সিপাহী বিদ্রোহ নাকি ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ? ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
Series: সিপাহী বিদ্রোহ ১৮৫৭: ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের মহাবিদ্রোহ
- Author: Admin
- August 15, 2026
সিপাহী বিদ্রোহ নাকি ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ?
১৮৫৭ সালের ঘটনাকে কী নামে ডাকা উচিত—“সিপাহী বিদ্রোহ”, “মহাবিদ্রোহ”, “১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহ”, নাকি “ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ”? দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় পরও এই প্রশ্নের একটি সর্বজনস্বীকৃত উত্তর নেই। কারণ নামকরণের সঙ্গে শুধু শব্দের পার্থক্য জড়িত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমরা ঘটনাটির প্রকৃতি কীভাবে বুঝছি। এটি কি মূলত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনীর ভারতীয় সিপাহীদের সামরিক বিদ্রোহ ছিল? নাকি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন উৎখাতের জন্য একটি বৃহৎ ভারতীয় সংগ্রাম? নাকি বাস্তবতা এই দুই ব্যাখ্যার মাঝামাঝি আরও জটিল কোনো জায়গায় অবস্থান করছে?
ঘটনার সূচনা দেখলে “সিপাহী বিদ্রোহ” শব্দটির একটি স্পষ্ট ভিত্তি পাওয়া যায়। ১৮৫৭ সালের প্রথম বিস্ফোরণগুলো ঘটেছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বেঙ্গল আর্মির মধ্যে। এনফিল্ড রাইফেলের নতুন কার্তুজে গরু ও শূকরের চর্বি ব্যবহারের গুজব হিন্দু ও মুসলিম সিপাহীদের মধ্যে ধর্মীয় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। ব্যারাকপুরে মঙ্গল পান্ডের ঘটনা এবং পরে মিরাটের সিপাহীদের বিদ্রোহ সামরিক অসন্তোষকে প্রকাশ্য সংঘর্ষে পরিণত করে।
১০ মে ১৮৫৭ মিরাটে বিদ্রোহের পর সিপাহীরা দিল্লির দিকে অগ্রসর হয়, পরদিন শহরে প্রবেশ করে এবং শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে নিজেদের প্রতীকী নেতা হিসেবে গ্রহণ করে। এই পর্যায় পর্যন্ত ঘটনাটিকে সেনাবাহিনীর বিদ্রোহ হিসেবে বর্ণনা করা অযৌক্তিক নয়। বিদ্রোহের বিস্তারের প্রধান বাহকও ছিল বিভিন্ন সেনানিবাসের ভারতীয় রেজিমেন্ট।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন আমরা মিরাট ও দিল্লির বাইরে তাকাই। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আওধ, রোহিলখণ্ড, কানপুর, বুন্দেলখণ্ড, বিহার এবং মধ্য ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্রিটিশ কর্তৃত্ব ভেঙে পড়ে। সেখানে শুধু সিপাহীরাই যুদ্ধ করেনি। তালুকদার, জমিদার, কৃষক, দেশীয় রাজপরিবার, ধর্মীয় নেতা, নগরবাসী এবং বিভিন্ন স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীও বিদ্রোহে যুক্ত হয়েছিল।
আওধ এই বৃহত্তর চরিত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণ। ব্রিটিশরা ১৮৫৬ সালে আওধ দখল করার পর রাজপরিবার ক্ষমতা হারায়, বহু তালুকদারের জমি ও প্রভাব ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পুরোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য মানুষ জীবিকা হারায়। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ শুরু হলে এই জমে থাকা অসন্তোষ বিস্ফোরিত হয়। বেগম হযরত মহলের নেতৃত্বে লক্ষ্ণৌতে বিকল্প শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে এবং আওধের গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ প্রতিরোধ শুরু হয়।
