বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

গ্রাফিন কী? এক পরমাণু পুরু এই পদার্থকে ভবিষ্যতের বিস্ময় বলা হয় কেন?

গ্রাফিন কী? এক পরমাণু পুরু এই পদার্থকে ভবিষ্যতের বিস্ময় বলা হয় কেন?
এক পরমাণু পুরু ভবিষ্যতের বিস্ময় গ্রাফিন

একটি সাধারণ পেন্সিল দিয়ে কাগজে লিখলে যে কালো রেখা তৈরি হয়, তার প্রধান উপাদান গ্রাফাইট। সেই পরিচিত গ্রাফাইটের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে আলোচিত পদার্থগুলোর একটি—গ্রাফিন। গ্রাফাইট আসলে কার্বন পরমাণুর অসংখ্য পাতলা স্তর একটির ওপর আরেকটি সাজিয়ে তৈরি। এই স্তরগুলোর মধ্য থেকে মাত্র একটি পরমাণু পুরু স্তর আলাদা করা হলে সেটিই গ্রাফিন। সহজ ভাষায়, গ্রাফিন হলো কার্বন পরমাণুর একক সমতল স্তর, যেখানে পরমাণুগুলো মৌচাকের মতো পুনরাবৃত্ত ষড়ভুজাকার জালিকায় পরস্পরের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত থাকে।

গ্রাফিনের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ থাকতে পারে, কিন্তু এর পুরুত্ব মাত্র একটি কার্বন পরমাণুর সমান। তাই একে দ্বিমাত্রিক পদার্থ বলা হয়। বাস্তব জগতে এটি সম্পূর্ণ গাণিতিক দ্বিমাত্রিক বস্তু নয়, কারণ কার্বন পরমাণুর নিজস্ব আকার রয়েছে; তবু পুরুত্বের দিকটি এত ক্ষুদ্র যে পদার্থবিজ্ঞানের আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে একে দ্বিমাত্রিক হিসেবেই বিবেচনা করা যায়। মানবজাতি আগে পাতলা আবরণ তৈরি করলেও এক পরমাণু পুরু অথচ আলাদাভাবে টিকে থাকতে সক্ষম স্ফটিক তৈরির ধারণা দীর্ঘদিন অসম্ভব বলে মনে করা হয়েছিল। গ্রাফিন সেই ধারণাই বদলে দেয়।

কার্বনের বিশেষত্ব হলো এটি বিভিন্নভাবে নিজের সঙ্গে বন্ধন তৈরি করতে পারে। একই কার্বন দিয়ে নরম গ্রাফাইট, অত্যন্ত কঠিন হীরা, গোলাকার ফুলারিন, নলাকার কার্বন অতিনল এবং সমতল গ্রাফিন তৈরি হতে পারে। পার্থক্য সৃষ্টি হয় কার্বন পরমাণুগুলো কীভাবে সাজানো এবং পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত তার ওপর। হীরায় প্রতিটি কার্বন পরমাণু ত্রিমাত্রিক শক্ত জালিকা তৈরি করে। গ্রাফিনে প্রতিটি কার্বন পরমাণু একই সমতলে কাছের তিনটি কার্বন পরমাণুর সঙ্গে দৃঢ় বন্ধনে যুক্ত থাকে। অবশিষ্ট ইলেকট্রনগুলো পুরো জালিকার ওপর তুলনামূলক স্বাধীনভাবে চলতে পারে। এই গঠনই গ্রাফিনের অসাধারণ যান্ত্রিক, বৈদ্যুতিক ও তাপীয় বৈশিষ্ট্যের ভিত্তি।

দীর্ঘদিন বিজ্ঞানীরা জানতেন যে গ্রাফাইটের প্রতিটি স্তর মূলত গ্রাফিনের মতো। কিন্তু একক স্তর আলাদা করে স্থিতিশীল অবস্থায় রাখা সম্ভব কি না, তা নিয়ে সংশয় ছিল। দুই হাজার চার সালে ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দ্রে গেইম ও কনস্তান্তিন নভোসেলভ সাধারণ আঠালো ফিতা ব্যবহার করে গ্রাফাইটের অত্যন্ত পাতলা স্তর আলাদা করেন। গ্রাফাইটের ওপর ফিতা লাগিয়ে তুলে নেওয়া, তারপর সেই স্তরকে বারবার ভাগ করার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত এক পরমাণু পুরু গ্রাফিন পাওয়া যায়। পদ্ধতিটি দেখতে বিস্ময়করভাবে সহজ হলেও এর মাধ্যমে সম্পূর্ণ নতুন শ্রেণির দ্বিমাত্রিক পদার্থ নিয়ে পরীক্ষার পথ খুলে যায়। গ্রাফিন নিয়ে যুগান্তকারী পরীক্ষার জন্য তাঁরা দুই হাজার দশ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

