বেইজিংয়ের লেগেশন অবরোধ: ৫৫ দিনের সংঘর্ষ কীভাবে বিশ্বশক্তিকে চীনের বিরুদ্ধে এক করেছিল
Series: বক্সার প্রোটোকল: চীনের অপমান, বিদেশি শক্তি ও এক অসম চুক্তির ইতিহাস
- Author: Admin
- August 15, 2026
বেইজিংয়ের লেগেশন অবরোধ
১৯০০ সালের গ্রীষ্মে বেইজিং এমন এক আন্তর্জাতিক সংকটের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল, যেখানে কয়েকশ বিদেশি কূটনীতিক, সৈন্য ও সাধারণ নাগরিক এবং কয়েক হাজার চীনা খ্রিস্টান প্রায় দুই মাস ধরে অবরুদ্ধ অবস্থায় টিকে থাকার চেষ্টা করেছিলেন। ইতিহাসে এই ঘটনা বেইজিংয়ের লেগেশন অবরোধ নামে পরিচিত। সাধারণভাবে একে “৫৫ দিনের অবরোধ” বলা হয়, কারণ ২০ জুন থেকে ১৪ আগস্ট ১৯০০ পর্যন্ত প্রায় ৫৫ দিন লেগেশন কোয়ার্টার কার্যত বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। এই সংঘর্ষ শুধু বক্সার বিদ্রোহের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়গুলোর একটি ছিল না; এটি এমন এক আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যার ফলে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বী আটটি শক্তি সাময়িকভাবে একসঙ্গে চীনের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায়।
লেগেশন কোয়ার্টার ছিল বেইজিংয়ের এমন একটি অঞ্চল যেখানে বিভিন্ন বিদেশি রাষ্ট্রের দূতাবাস, কূটনৈতিক বাসভবন এবং সংশ্লিষ্ট স্থাপনা ছিল। উনিশ শতকের অসম চুক্তির ফলে বিদেশি শক্তিগুলো চীনে ক্রমশ বিশেষ কূটনৈতিক ও আইনি সুবিধা লাভ করেছিল। ফলে রাজধানীর মধ্যেই বিদেশি প্রতিনিধিত্বের একটি স্পষ্ট ভূরাজনৈতিক কেন্দ্র তৈরি হয়েছিল। চীনা জাতীয়তাবাদী ও বিদেশিবিরোধী শক্তির কাছে এই এলাকা ছিল বিদেশি হস্তক্ষেপ ও অসম ক্ষমতার দৃশ্যমান প্রতীক।
১৮৯৯ সালের শেষ এবং ১৯০০ সালের শুরুতে বক্সার আন্দোলন উত্তর চীনে দ্রুত বিস্তার লাভ করলে বেইজিংয়ের বিদেশি সম্প্রদায় ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। বক্সাররা বিদেশি মিশনারি, খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠান, রেলপথ এবং চীনা ধর্মান্তরিত খ্রিস্টানদের আক্রমণ করছিল। স্থানীয় সহিংসতার খবর রাজধানীতে পৌঁছাতে থাকলে বিদেশি কূটনীতিকেরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন।
পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয় যখন বক্সাররা রাজধানীর আশপাশে ব্যাপকভাবে জড়ো হতে শুরু করে। বিদেশি প্রতিনিধিরা নিজেদের দূতাবাস রক্ষার জন্য সীমিতসংখ্যক মেরিন ও নৌসৈন্য বেইজিংয়ে আনার অনুমতি নেন। কিন্তু এই সেনাদের সংখ্যা ছিল খুবই কম এবং তারা মূলত প্রতিরক্ষার জন্য এসেছিল। তবু চিং দরবারের রক্ষণশীল অংশের চোখে বিদেশি সৈন্যদের রাজধানীতে প্রবেশ নতুন সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা তৈরি করেছিল।
১৯০০ সালের জুনে বেইজিংয়ের পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বক্সাররা শহরের বিভিন্ন স্থানে খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি সম্পত্তির ওপর হামলা চালায়। রেললাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়, টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা নষ্ট হয় এবং রাজধানীর সঙ্গে উপকূলের যোগাযোগ ক্রমে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে বিদেশি দূতাবাসগুলো কার্যত এক ধরনের বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়।
