বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

রিগ্যান যুগ ও স্নায়ুযুদ্ধ: অস্ত্র প্রতিযোগিতা, স্টার ওয়ার্স এবং সোভিয়েত সংকট

সিরিজ: স্নায়ুযুদ্ধ: দুই পরাশক্তির বিশ্বসংঘাত

রিগ্যান যুগ ও স্নায়ুযুদ্ধ: অস্ত্র প্রতিযোগিতা, স্টার ওয়ার্স এবং সোভিয়েত সংকট
রিগ্যান যুগে ফিরে আসা স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনা

১৯৮১ সালের জানুয়ারিতে রোনাল্ড রিগ্যান যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন স্নায়ুযুদ্ধ একটি নতুন অনিশ্চিত পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। ১৯৭০-এর দশকের দেতান্ত বা উত্তেজনা প্রশমনের পরিবেশ ইতিমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান আক্রমণ, ইরানের বিপ্লব, আফ্রিকা ও মধ্য আমেরিকায় প্রক্সি সংঘাত এবং ইউরোপে নতুন পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন দুই পরাশক্তির সম্পর্ককে আবার অবিশ্বাসের দিকে ঠেলে দেয়। এই প্রেক্ষাপটে রিগ্যান মনে করতেন, আগের মার্কিন প্রশাসনগুলো সোভিয়েত সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে যথেষ্ট দৃঢ় ছিল না। তাঁর লক্ষ্য শুধু সোভিয়েত শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বরং এমন রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা, যাতে মস্কো নিজের দুর্বলতার মুখোমুখি হতে বাধ্য হয়।

রিগ্যানের দৃষ্টিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল কেবল একটি প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র নয়, বরং স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের বিপরীতে দাঁড়ানো একটি দমনমূলক ব্যবস্থা। ১৯৮৩ সালে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নকে “অশুভ সাম্রাজ্য” হিসেবে বর্ণনা করেন। এই ভাষা দেতান্তের সতর্ক কূটনৈতিক শব্দচয়ন থেকে স্পষ্ট বিচ্যুতি ছিল। রিগ্যান প্রশাসনের ধারণা ছিল, সোভিয়েত ব্যবস্থাকে স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় ধরে নেওয়া উচিত নয়। মার্কিন শক্তি পুনর্গঠন, সোভিয়েত দুর্বলতা কাজে লাগানো এবং আলোচনার আগে প্রতিপক্ষকে চাপের মধ্যে রাখাই হয়ে ওঠে নতুন কৌশলের ভিত্তি।

১৯৭০-এর দশকের শেষ নাগাদ সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব ইউরোপে মোবাইল SS-20 মাঝারি পাল্লার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছিল। এগুলো পশ্চিম ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ শহর ও সামরিক স্থাপনায় আঘাত করতে সক্ষম ছিল। প্রতিক্রিয়ায় ন্যাটো ১৯৭৯ সালে তথাকথিত ডাবল-ট্র্যাক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। একদিকে মস্কোর সঙ্গে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আলোচনা চালানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়, অন্যদিকে সমঝোতা না হলে পশ্চিম ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের পার্শিং-২ ক্ষেপণাস্ত্র ও ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রিগ্যান ক্ষমতায় এসে এই মোতায়েন বাস্তবায়নে দৃঢ় থাকেন।

১৯৮৩ সাল থেকে পশ্চিম জার্মানি, ব্রিটেন, ইতালি, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন শুরু হয়। বিশেষ করে দ্রুতগতির পার্শিং-২ ক্ষেপণাস্ত্র সোভিয়েত নেতৃত্বের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে, কারণ পশ্চিম ইউরোপ থেকে উৎক্ষেপণ করা হলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে সোভিয়েত ভূখণ্ডের লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আশঙ্কা ছিল। একই সময়ে ইউরোপজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী বিশাল বিক্ষোভ গড়ে ওঠে। লাখো মানুষ আশঙ্কা করছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে ইউরোপই ভবিষ্যৎ পারমাণবিক যুদ্ধের প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হবে।