গ্রাফিনকে ভবিষ্যতের বিস্ময় বলার প্রথম কারণ এর অস্বাভাবিক শক্তি। একটি নিখুঁত গ্রাফিন স্তরের প্রসারণসহন শক্তি উচ্চমানের ইস্পাতের তুলনায় প্রায় দুইশ গুণ পর্যন্ত বেশি বলে বহুল উল্লেখ করা হয়। তবে এই বক্তব্যের অর্থ একই পুরুত্ব বা সমতুল্য তুলনায় গ্রাফিন অত্যন্ত শক্তিশালী; এক টুকরো এক পরমাণু পুরু গ্রাফিন দিয়ে সরাসরি একটি ইস্পাতের সেতু প্রতিস্থাপন করা যাবে—এমন নয়। গ্রাফিনের প্রকৃত স্তর এত পাতলা যে বড় কাঠামোতে একে সাধারণত অন্য পদার্থের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করতে হয়। তবু পরমাণুগুলোর দৃঢ় বন্ধনের কারণে অতি সামান্য ওজন যোগ করেই কোনো যৌগিক পদার্থের শক্তি, স্থায়িত্ব বা ফাটল প্রতিরোধ বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

শক্ত হওয়ার পাশাপাশি গ্রাফিন নমনীয়। অনেক শক্ত পদার্থ ভঙ্গুর হয়; চাপ পড়লে বাঁকানোর বদলে ফেটে যায়। গ্রাফিন তার সমতল জালিকাকে বাঁকাতে, ঢেউ খেলাতে এবং কিছুটা প্রসারিত করতে পারে। উপযুক্ত ভিত্তির ওপর বসানো গ্রাফিন স্তর ভাঁজ বা বক্র পৃষ্ঠের সঙ্গেও মানিয়ে নিতে পারে। শক্তি ও নমনীয়তার এই বিরল সমন্বয় নমনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্র, শরীরে পরা সংবেদক, ভাঁজ করা পর্দা এবং বক্র পৃষ্ঠে বসানো বৈদ্যুতিক বর্তনীর জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

গ্রাফিন বিদ্যুৎ পরিবহনেও অসাধারণ। এর জালিকার মধ্যে কিছু ইলেকট্রন এমনভাবে চলাচল করে যে তারা সাধারণ অর্ধপরিবাহী পদার্থের তুলনায় খুব দ্রুত সাড়া দিতে পারে। বিশুদ্ধ ও ত্রুটিমুক্ত গ্রাফিনে বৈদ্যুতিক আধানের চলাচল বাধাগ্রস্ত করার মতো পরমাণবিক ত্রুটি খুব কম থাকে। ফলে উচ্চগতির বৈদ্যুতিক যন্ত্র, অতি দ্রুত সংবেদক এবং উচ্চ কম্পাঙ্কের যোগাযোগব্যবস্থায় গ্রাফিনের সম্ভাবনা রয়েছে। খুব সামান্য পরিমাণ রাসায়নিক পদার্থ, গ্যাস বা বৈদ্যুতিক পরিবর্তনও এর পরিবাহিতায় মাপযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। এই বৈশিষ্ট্য অতি সংবেদনশীল শনাক্তকারী তৈরিতে বিশেষভাবে উপযোগী।