এই সময় বিদেশি শক্তিগুলো বেইজিংয়ে সাহায্য পাঠানোর চেষ্টা করে। ব্রিটিশ ভাইস-অ্যাডমিরাল এডওয়ার্ড সেমুরের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী তিয়ানজিন থেকে রাজধানীর দিকে অগ্রসর হয়। কিন্তু রেললাইন ধ্বংস, বক্সারদের আক্রমণ এবং চিং সেনাবাহিনীর প্রতিরোধের কারণে এই অভিযান ব্যর্থ হয়। বাহিনীকে পিছিয়ে আসতে হয়। সেমুর অভিযানের ব্যর্থতা বেইজিংয়ে অবরুদ্ধ বিদেশিদের কাছে স্পষ্ট করে দেয় যে দ্রুত উদ্ধার আসছে না।
এদিকে ১৭ জুন বিদেশি নৌবাহিনী দাগু দুর্গ আক্রমণ ও দখল করে। এই ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করে। চিং দরবার এটিকে সরাসরি সামরিক আগ্রাসন হিসেবে দেখে এবং বিদেশিদের সঙ্গে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
২০ জুন ১৯০০ সালে সংকট চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। জার্মান রাষ্ট্রদূত ক্লেমেন্স ফন কেটেলার বেইজিংয়ের রাস্তায় নিহত হন। তিনি চিং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পথে গুলিবিদ্ধ হন। একজন বিদেশি রাষ্ট্রদূতের প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অত্যন্ত গুরুতর ঘটনা ছিল এবং এটি পরিস্থিতিকে আর শুধু একটি অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের পর্যায়ে রাখেনি।
এর পরপরই বিদেশি কূটনীতিকেরা লেগেশন কোয়ার্টারে নিজেদের প্রতিরক্ষা সংগঠিত করেন। ব্রিটিশ লেগেশন তুলনামূলকভাবে কেন্দ্রীয় ও সুরক্ষিত হওয়ায় সেটি প্রতিরক্ষার প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। বিভিন্ন দূতাবাসের সৈন্য ও স্বেচ্ছাসেবীরা ব্যারিকেড তৈরি করেন, দেয়াল শক্তিশালী করেন এবং ভবনের মধ্যবর্তী যোগাযোগপথ সুরক্ষিত করেন।
লেগেশন এলাকায় তখন শুধু বিদেশিরাই ছিলেন না। হাজার হাজার চীনা খ্রিস্টানও সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন, কারণ বক্সারদের হাতে তাদের জীবনের সরাসরি হুমকি ছিল। এদের মধ্যে অনেকে প্রতিরক্ষা নির্মাণ, খাবার সরবরাহ, আগুন নেভানো এবং আহতদের সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
অবরোধের সময় প্রতিরক্ষাকারীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল জনবল ও অস্ত্রের সীমাবদ্ধতা। বিভিন্ন দেশের কয়েকশ সৈন্য ও মেরিনকে বিশাল একটি অঞ্চল রক্ষা করতে হচ্ছিল। তাদের কাছে রাইফেল, সীমিত গোলাবারুদ এবং কয়েকটি হালকা কামান ছিল। এক পর্যায়ে পুরোনো কামানের বিভিন্ন অংশ জোড়া দিয়ে একটি কার্যকর অস্ত্র তৈরি করা হয়েছিল, যা বিখ্যাতভাবে “International Gun” নামে পরিচিত হয়।
প্রতিরক্ষা ছিল অত্যন্ত অস্থায়ী কিন্তু কৌশলগতভাবে সংগঠিত। দেয়ালের ওপরে পর্যবেক্ষণ পোস্ট বসানো হয়, রাস্তা বন্ধ করা হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে বালুর বস্তা, কাঠ ও ভাঙা আসবাব দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়। অনেক ভবন আগুনে পুড়ে গেলে বা গোলাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুন প্রতিরক্ষা রেখা গড়ে তুলতে হয়।
অন্যদিকে বক্সার এবং চিং বাহিনীর মধ্যেও একক সামরিক নির্দেশনা ছিল না। এটি অবরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বক্সাররা আক্রমণ চালালেও তারা আধুনিক সামরিক অবরোধে দক্ষ ছিল না। চিং সেনাবাহিনীর কিছু ইউনিট বিদেশিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করেছিল, কিন্তু অন্য কিছু কর্মকর্তা সংঘর্ষ সীমিত রাখার চেষ্টা করেন।
