যার একমাত্র কারণ এটি ছিল না। আরও গভীর ছিল নাগরিক পরিচয়ের ব্যর্থতা: যাঁদের খ্রিস্টান হতে বাধ্য করা হয়েছিল, তাঁদের বংশধরদেরও শেষ পর্যন্ত অবিশ্বস্ত বলে তাড়ানো হলো। গ্রানাডার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি থেকে এই পরিণতিতে পৌঁছানোর ইতিহাস দেখায়, ধর্মান্তরও নিরাপত্তা দিতে পারে না যখন রাষ্ট্র বংশপরিচয়কে স্থায়ী সন্দেহের ভিত্তি বানায়। সেই সন্দেহ আদালতে কীভাবে অভিযোগ, স্বীকারোক্তি ও শাস্তিতে রূপ নিত, ইনকুইজিশনের বিচারপদ্ধতি বুঝতে এবার সেদিকেই তাকাতে হয়।
আমেরিগো ভেসপুচি: নতুন বিশ্বের পরিচয় ও আমেরিকা নামের ইতিহাস
ভাস্কো দা গামার ভারত অভিযান: ১৪৯৮ সালে কালিকটে পৌঁছানোর ইতিহাস
টরডেসিলাস চুক্তি ১৪৯৪: স্পেন ও পর্তুগালের বিশ্ব ভাগের ইতিহাস
সেন্ট হেলেনায় নেপোলিয়ন: নির্বাসন, মৃত্যু ও ইউরোপে তার দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার
ওয়াটারলুর যুদ্ধ: ওয়েলিংটন ও ব্লুশারের কাছে নেপোলিয়ন কেন পরাজিত হন?
এলবা থেকে প্রত্যাবর্তন ও হান্ড্রেড ডেজ: নেপোলিয়নের আবার ক্ষমতা দখল