তবে গ্রাফিনের উচ্চ পরিবাহিতা তাকে প্রচলিত কম্পিউটার যন্ত্রাংশে সরাসরি সিলিকনের সহজ বিকল্প বানায় না। আধুনিক গণনাযন্ত্রের ক্ষুদ্র সুইচকে প্রয়োজনে বিদ্যুৎ চলতে দেওয়া এবং সম্পূর্ণ বন্ধ করা দরকার। বিশুদ্ধ গ্রাফিনে স্বাভাবিক শক্তিব্যবধান নেই বলে এর মধ্য দিয়ে প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। ফলে গ্রাফিনের তৈরি সুইচে বন্ধ অবস্থাতেও কিছু বিদ্যুৎ চলতে পারে। পরমাণু জালিকার আকার পরিবর্তন, সরু ফিতা তৈরি, দুটি গ্রাফিন স্তর বিশেষভাবে সাজানো অথবা অন্য দ্বিমাত্রিক পদার্থের সঙ্গে যুক্ত করে এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে। তাই গ্রাফিন দ্রুত সিলিকনকে সম্পূর্ণ সরিয়ে দেবে—এমন দাবি বাস্তবসম্মত নয়।

গ্রাফিন তাপও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বহন করতে পারে। বৈদ্যুতিক যন্ত্র যত ক্ষুদ্র ও শক্তিশালী হচ্ছে, অতিরিক্ত তাপ বের করে দেওয়া তত কঠিন হয়ে উঠছে। তাপ জমলে যন্ত্রের কর্মক্ষমতা কমে, শক্তির অপচয় বাড়ে এবং যন্ত্রাংশের আয়ু হ্রাস পায়। গ্রাফিনের উচ্চ তাপ পরিবাহিতা ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক যন্ত্র, আলো উৎপাদক উপাদান, শক্তি সঞ্চয়ব্যবস্থা এবং উচ্চক্ষমতার বর্তনী থেকে তাপ ছড়িয়ে দিতে কাজে লাগতে পারে। তবে পরীক্ষাগারের নিখুঁত গ্রাফিনে যে পরিবাহিতা দেখা যায়, বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত ত্রুটিযুক্ত বা বহুস্তরীয় গ্রাফিনে সেটি কম হতে পারে।

একটি গ্রাফিন স্তর অত্যন্ত পাতলা বলে এটি প্রায় স্বচ্ছ। দৃশ্যমান আলোর মাত্র অল্প অংশ শোষণ করে, অথচ বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে। এই যুগল বৈশিষ্ট্য স্বচ্ছ বিদ্যুৎদ্বার, স্পর্শসংবেদী পর্দা, সৌরকোষ, স্বচ্ছ উষ্ণায়ক, বক্র প্রদর্শনপর্দা এবং জানালায় বসানো বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বর্তমানে ব্যবহৃত কিছু স্বচ্ছ পরিবাহী পদার্থ ভঙ্গুর এবং সেগুলোতে তুলনামূলক দুর্লভ মৌল দরকার হয়। গ্রাফিন কার্বন দিয়ে তৈরি ও নমনীয় হওয়ায় একটি আকর্ষণীয় বিকল্প, যদিও সমান আকারে কম বৈদ্যুতিক বাধা, একরূপতা ও উৎপাদনমূল্যের ক্ষেত্রে এখনো নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

গ্রাফিনের আরেকটি বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এর বিশাল কার্যকর পৃষ্ঠতল। একটি গ্রাম গ্রাফিনকে পুরোপুরি একক স্তরে ছড়াতে পারলে তার মোট পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল অত্যন্ত বড় হয়। শক্তি সঞ্চয়কারী যন্ত্রে তড়িৎদ্বারের পৃষ্ঠ যত বড় হয়, আধান ও রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্য তত বেশি স্থান পাওয়া যেতে পারে। এ কারণে গ্রাফিন ও গ্রাফিনজাত পদার্থকে বিদ্যুৎকোষ, অতিধারক এবং দ্রুত আধান গ্রহণকারী শক্তি সঞ্চয়ব্যবস্থায় পরীক্ষা করা হচ্ছে। গ্রাফিন পরিবাহী পথ তৈরি করতে, তড়িৎদ্বারের কাঠামোকে স্থিতিশীল রাখতে এবং আধান চলাচলের সুবিধা বাড়াতে পারে।

তবে শুধু গ্রাফিন যোগ করলেই কোনো বিদ্যুৎকোষ কয়েক সেকেন্ডে পূর্ণ হয়ে যাবে বা বর্তমানের তুলনায় বহুগুণ বেশি শক্তি ধরে রাখবে—এমন প্রচারণা বিভ্রান্তিকর। শক্তি সঞ্চয়ের ক্ষমতা পুরো ব্যবস্থার তড়িৎদ্বার, তড়িৎবিশ্লেষ্য, রাসায়নিক বিক্রিয়া, তাপ নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তার ওপর নির্ভর করে। গ্রাফিন এসবের কোনো এক বা একাধিক অংশ উন্নত করতে পারে, কিন্তু এটি একাই সব সীমাবদ্ধতা দূর করে না। গবেষণাগারে ভালো ফল পাওয়া এবং সাশ্রয়ী মূল্যে দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকোষ তৈরি করা দুটি ভিন্ন বিষয়।

