বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

হিরোশিমার ধ্বংসযজ্ঞ ও হিবাকুশা: বিস্ফোরণ, আগুন ও তেজস্ক্রিয়তার করুণ ইতিহাস

সিরিজ: হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলা

হিরোশিমার ধ্বংসযজ্ঞ ও হিবাকুশা: বিস্ফোরণ, আগুন ও তেজস্ক্রিয়তার করুণ ইতিহাস
হিবাকুশা: ধ্বংসের ভেতর বেঁচে থাকার ইতিহাস

১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে হিরোশিমার আকাশে “লিটল বয়” বিস্ফোরিত হওয়ার পর শহরটির ধ্বংস কেবল একটি মুহূর্তে সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রথমে এসেছিল অন্ধ করে দেওয়া আলোর ঝলক, তারপর অসহনীয় তাপ, প্রচণ্ড অভিঘাত তরঙ্গ এবং বিস্তৃত অগ্নিকাণ্ড। কিন্তু দৃশ্যমান ধ্বংসের পরও বিপর্যয় শেষ হয়নি। তেজস্ক্রিয়তা মানুষের শরীরের ভেতর নীরবে ক্ষতি করতে থাকে; আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে; খাদ্য, পানি ও আশ্রয়ের সংকট দেখা দেয়। যারা প্রাণে বেঁচেছিলেন, তাঁদের অনেককে পরবর্তী কয়েক দশক রোগ, মানসিক আঘাত এবং সামাজিক বৈষম্যের সঙ্গে লড়তে হয়। এই বেঁচে যাওয়া মানুষদেরই বলা হয় হিবাকুশা—অর্থাৎ বিস্ফোরণে আক্রান্ত ব্যক্তি।

বোমাটি শিমা হাসপাতালের কাছে ভূমি থেকে প্রায় ৬০০ মিটার উঁচুতে বিস্ফোরিত হয়েছিল। মুহূর্তের মধ্যে একটি আগুনের গোলক তৈরি হয় এবং তীব্র তাপীয় বিকিরণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ফোরণকেন্দ্রের কাছাকাছি থাকা বহু মানুষ সঙ্গে সঙ্গে নিহত হন। দূরে থাকা মানুষদের উন্মুক্ত ত্বক মারাত্মকভাবে পুড়ে যায়। কেউ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, কেউ রাস্তায় হাঁটছিলেন, কেউ ট্রামের অপেক্ষায় ছিলেন, আবার হাজার হাজার বিদ্যালয়শিক্ষার্থী অগ্নিনিরোধী খোলা এলাকা তৈরির জন্য বাড়িঘর ভাঙার কাজে নিয়োজিত ছিল। খোলা আকাশের নিচে থাকা এসব কিশোর-কিশোরী সরাসরি তাপ ও অভিঘাতের মুখে পড়ে।

তীব্র আলোর পরই শহরের ওপর আছড়ে পড়ে শক্তিশালী অভিঘাত তরঙ্গ। কাঠের বাড়িগুলো ভেঙে যায়, ছাদ উড়ে পড়ে এবং কাচের টুকরা মানুষের শরীরে বিদ্ধ হয়। বিস্ফোরণকেন্দ্রের কাছে শক্ত পাথর ও কংক্রিটের ভবনের বাইরের অংশ কোনোভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেও ভেতরের মানুষ রক্ষা পাননি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হিরোশিমার রাস্তাগুলো ধ্বংসস্তূপে বন্ধ হয়ে যায়। বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়ে, পানির পাইপ ভেঙে যায়, যোগাযোগব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। শহরটি শুধু আক্রমণের শিকার হয়নি; আহতদের বাঁচানোর প্রায় সব অবকাঠামোও একই সঙ্গে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

