১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ ও ব্রিটিশ রাজ: কোম্পানি শাসনের অবসান ও সরাসরি ব্রিটিশ শাসনের সূচনা
সিরিজ: ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ থেকে ব্রিটিশ রাজ প্রতিষ্ঠার রক্তক্ষয়ী ইতিহাস
১৮৫৭ সালের ১০ মে মিরাট সেনানিবাসে ভারতীয় সিপাহিদের বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে এমন এক বিস্ফোরণ শুরু হয়, যা অল্প সময়ের মধ্যে উত্তর ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্রোহীরা পরদিন দিল্লিতে পৌঁছে বৃদ্ধ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে নিজেদের প্রতীকী সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করে। দিল্লি, কানপুর, লখনউ, ঝাঁসি, বেরেলি ও বিহারের বিভিন্ন অঞ্চলে কোম্পানির কর্তৃত্ব ভেঙে পড়ে। ব্রিটিশরা একে দীর্ঘদিন শুধু “সিপাহী বিদ্রোহ” হিসেবে বর্ণনা করলেও এটি কেবল সেনাবাহিনীর অসন্তোষ ছিল না। এতে ক্ষমতাচ্যুত রাজপরিবার, জমিদার, কৃষক, কারিগর, ধর্মীয় নেতা ও শহুরে জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন অংশ যোগ দিয়েছিল। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ছিল বহু বিচ্ছিন্ন ক্ষোভের মিলিত বিস্ফোরণ, যা ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের ভিত্তি কাঁপিয়ে দেয়।
বিদ্রোহের পেছনে প্রায় এক শতাব্দীর কোম্পানি সম্প্রসারণের গভীর প্রভাব ছিল। পলাশী ও বক্সারের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যুদ্ধ, সহায়ক জোট, স্বত্ববিলোপ নীতি এবং কথিত কুশাসনের অভিযোগে একের পর এক রাজ্য দখল করেছিল। লর্ড ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতিতে দত্তক উত্তরাধিকারীকে অস্বীকার করে সাতারা, ঝাঁসি ও নাগপুরের মতো রাজ্য দখল করা হয়। ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের দত্তকপুত্রকে উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ায় তার রাজ্য কোম্পানির অধীনে চলে যায়। ১৮৫৬ সালে আওধকে কুশাসনের অভিযোগে দখল করা হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। কোম্পানির প্রতি দীর্ঘদিন অনুগত একটি রাজ্যের শাসককে অপসারণ করায় ভারতীয় রাজপরিবারগুলো নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
আওধ দখলের সামাজিক প্রভাব ছিল ব্যাপক। নবাবের দরবার, সৈন্য, কারিগর, কবি, কর্মকর্তা ও সেবানির্ভর বহু মানুষ জীবিকা হারায়। নতুন ভূমি বন্দোবস্তে অনেক তালুকদারের অধিকার ক্ষুণ্ন হয় এবং কৃষকদের ওপর রাজস্বের চাপ বৃদ্ধি পায়। বাংলার সেনাবাহিনীর বহু সিপাহী আওধ ও তার আশপাশের কৃষক পরিবার থেকে আসতেন। ফলে তাদের অসন্তোষ শুধু বেতন বা সামরিক মর্যাদার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ ছিল না; নিজেদের পরিবার, জমি ও সামাজিক অবস্থার ওপর কোম্পানির নীতির প্রভাবও তারা সরাসরি অনুভব করছিলেন।