চিং দরবারের ভেতরের বিভাজনও যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়। কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বিদেশিদের সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে চাইছিলেন। আবার অন্যরা আশঙ্কা করছিলেন, লেগেশন এলাকায় বিদেশি কূটনীতিকদের গণহত্যা ঘটলে চীনের বিরুদ্ধে এমন আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে যা সাম্রাজ্যের পক্ষে মোকাবিলা করা অসম্ভব।
ফলে অবরোধ ছিল কখনও প্রচণ্ড, কখনও আবার অদ্ভুতভাবে স্থবির। চীনা বাহিনী লেগেশন এলাকায় কামান ও রাইফেল দিয়ে হামলা চালালেও এমন বহু সুযোগ ছিল যখন আরও সংগঠিত ও সর্বাত্মক আক্রমণ প্রতিরক্ষা ভেঙে দিতে পারত। কেন তা করা হয়নি, তা নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—চিং সরকার নিজের ভেতরেই ঐক্যবদ্ধ ছিল না।
অবরোধের সবচেয়ে তীব্র লড়াইগুলোর একটি হয় শহরের প্রাচীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। লেগেশন কোয়ার্টারের কাছাকাছি এই প্রাচীর উঁচু অবস্থান থেকে প্রতিরক্ষাকারীদের ওপর গুলি চালানোর সুযোগ দিতে পারত। ফলে উভয় পক্ষই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠে। বিদেশি সৈন্যরা ছোট ছোট হামলা চালিয়ে কৌশলগত অবস্থান পুনর্দখল করার চেষ্টা করে।
এই সময় দৈনন্দিন জীবন দ্রুত কঠিন হয়ে পড়ে। খাবার সীমিত ছিল, চিকিৎসা সামগ্রী কমছিল এবং অবিরাম গুলি ও আগুনের মধ্যে মানুষকে আশ্রয় নিতে হচ্ছিল। ঘোড়াসহ বিভিন্ন খাদ্যসম্পদ ব্যবহার করতে হয়েছিল। আহতদের চিকিৎসা অস্থায়ী হাসপাতাল ও দূতাবাসের ভবনে করা হতো।
আগুন ছিল আরেকটি বড় বিপদ। বক্সার ও চিং বাহিনী বিভিন্ন ভবনে আগুন লাগানোর চেষ্টা করে, যাতে আগুন ছড়িয়ে লেগেশন এলাকাকে ধ্বংস করে। প্রতিরক্ষাকারীরা দেয়াল ভেঙে আগুনের বিস্তার ঠেকানো, পানি বহন করা এবং ভবন বিচ্ছিন্ন করার মতো ব্যবস্থা নেয়।
একই সময়ে বেইজিংয়ের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অবরোধ চলছিল বেইতাং বা নর্দার্ন ক্যাথেড্রাল ঘিরে। সেখানে বহু চীনা ক্যাথলিক এবং বিদেশি ধর্মযাজক আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদেরও দীর্ঘ সময় ধরে বক্সার ও চিং বাহিনীর আক্রমণের মুখে টিকে থাকতে হয়। ফলে রাজধানীর সংকট কেবল কূটনৈতিক এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল না।
লেগেশন কোয়ার্টারে সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক চাপ ছিল তথ্যের অভাব। টেলিগ্রাফ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় অবরুদ্ধ মানুষ জানতেন না বাইরের বিশ্বে কী ঘটছে। কখনও গুজব ছড়াত উদ্ধারবাহিনী কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, আবার কখনও বলা হতো সমস্ত বিদেশি বাহিনী পরাজিত হয়েছে।
এই অনিশ্চয়তাই অবরোধকে সামরিক সংঘর্ষের পাশাপাশি এক বিশাল মানসিক যুদ্ধে পরিণত করেছিল।
কিন্তু বাইরে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছিল। বেইজিংয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের অবরুদ্ধ থাকা ব্রিটেন, জাপান, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির জন্য এমন একটি সংকট সৃষ্টি করে যেখানে তাদের পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সাময়িকভাবে দ্বিতীয় স্থানে চলে যায়।
এই রাষ্ট্রগুলো তখন একে অপরের সহযোগী ছিল না। বরং এশিয়া ও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তারা পরস্পরের প্রতিযোগী ছিল। রাশিয়া ও জাপানের মধ্যে উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছিল, ব্রিটেন রুশ সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল, জার্মানিও চীনে নিজের প্রভাব বাড়াতে চাইছিল। তবু বেইজিংয়ে নিজেদের কূটনীতিক ও নাগরিকদের জীবন বিপন্ন হওয়ায় তারা যৌথ সামরিক উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়।