ঝাঁসিতেও পরিস্থিতি শুধু সামরিক বিদ্রোহে সীমাবদ্ধ ছিল না। রানি লক্ষ্মীবাইয়ের সঙ্গে ব্রিটিশদের বিরোধের মূল ছিল তাঁর দত্তকপুত্রের উত্তরাধিকার প্রত্যাখ্যান এবং ডকট্রিন অব ল্যাপসের মাধ্যমে ঝাঁসি দখল। ১৮৫৭ সালের ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। পরে ঝাঁসি, কালপি এবং গোয়ালিয়রের যুদ্ধে তাঁর ভূমিকা তাঁকে বিদ্রোহের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত করে।
কানপুরে নানা সাহেবের অভিযোগও একইভাবে কোম্পানির রাজনৈতিক নীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাঁর দত্তকপিতা সাবেক পেশোয়া বাজিরাও দ্বিতীয়ের পেনশন তাঁকে দিতে ব্রিটিশরা অস্বীকার করেছিল। বিহারে কুনওয়ার সিংয়ের নেতৃত্বে স্থানীয় যোদ্ধা ও বিদ্রোহী সিপাহীরা যুদ্ধ করে। রোহিলখণ্ডে খান বাহাদুর খান এবং আওধে মৌলভি আহমদুল্লাহ শাহের মতো নেতারাও সামনে আসেন।
এই বাস্তবতাগুলো দেখায় যে ১৮৫৭-কে শুধু সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ বলা যথেষ্ট নয়। সিপাহীরা বিস্ফোরণের প্রধান অনুঘটক ছিল, কিন্তু বহু অঞ্চলে তাদের বিদ্রোহ দ্রুত বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিরোধের সঙ্গে মিশে যায়।
তাহলে কি একে সরাসরি “ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ” বলা যায়? এখানেই দ্বিতীয় বিতর্ক শুরু হয়।
এই ব্যাখ্যার শক্তিশালী ভিত্তিও রয়েছে। প্রথমত, বিদ্রোহীরা বহু অঞ্চলে সরাসরি ব্রিটিশ কর্তৃত্ব উৎখাত করেছিল। দিল্লিতে বাহাদুর শাহ জাফরের নামে শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়, কানপুরে নানা সাহেব কর্তৃত্ব গ্রহণ করেন, লক্ষ্ণৌতে বিরজিস কদরকে আওধের শাসক ঘোষণা করা হয় এবং ঝাঁসিতে লক্ষ্মীবাই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীন সামরিক প্রতিরোধ পরিচালনা করেন। ব্রিটিশ শাসন অপসারণ ছিল বিদ্রোহের বহু গুরুত্বপূর্ণ নেতার বাস্তব রাজনৈতিক লক্ষ্য।
দ্বিতীয়ত, হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ বহু স্থানে একই পক্ষ থেকে যুদ্ধ করেছে। এনফিল্ড কার্তুজের ঘটনায় দুই ধর্মের সিপাহীদের ধর্মীয় উদ্বেগ একত্রিত হয়েছিল। দিল্লির বিদ্রোহী ঘোষণাগুলোতেও বিভিন্ন সম্প্রদায়কে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা দেখা যায়। পরবর্তী জাতীয়তাবাদী স্মৃতিতে এই সহযোগিতা বিশেষ গুরুত্ব পায়।
কিন্তু আধুনিক জাতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধের ধারণা সরাসরি ১৮৫৭-এর ওপর বসিয়ে দিলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা তৈরি হয়। বিদ্রোহীদের কোনো একক সর্বভারতীয় রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না। বাহাদুর শাহ জাফর, নানা সাহেব, লক্ষ্মীবাই, বেগম হযরত মহল ও কুনওয়ার সিং সবাই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়লেও তাঁদের প্রত্যেকের রাজনৈতিক অবস্থান ও উদ্দেশ্য একই ছিল না।
অনেকেই মূলত ব্রিটিশদের হাতে হারানো পুরোনো অধিকার, রাজ্য, পেনশন, জমি বা রাজনৈতিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিলেন। কেউ মুঘল কর্তৃত্বের প্রতীক ব্যবহার করছিলেন, কেউ মারাঠা ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কেউ নিজের দেশীয় রাজ্যের বৈধতা রক্ষা করছিলেন। একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক, ঐক্যবদ্ধ ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহীদের মধ্যে ছিল