কোম্পানির সেনাবাহিনীতে ভারতীয় সিপাহির সংখ্যা ইউরোপীয় সৈন্যের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। তারাই কোম্পানির হয়ে মহীশূর, মারাঠা, শিখ ও অন্যান্য ভারতীয় শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল। কিন্তু বেতন, ভাতা ও পদোন্নতিতে তারা বৈষম্যের শিকার হতেন। উচ্চপদগুলো প্রায় সম্পূর্ণভাবে ইউরোপীয়দের জন্য সংরক্ষিত ছিল। নতুন অঞ্চলে দায়িত্ব পালনের সময় পুরোনো ভাতা বাতিল করা এবং সমুদ্রপথে বিদেশে যাওয়ার সম্ভাবনা উচ্চবর্ণের কিছু সিপাহির ধর্মীয় ও সামাজিক উদ্বেগ বাড়ায়। ১৮৫৬ সালের সাধারণ সেনাভর্তি আইন নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রয়োজনে বিদেশে সেবা দিতে বাধ্য করার সুযোগ সৃষ্টি করলে এই আশঙ্কা আরও তীব্র হয়।
তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণ ঘটায় নতুন এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজ। রাইফেলে গুলি ভরার আগে কার্তুজের মুখ দাঁত দিয়ে ছিঁড়তে হতো। সিপাহিদের মধ্যে গুজব ছড়ায় যে কার্তুজে গরু ও শূকরের চর্বি ব্যবহার করা হয়েছে। গরু হিন্দুদের কাছে পবিত্র এবং শূকর মুসলমানদের কাছে নিষিদ্ধ হওয়ায় উভয় সম্প্রদায়ের সিপাহিরা এটিকে ধর্ম নষ্ট করার পরিকল্পনা হিসেবে দেখেন। কোম্পানি পরে কার্তুজব্যবস্থায় পরিবর্তনের চেষ্টা করলেও বিশ্বাস ইতিমধ্যে ভেঙে পড়েছিল। কার্তুজ ছিল আগুন ধরানোর স্ফুলিঙ্গ; বারুদ তৈরি হয়েছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দখল, অর্থনৈতিক চাপ, সামরিক বৈষম্য ও ধর্মীয় ভয়ের মাধ্যমে।
১৮৫৭ সালের মার্চে ব্যারাকপুরে সিপাহী মঙ্গল পাণ্ডে ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের আক্রমণ করেন এবং পরে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ৯ মে মিরাটে কার্তুজ ব্যবহারে অস্বীকৃতি জানানো ৮৫ জন সিপাহিকে দীর্ঘ কারাদণ্ড দিয়ে প্রকাশ্যে অপমান করা হয়। পরদিন তাদের সহযোদ্ধারা বিদ্রোহ করে বন্দীদের মুক্ত করেন, ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও বেসামরিকদের ওপর আক্রমণ চালান এবং দিল্লির দিকে অগ্রসর হন। দিল্লিতে পৌঁছে তারা দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের সমর্থন দাবি করেন। মুঘল সম্রাটের বাস্তব ক্ষমতা না থাকলেও তার নাম বিদ্রোহকে ঐতিহাসিক বৈধতা এবং একটি সাধারণ প্রতীক দেয়।
দিল্লি দ্রুত বিদ্রোহের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। বখত খানসহ বিদ্রোহী নেতারা প্রতিরক্ষা সংগঠনের চেষ্টা করেন, কিন্তু তাদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব, নিয়মিত সরবরাহ ও সুস্পষ্ট কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার অভাব ছিল। তবু শহরটি কয়েক মাস কোম্পানির হাতের বাইরে থাকে। পাঞ্জাব থেকে আনা ব্রিটিশ ও অনুগত ভারতীয় বাহিনী দীর্ঘ অবরোধের পর ১৮৫৭ সালের সেপ্টেম্বরে দিল্লি পুনর্দখল করে। এরপর শহরে ব্যাপক হত্যা, লুণ্ঠন ও উচ্ছেদ চালানো হয়। বাহাদুর শাহকে বন্দী করে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয় এবং তার কয়েকজন পুত্রকে হত্যা করা হয়। এর মাধ্যমে মুঘল রাজবংশের শেষ রাজনৈতিক প্রতীকও বিলুপ্ত হয়।