এভাবেই গড়ে ওঠে আট-জাতি জোট। আন্তর্জাতিক বাহিনীর একটি বড় অংশ জাপানি, রুশ, ব্রিটিশ ও আমেরিকান সৈন্য নিয়ে গঠিত ছিল; অন্যান্য রাষ্ট্রও বাহিনী পাঠায়। তাদের লক্ষ্য ছিল তিয়ানজিনের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা এবং তারপর বেইজিংয়ের দিকে অগ্রসর হয়ে লেগেশন অবরোধ ভাঙা।
তিয়ানজিন অঞ্চলের তীব্র যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক বাহিনী রাজধানীর দিকে অগ্রসর হয়। প্রচণ্ড গরম, যোগাযোগ সমস্যা এবং চীনা প্রতিরোধ সত্ত্বেও তারা ধীরে ধীরে বেইজিংয়ের কাছে পৌঁছে যায়।
১৪ আগস্ট ১৯০০ সালে আন্তর্জাতিক বাহিনী বেইজিংয়ে প্রবেশ শুরু করে। বিভিন্ন দেশের সৈন্যরা শহরের পৃথক প্রবেশপথ ব্যবহার করে এগিয়ে আসে। দিনের মধ্যেই বিদেশি বাহিনীর অংশ লেগেশন কোয়ার্টারের কাছে পৌঁছে যায় এবং প্রায় ৫৫ দিনের অবরোধের অবসান ঘটে।
অবরুদ্ধ মানুষের কাছে উদ্ধার ছিল নাটকীয় স্বস্তির মুহূর্ত। কিন্তু বেইজিংয়ের বৃহত্তর জনগণের জন্য নতুন অধ্যায়টি মোটেও শান্তিপূর্ণ ছিল না। আন্তর্জাতিক বাহিনী রাজধানী দখলের পর ব্যাপক লুটপাট, প্রতিশোধমূলক সহিংসতা এবং শাস্তিমূলক অভিযান সংঘটিত হয়। বিদেশি শক্তিগুলো উত্তর চীনের বিভিন্ন এলাকায় বক্সার ও তাদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়।
সুতরাং লেগেশন অবরোধের অবসান একটি মানবিক উদ্ধার হলেও একই সঙ্গে বিদেশি সামরিক দখল ও আরও গভীর রাজনৈতিক অপমানের সূচনা ছিল।
রাজদরবারের অবস্থাও দ্রুত ভেঙে পড়ে। সম্রাজ্ঞী বিধবা সিশি ও গুয়াংশু সম্রাট বেইজিং ছেড়ে পশ্চিমে পালিয়ে যান। রাজধানী বিদেশি বাহিনীর হাতে চলে যাওয়া চিং সরকারের দুর্বলতার সবচেয়ে প্রকাশ্য প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।
লেগেশন অবরোধ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে যে প্রভাব ফেলেছিল, তা ছিল অত্যন্ত গভীর। বক্সার সহিংসতা শুরুতে বিদেশি মিশনারি ও চীনা খ্রিস্টানদের ওপর কেন্দ্রীভূত থাকলেও বেইজিংয়ে কূটনীতিকদের অবরোধ এবং কেটেলারের হত্যাকাণ্ড সংকটকে রাষ্ট্র-রাষ্ট্র সংঘর্ষে পরিণত করে।
কোনো একটি বিদেশি রাষ্ট্রের দূতাবাস নয়, একসঙ্গে বহু দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্ব হুমকির মুখে পড়েছিল। ফলে প্রতিটি শক্তির কাছে সামরিক হস্তক্ষেপের নিজস্ব কারণ তৈরি হয়। এটাই বক্সার সংকটের আন্তর্জাতিকীকরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, চিং সরকারের কিছু বাহিনী যখন অবরোধে অংশ নেয়, তখন বিদেশি শক্তিগুলোর কাছে বক্সার সহিংসতা এবং চিং রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। বিদ্রোহ দমন করার পরিবর্তে সরকার নিজেই যদি বিদেশিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তাহলে সংঘর্ষ আর নিছক বিদ্রোহ থাকে না।
এই পরিবর্তনই শেষ পর্যন্ত চিং সাম্রাজ্যের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। আন্তর্জাতিক বাহিনী শুধু লেগেশন মুক্ত করেই থামেনি; পরবর্তী শান্তি আলোচনায় বিদেশি রাষ্ট্রগুলো ব্যাপক ক্ষতিপূরণ, সামরিক নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক ছাড় দাবি করে।
