বাক্কাস ও বাক্কানালিয়া: মদ, উন্মত্ত উৎসব ও রোমান রহস্যধর্ম
সিরিজ: রোমান পুরাণ: রোমের জন্ম থেকে দেবদেবীর কিংবদন্তি
বাক্কাসের আঙুরলতায় মিশে ছিল আনন্দ, ধর্মীয় উচ্ছ্বাস ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়।
জানুসের দরজা পেরিয়ে মানুষ নতুন পথে যাত্রা করত, কিন্তু রোমান ধর্মে এমন এক দেবতাও ছিলেন, যাঁর উপস্থিতিতে পরিচিত নিয়মের সীমা কেঁপে উঠত। তিনি বাক্কাস—মদ, আঙুরলতা, আনন্দ এবং প্রবল ধর্মীয় উচ্ছ্বাসের সঙ্গে যুক্ত দেবতা। তাঁর উৎসবে মানুষ শুধু নতুন সময়ে প্রবেশ করত না; কখনো নিজের দৈনন্দিন পরিচয়ের বাইরেও যেতে চাইত। পরিবার, সামাজিক মর্যাদা ও আত্মসংযমের বাঁধন সাময়িকভাবে শিথিল হওয়ার এই সম্ভাবনা ছিল আকর্ষণীয়, আবার ভীতিকরও। তাই বাক্কাসের গল্পে উল্লাসের পাশে বিপদ এবং মুক্তির পাশে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে।
বাক্কাসের পরিচয়ের প্রধান পৌরাণিক ভিত্তি গ্রিক ডায়োনিসাস। ‘বাক্কাস’ নামটি গ্রিক উপাসনাতেও ব্যবহৃত হতো; রোমানরা সেই নাম ও কাহিনি গ্রহণ করে নিজেদের ধর্মীয় জগতে স্থান দিয়েছিল। তবে ইতালির দেবতা লিবারকে তাঁর সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি আলাদা করে বোঝা দরকার। লিবারের উপাসনা প্রজননশক্তি, বৃদ্ধি এবং রোমান নাগরিক জীবনের নিজস্ব পরম্পরার অংশ ছিল। পরে ডায়োনিসাস-বাক্কাসের সঙ্গে তাঁর পরিচয় অনেক ক্ষেত্রে মিশে যায়। বাক্কাস, লিবার এবং তাঁদের সব উৎসবকে শুরু থেকেই অভিন্ন মনে করলে রোমান ধর্মের পরিবর্তনের ইতিহাস হারিয়ে যায়।
গ্রিক থেকে গৃহীত জন্মকাহিনিতে বাক্কাস ছিলেন জুপিটার ও মানবী সেমেলের সন্তান। জুনোর প্ররোচনায় সেমেলে প্রেমিক দেবতাকে তাঁর পূর্ণ দৈব মহিমায় দেখার দাবি করেন। জুপিটারের সেই রূপ মানুষের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব ছিল না; সেমেলে প্রাণ হারান। জুপিটার অনাগত সন্তানকে উদ্ধার করে নিজের উরুতে ধারণ করেন এবং পরে তার জন্ম হয়। এই কারণে দেবতা দুইবার জন্ম নেওয়া হিসেবে পরিচিত। কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছে বিপদের মধ্য দিয়ে টিকে থাকা এবং মানুষের সঙ্গে দেবতার অসম সম্পর্ক। দেবতার জন্ম নিজেই স্বাভাবিক সীমা অতিক্রমের ঘটনা।
আঙুর থেকে মদ তৈরি হওয়ার পরিবর্তনও বাক্কাসের চরিত্র বোঝার একটি পথ। দৃশ্যমান ফল গাঁজনের মধ্য দিয়ে এমন পানীয়ে পরিণত হয়, যা মানুষের অনুভূতি ও আচরণ বদলে দিতে পারে। প্রাচীন মানুষের কাছে এই পরিবর্তনে দেবতার শক্তি অনুভব করার সুযোগ ছিল। মদ ভোজে আনন্দ, অতিথিসেবা এবং সামাজিক মিলনের উপাদান; আবার অতিরিক্ত পান আত্মসংযম নষ্ট করতে পারে। বাক্কাসের আশীর্বাদ ও বিপদ একই অভিজ্ঞতার দুই সম্ভাবনা। তাঁকে কেবল মাতলামির দেবতা বললে কৃষি, ধর্মীয় দীক্ষা এবং সমবেত আনন্দের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক আড়ালে পড়ে যায়।
বাক্কাসের পৌরাণিক অনুসারীদের মধ্যে ছিলেন মেনাড বা বাক্কান্ত নামে পরিচিত উচ্ছ্বসিত নারী এবং স্যাটিরেরা। তাঁদের সঙ্গে নৃত্য, ঢাক, ঝাঁঝর, পাহাড়ি বন এবং প্রবল আবেগের ছবি যুক্ত ছিল। দেবতার হাতে দেখা যায় থিরসাস—লতায় মোড়ানো দণ্ড, যার মাথায় প্রায়ই পাইনফলের আকৃতি থাকে। আইভি, আঙুরলতা ও চিতাবাঘও তাঁর পরিচিত প্রতীক। তবে শিল্পের পৌরাণিক মিছিলকে বাস্তব রোমান উপাসনার হুবহু দৃশ্য মনে করা যাবে না। সাহিত্য ও শিল্প দেবতার শক্তিকে নাটকীয়ভাবে প্রকাশ করে; বাস্তব আচারের বিবরণ জানতে আলাদা সাক্ষ্য দরকার।