হিরোশিমার বহু বাড়ি কাঠ, কাগজ ও হালকা নির্মাণসামগ্রী দিয়ে তৈরি ছিল। বিস্ফোরণের তাপ এবং উল্টে যাওয়া চুলা ও বাতি থেকে অসংখ্য স্থানে আগুন ধরে যায়। অল্প সময়ের মধ্যে বিচ্ছিন্ন অগ্নিকাণ্ড একত্রিত হয়ে বিশাল অগ্নিঝড়ে পরিণত হয়। উত্তপ্ত বাতাস দ্রুত ওপরে উঠতে থাকলে চারদিক থেকে প্রবল বায়ু আগুনের দিকে ছুটে আসে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষ সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিলেন, কিন্তু তাঁদের আত্মীয় বা পথচারীরা কাছে যেতে পারছিলেন না। অনেককে জীবিত রেখেই আগুনের সামনে থেকে সরে যেতে হয়েছিল। বেঁচে যাওয়ার অর্থ কখনো কখনো প্রিয়জনকে ফেলে চলে যাওয়ার অসহনীয় অপরাধবোধ বহন করা।

অসংখ্য আহত মানুষ ওটা নদীর শাখা ও শহরের খালগুলোর দিকে এগিয়ে যান। দগ্ধ শরীর ঠান্ডা করার জন্য সবাই পানি চাইছিলেন। কারও ত্বক ঝুলে পড়েছিল, কারও চোখ ফুলে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, কেউ দিক হারিয়ে নীরবে অন্যদের অনুসরণ করছিলেন। নদীর তীর আহত মানুষে ভরে যায়। প্রচণ্ড তৃষ্ণায় অনেকে নদীর পানি পান করেন; কেউ পানিতে নেমে আর উঠে আসতে পারেননি। উদ্ধারকারীরা পরে নদীতে অসংখ্য মৃতদেহ দেখতে পান। যারা পানি দিতে পেরেছিলেন, তাঁদের অনেকেই পরবর্তী জীবনে মনে করেছেন পানি দেওয়ার পর আহত ব্যক্তি মারা গেছেন; যারা দেননি, তাঁরা সেই প্রত্যাখ্যানের স্মৃতিতে পীড়িত হয়েছেন।

হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর অবস্থা ছিল আরও ভয়াবহ। শহরের অধিকাংশ চিকিৎসক ও সেবিকা নিহত অথবা আহত হন। হাসপাতাল ধসে পড়ে, ওষুধ পুড়ে যায় এবং চিকিৎসার সরঞ্জাম নষ্ট হয়। অক্ষত থাকা বিদ্যালয়, মন্দির ও সরকারি ভবনকে অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়। সেখানে শয্যা, জীবাণুমুক্ত কাপড়, ব্যথানাশক কিংবা পর্যাপ্ত পানি ছিল না। চিকিৎসাকর্মীদের সামনে এত বেশি রোগী এসেছিলেন যে তাঁরা অনেক সময় শুধু সবচেয়ে বাঁচার সম্ভাবনা থাকা মানুষদের সাহায্য করতে বাধ্য হন। গুরুতর দগ্ধ ক্ষতে রান্নার তেল, সাধারণ মলম বা হাতে পাওয়া কাপড় ব্যবহার করা হয়েছিল।

বিস্ফোরণের কয়েক ঘণ্টা পর হিরোশিমার উত্তর-পশ্চিমাংশসহ কিছু এলাকায় গাঢ় রঙের বৃষ্টি নামে। ধোঁয়া, কালি, ধূলা, জলীয় বাষ্প ও তেজস্ক্রিয় কণা মিশে তৈরি এই বৃষ্টিকে পরে “কালো বৃষ্টি” বলা হয়। বৃষ্টির বড় ফোঁটা মানুষের পোশাক ও দেয়ালে কালচে দাগ রেখে যায়। অনেকে এটিকে সাধারণ বৃষ্টি ভেবে তৃষ্ণা মেটাতে মুখ খুলেছিলেন বা পাত্রে সংগ্রহ করেছিলেন। তখন সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, বহু চিকিৎসকও বুঝতে পারেননি যে বিস্ফোরণটি তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ছড়িয়েছে। ফলে দৃশ্যমান আঘাত না থাকা ব্যক্তিদের বিপদ প্রথমে গুরুত্ব পায়নি।

হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর অবস্থা ছিল আরও ভয়াবহ। শহরের অধিকাংশ চিকিৎসক ও সেবিকা নিহত অথবা আহত হন। হাসপাতাল ধসে পড়ে, ওষুধ পুড়ে যায় এবং চিকিৎসার সরঞ্জাম নষ্ট হয়। অক্ষত থাকা বিদ্যালয়, মন্দির ও সরকারি ভবনকে অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়। সেখানে শয্যা, জীবাণুমুক্ত কাপড়, ব্যথানাশক কিংবা পর্যাপ্ত পানি ছিল না। চিকিৎসাকর্মীদের সামনে এত বেশি রোগী এসেছিলেন যে তাঁরা অনেক সময় শুধু সবচেয়ে বাঁচার সম্ভাবনা থাকা মানুষদের সাহায্য করতে বাধ্য হন। গুরুতর দগ্ধ ক্ষতে রান্নার তেল, সাধারণ মলম বা হাতে পাওয়া কাপড় ব্যবহার করা হয়েছিল।

বিস্ফোরণের কয়েক ঘণ্টা পর হিরোশিমার উত্তর-পশ্চিমাংশসহ কিছু এলাকায় গাঢ় রঙের বৃষ্টি নামে। ধোঁয়া, কালি, ধূলা, জলীয় বাষ্প ও তেজস্ক্রিয় কণা মিশে তৈরি এই বৃষ্টিকে পরে “কালো বৃষ্টি” বলা হয়। বৃষ্টির বড় ফোঁটা মানুষের পোশাক ও দেয়ালে কালচে দাগ রেখে যায়। অনেকে এটিকে সাধারণ বৃষ্টি ভেবে তৃষ্ণা মেটাতে মুখ খুলেছিলেন বা পাত্রে সংগ্রহ করেছিলেন। তখন সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, বহু চিকিৎসকও বুঝতে পারেননি যে বিস্ফোরণটি তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ছড়িয়েছে। ফলে দৃশ্যমান আঘাত না থাকা ব্যক্তিদের বিপদ প্রথমে গুরুত্ব পায়নি।

কয়েক দিন পর এক অজানা অসুস্থতা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। বিস্ফোরণ থেকে জীবিত ও তুলনামূলক অক্ষত বেরিয়ে আসা অনেকে হঠাৎ জ্বর, বমি, দুর্বলতা ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন। তাঁদের চুল গোছায় গোছায় পড়ে যেতে থাকে, মাড়ি ও নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ হয় এবং ত্বকের নিচে বেগুনি দাগ দেখা দেয়। সামান্য ক্ষতও শুকাতে চাইত না। শ্বেত রক্তকণিকা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় শরীরের সংক্রমণ প্রতিরোধক্ষমতা ভেঙে পড়ে। চিকিৎসকেরা প্রথমে রোগটির কারণ বুঝতে পারেননি। এটি ছিল তীব্র বিকিরণজনিত অসুস্থতা, যা পারমাণবিক অস্ত্রের দৃশ্যমান ধ্বংসের বাইরে থাকা নতুন এক মৃত্যুফাঁদ।