এর ফল ছিল ১৯০১ সালের বক্সার প্রোটোকল। চীনকে ৪৫০ মিলিয়ন হাইকওয়ান তায়েল ক্ষতিপূরণ, বিদেশি সেনা মোতায়েনের অধিকার, দাগু দুর্গ ধ্বংস, বিদেশিবিরোধী কর্মকর্তাদের শাস্তি এবং লেগেশন কোয়ার্টারের বিশেষ সুরক্ষাসহ একাধিক কঠোর শর্ত মেনে নিতে হয়।
এই অর্থে লেগেশন অবরোধের সঙ্গে বক্সার প্রোটোকলের সরাসরি সম্পর্ক ছিল। অবরোধ যত দীর্ঘ হয়েছে এবং বিদেশি কূটনীতিকদের নিরাপত্তা যত বেশি হুমকির মুখে পড়েছে, আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়াও তত কঠোর হয়েছে।
তবে “বিশ্বশক্তি এক হয়ে চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল”—এই বক্তব্যেরও সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা প্রয়োজন। আট-জাতি জোট কোনো স্থায়ী রাজনৈতিক বন্ধুত্ব ছিল না। তারা একই শত্রুর বিরুদ্ধে সাময়িক সহযোগিতা করেছিল। চীনে প্রত্যেক রাষ্ট্রের স্বার্থ আলাদা ছিল এবং বিজয়ের পরও তাদের মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ ও প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকে।
তবু ১৯০০ সালের বেইজিং সংকট এমন একটি বিরল মুহূর্ত তৈরি করেছিল যেখানে ইউরোপীয় সাম্রাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপান একই সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছিল। তাদের ঐক্যের প্রধান কারণ ছিল কোনো অভিন্ন আদর্শ নয়, বরং নিজেদের নাগরিক, কূটনৈতিক মর্যাদা এবং চীনে অর্জিত স্বার্থ রক্ষা।
বেইজিংয়ের ৫৫ দিনের লেগেশন অবরোধ তাই শুধু একটি নাটকীয় অবরোধের ইতিহাস নয়। এটি দেখায় কীভাবে একটি স্থানীয় বিদেশিবিরোধী আন্দোলন, দুর্বল ও বিভক্ত রাজদরবারের ভুল সিদ্ধান্ত এবং বিদেশি কূটনীতিকদের সরাসরি হুমকি মিলিত হয়ে আন্তর্জাতিক যুদ্ধে পরিণত হতে পারে।
এটি একই সঙ্গে বক্সার আন্দোলনের সবচেয়ে বড় কৌশলগত বিপর্যয়গুলোর একটি ছিল। বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে বক্সাররা এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, যাতে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো নিজেদের বিভেদ সাময়িকভাবে ভুলে চীনে সম্মিলিত সামরিক হস্তক্ষেপের যৌক্তিকতা খুঁজে পায়।
শেষ পর্যন্ত ৫৫ দিনের অবরোধ শুধু লেগেশন কোয়ার্টারের দেয়ালের ভেতরে আটকে থাকা কয়েক হাজার মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করেনি; এটি পুরো চিং সাম্রাজ্যের আন্তর্জাতিক অবস্থান বদলে দিয়েছিল। অবরোধ ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে বেইজিং বিদেশি সেনাদের হাতে চলে যায়, চিং দরবার পালিয়ে যায় এবং পরের বছর বক্সার প্রোটোকলের মাধ্যমে চীনের ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক শর্ত চাপানো হয়। এই কারণেই বেইজিংয়ের লেগেশন অবরোধ বক্সার বিদ্রোহের কেন্দ্রীয় ঘটনা এবং চীনের তথাকথিত “জাতীয় অপমানের শতাব্দী”-র অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়।
বক্সার প্রোটোকল ১৯০১: কারা স্বাক্ষর করেছিল এবং চুক্তির প্রধান শর্তগুলো কী ছিল?
সিপাহী বিদ্রোহ নাকি ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ? ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পরিণতি: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পতন ও ব্রিটিশ রাজের সূচনা
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ: নেতৃত্ব, ঐক্য, অস্ত্র ও কৌশলে কোথায় পিছিয়ে ছিল বিদ্রোহীরা?
বক্সার বিদ্রোহের পর শান্তি আলোচনা: পরাজিত চীনের ওপর কী কী শর্ত চাপিয়েছিল বিদেশি শক্তিগুলো
বেইজিংয়ের পতন ১৯০০: বিদেশি সেনাদের দখল, লুটপাট ও চিং সাম্রাজ্যের অপমান