রিগ্যান প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করে। সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন, নতুন যুদ্ধবিমান, বিমানবাহী রণতরি, পারমাণবিক সাবমেরিন এবং কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণে বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। B-1 বোমারু বিমান কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত হয়, ট্রাইডেন্ট সাবমেরিন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হয় এবং MX আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া হয়। প্রচলিত বাহিনীকেও দ্রুত যুদ্ধের উপযোগী করে তোলা হয়। ওয়াশিংটনের বার্তা ছিল পরিষ্কার—সোভিয়েত ইউনিয়ন যত অস্ত্রই তৈরি করুক, যুক্তরাষ্ট্র আরও উন্নত প্রযুক্তি ও বৃহত্তর অর্থনীতির সাহায্যে সেই প্রতিযোগিতা চালিয়ে যেতে সক্ষম।

তবে রিগ্যানের সামরিক নীতির সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল ১৯৮৩ সালের ২৩ মার্চ ঘোষিত স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স ইনিশিয়েটিভ বা এসডিআই। জনপ্রিয়ভাবে এটি “স্টার ওয়ার্স” নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। পরিকল্পনাটির লক্ষ্য ছিল মহাকাশ ও স্থলভিত্তিক সেন্সর, উপগ্রহ, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ভবিষ্যৎ লেজার প্রযুক্তির সমন্বয়ে এমন একটি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা শত্রুর আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই শনাক্ত ও ধ্বংস করতে পারবে। রিগ্যান দাবি করেছিলেন, মানবজাতিকে পারমাণবিক প্রতিশোধের ভয়ের ওপর নির্ভরতা থেকে মুক্ত করাই তাঁর উদ্দেশ্য।

তৎকালীন পারমাণবিক ভারসাম্য দাঁড়িয়ে ছিল পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংসের নীতির ওপর। এর অর্থ ছিল, কোনো পক্ষ প্রথমে আক্রমণ করলেও অন্য পক্ষ পাল্টা আঘাতে আক্রমণকারীকে ধ্বংস করতে পারবে। তাই পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু করা কার্যত আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এসডিআই সফল হলে যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত প্রতিশোধমূলক হামলার একটি বড় অংশ ঠেকিয়ে দিতে পারে—এমন আশঙ্কা মস্কোকে বিচলিত করে। সোভিয়েত নেতাদের ধারণা ছিল, এতে কৌশলগত ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রথম হামলা চালানোর সাহস পেতে পারে।

এসডিআইয়ের বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে শুরু থেকেই বিজ্ঞানী ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক ছিল। হাজার হাজার দ্রুতগতির ক্ষেপণাস্ত্র ও ভুয়া লক্ষ্যবস্তুকে মহাকাশে নির্ভুলভাবে শনাক্ত করে ধ্বংস করার প্রযুক্তি তখনো অর্জিত হয়নি। কার্যকর ব্যবস্থাটি নির্মাণে বিপুল ব্যয় এবং অসংখ্য প্রযুক্তিগত বাধাও ছিল। রিগ্যানের কল্পিত পূর্ণাঙ্গ মহাকাশ প্রতিরক্ষা কখনো বাস্তবায়িত হয়নি। তা সত্ত্বেও এর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। এটি সোভিয়েত নেতৃত্বের সামনে এমন এক প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার সম্ভাবনা হাজির করেছিল, যেখানে পিছিয়ে থাকা তাদের পক্ষে বিপজ্জনক, অথচ সমানভাবে প্রতিযোগিতা করাও অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

