বক্সার নেতাদের শাস্তি ও জার্মানির কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা: বক্সার প্রোটোকলের সবচেয়ে অপমানজনক শর্তগুলোর ইতিহাস
Series: বক্সার প্রোটোকল: চীনের অপমান, বিদেশি শক্তি ও এক অসম চুক্তির ইতিহাস
- Author: Admin
- August 15, 2026
বক্সার নেতাদের শাস্তি ও জার্মানির কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা
১৯০১ সালের বক্সার প্রোটোকলের কঠোরতা শুধু ৪৫০ মিলিয়ন হাইকওয়ান টেল ক্ষতিপূরণ, দাগু দুর্গ ধ্বংস বা বেইজিংয়ে বিদেশি সেনা রাখার অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। চুক্তিতে এমন কিছু প্রকাশ্য শাস্তি ও আনুষ্ঠানিক অনুশোচনার শর্ত রাখা হয়েছিল, যেগুলোর উদ্দেশ্য ছিল বক্সার বিদ্রোহে বিদেশিদের বিরুদ্ধে সহিংসতার জন্য দায়ীদের শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি চিং সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে তার ব্যর্থতা ও দায় স্বীকার করতে বাধ্য করা। উচ্চপদস্থ রাজপুত্র ও কর্মকর্তাদের মৃত্যুদণ্ড, আত্মহত্যার নির্দেশ, নির্বাসন ও পদচ্যুতি থেকে শুরু করে জার্মান সম্রাটের কাছে বিশেষ ক্ষমাপ্রার্থনা মিশন পাঠানো—সব মিলিয়ে এই শর্তগুলো চীনের কাছে বক্সার প্রোটোকলের সবচেয়ে অপমানজনক অংশগুলোর মধ্যে পরিণত হয়।
তবে “বক্সার নেতাদের শাস্তি” কথাটি কিছুটা ব্যাখ্যা করা দরকার। বক্সার আন্দোলন আধুনিক রাজনৈতিক দলের মতো কেন্দ্রীয় নেতৃত্বাধীন সংগঠন ছিল না। উত্তর চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় দল, ধর্মীয়-যুদ্ধকলা গোষ্ঠী এবং গ্রামীণ অনুসারীদের মাধ্যমে আন্দোলনটি বিস্তার লাভ করেছিল। তাই ১৯০১ সালের চুক্তিতে শাস্তির প্রধান লক্ষ্য শুধু মাঠপর্যায়ের বক্সার যোদ্ধারা ছিলেন না; বরং চিং রাজদরবারের সেই রাজপুত্র, মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা, যাদের বিদেশি শক্তিগুলো বক্সারদের সমর্থন, উৎসাহ বা বিদেশিবিরোধী সহিংসতার জন্য দায়ী মনে করেছিল।
এর পেছনে ছিল ১৯০০ সালের ঘটনাপ্রবাহ। প্রথমদিকে চিং দরবার বক্সারদের নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত থাকলেও পরে রক্ষণশীল একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী আন্দোলনটিকে বিদেশিদের বিরুদ্ধে কাজে লাগানোর পক্ষে অবস্থান নেয়। সম্রাজ্ঞী বিধবা সিশির দরবারের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বিশ্বাস করেছিলেন, বক্সারদের গণসমর্থন ও চিং সেনাবাহিনী একত্রে বিদেশি শক্তিকে উত্তর চীন থেকে বিতাড়িত করতে পারে।
এই নীতির পরিণতি হয় বিপর্যয়কর। বেইজিংয়ের লেগেশন কোয়ার্টার অবরুদ্ধ হয়, বিদেশি নাগরিক ও চীনা খ্রিস্টানদের ওপর সহিংসতা ঘটে এবং চিং সেনাবাহিনীর কিছু ইউনিটও বিদেশিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয়। আট জাতির জোট বেইজিং দখল করার পর বিজয়ী শক্তিগুলো তাই দাবি তোলে—শুধু বিদ্রোহীদের নয়, তাদের পৃষ্ঠপোষক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও শাস্তি দিতে হবে।
বিদেশিদের কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তিদের একজন ছিলেন প্রিন্স দুয়ান বা জাইই। তিনি চিং রাজপরিবারের প্রভাবশালী সদস্য এবং দরবারের কট্টর বিদেশিবিরোধী গোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তার পুত্রকে সম্ভাব্য সিংহাসন উত্তরাধিকারী হিসেবে সামনে আনার রাজনৈতিক পরিকল্পনাও একসময় ছিল, ফলে দরবারে তার অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।
