বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ইনকা সাম্রাজ্যের গৃহযুদ্ধ ও মহামারি: হুয়াসকার–আতাহুয়ালপার সংঘাতে স্প্যানিশ বিজয়ের পথ

সিরিজ: ইনকা সাম্রাজ্যের পতন

ইনকা সাম্রাজ্যের গৃহযুদ্ধ ও মহামারি: হুয়াসকার–আতাহুয়ালপার সংঘাতে স্প্যানিশ বিজয়ের পথ
দুই রাজপুত্রের ক্ষমতার লড়াইয়ে বিভক্ত হয়েছিল ইনকা সাম্রাজ্য।

হুয়াইনা কাপাকের শাসনে ইনকা সাম্রাজ্য যখন বিস্তারের শীর্ষে, তখনই তার শক্তির কেন্দ্রে তৈরি হচ্ছিল এক বিপজ্জনক অনিশ্চয়তা। কুসকো থেকে দূরবর্তী প্রদেশ পর্যন্ত সড়ক, খাদ্যগুদাম ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সাম্রাজ্যকে যুক্ত রেখেছিলেন। কিন্তু এই বিশাল ব্যবস্থার সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব নির্ভর করত একজন শাসকের ওপর। তাঁর মৃত্যু ঘটলে পরবর্তী সম্রাট কে হবেন, সেই প্রশ্নের সর্বজনস্বীকৃত সমাধান ছিল না। হুয়াইনা কাপাকের মৃত্যু তাই শুধু একজন সম্রাটের জীবনাবসান নয়; এটি সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্য ভেঙে পড়ার সূচনা।

তাঁর মৃত্যুর সঠিক সাল নিয়ে মতভেদ রয়েছে; সাধারণভাবে ১৫২০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে শেষভাগের মধ্যে ঘটনাটি স্থাপন করা হয়। তখন তিনি সাম্রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে অবস্থান করছিলেন। বিভিন্ন বিবরণে তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে একটি সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের সম্পর্ক পাওয়া যায়। সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী হিসেবে উল্লিখিত নিনান কুয়োচিও কাছাকাছি সময়ে মারা যান। কে আগে মারা গিয়েছিলেন এবং উত্তরাধিকার নির্ধারণ কত দূর এগিয়েছিল, তা নিশ্চিত নয়। তবে পরপর এই মৃত্যুগুলো ক্ষমতা হস্তান্তরের সুযোগ সংকুচিত করেছিল।

এই রোগকে সাধারণত গুটিবসন্ত বলা হয়। ইউরোপীয়দের আগমনের পর আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণ মানুষের যোগাযোগের মাধ্যমে স্প্যানিশ বাহিনীর আগেই আন্দিজে পৌঁছাতে পারে—এটি প্রচলিত ব্যাখ্যা। কিন্তু হুয়াইনা কাপাকের অসুস্থতার প্রাচীন বর্ণনা অস্পষ্ট এবং পরস্পরের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। ফলে তাঁর মৃত্যুর কারণ নিশ্চিতভাবে গুটিবসন্ত ছিল বলা কঠিন। মহামারির বিস্তার ও মৃত্যুসংখ্যাও নির্ভুলভাবে জানা যায় না। রোগের উপস্থিতি এবং রোগটির নিশ্চিত পরিচয় এক বিষয় নয়।

সংক্রামক রোগের ধাক্কা কৃষিভিত্তিক সমাজে বহুমুখী হতে পারে। চাষের সময় শ্রমিকের মৃত্যু বা অসুস্থতা উৎপাদন কমায়; পরিবহন ব্যাহত হলে গুদামের খাদ্য প্রয়োজনীয় স্থানে পৌঁছায় না। কর্মকর্তা ও স্থানীয় নেতাদের মৃত্যু প্রশাসনিক অভিজ্ঞতারও ক্ষতি করে। তবে স্প্যানিশ আগমনের আগেই সমগ্র ইনকা সমাজ সম্পূর্ণ অচল হয়ে গিয়েছিল—এমন ধারণা ভুল। সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনী তখনো বড় অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম ছিল। সংকটের কেন্দ্রে ছিল রোগের অভিঘাতের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা যুক্ত হওয়া।

ইনকা উত্তরাধিকারব্যবস্থায় জ্যেষ্ঠ পুত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিংহাসন পেতেন না। রাজবংশীয় মর্যাদা, মায়ের পরিচয়, ব্যক্তিগত যোগ্যতা এবং অভিজাতদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মৃত শাসকদের বংশগোষ্ঠী বা পানাকা নিজেদের সম্পদ ও প্রভাব ধরে রাখত। নতুন সম্রাটকে তাই শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠীর মধ্যে অবস্থান তৈরি করতে হতো। এই ব্যবস্থা সক্ষম প্রার্থী বেছে নেওয়ার সুযোগ দিলেও প্রতিদ্বন্দ্বী দাবিদারদের সংঘর্ষের পথ খোলা রাখত। হুয়াইনা কাপাকের মৃত্যুর পর সেই দুর্বলতাই সামনে আসে।