সোভিয়েত ইউনিয়নের সামরিক ক্ষমতা বিশাল হলেও তার অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে পড়েছিল। কেন্দ্রীয় পরিকল্পনাব্যবস্থা ভারী শিল্প ও প্রতিরক্ষা উৎপাদনে বিপুল সম্পদ ব্যয় করলেও ভোগ্যপণ্য, কৃষি, সেবা ও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিতে পিছিয়ে ছিল। দোকানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি, উৎপাদনশীলতার নিম্নহার, পুরোনো কারখানা এবং আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা সাধারণ মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছিল। তেল ও গ্যাস রপ্তানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা এলেও ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় মস্কোর আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় আফগানিস্তানে চলমান ব্যয়বহুল যুদ্ধ, পূর্ব ইউরোপীয় মিত্ররাষ্ট্রগুলোকে অর্থনৈতিক সহায়তা এবং বিশ্বজুড়ে মিত্র সরকার ও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন। সোভিয়েত জাতীয় সম্পদের একটি বড় অংশ সামরিক খাতে ব্যয় হলেও যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় দেশটির অর্থনীতি ছিল অনেক ছোট। তাই প্রতিটি নতুন মার্কিন অস্ত্র কর্মসূচির জবাব দেওয়া মস্কোর জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি কষ্টকর ছিল। রিগ্যান প্রশাসন এই বৈষম্যকে কাজে লাগাতে চেয়েছিল—যদিও সোভিয়েত পতনের সব কৃতিত্ব শুধু মার্কিন সামরিক ব্যয়ের ওপর আরোপ করা ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে।

রিগ্যান নীতি শুধু অস্ত্র নির্মাণে সীমাবদ্ধ ছিল না। আফগান মুজাহিদিন, নিকারাগুয়ার কনট্রা বিদ্রোহী এবং কমিউনিস্ট বা সোভিয়েতসমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত বিভিন্ন শক্তিকে সহায়তা দেওয়া হয়। এই পদ্ধতি রিগ্যান ডকট্রিন নামে পরিচিত হয়। আগের নিয়ন্ত্রণনীতির তুলনায় এখানে প্রতিপক্ষের প্রভাব শুধু আটকে রাখা নয়, কিছু অঞ্চলে তা পেছনে ঠেলে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিল। তবে এসব গোপন ও প্রকাশ্য সহায়তা বহু ক্ষেত্রে গৃহযুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে এবং গুরুতর মানবিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করে।

১৯৮৩ সাল স্নায়ুযুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক বছরগুলোর একটি হয়ে ওঠে। সেপ্টেম্বরে সোভিয়েত যুদ্ধবিমান ভুলবশত সোভিয়েত আকাশসীমায় প্রবেশ করা কোরিয়ান এয়ার লাইনসের যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ফ্লাইট ০০৭ গুলি করে ভূপাতিত করলে ২৬৯ জন নিহত হন। ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ সৃষ্টি করে এবং যুক্তরাষ্ট্র–সোভিয়েত সম্পর্ক আরও খারাপ হয়। নভেম্বরে ন্যাটোর এবল আর্চার ৮৩ সামরিক মহড়াকে সোভিয়েত গোয়েন্দারা সম্ভাব্য বাস্তব পারমাণবিক হামলার প্রস্তুতি হিসেবে সন্দেহ করেছিল। মস্কোর কিছু বাহিনী সতর্ক অবস্থায় যায়। পরবর্তী তথ্য থেকে বোঝা যায়, পারস্পরিক ভুল ধারণা পৃথিবীকে অজান্তেই বিপজ্জনক পরিস্থিতির কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল।

১৯৮২ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে সোভিয়েত নেতৃত্বেও অস্বাভাবিক অস্থিরতা দেখা দেয়। লিওনিদ ব্রেজনেভের মৃত্যুর পর ইউরি আন্দ্রোপভ এবং তাঁর পর কনস্তান্তিন চেরনেঙ্কো ক্ষমতায় আসেন; দুজনই অসুস্থ অবস্থায় অল্প সময় নেতৃত্ব দিয়ে মারা যান। বয়স্ক নেতৃত্বের এই ধারাবাহিকতা সোভিয়েত ব্যবস্থার স্থবিরতার প্রতীক হয়ে ওঠে। ১৯৮৫ সালের মার্চে তুলনামূলক তরুণ মিখাইল গর্বাচেভ ক্ষমতায় এসে উপলব্ধি করেন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন না করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা চালাতে পারবে না।

