বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

অ্যানসেস্ট্রাল পুয়েবলো সভ্যতা: পাহাড়ের গায়ের বসতিগুলো কেন পরিত্যক্ত হয়েছিল?

সিরিজ: হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন সভ্যতার রহস্য

অ্যানসেস্ট্রাল পুয়েবলো সভ্যতা: পাহাড়ের গায়ের বসতিগুলো কেন পরিত্যক্ত হয়েছিল?
পাহাড়ের গায়ের শূন্য ঘরগুলো অন্তর্ধান নয়, অভিবাসনের সাক্ষ্য।

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শুষ্ক গিরিখাতে পাহাড়ের গায়ের দিকে তাকালে হঠাৎ চোখে পড়ে সারি সারি পাথরের ঘর। কোথাও বহুতল দেওয়াল, কোথাও ছোট জানালা, আবার কোথাও গোলাকার কক্ষের অবশেষ। মাথার ওপর বিশাল শিলাছাদ, সামনে গভীর খাদ—এমন স্থানে মানুষ কীভাবে বসবাস করতেন, তা ভাবলেই বিস্ময় জাগে। আরও বড় প্রশ্ন, এত যত্নে তৈরি বাড়িগুলো কেন ছেড়ে গেলেন? অ্যানসেস্ট্রাল পুয়েবলোদের এই ইতিহাস কোনো জনগোষ্ঠীর রহস্যময় অন্তর্ধানের গল্প নয়; এটি পরিবেশগত চাপ, সামাজিক পরিবর্তন এবং নতুন জনপদে জীবন গড়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়া। সেই পার্থক্য থেকেই পরিত্যক্ত বসতিগুলোর রহস্য বোঝা শুরু করতে হয়।

অ্যানসেস্ট্রাল পুয়েবলো বলতে একটি একক সাম্রাজ্য বা সর্বত্র অভিন্ন সমাজ বোঝায় না। বর্তমান কলোরাডো, উটাহ, অ্যারিজোনা ও নিউ মেক্সিকোর বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের সম্পর্কিত জনগোষ্ঠী বসবাস করতেন। স্থাপত্য, কৃষি, মৃৎপাত্র ও আনুষ্ঠানিক জীবনে মিল থাকলেও স্থানভেদে সমাজ বদলেছে। তাদের সবাই পাহাড়ের গায়ে থাকতেন না; সমতল ভূমি, পাহাড়চূড়া ও উপত্যকাতেও জনপদ ছিল। আজকের পুয়েবলো সম্প্রদায়ের পূর্বপুরুষ হিসেবে তাদের পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ। ফলে একটি এলাকার বসতি ছেড়ে যাওয়াকে সমগ্র সংস্কৃতির অবসান বলা ইতিহাসকে বিকৃত করে।

সবচেয়ে পরিচিত পাহাড়ি বসতিগুলোর একটি অঞ্চল হলো কলোরাডোর মেসা ভার্দে। এখানে বহু শতাব্দী ধরে বাড়িঘরের ধরন পরিবর্তিত হয়েছিল। প্রথমদিকে মাটির নিচে আংশিক নামানো ঘর ব্যবহৃত হতো; পরে ওপরের ভূমিতে পাথরের বৃহত্তর আবাসিক ভবন তৈরি হয়। বিখ্যাত শিলাখাঁজের বসতিগুলোর অধিকাংশ নির্মিত হয় দ্বাদশ শতকের শেষ থেকে ত্রয়োদশ শতকের মধ্যে। যে স্থাপনাগুলোকে আমরা অ্যানসেস্ট্রাল পুয়েবলো ইতিহাসের প্রতীক ভাবি, সেগুলো আসলে দীর্ঘ সাংস্কৃতিক বিকাশের তুলনামূলক শেষ পর্যায়ের নির্মাণ। এগুলো তাদের পুরো ইতিহাসের একমাত্র আবাসনরীতি ছিল না।

এই ঘরগুলো পাহাড় কেটে সম্পূর্ণ তৈরি করা হয়নি। বেলেপাথরের গায়ে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হওয়া বড় খাঁজ বা শিলাছাদের নিচে নির্মাতারা পাথর ও মাটির গাঁথুনি দিয়ে ভবন দাঁড় করিয়েছিলেন। অসম মেঝে ভরাট করে বাসযোগ্য করা হতো। পাথরকে শক্ত পাথরের সরঞ্জাম দিয়ে আকার দেওয়া এবং কাঠ ব্যবহার করে ছাদ নির্মাণ তাদের দক্ষতার পরিচয় দেয়। শিলাছাদ রোদ ও বৃষ্টির কিছু প্রভাব থেকে ঘরকে রক্ষা করত। তবে আশ্রয় থাকলেই জীবন সহজ হয়ে যেত না; কৃষিজমি, পানির উৎস ও চলাচলের পথের সঙ্গে প্রতিদিন সম্পর্ক বজায় রাখতে হতো।