গ্রাফিনের জালিকা ঘন হওয়ায় নিখুঁত অবস্থায় এটি অত্যন্ত ছোট পরমাণু ও অণুর চলাচলও আটকে দিতে পারে। একই সঙ্গে জালিকায় নিয়ন্ত্রিত অতি ক্ষুদ্র ছিদ্র তৈরি করলে নির্দিষ্ট আকারের অণু বা আয়নকে যেতে দেওয়া সম্ভব। এই ধারণা পানি থেকে লবণ পৃথক করা, গ্যাস ছাঁকন, রাসায়নিক পদার্থ আলাদা করা এবং শিল্পবর্জ্য পরিশোধনের জন্য অতিপাতলা ঝিল্লি তৈরির সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। ঝিল্লি যত পাতলা, পদার্থকে তত কম পথ অতিক্রম করতে হয়; ফলে তাত্ত্বিকভাবে দ্রুত পরিশোধন এবং কম শক্তি ব্যয় সম্ভব হতে পারে।

বাস্তবে বড় আকারের নিখুঁত গ্রাফিন ঝিল্লি তৈরি করা কঠিন। অনিচ্ছাকৃত ছিদ্র, ফাটল, ভাঁজ কিংবা স্তরগুলোর দুর্বল সংযোগ থাকলে অপরিশোধিত পদার্থ সেখান দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। খুব ছোট ছিদ্রের আকার সমান রাখা এবং পানির মধ্যে দীর্ঘ সময় ঝিল্লির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করাও বড় প্রকৌশলগত সমস্যা। তাই গ্রাফিনভিত্তিক পানি পরিশোধন আশাব্যঞ্জক হলেও সব প্রচলিত ঝিল্লিকে অবিলম্বে প্রতিস্থাপন করার পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

গ্রাফিনকে রবার, প্লাস্টিক, ধাতু, কংক্রিট বা কার্বন তন্তুর মতো পদার্থের সঙ্গে অল্প পরিমাণে মিশিয়ে যৌগিক বস্তু তৈরি করা যায়। সঠিকভাবে ছড়িয়ে দিতে পারলে এটি শক্তি, ঘর্ষণ প্রতিরোধ, তাপ পরিবাহিতা, বিদ্যুৎ পরিবাহিতা অথবা গ্যাস প্রবেশ প্রতিরোধ বাড়াতে পারে। এমন যৌগিক পদার্থ উড়োজাহাজ, মোটরযান, বায়ুচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদক, ক্রীড়াসামগ্রী, জুতা, সুরক্ষামূলক আবরণ এবং নির্মাণসামগ্রীতে ব্যবহার করা যেতে পারে। কিছু গ্রাফিনযুক্ত আবরণ ও ক্রীড়াসামগ্রী ইতিমধ্যে বাজারেও এসেছে।

কিন্তু গ্রাফিনকে কোনো পদার্থে মিশিয়ে দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অসাধারণ ফল পাওয়া যায় না। পাতাগুলো একত্রে দলা পাকিয়ে গেলে তাদের কার্যকর পৃষ্ঠ কমে যায় এবং দুর্বল অঞ্চল তৈরি হতে পারে। মূল পদার্থের সঙ্গে গ্রাফিনের সংযোগ যথেষ্ট দৃঢ় না হলে চাপ সঠিকভাবে স্থানান্তরিত হয় না। একদিকে বেশি গ্রাফিন যোগ করলে খরচ বাড়ে, অন্যদিকে গঠনও দুর্বল হতে পারে। তাই কতটুকু গ্রাফিন, কী আকারের কণা, কত স্তর, কী ধরনের রাসায়নিক পৃষ্ঠ এবং কোন প্রক্রিয়ায় মেশানো হবে—এসবই চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করে।