কুসকোয় হুয়াসকার সম্রাট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। রাজধানীর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রাজবংশীয় ঐতিহ্য এবং অভিজাতদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাঁর ক্ষমতার ভিত্তি ছিল। অন্যদিকে তাঁর বৈমাত্রেয় ভাই আতাহুয়ালপা উত্তরাঞ্চলে অবস্থান করছিলেন। সেখানে হুয়াইনা কাপাকের অভিযানে অভিজ্ঞ সেনাবাহিনী এবং প্রভাবশালী সেনাপতিদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল। ফলে দুই ভাইয়ের শক্তির উৎস আলাদা হয়ে দাঁড়ায়: একজনের হাতে রাজধানীর প্রতিষ্ঠিত কর্তৃত্ব, অন্যজনের পাশে যুদ্ধপরীক্ষিত সামরিক নেতৃত্ব। এই বিভাজন পরবর্তী সংঘাতের চরিত্র নির্ধারণ করে।

জনপ্রিয় বর্ণনায় বলা হয়, হুয়াইনা কাপাক সাম্রাজ্য দুই পুত্রের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিলেন—হুয়াসকারকে কুসকো এবং আতাহুয়ালপাকে কিতো। কিন্তু এমন আনুষ্ঠানিক বিভাজনকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। আতাহুয়ালপার মাতৃপরিচয় এবং কিতোকেন্দ্রিক স্বতন্ত্র রাজ্যের ধারণা নিয়েও সমস্যা রয়েছে। এটি মূলত একই সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দুটি স্বীকৃত স্বাধীন রাষ্ট্রের সীমান্তযুদ্ধ নয়। উত্তরাঞ্চলের সামরিক শক্তি ও রাজধানীর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বিরোধ এতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

দুই ভাইয়ের সম্পর্ক কীভাবে প্রকাশ্য যুদ্ধে গড়ায়, সে বিষয়ে বিবরণগুলো একমত নয়। দূতদের অপমান, আনুগত্য নিয়ে সন্দেহ এবং আতাহুয়ালপাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার কাহিনি পাওয়া যায়। এগুলোর অনেকটাই বিজয়ের পর লেখা, যখন বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের অবস্থান ন্যায্য প্রমাণ করতে চাইছিল। অপেক্ষাকৃত নিশ্চিত বিষয় হলো, ১৫২০-এর দশকের শেষভাগে বিরোধ তীব্র হয় এবং পরবর্তী কয়েক বছরে বৃহৎ সামরিক সংঘর্ষে রূপ নেয়। প্রাদেশিক নেতাদের তখন বেছে নিতে হয়, কোন দাবিদারের পাশে দাঁড়ালে তাঁদের স্বার্থ রক্ষা পাবে।

হুয়াসকারের পক্ষে রাজধানীর মর্যাদা থাকলেও আতাহুয়ালপার পক্ষে ছিলেন চালকুচিমা ও কিসকিসের মতো অভিজ্ঞ সেনাপতি। তাঁরা উত্তরাঞ্চলের বাহিনীকে সংগঠিত করে দক্ষিণের দিকে অভিযান চালান। যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে আতাহুয়ালপার বিপর্যয় এবং বন্দিত্ব থেকে পালানোর কাহিনিও আছে, যদিও বিস্তারিত নিয়ে সতর্কতা প্রয়োজন। সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামরিক অভিজ্ঞতা, সরবরাহ এবং নেতৃত্বের সমন্বয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত আতাহুয়ালপার সেনাপতিরা হুয়াসকারের বাহিনীকে পিছু হটিয়ে কুসকোর দিকে অগ্রসর হন।

যুদ্ধের চাপ পড়ে সাম্রাজ্যের সাধারণ মানুষের ওপর। সৈন্য সংগ্রহের অর্থ ছিল কৃষিকাজ থেকে মানুষ সরিয়ে নেওয়া; অভিযানের জন্য খাদ্য, পোশাক ও পরিবহনও প্রয়োজন। যে সড়ক একসময় প্রশাসনিক ঐক্যের ভিত্তি ছিল, সেই পথেই প্রতিদ্বন্দ্বী বাহিনী চলতে থাকে। গুদামের মজুত যুদ্ধের খরচ মেটায়। কিছু অঞ্চলে প্রতিশোধমূলক অভিযান বসতি ও উৎপাদন ধ্বংস করে। উত্তরাঞ্চলের কানিয়ারি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আতাহুয়ালপার পক্ষের সংঘর্ষ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ; পরবর্তীকালে তাদের একাংশ স্প্যানিশদের সহযোগী হয়ে ওঠে।