এই শক্তির ভয়াবহ দিক দেখা যায় থিবসের রাজা পেন্থেউসের কাহিনিতে। তিনি নতুন দেবতার উপাসনা প্রত্যাখ্যান করেন এবং অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণ করতে চান। শেষ পর্যন্ত উন্মত্ত উপাসিকাদের হাতে তাঁর মৃত্যু হয়; তাঁর নিজের মা আগাভেও সেই হত্যায় অংশ নেন, বিভ্রমে ছেলেকে চিনতে না পেরে। রোমান কবি ওভিদের রচনায় এই গ্রিক কাহিনি নতুন পাঠকসমাজে পৌঁছায়। গল্পটি ধর্মীয় উচ্ছ্বাসকে নিছক আনন্দ হিসেবে দেখায় না। দেবতার শক্তিকে অস্বীকার করা এবং নিজের ক্ষমতার সীমা না বোঝার পরিণতি এখানে একই সঙ্গে উপস্থিত।
জলদস্যুদের কাহিনিতে বাক্কাসের পরিচয় গোপন থাকে। তাঁকে সাধারণ তরুণ ভেবে অপহরণকারী নাবিকেরা বন্দি করতে চায়। কিন্তু জাহাজে অলৌকিক পরিবর্তন শুরু হয়: লতা ছড়িয়ে পড়ে, দেবতার ভয়ংকর উপস্থিতি প্রকাশ পায় এবং আতঙ্কিত জলদস্যুরা সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে ডলফিনে রূপান্তরিত হয়। বিভিন্ন বর্ণনায় ঘটনাবিন্যাসের পার্থক্য আছে। তবু মূল বিষয়টি স্পষ্ট—মানুষ যাকে দুর্বল বন্দি মনে করছে, তার মধ্যেই অপরিমেয় শক্তি লুকিয়ে আছে। বাক্কাসের জগতে বাহ্যিক পরিচয় স্থায়ী নয়, আর মানুষের নিশ্চিত ধারণা মুহূর্তেই ভেঙে যেতে পারে।
আরিয়াদনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এই দেবতার কোমল দিকটি সামনে আনে। থিসিউসের পরিত্যক্ত আরিয়াদনেকে বাক্কাস গ্রহণ করেন—প্রচলিত কাহিনির এই ধারায় বিচ্ছেদের পরে নতুন মর্যাদা ও সম্পর্কের সম্ভাবনা তৈরি হয়। তাঁর মুকুটের সঙ্গে আকাশের নক্ষত্রমণ্ডল যুক্ত করার গল্পও পরিচিত। তবে আরিয়াদনের ভাগ্য নিয়ে প্রাচীন সাহিত্যে একাধিক পরম্পরা ছিল। বাক্কাস তাই শুধু ধ্বংসাত্মক উন্মত্ততার দেবতা নন; পরিত্যক্ত মানুষের জীবনে নতুন স্থান দেওয়ার দেবতাও হতে পারেন। তাঁর পৌরাণিক উপস্থিতি কখনো পরিচয় ভেঙে দেয়, কখনো নতুন পরিচয় গড়ে তোলে।
বাস্তব ধর্মীয় জীবনে বাক্কাস-সম্পর্কিত কিছু উপাসনায় দীক্ষা এবং নির্বাচিত অংশগ্রহণকারীদের জন্য বিশেষ আচার ছিল। আধুনিক ভাষায় এগুলোকে রহস্যধর্ম বলা হয়। এখানে ‘রহস্য’ মানে অপরিহার্যভাবে অপরাধ বা ষড়যন্ত্র নয়; এমন ধর্মীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা, যা দীক্ষিতদের মধ্যেই সীমিত রাখা হতো। কিছু বাক্কীয় পরম্পরায় মৃত্যুর পর আত্মার কল্যাণের আশাও গুরুত্ব পেয়েছিল। কিন্তু সব অঞ্চলের সব উপাসক একই মত অনুসরণ করতেন না। গোপনীয়তা থাকলেই একটি অভিন্ন গোপন ধর্মতত্ত্ব ছিল, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো তথ্য আমাদের হাতে নেই।
রোমান ইতিহাসে এই উপাসনার সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ১৮৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দের বাক্কানালিয়া সংকট। সেনেট বাক্কাসের কিছু ধর্মীয় সমাবেশের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। ঐতিহাসিক লিভির বিবরণে গোপন সভা, যৌন অনাচার, প্রতারণা ও হত্যার বিস্তৃত অভিযোগ উঠে আসে। এই বর্ণনা নাটকীয়, কিন্তু ঘটনাগুলোর বহু পরে লেখা এবং রোমান নৈতিক উদ্বেগে প্রভাবিত। তাই প্রতিটি অভিযোগকে স্বাধীনভাবে প্রমাণিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা ঠিক নয়। বিশেষত নারী ও সামাজিকভাবে অধীন মানুষের অংশগ্রহণ নিয়ে তাঁর বক্তব্য পড়ার সময় লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনা করা জরুরি।