হামলার দিন ঠিক কতজন নিহত হয়েছিলেন, তার নির্ভুল হিসাব নেই। বিস্ফোরণে সরকারি নথি ধ্বংস হয়, পুরো পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং শহরে থাকা কোরীয় শ্রমিক ও অস্থায়ী বাসিন্দাদের অনেকের নাম পূর্ণ তালিকায় ছিল না। ধারণা করা হয়, প্রথম দিনেই কয়েক দশ হাজার মানুষ মারা যান এবং ১৯৪৫ সালের শেষ নাগাদ আঘাত, দগ্ধ ক্ষত ও তেজস্ক্রিয়তার কারণে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজারে পৌঁছায়। নিহতদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক শিশু, নারী, বৃদ্ধ, চিকিৎসাকর্মী এবং কোরীয় নাগরিক ছিলেন। অল্পসংখ্যক চীনা নাগরিক ও মিত্রবাহিনীর যুদ্ধবন্দীরও মৃত্যু ঘটে।

বেঁচে যাওয়াদের সবাই হিরোশিমার স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন না। কেউ হামলার সময় শহরে ছিলেন, কেউ বিস্ফোরণের পরে আত্মীয় খুঁজতে বা উদ্ধারকাজে প্রবেশ করেছিলেন, আবার কেউ গর্ভে থাকা অবস্থায় বিকিরণের সংস্পর্শে আসেন। পরবর্তী সময়ে জাপান সরকার এসব শ্রেণির স্বীকৃত আক্রান্ত ব্যক্তিকে হিবাকুশা হিসেবে চিহ্নিত করে। কিন্তু স্বীকৃতি ও চিকিৎসাসহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়া সবসময় সহজ ছিল না। বিশেষ করে কালো বৃষ্টিতে আক্রান্ত দূরবর্তী এলাকার মানুষ এবং কোরীয় হিবাকুশাদের দীর্ঘদিন নিজেদের অসুস্থতার স্বীকৃতির জন্য লড়তে হয়েছে।

বিকিরণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়। হামলার কয়েক বছর পর শিশু ও তরুণদের মধ্যে লিউকেমিয়ার হার বাড়তে দেখা যায়। পরে কিছু কঠিন ক্যানসার, চোখের ছানি এবং অন্যান্য রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। গুরুতরভাবে পোড়া ব্যক্তিদের শরীরে মোটা, উঁচু কেলয়েড দাগ তৈরি হয়েছিল। অনেককে বারবার অস্ত্রোপচার করাতে হয়। বিস্ফোরণের সময় গর্ভে থাকা কিছু শিশুর মধ্যে শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সমস্যা দেখা দিয়েছিল, বিশেষত গর্ভাবস্থার সংবেদনশীল পর্যায়ে উচ্চমাত্রার বিকিরণের শিকার হলে। তবে সব হিবাকুশা অসুস্থ হয়েছিলেন বা তাঁদের সন্তানদের মধ্যে অবধারিতভাবে বংশগত রোগ ছড়িয়েছিল—এ ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।

তবু বিকিরণ সম্পর্কে ভয় ও অজ্ঞতা হিবাকুশাদের সামাজিক জীবনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। অনেক নিয়োগকর্তা মনে করতেন তাঁরা দুর্বল, ঘন ঘন অসুস্থ হবেন অথবা দীর্ঘদিন কাজ করতে পারবেন না। বিয়ের ক্ষেত্রে পরিবারগুলো আশঙ্কা করত তাঁদের সন্তান বিকলাঙ্গ হয়ে জন্মাবে। ফলে বহু বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি নিজেদের পরিচয় গোপন করেন। নারী হিবাকুশারা বিশেষভাবে বিয়ে ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হন। যাঁরা একটি পারমাণবিক বিস্ফোরণ থেকে বেঁচেছিলেন, তাঁদের আবার সমাজের সন্দেহ ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধেও বেঁচে থাকতে হয়েছে।

মানসিক যন্ত্রণার কোনো সহজ পরিমাপ ছিল না। অনেক হিবাকুশা দুঃস্বপ্ন, শব্দ ও আলোর প্রতি আতঙ্ক, বিষণ্নতা এবং বেঁচে থাকার অপরাধবোধে ভুগেছেন। শিশুরা এক সকালে মা-বাবা ও ভাইবোন হারিয়ে অনাথ হয়ে যায়। কেউ বহু বছর ধরে নিখোঁজ স্বজনের কোনো চিহ্ন পাননি। পোড়া মৃতদেহ শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় অনেক পরিবার শেষকৃত্যও করতে পারেনি। তখন “মানসিক আঘাত” নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করার সামাজিক পরিবেশ ছিল না; তাই অসংখ্য মানুষ নীরবে স্মৃতি বহন করেছেন।