প্রিন্স দুয়ান বক্সারদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং বিদেশিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। বেইজিং সংকটের সময় তার নাম বিদেশি প্রতিনিধিদের কাছে বক্সারপন্থী রাজদরবারি গোষ্ঠীর প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
বক্সার প্রোটোকলের পূর্ববর্তী আলোচনায় বিদেশি শক্তিগুলো তার কঠোর শাস্তি দাবি করে। শেষ পর্যন্ত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি, কিন্তু তার পদমর্যাদা ও সরকারি দায়িত্ব কেড়ে নিয়ে দূরবর্তী অঞ্চলে নির্বাসিত করা হয়। তার রাজনৈতিক প্রভাব কার্যত শেষ হয়ে যায়।
আরও কঠোর পরিণতি হয় কিছু অন্য কর্মকর্তার। জাইশুন, যিনি প্রিন্স ঝুয়াং নামে পরিচিত ছিলেন, বক্সারপন্থী অবস্থানের কারণে শাস্তির মুখে পড়েন। তাকে আত্মহত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়। চিং প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ইউ শিয়েনও বিদেশিদের কাছে বিশেষভাবে কুখ্যাত ছিলেন। শানতুং এবং পরে শানশিতে তার প্রশাসনিক ভূমিকা বক্সার ও খ্রিস্টানবিরোধী সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত বলে বিবেচিত হয়। তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
এছাড়া গাংই-এর মতো কট্টর রক্ষণশীল কর্মকর্তারাও বিদেশিদের শাস্তির তালিকায় ছিলেন। তবে তিনি চূড়ান্ত শাস্তি কার্যকর হওয়ার আগেই মারা যান। আরও কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আত্মহত্যা, মৃত্যুদণ্ড, নির্বাসন বা পদচ্যুতির শিকার হন।
এই শাস্তিগুলোর একটি গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল। সাধারণত কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র নিজের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেবে তা সেই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু এখানে বিদেশি শক্তিগুলো নাম ধরে নির্দিষ্ট চীনা কর্মকর্তাদের শাস্তির দাবি করছিল এবং পরাজিত চিং সরকার তা কার্যকর করতে বাধ্য হচ্ছিল।
অর্থাৎ বক্সার প্রোটোকল শুধু বিদেশি নাগরিকদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করেনি; এটি চীনের নিজস্ব রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজাতদের ভাগ্য নির্ধারণেও বিদেশি শক্তিকে কার্যকর প্রভাব দিয়েছিল। চীনের সার্বভৌমত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়।
শাস্তি শুধু কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিদেশিবিরোধী আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি দুর্বল করার জন্য আরও বিস্তৃত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যেসব শহর বা অঞ্চলে বিদেশিদের হত্যা বা গুরুতর নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল, সেখানে সাম্রাজ্যিক সরকারি পরীক্ষা পাঁচ বছরের জন্য স্থগিত রাখার শর্ত আরোপ করা হয়।
এই শাস্তির গুরুত্ব আধুনিক সময়ে সহজে বোঝা কঠিন। চীনের সাম্রাজ্যিক পরীক্ষা ব্যবস্থা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কর্মকর্তা নির্বাচনের কেন্দ্রীয় পদ্ধতি ছিল। একটি অঞ্চলের শিক্ষিত পরিবারের জন্য পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শুধু চাকরির সুযোগ নয়, সামাজিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক উত্থানের প্রধান পথ ছিল।
ফলে কোনো শহরে পাঁচ বছরের জন্য পরীক্ষা বন্ধ করা মানে শুধু কয়েকজন অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া নয়; পুরো এলাকার শিক্ষিত শ্রেণিকে সমষ্টিগতভাবে শাস্তির আওতায় আনা। বিদেশি শক্তিগুলো এর মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছিল—ভবিষ্যতে বিদেশিবিরোধী সহিংসতা ঘটলে তার মূল্য স্থানীয় সমাজকেও বহন করতে হবে।