১৫৩২ সালে কুসকোর নিকটবর্তী সংঘর্ষে হুয়াসকারের প্রতিরোধ ভেঙে যায় এবং তিনি বন্দি হন। ঘটনাগুলোকে সাধারণত কিপাইপানের যুদ্ধ ও তার আশপাশের অভিযানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। আতাহুয়ালপার সেনাপতিরা রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে ঐক্য ফিরে আসেনি। হুয়াসকারপন্থী অভিজাতদের ওপর দমন ও হত্যাকাণ্ডের বিবরণ রয়েছে, যদিও নির্দিষ্ট সংখ্যার বিশ্বাসযোগ্যতা সীমিত। সিংহাসনের প্রতিদ্বন্দ্বী পরাজিত হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর সমর্থকদের ক্ষোভ দূর হয়নি।

এই পরিস্থিতিতেই ফ্রান্সিসকো পিজারোর অভিযাত্রীরা ইনকা ভূখণ্ডে অগ্রসর হচ্ছিল। তারা এমন এক সাম্রাজ্যের মুখোমুখি হয়, যার সামরিক শক্তি বিপুল, অথচ রাজনৈতিক নেতৃত্ব সদ্য রক্তক্ষয়ী সংঘাত পার করেছে। স্থানীয় মানুষদের কাছে স্প্যানিশদের পরিচয় ও উদ্দেশ্যও পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল না। কেউ তাদের বিপজ্জনক আগন্তুক হিসেবে দেখেছে, কেউ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করেছে। ইউরোপীয়দের সঙ্গে যোগাযোগের প্রতিটি সিদ্ধান্ত তখন চলমান স্থানীয় ক্ষমতার হিসাবের মধ্যেই নেওয়া হচ্ছিল।

গৃহযুদ্ধ স্প্যানিশদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে কয়েকভাবে। প্রথমত, কেন্দ্রের নির্দেশ মানার বদলে বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রতিশোধকে অগ্রাধিকার দিতে থাকে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সহযোগীদের মাধ্যমে আগন্তুকেরা পথ, সরবরাহ ও রাজনৈতিক বিরোধ সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার সুযোগ পায়। তৃতীয়ত, আতাহুয়ালপা সদ্য বিজয়ী হওয়ায় নিজের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। অল্পসংখ্যক বিদেশিকে তিনি কতটা হুমকি মনে করেছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না; তবে তাদের আটক বা মোকাবিলার সামর্থ্য নিজের আছে বলে ভাবার কারণ তাঁর ছিল।

তবু গৃহযুদ্ধকে স্প্যানিশ বিজয়ের একমাত্র কারণ বলা যায় না। ইনকা বাহিনী বিলুপ্ত হয়নি, খাদ্যগুদামও সব শেষ হয়ে যায়নি। স্প্যানিশদের ঘোড়া, ইস্পাতের অস্ত্র, আকস্মিক আক্রমণের কৌশল, স্থানীয় মিত্র এবং পরবর্তী ঘটনাবলি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মহামারিও একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া; পরবর্তী দশকগুলোর জনসংখ্যাগত বিপর্যয়কে আগের কয়েক বছরের মধ্যে ঠেলে দেওয়া ভুল। গৃহযুদ্ধ মূলত সেই রাজনৈতিক ঐক্য দুর্বল করেছিল, যার সাহায্যে ইনকারা বহিরাগত হুমকির বিরুদ্ধে সমন্বিত প্রতিক্রিয়া গড়তে পারত।

হুয়াসকার বন্দি, কুসকো বিজয়ী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে, আর আতাহুয়ালপা উত্তরাঞ্চল থেকে নিজের কর্তৃত্ব সুসংহত করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাঁর কাছে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করার সংবাদ পৌঁছেছিল; একই সময়ে এগিয়ে আসছিল পিজারোর ছোট বাহিনী। রাজবংশের গৃহযুদ্ধে জয় তাঁকে সাম্রাজ্যের দাবিদার করেছিল, কিন্তু নিরাপদ করেনি। ১৫৩২ সালের নভেম্বরে কাজামার্কায় দুই পক্ষের সাক্ষাৎ সেই সত্যকে ভয়াবহভাবে প্রকাশ করবে। পাহাড়ি পথ ধরে আসা বিদেশিদের সঙ্গে আলোচনাই শিগগির ইনকা শাসনের কেন্দ্রে এমন আঘাত আনবে, যার জন্য বিজয়ী সম্রাট প্রস্তুত ছিলেন না।