না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, পুরো ভারত বিদ্রোহ করেনি। দক্ষিণ ভারতের বড় অংশ, বোম্বে ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির অধিকাংশ অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে থাকে। বহু দেশীয় রাজা বিদ্রোহে যোগ দেননি। হায়দরাবাদের নিজাম, গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া, পাতিয়ালা, জিন্দ ও নাভার শাসকেরা ব্রিটিশদের পাশে বা তাদের সঙ্গে সহযোগিতামূলক অবস্থানে ছিলেন।
শিখ, গুর্খা, পাঞ্জাবি এবং অন্যান্য ভারতীয় সৈন্যের উল্লেখযোগ্য অংশও ব্রিটিশ বাহিনীতে যুদ্ধ করেছিল। দিল্লি পুনর্দখলকারী বাহিনীর মধ্যেই বিপুলসংখ্যক ভারতীয় সৈন্য ছিল। ফলে ১৮৫৭-কে পুরো ভারতীয় জাতি বনাম বিদেশি ব্রিটিশ শক্তির একটি সরল দ্বিপক্ষীয় যুদ্ধ হিসেবে দেখানো ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে বিকৃত করবে।
এই জটিলতার কারণেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন “Sepoy Mutiny” শব্দটি জনপ্রিয় ছিল। এই নাম বিদ্রোহের সামরিক সূচনাকে সামনে আনে, কিন্তু এর মাধ্যমে বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে ছোট করে দেখানোর প্রবণতাও তৈরি হয়। বিশেষ করে আওধের মতো অঞ্চলে যে ধরনের ব্যাপক গ্রামীণ বিদ্রোহ ঘটেছিল, তাকে শুধু “সিপাহী মিউটিনি” বলা যথেষ্ট ব্যাখ্যা দেয় না।
পরবর্তী ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ইতিহাসে বিপরীত ব্যাখ্যা শক্তিশালী হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিনায়ক দামোদর সাভারকর ১৮৫৭ সালের ঘটনাকে ভারতের স্বাধীনতার প্রথম যুদ্ধ হিসেবে জনপ্রিয়ভাবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর লেখায় লক্ষ্মীবাই, নানা সাহেব, তাতিয়া টোপে, বাহাদুর শাহ জাফরসহ বিদ্রোহী নেতারা একটি বৃহত্তর জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের যোদ্ধা হিসেবে উপস্থাপিত হন।
এই ব্যাখ্যা পরবর্তী ঔপনিবেশিকবিরোধী রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। ১৮৫৭-এর নেতারা শুধু অতীতের পরাজিত বিদ্রোহী থাকেননি; তাঁরা ভবিষ্যৎ স্বাধীনতা সংগ্রামের অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে রানি লক্ষ্মীবাইয়ের জীবন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতিতে অসাধারণ শক্তিশালী স্থান অর্জন করে।
তবে আধুনিক ইতিহাসচর্চায় অনেক গবেষক এই দুই প্রান্তিক ব্যাখ্যার মাঝখানে অবস্থান করেন। তাঁদের কাছে ১৮৫৭ একই সঙ্গে সামরিক বিদ্রোহ, আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রতিরোধ, সামাজিক বিদ্রোহ এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বৃহৎ অভ্যুত্থান—কিন্তু সব অঞ্চলে এর চরিত্র এক ছিল না।
মিরাটে এটি প্রধানত সিপাহীদের বিদ্রোহ হিসেবে শুরু হয়েছিল। আওধে এটি ব্যাপক গ্রামীণ ও তালুকদার প্রতিরোধের রূপ নিয়েছিল। ঝাঁসিতে রাজবংশীয় অধিকার ও ঔপনিবেশিক সংযুক্তির প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিহারে স্থানীয় জমিদারি নেতৃত্ব বড় ভূমিকা নিয়েছিল। দিল্লিতে মুঘল সম্রাটের প্রতীকী কর্তৃত্ব বিদ্রোহীদের একত্র করার চেষ্টা করেছিল। একটি নাম দিয়ে এই সব অভিজ্ঞতাকে পুরোপুরি ধারণ করা কঠিন।
তবু ১৮৫৭ সালের ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে খুব কমই সন্দেহ রয়েছে। প্রথমত, এটি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের ভিত্তি কাঁপিয়ে দিয়েছিল। সামরিকভাবে বিদ্রোহীরা পরাজিত হলেও ১৮৫৮ সালে কোম্পানির ভারত শাসনের অধিকার বিলুপ্ত করা হয়। ব্রিটিশ ক্রাউন সরাসরি ভারতের প্রশাসন গ্রহণ করে এবং শুরু হয় ব্রিটিশ রাজ।