কিন্তু বক্সার প্রোটোকলের সবচেয়ে নাটকীয় ও প্রতীকী শর্তগুলোর একটি তৈরি হয়েছিল একজন মানুষের হত্যাকে কেন্দ্র করে। তিনি ছিলেন চীনে নিযুক্ত জার্মান মন্ত্রী ক্লেমেন্স ফন কেটেলার।
১৯০০ সালের ২০ জুন বেইজিংয়ের পরিস্থিতি যখন চরম উত্তেজনাপূর্ণ, তখন কেটেলার চিং সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্দেশ্যে লেগেশন এলাকা থেকে বের হন। পথে একজন চীনা সৈন্য তাকে গুলি করে হত্যা করে। একজন স্বীকৃত বিদেশি কূটনৈতিক প্রতিনিধির রাজধানীর রাস্তায় নিহত হওয়া আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুতর ঘটনা ছিল।
জার্মানিতে ঘটনাটি তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সম্রাট দ্বিতীয় ভিলহেল্ম এবং জার্মান সরকার এটিকে শুধু একজন কর্মকর্তার হত্যা নয়, জার্মান সাম্রাজ্যের মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচনা করে।
ফলে শান্তি আলোচনায় জার্মানি আনুষ্ঠানিক ও প্রকাশ্য প্রায়শ্চিত্তের দাবি জানায়। চিং সরকারকে এমন একজন উচ্চপদস্থ রাজপরিবারের সদস্যকে জার্মানিতে পাঠাতে হবে, যিনি সম্রাটের কাছে ব্যক্তিগতভাবে চীনের অনুশোচনা প্রকাশ করবেন।
এই কাজের জন্য নির্বাচন করা হয় প্রিন্স চুন বা জাইফেংকে। তিনি ছিলেন চিং রাজপরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং ভবিষ্যৎ শেষ সম্রাট পুয়ির পিতা। ১৯০১ সালে তিনি একটি বিশেষ ক্ষমাপ্রার্থনা মিশনের নেতৃত্ব দিয়ে জার্মানিতে যান।
এই সফর ছিল সাধারণ কূটনৈতিক সফর নয়। এর পুরো উদ্দেশ্যই ছিল কেটেলার হত্যার জন্য চিং সরকারের পক্ষ থেকে জার্মান সম্রাটের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুশোচনা জানানো। পরাজিত চীনের একজন রাজপুত্রকে ইউরোপে গিয়ে বিজয়ী শক্তির সম্রাটের সামনে এমন দায়িত্ব পালন করতে হওয়া চীনা রাজনৈতিক মর্যাদার জন্য অত্যন্ত অপমানজনক বলে বিবেচিত হয়েছিল।
তবে বার্লিনে অনুষ্ঠান কীভাবে হবে তা নিয়েও কূটনৈতিক টানাপোড়েন দেখা দেয়। জার্মান পক্ষ এমন আনুষ্ঠানিকতা চাইছিল যা চীনের অধস্তন অবস্থান স্পষ্ট করবে। অন্যদিকে চীনা প্রতিনিধিরা এমন কোনো আচার এড়াতে চাইছিলেন যা সরাসরি জাতীয় অবমাননা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত প্রিন্স চুন জার্মান সম্রাট দ্বিতীয় ভিলহেল্মের কাছে চিং সম্রাটের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুশোচনার বার্তা উপস্থাপন করেন। এটি বক্সার সংকটের সামরিক পরাজয়কে ইউরোপের রাজদরবারে দৃশ্যমান কূটনৈতিক অপমানে রূপান্তরিত করেছিল।
কেটেলার হত্যার জন্য শুধু ক্ষমাপ্রার্থনাই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হয়নি। বেইজিংয়ে যে স্থানে তাকে হত্যা করা হয়েছিল, সেখানে তার স্মরণে একটি স্মারক খিলান বা monument নির্মাণের শর্তও দেওয়া হয়।
এই স্মৃতিস্তম্ভের রাজনৈতিক অর্থ ছিল গভীর। চীনের রাজধানীর রাস্তায় স্থায়ীভাবে এমন একটি স্থাপনা থাকবে, যা প্রতিদিন মনে করিয়ে দেবে একজন বিদেশি কূটনীতিকের হত্যার জন্য চিং সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে দায় স্বীকার করতে হয়েছিল।
অর্থাৎ স্মৃতিস্তম্ভটি শুধু কেটেলারকে স্মরণ করার জন্য ছিল না; এটি ছিল বিদেশি শক্তির বিজয় এবং চীনের বাধ্যতামূলক অনুশোচনার দৃশ্যমান প্রতীক।
জাপানের ক্ষেত্রেও অনুরূপ দাবি ছিল। ১৯০০ সালের সংকটের সময় জাপানি দূতাবাসের চ্যান্সেলর সুগিয়ামা আকিরা চীনা সৈন্যদের হাতে নিহত হন। বক্সার প্রোটোকলে তার হত্যার জন্যও চীনা সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুশোচনা প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হয়।