অতি সংবেদনশীল সংবেদক তৈরিতে গ্রাফিনের সম্ভাবনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর প্রায় সব পরমাণুই পৃষ্ঠে উন্মুক্ত থাকে। কোনো গ্যাস, রাসায়নিক অণু বা জৈব পদার্থ পৃষ্ঠে যুক্ত হলে গ্রাফিনের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য বদলে যেতে পারে। সেই পরিবর্তন মেপে অতি অল্প পরিমাণ পদার্থ শনাক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিবেশের ক্ষতিকর গ্যাস, খাদ্যের দূষণ, পানির বিষাক্ত উপাদান, মানবদেহের ঘাম বা নিঃশ্বাসে থাকা কিছু নির্দেশক এবং শারীরিক নড়াচড়া পর্যবেক্ষণে গ্রাফিনভিত্তিক সংবেদক নিয়ে গবেষণা চলছে।

শরীরে পরিধানযোগ্য যন্ত্রে গ্রাফিনের নমনীয়তা ও পরিবাহিতা একসঙ্গে কাজে লাগতে পারে। ত্বকের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া পাতলা সংবেদক হৃদ্‌স্পন্দন, শ্বাস, শরীরের তাপমাত্রা, পেশির নড়াচড়া কিংবা ঘামের রাসায়নিক পরিবর্তন মাপতে পারে। কঠিন ধাতব বর্তনীর তুলনায় গ্রাফিনভিত্তিক পাতলা ব্যবস্থা কাপড়, নমনীয় আবরণ বা ত্বকসদৃশ পৃষ্ঠে বসানো সহজ হতে পারে। তবে মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের আগে ত্বকের প্রতিক্রিয়া, জীবাণুমুক্তকরণ, স্থায়িত্ব এবং ব্যবহৃত গ্রাফিনজাত কণার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

চিকিৎসাক্ষেত্রে গ্রাফিন ও গ্রাফিন অক্সাইডকে ওষুধ বহন, ক্ষত পর্যবেক্ষণ, জীবাণুনাশক আবরণ, কৃত্রিম স্নায়ু-সংযোগ এবং জৈব শনাক্তকরণে পরীক্ষা করা হচ্ছে। বিশাল পৃষ্ঠের কারণে এতে বিভিন্ন অণু যুক্ত করা যায়। বিদ্যুৎ পরিবাহিতার কারণে স্নায়ু বা পেশির বৈদ্যুতিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণেও সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু চিকিৎসায় ব্যবহার সবচেয়ে সতর্কতার দাবি রাখে। কণার আকার, স্তরের সংখ্যা, ধারালো প্রান্ত, পৃষ্ঠের রাসায়নিক গঠন, মাত্রা ও শরীরে প্রবেশের পথ অনুযায়ী জৈব প্রতিক্রিয়া বদলাতে পারে। তাই ‘কার্বন দিয়ে তৈরি’ বলেই গ্রাফিন সব অবস্থায় নিরাপদ—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।

গ্রাফিন তৈরির সবচেয়ে পরিষ্কার পরীক্ষাগার পদ্ধতি হলো গ্রাফাইট থেকে যান্ত্রিকভাবে পাতলা স্তর আলাদা করা। এতে অত্যন্ত উচ্চমানের ছোট গ্রাফিন পাত পাওয়া যায়, যা মৌলিক গবেষণার জন্য উপযোগী। কিন্তু শিল্পে বিপুল পরিমাণ উৎপাদনের জন্য আঠালো ফিতা ব্যবহার বাস্তবসম্মত নয়। বড় ও প্রায় একটানা গ্রাফিন স্তর তৈরিতে উত্তপ্ত ধাতব পৃষ্ঠের ওপর কার্বনযুক্ত গ্যাস থেকে পরমাণু জমিয়ে জালিকা বৃদ্ধির পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। তৈরি স্তর পরে অন্য ভিত্তির ওপর স্থানান্তর করা যায়। এতে বড় পাত পাওয়া গেলেও দানার সীমানা, ভাঁজ, দূষণ এবং স্থানান্তরের ক্ষতি সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