অন্যদিকে, সেনেটের নির্দেশের সংরক্ষিত ব্রোঞ্জলিপি দেখায় যে ধর্মীয় সংগঠনের ওপর বাস্তব প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। অনুমতি, নেতৃত্ব, যৌথ অর্থভাণ্ডার, শপথ এবং সমাবেশের আকার নিয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এটি শুধু মদপানের বিরুদ্ধে অভিযান ছিল না; স্বাধীনভাবে সংগঠিত একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ঘটনাও ছিল। লিভির অপরাধবর্ণনা এবং এই প্রশাসনিক দলিল একই ধরনের সাক্ষ্য নয়। একটিতে ঘটনার নৈতিক ব্যাখ্যা প্রাধান্য পায়, অন্যটিতে কর্তৃপক্ষ কোন সংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল, তা বোঝা যায়।
কেন এই সমাবেশ এত উদ্বেগ তৈরি করেছিল, তার একটিমাত্র নিশ্চিত উত্তর নেই। রাতের সভা, গোপন শপথ এবং পরিবার বা প্রচলিত কর্তৃপক্ষের বাইরে সম্পর্ক গড়ে ওঠা সেনেটের চোখে সন্দেহজনক হতে পারে। নারী, পুরুষ এবং বিভিন্ন সামাজিক অবস্থানের মানুষের মিলনও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন তুলেছিল। তবে ধর্মীয় সংগঠনকে সরাসরি রাষ্ট্র উৎখাতের পরিকল্পনা হিসেবে ঘোষণা করা প্রমাণের সীমা ছাড়িয়ে যায়। রাষ্ট্রের ভয়, প্রচারিত অভিযোগ এবং উপাসকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা এক জিনিস নয়। এই পার্থক্য রেখেই বাক্কানালিয়া সংকটের রাজনৈতিক অর্থ বিচার করতে হয়।
কঠোর ব্যবস্থার পরেও বাক্কাস রোমান জগৎ থেকে হারিয়ে যাননি। অনুমোদিত উপাসনা এবং শিল্পে তাঁর উপস্থিতি টিকে থাকে। ভোজকক্ষের সাজসজ্জা, চিত্র, মোজাইক ও সমাধিসংক্রান্ত শিল্পে তাঁর মিছিল দেখা যায়। বিশেষত সমাধির শিল্পে আনন্দ, পুনর্জাগরণ বা মৃত্যুর ওপারে আশার অর্থ থাকতে পারে, যদিও সব ছবির ব্যাখ্যা এক নয়। লিবারের নিজস্ব জনউৎসবকেও নিষিদ্ধ গোপন সমাবেশের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। রোমান রাষ্ট্র দেবতাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করার বদলে উপাসনার নির্দিষ্ট সংগঠন ও রূপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারত।
বাক্কাসের গল্প তাই রোমান জীবনের একটি গভীর দ্বন্দ্ব প্রকাশ করে। মানুষ আনন্দ, সঙ্গ এবং নিজের দৈনন্দিন ভার থেকে মুক্তি চাইত; একই মানুষ নিয়ন্ত্রণ হারানোর পরিণতিও ভয় পেত। ধর্মীয় উচ্ছ্বাস কখন মুক্তির অভিজ্ঞতা, আর কখন ভয়ের কারণ—বাক্কাস সেই প্রশ্নের দেবতা। জানুসের দরজা মানুষকে নতুন পথে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিল; বাক্কাস দেখালেন, সেই পথে নিজের পরিচয়ও বদলে যেতে পারে। তাঁর আঙুরলতায় রোমানরা শুধু মদের প্রতিশ্রুতি দেখেনি—দেখেছে মিলনের আনন্দ, দেবতার অপ্রত্যাশিত শক্তি এবং সমাজের বাঁধন কত দূর শিথিল করা যায়, সেই অনিশ্চয়তা।
স্যাটার্ন ও স্বর্ণযুগ: রোমান পুরাণে স্যাটার্নালিয়া উৎসবের গল্প
সেরেস ও প্রোসারপিনা: পাতালজগৎ, ঋতুর জন্ম ও ফসলের রোমান কিংবদন্তি
রিগ্যান যুগ ও স্নায়ুযুদ্ধ: অস্ত্র প্রতিযোগিতা, স্টার ওয়ার্স এবং সোভিয়েত সংকট
সোভিয়েত–আফগান যুদ্ধ: ১৯৭৯ সালের আক্রমণ ও স্নায়ুযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী অধ্যায়
দেতান্ত ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ: নিক্সন, ব্রেজনেভ ও SALT চুক্তির ইতিহাস