এসব দাবি বিদেশি শক্তিগুলোর দৃষ্টিকোণ থেকে কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের বিশেষ মর্যাদা রক্ষার সঙ্গে যুক্ত ছিল। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা স্বাগতিক সরকারের মৌলিক দায়িত্ব। চিং সরকার ১৯০০ সালে সেই নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছিল।
কিন্তু চীনা দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নটি ছিল আরও জটিল। বিদেশি শক্তিগুলো আগের কয়েক দশকে যুদ্ধের মাধ্যমে চীনের কাছ থেকে একের পর এক বিশেষ অধিকার আদায় করেছিল। এখন তাদের সৈন্য রাজধানী দখল করে আছে এবং সেই সামরিক অবস্থানের শক্তিতে তারা চীনা রাজপরিবারের সদস্যদের বিদেশে পাঠিয়ে প্রকাশ্যে অনুশোচনা জানাতে বাধ্য করছে।
আইনি দায়বদ্ধতা ও সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতার প্রদর্শন—দুটি বিষয় একই ঘটনায় মিশে গিয়েছিল।
বক্সার প্রোটোকলের শাস্তিমূলক ধারাগুলোর আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতে চিং কর্মকর্তাদের আচরণ পরিবর্তন করা। বিদেশিবিরোধী সংগঠন নিষিদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সতর্ক করা হয় যে ভবিষ্যতে এমন আন্দোলন দমন করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই শাস্তির মুখে পড়বেন।
এর ফলে চিং কর্মকর্তাদের জন্য একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। আগে কোনো স্থানীয় বিদেশিবিরোধী আন্দোলনকে সহানুভূতির চোখে দেখলে বা উপেক্ষা করলে হয়তো কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনা করা যথেষ্ট ছিল। কিন্তু এখন বিদেশি শক্তির প্রতিক্রিয়াও তাদের ব্যক্তিগত কর্মজীবন ও জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।
বক্সার প্রোটোকল এভাবে চীনের প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভেতরেও বিদেশি চাপের স্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তৈরি করেছিল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শাস্তির এই ব্যবস্থা চিং রাজবংশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেও পাল্টে দেয়। বক্সারদের সমর্থনকারী রক্ষণশীল গোষ্ঠী বিপর্যস্ত হয়। যে ব্যক্তিরা ১৯০০ সালে বিদেশিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে এসেছিলেন, তাদের অনেকেই এক বছরের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, নির্বাসিত বা রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস হয়ে যান।
সম্রাজ্ঞী বিধবা সিশিও বাস্তবতা বুঝে নিজের নীতি দ্রুত পরিবর্তন করেন। যে বক্সার আন্দোলনকে একসময় বিদেশিদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছিল, পরাজয়ের পর সেই আন্দোলনের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করা হয়। চিং সরকার এখন বিদেশি শক্তিগুলোকে দেখাতে চায় যে ভবিষ্যতে এমন বিদ্রোহ আর সহ্য করা হবে না।
এটি ছিল এক তীব্র রাজনৈতিক পরিহাস। ১৯০০ সালে যাদের বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে দেশরক্ষার সম্ভাব্য সহযোগী হিসেবে দেখা হয়েছিল, ১৯০১ সালে তাদের সমর্থকেরাই রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ালেন।
এসব শর্ত সাধারণ চীনা জনগণের কাছেও গভীর অপমানের প্রতীক হয়ে ওঠে। বিদেশি শক্তির কাছে বিপুল ক্ষতিপূরণ দেওয়া এক ধরনের অর্থনৈতিক পরাজয় ছিল; রাজধানীতে বিদেশি সেনা রাখা ছিল সামরিক পরাজয়; আর রাজপরিবারের সদস্যকে ইউরোপে পাঠিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করানো ছিল মর্যাদা ও সম্মানের প্রকাশ্য পরাজয়।