ক্লিফ প্যালেসে প্রায় ১৫০টি কক্ষ এবং ২৩টি কিভা শনাক্ত হয়েছে। এত ঘর দেখে প্রতিটি কক্ষকে আলাদা পরিবারের বাসস্থান ভাবা ভুল; কিছু ঘর ছিল মজুত বা অন্য ব্যবহারের জন্য। কিভা ছিল সাধারণত গোলাকার, আংশিক ভূগর্ভস্থ কক্ষ, যার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক রয়েছে। কাঠের ছাদ থাকলে তার ওপরের স্থানও কাজে ব্যবহার করা যেত। এই বসতিগুলো শুধু পাশাপাশি সাজানো ঘর নয়; আবাসন, খাদ্য সংরক্ষণ এবং সম্প্রদায়ের জীবনকে একত্র করা পরিকল্পিত জনপদ। কিছু বড় বসতি আশপাশের ছোট জনপদের কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করত।

কেন মানুষ উঁচু ভূমির বাড়ি ছেড়ে শিলাখাঁজে ঘর তুলেছিলেন, তার একক উত্তর নেই। আশ্রয়, পানির কাছাকাছি থাকা, সামাজিকভাবে একত্র হওয়া এবং নিরাপত্তা—বিভিন্ন কারণ বিবেচিত হয়। বেলেপাথরের স্তর দিয়ে পানি প্রবেশ করে নিচের অপেক্ষাকৃত অপ্রবেশ্য স্তরে আটকে গেলে পাহাড়ের গায়ে ছোট ঝরনা তৈরি হতে পারে। কিছু বসতির কাছে এমন উৎস ছিল। আবার সংকীর্ণ প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ করা তুলনামূলক সহজ হতে পারত। কিন্তু প্রতিটি পাহাড়ি বসতি শুধু যুদ্ধের ভয়ে তৈরি হয়েছিল—এমন সিদ্ধান্তের যথেষ্ট প্রমাণ নেই। স্থানভেদে সুবিধা ও প্রয়োজন আলাদা ছিল।

খাদ্য উৎপাদনে ভুট্টা, শিম ও কুমড়ার গুরুত্ব ছিল। মেসা ভার্দের ওপরের সমতল ভূমিতে কৃষির উপযোগী মাটি পাওয়া যেত, যদিও বসতিগুলো অনেক সময় নিচের শিলাখাঁজে ছিল। পরিবারগুলোকে ক্ষেত ও ঘরের মধ্যে যাতায়াত করতে হতো। বৃষ্টিনির্ভর কৃষিতে মোট পানির পরিমাণের পাশাপাশি বৃষ্টি কখন হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ফসলের বৃদ্ধির সময় পর্যাপ্ত আর্দ্রতা না থাকলে উৎপাদন কমতে পারত। কিছু স্থানে ছোট বাঁধ ও পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা ছিল, যা দেখায় মানুষ পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

ত্রয়োদশ শতকের শেষভাগের দীর্ঘ খরা অভিবাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা। বহুল আলোচিত খরাপর্বটি সাধারণভাবে ১২৭৬ থেকে ১২৯৯ সালের সঙ্গে যুক্ত। নির্মাণে ব্যবহৃত কাঠ এবং জীবিত বা পুরোনো গাছের বৃদ্ধিবলয় বিশ্লেষণ করে অতীতের আর্দ্রতার পরিবর্তন বোঝা যায়। শুষ্ক বছরে গাছের বৃদ্ধি কমতে পারে; বিভিন্ন নমুনা মিলিয়ে দীর্ঘ সময়ের জলবায়ু পুনর্গঠন করা হয়। খরার অস্তিত্বের প্রমাণ শক্তিশালী হলেও, তা একাই প্রতিটি পরিবার কেন চলে গেল তার পূর্ণ উত্তর দেয় না। বসতি ছেড়ে যাওয়ার সময়ও সর্বত্র একই ছিল না।

পরপর ফসল কম হলে খাদ্যের মজুত ও পরবর্তী চাষের বীজ দুটোই চাপে পড়তে পারে। পানির উৎস দুর্বল হলে সমস্যাটি আরও বাড়ে। আবার উচ্চতার কারণে ঠান্ডা ও ফসল ফলানোর মৌসুমের দৈর্ঘ্যও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কোনো স্থানে সামান্য জলবায়ু পরিবর্তন কৃষির নির্ভরযোগ্যতা কমিয়ে দিতে পারত। ত্রয়োদশ শতকের প্রথমভাগে অঞ্চলের জনসংখ্যা বেড়েছিল বলে গবেষণা নির্দেশ করে। ফলে অনুকূল জমি ও নির্ভরযোগ্য পানির ওপর চাপ বাড়ার সম্ভাবনা ছিল। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে একা পতনের কারণ বলা যায় না; উৎপাদন, বণ্টন ও সহযোগিতার ব্যবস্থাও বিচার করতে হয়।

সমাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগেরও প্রমাণ রয়েছে। স্যান্ড ক্যানিয়ন পুয়েবলো ও ক্যাসল রকের মতো কয়েকটি স্থানে সহিংস মৃত্যু এবং সংঘর্ষের চিহ্ন পাওয়া গেছে। কিছু স্থাপনায় আগুনের প্রমাণও আছে। এসব ঘটনা দেখায়, অঞ্চল ছেড়ে যাওয়ার ইতিহাস সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ছিল না। কিন্তু একটি জনপদের আক্রমণকে সব পাহাড়ি বসতির অভিন্ন পরিণতি হিসেবে দেখানো ঠিক নয়। কোনো নির্দিষ্ট বিদেশি আক্রমণকারী এসে সমগ্র অ্যানসেস্ট্রাল পুয়েবলো সমাজকে বিতাড়িত করেছিল—এমন সরল ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠিত নয়। সংঘাতের পক্ষ ও উদ্দেশ্যও সব ক্ষেত্রে জানা যায়নি।

খরা ও সংঘাত পরস্পরের চাপ বাড়িয়ে থাকতে পারে। খাদ্য কমলে বিনিময় ও সাহায্যের সম্পর্ক দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে; নিরাপত্তাহীনতায় ক্ষেত ব্যবহার করা কঠিন হলে উৎপাদন আরও কমতে পারে। আবার একটি সম্প্রদায় নতুন এলাকায় চলে গেলে পুরোনো প্রতিবেশীদের সহযোগিতার সুযোগ বদলে যায়। এই ধরনের সম্পর্ক গবেষকদের আগ্রহের বিষয়, কিন্তু প্রতিটি ধাপ সরাসরি প্রমাণিত নয়। সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবর্তনও মানুষের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই কেন চলে গেলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু বৃষ্টির পরিমাণ বা যুদ্ধের চিহ্ন দিয়ে সম্পূর্ণ হয় না।

ত্রয়োদশ শতকের শেষের দিকে মেসা ভার্দে অঞ্চলের বসতিগুলো থেকে মানুষ ব্যাপকভাবে সরে যান। অনেক পরিবার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বের জনপদের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন, যেখানে নতুন বা আগে থেকেই থাকা সম্প্রদায়ের সঙ্গে জীবন গড়ার সুযোগ ছিল। অ্যারিজোনা ও নিউ মেক্সিকোর বিভিন্ন পুয়েবলো সমাজের ইতিহাসে সেই সম্পর্ক রয়েছে। স্থানান্তর মানে শুধু দুর্যোগ থেকে পালানো নয়; আত্মীয়তা, পরিচিত পথ এবং ভালো ভবিষ্যতের সন্ধানও বিবেচ্য। পুরোনো বাড়ি ছেড়ে যাওয়া ব্যর্থতার একমাত্র চিহ্ন নয়; কখনো তা টিকে থাকার সচেতন ও কার্যকর সিদ্ধান্ত।

এই ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে বর্তমান পুয়েবলো জনগোষ্ঠীর মৌখিক ঐতিহ্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের কাছে পূর্বপুরুষের স্থান কেবল ব্যবহার শেষ হয়ে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ নয়; সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ও স্মৃতির অংশ। কোনো স্থানে স্থায়ী বসবাস বন্ধ হলেও সেই স্থানের গুরুত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মাটির নিদর্শন থেকে চলাচলের ইতিহাস খোঁজেন, আর উত্তরসূরি সম্প্রদায়ের বর্ণনা মানুষ কীভাবে নিজেদের অতীত বোঝেন, তা জানায়। দুটিকে পাশাপাশি রাখলে ‘হারিয়ে যাওয়া জাতি’র ধারণার বদলে ধারাবাহিকতা ও পরিবর্তনের সমৃদ্ধ ছবি পাওয়া যায়।

পাহাড়ের গায়ের ঘরগুলো কেন পরিত্যক্ত হয়েছিল? সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য উত্তর হলো, দীর্ঘ খরা, কৃষির অনিশ্চয়তা, জনসংখ্যার চাপ, কিছু স্থানের সংঘাত এবং সামাজিক সম্পর্কের পরিবর্তন বিভিন্নভাবে মিলেছিল। কোনো এক কারণ সব বসতির জন্য সমান ব্যাখ্যা দেয় না। আজকের নীরব দরজা ও শূন্য মজুতঘর সেই সিদ্ধান্তগুলোর স্থায়ী চিহ্ন। কিন্তু নির্মাতাদের ইতিহাস সেখানে থেমে নেই। হোপি, জুনি এবং অন্যান্য বর্তমান পুয়েবলো সম্প্রদায়ের জীবনে এই পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকার টিকে আছে—তারা অদৃশ্য হননি, নতুন স্থানে জীবন চালিয়ে গেছেন।