গ্রাফাইটকে তরলের মধ্যে রেখে যান্ত্রিক শক্তি বা শব্দতরঙ্গের সাহায্যে স্তর বিচ্ছিন্ন করেও গ্রাফিনজাত পাত তৈরি করা যায়। এই পদ্ধতি কালিতে, আবরণে, যৌগিক পদার্থে ও শক্তি সঞ্চয়ে ব্যবহারের জন্য তুলনামূলক বেশি পরিমাণ উপাদান দিতে পারে। রাসায়নিকভাবে গ্রাফাইটকে জারিত করে গ্রাফিন অক্সাইড তৈরি করা হয়, যা পানিসহ বিভিন্ন তরলে তুলনামূলক সহজে ছড়ানো যায়। পরে অক্সিজেনযুক্ত অংশ কমিয়ে পরিবাহিতা কিছুটা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে গ্রাফিন অক্সাইড কিংবা হ্রাসকৃত গ্রাফিন অক্সাইড নিখুঁত একক-স্তর গ্রাফিনের সমান নয়; তাদের গঠন ও বৈশিষ্ট্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকে।

বাজারে ‘গ্রাফিন’ নামে বিক্রি হওয়া সব উপাদানও এক রকম নয়। কোনোটি সত্যিকারের একক স্তর, কোনোটি কয়েক স্তরের পাত, কোনোটি ক্ষুদ্র গ্রাফিন খণ্ড, কোনোটি গ্রাফিন অক্সাইড এবং কোনোটি বহুস্তরীয় গ্রাফাইটজাত কণা। পাতার আকার, পুরুত্ব, বিশুদ্ধতা, ত্রুটির সংখ্যা এবং পৃষ্ঠের রাসায়নিক গঠন অনুযায়ী কর্মক্ষমতা ব্যাপকভাবে বদলে যায়। তাই শুধু কোনো পণ্যে গ্রাফিন আছে বললেই তার গুণমান বা কার্যকারিতা বোঝা যায় না। পরিমাপের অভিন্ন মান ও সঠিক শ্রেণিবিন্যাস গ্রাফিন শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রাফিনের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক বাধা হলো পরীক্ষাগারের অসাধারণ বৈশিষ্ট্যকে বড় আকারে একই মানে ধরে রাখা। একটি ক্ষুদ্র, পরিচ্ছন্ন ও ত্রুটিমুক্ত গ্রাফিন পাত যে ফল দেখায়, কয়েক বর্গমিটার আকারের উৎপাদিত স্তরে সেটি পাওয়া কঠিন। পরমাণু অনুপস্থিতি, জালিকার বিকৃতি, দানার সীমানা, রাসায়নিক দূষণ, ভাঁজ এবং ভিত্তির সঙ্গে পারস্পরিক প্রভাব পরিবাহিতা ও শক্তি কমাতে পারে। উচ্চমানের উৎপাদন ব্যয়বহুল, আবার সস্তা উৎপাদনে মানের তারতম্য বেশি হতে পারে।

গ্রাফিনকে যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করাও কঠিন। একক স্তর তৈরি করলেই ব্যবহারযোগ্য পণ্য হয় না; তাতে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎসংযোগ বসাতে, কাঙ্ক্ষিত আকারে কাটতে, অন্য পদার্থের ওপর স্থানান্তর করতে এবং বাতাস, আর্দ্রতা ও তাপের মধ্যে স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হয়। অতি ক্ষুদ্র স্তর সামলানোর প্রতিটি পর্যায়ে নতুন ত্রুটি তৈরি হতে পারে। বিদ্যমান কারখানায় গ্রাফিনের প্রক্রিয়া যুক্ত করা, প্রতিটি পণ্যের মান পরীক্ষা করা এবং প্রচলিত সস্তা উপাদানের চেয়ে প্রকৃত সুবিধা প্রমাণ করাও জরুরি।

এই বাস্তব সীমাবদ্ধতার কারণে গ্রাফিন আবিষ্কারের পর কল্পনা করা অনেক পণ্য দ্রুত বাজারে আসেনি। সংবাদমাধ্যমে কখনো এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল যে অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই গ্রাফিনের মুঠোফোন, মুহূর্তে পূর্ণ হওয়া বিদ্যুৎকোষ, অবিনাশী উড়োজাহাজ এবং সর্বত্র ব্যবহারযোগ্য নমনীয় বর্তনী দেখা যাবে। পদার্থবিজ্ঞানের আবিষ্কার থেকে নির্ভরযোগ্য শিল্পপণ্য তৈরি হতে সাধারণত দীর্ঘ সময় লাগে। পরীক্ষাগারে একটি বৈশিষ্ট্যের সর্বোচ্চ মান দেখানো আর সেই বৈশিষ্ট্যকে সস্তা, নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী ও কোটি কোটি পণ্যে সমানভাবে প্রয়োগ করা এক বিষয় নয়।