দ্বিতীয়ত, দেশীয় রাজ্যগুলোর প্রতি ব্রিটিশ নীতি পরিবর্তিত হয়। ডকট্রিন অব ল্যাপসের মতো আগ্রাসী সংযুক্তিকরণনীতি কার্যত পরিত্যক্ত হয়। ব্রিটিশরা বুঝতে পারে যে দেশীয় রাজাদের ব্যাপকভাবে বিচ্ছিন্ন করলে ভবিষ্যতে আবার বড় সংকট তৈরি হতে পারে। ফলে তাদের সাম্রাজ্যের অংশীদার ও সহযোগী হিসেবে ধরে রাখার নীতি শক্তিশালী হয়।
তৃতীয়ত, ভারতীয় সেনাবাহিনী পুনর্গঠন করা হয়। ব্রিটিশরা ইউরোপীয় সৈন্যের অনুপাত বাড়ায়, ভারী কামানবাহিনীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করে এবং বিভিন্ন অঞ্চল ও সম্প্রদায় থেকে সৈন্য নিয়োগের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ভারসাম্য পরিবর্তন করে। ১৮৫৭-এর মতো একযোগে বৃহৎ সামরিক বিদ্রোহ যাতে আর না ঘটে, সেটিই ছিল পুনর্গঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
চতুর্থত, ১৮৫৭ ব্রিটিশ ও ভারতীয়দের সম্পর্কেও গভীর পরিবর্তন আনে। বিদ্রোহের সময় উভয় পক্ষের সহিংসতা এবং পরবর্তী প্রতিশোধ দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস সৃষ্টি করে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সমাজে জাতিগত দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয় এবং ভারতীয়দের রাজনৈতিক আনুগত্য নিয়ে সন্দেহ বৃদ্ধি পায়।
কিন্তু সম্ভবত ১৮৫৭-এর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার ছিল স্মৃতির রাজনীতি। কোনো বিদ্রোহ সামরিকভাবে ব্যর্থ হলেও তার স্মৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনৈতিক কল্পনাকে প্রভাবিত করতে পারে। ১৮৫৭ ঠিক সেটিই করেছিল।
বাহাদুর শাহ জাফর নির্বাসনে মারা যান, লক্ষ্মীবাই গোয়ালিয়রের কাছে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন, তাতিয়া টোপেকে ফাঁসি দেওয়া হয়, বেগম হযরত মহল নেপালে নির্বাসিত জীবন কাটান এবং নানা সাহেবের শেষ পরিণতি রহস্যে হারিয়ে যায়। কিন্তু তাঁদের পরাজয় তাঁদের নাম মুছে দেয়নি। বরং পরবর্তী প্রজন্ম তাঁদের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে পুনরাবিষ্কার করে।
বিশ শতকের ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন অবশ্য ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সরাসরি ধারাবাহিকতা ছিল না। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, স্বদেশি আন্দোলন, বিপ্লবী সংগঠন, অসহযোগ, আইন অমান্য এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনের রাজনৈতিক ভাষা ও সংগঠন ছিল অনেক ভিন্ন। তবু ১৮৫৭ দেখিয়েছিল যে ব্রিটিশ কর্তৃত্বকে ভারতীয়রা অস্ত্র হাতে চ্যালেঞ্জ করতে পারে এবং একসময় বিশাল অঞ্চলে সেই কর্তৃত্ব ভেঙেও দিতে পারে।
১৮৫৭-এর স্মৃতি পরবর্তী বিপ্লবীদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে সশস্ত্র জাতীয়তাবাদীরা লক্ষ্মীবাই, তাতিয়া টোপে ও অন্যান্য নেতাকে বীরত্বের উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করেন। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজে একটি নারী ইউনিটের নাম রাখা হয় “রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট”—যা দেখায় ১৮৫৭-এর প্রতীকী উত্তরাধিকার প্রায় এক শতাব্দী পরও কতটা শক্তিশালী ছিল।
তাহলে শেষ পর্যন্ত কোন নামটি সবচেয়ে সঠিক?