যুদ্ধশেষের মার্কিন দখলদারত্বের প্রথম বছরগুলোতে পারমাণবিক হামলার ছবি, রোগের বিবরণ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রতিবেদন প্রকাশের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল। চিকিৎসা গবেষণাও হিবাকুশাদের কাছে সবসময় সহায়তা হিসেবে অনুভূত হয়নি। তাঁদের পরীক্ষা করা হলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না—এমন অভিযোগ তৈরি হয়। ফলে অনেকের মধ্যে এই অনুভূতি জন্মায় যে তাঁরা প্রথমে অস্ত্রের শিকার এবং পরে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছেন। পারমাণবিক হামলার পূর্ণ মানবিক বাস্তবতা বিশ্বের সামনে পৌঁছাতে তাই সময় লেগেছিল।

ধীরে ধীরে হিবাকুশারা নিজেদের অভিজ্ঞতা বলা শুরু করেন। তাঁরা বিদ্যালয়, সম্মেলন ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিস্ফোরণের স্মৃতি তুলে ধরেন। কেউ পোড়া পোশাক সংরক্ষণ করেছেন, কেউ আঁকা ছবিতে সেদিনের দৃশ্য ফুটিয়ে তুলেছেন, আবার কেউ মৃত শিশুদের গল্প বলেছেন। তাঁদের সাক্ষ্য পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি হয়ে ওঠে। হিবাকুশারা নিজেদের শুধু ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করেননি; তাঁরা স্মৃতি রক্ষক ও শান্তির দূতে পরিণত হয়েছেন।

হিরোশিমা পুনর্গঠিত হয়েছে, রাস্তায় আবার মানুষ চলেছে এবং ধ্বংসস্তূপের জায়গায় আধুনিক নগরী গড়ে উঠেছে। কিন্তু পারমাণবিক বোমা গম্বুজ, শান্তি স্মৃতি উদ্যান, নিহতদের নামের তালিকা এবং হিবাকুশাদের সাক্ষ্য মনে করিয়ে দেয় যে শহরের পুনর্নির্মাণ ইতিহাসকে মুছে দেয়নি। প্রতি বছর ৬ আগস্ট সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে নীরবতা পালন করা হয়। সেই নীরবতা কেবল মৃতদের জন্য শোক নয়; এটি মানুষের হাতে থাকা পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে সতর্কতা।

হিরোশিমার ধ্বংসযজ্ঞ বোঝার জন্য শুধু বিস্ফোরণের শক্তি, নিহতের সংখ্যা বা ধ্বংস হওয়া ভবনের হিসাব যথেষ্ট নয়। এর প্রকৃত ইতিহাস লুকিয়ে আছে পানি চাওয়া আহত শিশুর মধ্যে, স্বজনকে ধ্বংসস্তূপে ফেলে আসা মানুষের অপরাধবোধে, বিকিরণে অসুস্থ শরীরে এবং পরিচয় গোপন করে বেঁচে থাকা হিবাকুশাদের জীবনে। তাঁদের করুণ অভিজ্ঞতা দেখায়, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্ফোরণ কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হলেও এর মানবিক পরিণতি বহু দশক ধরে চলতে পারে। হিবাকুশাদের সাক্ষ্য তাই অতীতের বিবরণমাত্র নয়—এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি একটি আবেদন, যেন পৃথিবীর আর কোনো শহর হিরোশিমার মতো ইতিহাস বহন করতে বাধ্য না হয়।


আপনার পছন্দ হতে পারে