এই কারণেই বক্সার প্রোটোকল পরবর্তী চীনা জাতীয়তাবাদী ইতিহাসে শুধু একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি হিসেবে স্মরণীয় হয়নি। এটি “জাতীয় অপমান”-এর যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে ওঠে।
তবে ঘটনাটিকে শুধু চীনের অপমান হিসেবে দেখলে আরেকটি বাস্তবতা বাদ পড়ে। বক্সার সংকটে বহু বিদেশি এবং আরও বিপুলসংখ্যক চীনা খ্রিস্টান নিহত হয়েছিলেন। কূটনীতিক ও মিশনারিদের হত্যাকাণ্ড বাস্তব অপরাধ ছিল এবং রাষ্ট্র হিসেবে চিং সরকারের দায়ের প্রশ্নও ছিল বাস্তব।
সমস্যা ছিল শাস্তির প্রকৃতি ও ক্ষমতার অসমতা। ন্যায়বিচারের দাবি এমন এক সামরিক পরিস্থিতিতে বাস্তবায়িত হয়েছিল যেখানে বিজয়ী বিদেশি শক্তিগুলো শর্ত নির্ধারণ করছিল এবং পরাজিত চীন তা প্রত্যাখ্যান করার অবস্থায় ছিল না। ফলে বিচার, প্রতিশোধ এবং সাম্রাজ্যবাদী মর্যাদার প্রদর্শনের সীমারেখা অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্ট হয়ে যায়।
এই শর্তগুলো চিং রাজবংশের বৈধতাকেও আরও ক্ষয় করে। জাতীয়তাবাদী ও বিপ্লবীদের কাছে প্রশ্ন ছিল সরল—যে সরকার নিজের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার শাস্তির সিদ্ধান্তও বিদেশি দাবির বাইরে স্বাধীনভাবে নিতে পারে না এবং যার রাজপুত্রকে বিদেশে গিয়ে ক্ষমা চাইতে হয়, সেই সরকার কতটা সার্বভৌম?
মাত্র এক দশকের মধ্যে এই রাজনৈতিক অসন্তোষ আরও বিস্তৃত হয়। আধুনিক শিক্ষা, নতুন সেনাবাহিনী এবং বিপ্লবী সংগঠনের বিকাশের সঙ্গে চিংবিরোধী আন্দোলন শক্তিশালী হতে থাকে। ১৯১১ সালের বিপ্লব শেষ পর্যন্ত দুই শতাব্দীরও বেশি পুরোনো চিং শাসনের পতন ঘটায়।
বক্সার নেতাদের সমর্থনকারী কর্মকর্তাদের শাস্তি এবং জার্মানির কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা তাই বিচ্ছিন্ন কয়েকটি কূটনৈতিক ঘটনা ছিল না। এগুলো দেখিয়েছিল ১৯০০ সালের সামরিক পরাজয়ের পর চিং সরকার কতটা দুর্বল অবস্থানে পৌঁছেছিল।
৪৫০ মিলিয়ন টেলের ক্ষতিপূরণ চীনের অর্থনীতিকে বেঁধে ফেলেছিল, বিদেশি সৈন্য রাজধানীতে চীনের সামরিক সার্বভৌমত্ব সীমিত করেছিল, আর এই শাস্তি ও ক্ষমাপ্রার্থনার ধারাগুলো চিং সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক মর্যাদাকেই প্রকাশ্যে আঘাত করেছিল।
এই কারণেই বক্সার প্রোটোকলের সবচেয়ে স্মরণীয় অপমানগুলোর মধ্যে প্রিন্স চুনের জার্মানি যাত্রা, কেটেলারের স্মৃতিস্তম্ভ এবং চিং কর্মকর্তাদের বিদেশি দাবিতে শাস্তি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। চীনকে শুধু যুদ্ধে পরাজিত করা হয়নি; তাকে সেই পরাজয় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করতে, নিজের কর্মকর্তাদের শাস্তি দিতে এবং বিদেশি রাজদরবারের সামনে প্রকাশ্যে অনুশোচনা প্রকাশ করতেও বাধ্য করা হয়েছিল। আর এই রাজনৈতিক অপমানই পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বক্সার প্রোটোকলকে চীনের অসম চুক্তির যুগের অন্যতম তিক্ত প্রতীকে পরিণত করে।
সিপাহী বিদ্রোহ নাকি ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ? ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পরিণতি: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পতন ও ব্রিটিশ রাজের সূচনা
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ: নেতৃত্ব, ঐক্য, অস্ত্র ও কৌশলে কোথায় পিছিয়ে ছিল বিদ্রোহীরা?
বক্সার বিদ্রোহের পর শান্তি আলোচনা: পরাজিত চীনের ওপর কী কী শর্ত চাপিয়েছিল বিদেশি শক্তিগুলো
বেইজিংয়ের পতন ১৯০০: বিদেশি সেনাদের দখল, লুটপাট ও চিং সাম্রাজ্যের অপমান
আট জাতির জোট কারা ছিল? চীন আক্রমণে ব্রিটেন, জাপান, রাশিয়া ও অন্যান্য বিশ্বশক্তির ভূমিকা