“সিপাহী বিদ্রোহ” বললে এর সূচনাকে সঠিকভাবে ধরা যায়, কিন্তু বিস্তারকে পুরোপুরি বোঝানো যায় না। “প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ” বললে এর ঔপনিবেশিকবিরোধী চরিত্র ও পরবর্তী জাতীয়তাবাদী উত্তরাধিকার ধরা পড়ে, কিন্তু বিদ্রোহের আঞ্চলিক বিভাজন, ভিন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং বহু ভারতীয় শক্তির ব্রিটিশপন্থী অবস্থান আড়াল হয়ে যেতে পারে।
এই কারণে “১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ” বা “১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহ” তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত ঐতিহাসিক পরিভাষা। এতে ঘটনাটিকে শুধু সামরিক মিউটিনি হিসেবে ছোট করা হয় না, আবার পরবর্তী যুগের পূর্ণাঙ্গ জাতীয়তাবাদের ধারণাও সরাসরি তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় না।
তবে “ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ” নামটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আলাদা। এটি শুধু ১৮৫৭ সালে কী ঘটেছিল তার বর্ণনা নয়; পরবর্তী ভারতীয়রা ১৮৫৭-কে কীভাবে স্মরণ করেছে তারও ইতিহাস। একটি পরাজিত বিদ্রোহ কীভাবে কয়েক দশক পরে স্বাধীনতার প্রতীকে রূপ নিতে পারে, এই নাম সেই রাজনৈতিক স্মৃতির সাক্ষ্য বহন করে।
১৮৫৭ সালের প্রকৃত উত্তরাধিকার সম্ভবত এখানেই। বিদ্রোহীরা ব্রিটিশ শাসন উৎখাত করতে পারেনি, কিন্তু তাদের সংগ্রাম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটানোর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে নিজের প্রশাসনিক ও সামরিক নীতি আমূল পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছিল এবং ভবিষ্যৎ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জন্য এক শক্তিশালী ঐতিহাসিক স্মৃতি রেখে গিয়েছিল।
১৮৫৭ তাই শুধু “সিপাহীদের বিদ্রোহ” ছিল না, আবার আধুনিক অর্থে সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ জাতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধও ছিল না। এটি ছিল বহু অসন্তোষ, বহু নেতা, বহু সামাজিক শক্তি এবং বহু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের এক বিশাল ঔপনিবেশিকবিরোধী বিস্ফোরণ। আর সম্ভবত এই জটিলতাই ১৮৫৭-কে এত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। যুদ্ধটি পরাজয়ে শেষ হয়েছিল, কিন্তু তার স্মৃতি পরাজিত হয়নি—বরং পরবর্তী নব্বই বছরে সেই স্মৃতি বারবার ফিরে এসে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় প্রতিরোধের ইতিহাসকে নতুন অর্থ দিয়েছে।
বক্সার প্রোটোকল ১৯০১: কারা স্বাক্ষর করেছিল এবং চুক্তির প্রধান শর্তগুলো কী ছিল?
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ: নেতৃত্ব, ঐক্য, অস্ত্র ও কৌশলে কোথায় পিছিয়ে ছিল বিদ্রোহীরা?
বক্সার বিদ্রোহের পর শান্তি আলোচনা: পরাজিত চীনের ওপর কী কী শর্ত চাপিয়েছিল বিদেশি শক্তিগুলো
বেইজিংয়ের পতন ১৯০০: বিদেশি সেনাদের দখল, লুটপাট ও চিং সাম্রাজ্যের অপমান
আট জাতির জোট কারা ছিল? চীন আক্রমণে ব্রিটেন, জাপান, রাশিয়া ও অন্যান্য বিশ্বশক্তির ভূমিকা