গর্বাচেভ পেরেস্ত্রইকা বা পুনর্গঠন এবং গ্লাসনস্ত বা উন্মুক্ততার নীতি গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে তিনি পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও অস্ত্র ব্যয় কমাতে আগ্রহী হন। প্রথমদিকে রিগ্যান ও গর্বাচেভের আলোচনায় গভীর মতপার্থক্য ছিল। ১৯৮৬ সালের রেইকিয়াভিক সম্মেলনে দুই নেতা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যাপকভাবে কমানোর সম্ভাবনার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। কিন্তু রিগ্যান এসডিআই গবেষণা পরীক্ষাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে রাজি না হওয়ায় পূর্ণ সমঝোতা হয়নি। তারপরও বৈঠকটি ভবিষ্যৎ চুক্তির ভিত্তি তৈরি করে।

১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে দুই নেতা ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস চুক্তি বা আইএনএফ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি সম্পূর্ণ শ্রেণির ভূমিভিত্তিক মাঝারি ও স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে সম্মত হয়। পশ্চিমের পার্শিং-২ ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং সোভিয়েত SS-20-সহ হাজার হাজার অস্ত্র সরিয়ে ফেলা হয়। পারস্পরিক পরিদর্শনের ব্যবস্থাও করা হয়, যা আগের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিগুলোর তুলনায় নতুন মাত্রার স্বচ্ছতা সৃষ্টি করেছিল। মাত্র কয়েক বছর আগে যে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইউরোপকে পারমাণবিক আতঙ্কে রেখেছিল, সেগুলোই আলোচনার মাধ্যমে বিলুপ্ত হতে শুরু করে।

রিগ্যান যুগের সামরিক চাপ সোভিয়েত পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, কিন্তু সেটিই একমাত্র কারণ ছিল না। সোভিয়েত অর্থনীতির দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত দুর্বলতা, রাজনৈতিক অনমনীয়তা, আফগান যুদ্ধ, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা এবং গর্বাচেভের সংস্কারের অনিচ্ছাকৃত ফলাফলও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসডিআই সোভিয়েত নেতৃত্বকে উদ্বিগ্ন করেছিল, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন শুধু “স্টার ওয়ার্সের ব্যয় মেটাতে গিয়ে” ভেঙে পড়েছিল—এমন দাবি ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করে না।

রিগ্যানের প্রথম মেয়াদ স্নায়ুযুদ্ধকে বিপজ্জনক উত্তেজনার দিকে নিয়ে গেলেও তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে একই সামরিক দৃঢ়তা আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হয়। রিগ্যান ও গর্বাচেভের ব্যক্তিগত যোগাযোগ, পারমাণবিক যুদ্ধ এড়ানোর যৌথ উপলব্ধি এবং উভয় দেশের ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ শেষ পর্যন্ত সংঘাত প্রশমনের পথ খুলে দেয়। তাই রিগ্যান যুগের উত্তরাধিকার দ্বিমুখী: একদিকে অস্ত্র প্রতিযোগিতা, কঠোর ভাষা ও ভুল হিসাবের বিপদ; অন্যদিকে চাপ, কূটনীতি ও অস্ত্র হ্রাসের সমন্বয়ে স্নায়ুযুদ্ধের শেষ অধ্যায়ের সূচনা। এই সময় দেখিয়েছিল, পরাশক্তির শক্তি শুধু কত অস্ত্র রয়েছে তার ওপর নির্ভর করে না—সেই প্রতিযোগিতা বহন করার মতো অর্থনীতি, রাজনৈতিক স্থিতি এবং পরিবর্তনের ক্ষমতা আছে কি না, সেটিও শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করে।