তারপরও গ্রাফিনকে ব্যর্থ প্রতিশ্রুতি বলা ভুল হবে। গ্রাফিনযুক্ত কালি, ক্ষয়রোধী আবরণ, উন্নত যৌগিক পদার্থ, সংবেদক, তাপ ছড়ানোর স্তর এবং বিশেষ ক্রীড়াসামগ্রীসহ কিছু ব্যবহার বাস্তবে এগিয়ে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাফিন নিজে সম্পূর্ণ পণ্য নয়; অল্প পরিমাণে যোগ করা একটি কার্যকর উপাদান। ভবিষ্যতে এর সবচেয়ে সফল ব্যবহার হয়তো বিশাল দৃশ্যমান গ্রাফিন কাঠামো নয়, বরং বিদ্যুৎকোষ, আবরণ, বর্তনী, ঝিল্লি বা যৌগিক পদার্থের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অতি ক্ষুদ্র স্তর হবে।

গ্রাফিনের আবিষ্কার আরেকটি বড় পরিবর্তন এনেছে—এটি দ্বিমাত্রিক পদার্থের সম্পূর্ণ নতুন গবেষণাক্ষেত্র তৈরি করেছে। বিজ্ঞানীরা এখন বোরন নাইট্রাইড, মলিবডেনাম ডাইসালফাইড এবং আরও বহু পরমাণু-পাতলা পদার্থ নিয়ে কাজ করছেন। ভিন্ন দ্বিমাত্রিক স্তর একটির ওপর আরেকটি সাজিয়ে কৃত্রিম বহুস্তরীয় গঠন তৈরি করা যায়। কোনো স্তর বিদ্যুৎ পরিবহন করে, কোনোটি নিরোধক, আবার কোনোটি আলো বা বৈদ্যুতিক সংকেতে বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখায়। এভাবে পরমাণু স্তরে নির্বাচিত বৈশিষ্ট্য সাজিয়ে নতুন ধরনের ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক, আলোকীয় ও শক্তি সঞ্চয়কারী যন্ত্র তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

গ্রাফিনকে ভবিষ্যতের বিস্ময় বলা হয় কোনো একক জাদুকরী ক্ষমতার জন্য নয়। একই পদার্থে এক পরমাণু পুরুত্ব, অতি কম ওজন, বিপুল প্রসারণসহন শক্তি, নমনীয়তা, উচ্চ বিদ্যুৎ ও তাপ পরিবাহিতা, প্রায় স্বচ্ছতা, বিশাল পৃষ্ঠতল এবং রাসায়নিকভাবে পরিবর্তনযোগ্য গঠন একত্রে পাওয়া যায়। কিন্তু এসব বৈশিষ্ট্যের সবগুলো একই পণ্যে সর্বোচ্চ মাত্রায় পাওয়া যায় না। ভিত্তি, ত্রুটি, স্তরের সংখ্যা, উৎপাদনপদ্ধতি ও পরিবেশ অনুযায়ী গ্রাফিনের আচরণ বদলে যায়।

এই কারণেই গ্রাফিনকে বোঝার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপায় হলো একে সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান নয়, বরং অসাধারণ সম্ভাবনাসম্পন্ন একটি মৌলিক উপাদান হিসেবে দেখা। এটি কিছু ক্ষেত্রে প্রচলিত পদার্থকে প্রতিস্থাপন করতে পারে, কিছু ক্ষেত্রে অল্প পরিমাণে মিশে তাদের উন্নত করতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন যন্ত্র তৈরির সুযোগ দিতে পারে। উৎপাদনের মান, মূল্য, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘস্থায়িত্বের সমস্যাগুলো যত সমাধান হবে, এর ব্যবহার তত বিস্তৃত হতে পারে। পেন্সিলের কালো গ্রাফাইটের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক পরমাণু পুরু স্তর যে পদার্থবিজ্ঞান, প্রকৌশল ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি সম্পর্কে মানুষের চিন্তাই বদলে দিয়েছে—গ্রাফিনের প্রকৃত বিস্ময় সম্ভবত সেখানেই।


আপনার পছন্দ হতে পারে