কানপুরে পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাওয়ের দত্তকপুত্র নানা সাহেব বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন। কোম্পানি তার পিতার ভাতা উত্তরাধিকারসূত্রে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। প্রথমদিকে তার বাহিনী কানপুর দখল করলেও অবরুদ্ধ ব্রিটিশদের আত্মসমর্পণের পর সতীচৌরা ঘাট ও বিবিঘরে নারী-শিশুসহ বন্দীদের হত্যার ঘটনা ব্রিটিশ জনমতকে প্রচণ্ডভাবে ক্ষুব্ধ করে। পরে শহর পুনর্দখল করে ব্রিটিশ বাহিনী বিদ্রোহী ও সন্দেহভাজন সাধারণ মানুষের ওপর নির্মম প্রতিশোধ চালায়। উভয় পক্ষের সহিংসতা যুদ্ধটিকে দ্রুত প্রতিহিংসার নিষ্ঠুর সংঘাতে পরিণত করে।
লখনউ ও আওধে বিদ্রোহ আরও বিস্তৃত সামাজিক চরিত্র ধারণ করে। ক্ষমতাচ্যুত নবাবের স্ত্রী বেগম হজরত মহল তার অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্র বিরজিস কদরকে শাসক ঘোষণা করে প্রতিরোধ পরিচালনা করেন। তালুকদার, সাবেক সৈন্য, কৃষক ও শহুরে যোদ্ধাদের অনেকে কোম্পানির বিরুদ্ধে যোগ দেন। লখনউ রেসিডেন্সি কয়েক মাস অবরুদ্ধ থাকে। একাধিক উদ্ধার অভিযান ও দীর্ঘ যুদ্ধের পর ১৮৫৮ সালের মার্চে ব্রিটিশরা শহরটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়। কিন্তু আওধের গ্রামাঞ্চলে প্রতিরোধ আরও দীর্ঘ সময় অব্যাহত ছিল।
ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ বিদ্রোহের অন্যতম কিংবদন্তি নেত্রী হয়ে ওঠেন। প্রথমদিকে ঝাঁসিতে বিদ্রোহী সিপাহিদের কর্মকাণ্ডের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ কতটা ছিল, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে ব্রিটিশরা তাকে বিশ্বাস না করায় তিনি শেষ পর্যন্ত সক্রিয় প্রতিরোধে যোগ দেন। ১৮৫৮ সালে হিউ রোজের বাহিনী ঝাঁসি অবরোধ করলে রানি দুর্গ রক্ষা করেন, পরে সেখান থেকে বেরিয়ে তাতিয়া টোপের সঙ্গে যোগ দেন। তারা গোয়ালিয়র দখল করলেও ব্রিটিশ পাল্টা আক্রমণে লক্ষ্মীবাঈ নিহত হন। তার সাহস ও মৃত্যু পরে ঔপনিবেশিক বিরোধী সংগ্রামের শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়।
বিহারে বৃদ্ধ জমিদার কুনওয়ার সিং কোম্পানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন, আর বেরেলিতে খান বাহাদুর খান নেতৃত্ব দেন। কিন্তু বিদ্রোহ সমগ্র ভারতে সমানভাবে ছড়ায়নি। বাংলা, বোম্বে ও মাদ্রাজ সেনাবাহিনীর অধিকাংশ অংশ বিদ্রোহে যোগ দেয়নি। পাঞ্জাবের বহু শিখ, পাঠান ও অন্যান্য সৈন্য, নেপালের গোর্খা বাহিনী এবং হায়দরাবাদসহ অনেক দেশীয় রাজা কোম্পানিকে সহায়তা করেন বা নিরপেক্ষ থাকেন। মারাঠা, শিখ ও অন্যান্য শক্তির পুরোনো রাজনৈতিক স্মৃতিও সবাইকে মুঘল পতাকার নিচে একত্রিত হতে বাধা দেয়। বিদ্রোহীদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল অভিন্ন নেতৃত্ব, সমন্বিত সামরিক পরিকল্পনা এবং সর্বভারতীয় রাজনৈতিক লক্ষ্যের অভাব।
ব্রিটিশরা টেলিগ্রাফ, উন্নত যোগাযোগ, নিয়ন্ত্রিত বন্দর এবং পাঞ্জাব থেকে সংগৃহীত সৈন্য ব্যবহার করে দ্রুত বাহিনী স্থানান্তর করতে সক্ষম হয়। ক্রিমিয়ার যুদ্ধ ও পারস্য অভিযান শেষে উপলভ্য ইউরোপীয় সেনাও ভারতে পাঠানো হয়। কোম্পানির অর্থ, নৌপথ ও সামরিক সংগঠন বিদ্রোহীদের বিচ্ছিন্ন কেন্দ্রগুলো একে একে দমন করতে সাহায্য করে। ১৮৫৮ সালের মাঝামাঝি প্রধান শহরগুলো পুনর্দখল করা হলেও তাতিয়া টোপের মতো নেতারা আরও কিছু সময় গেরিলা লড়াই চালান। ১৮৫৯ সালের মধ্যে সংগঠিত প্রতিরোধ কার্যত শেষ হয়।
বিদ্রোহ দমনের সময় ব্রিটিশ বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা গণফাঁসি, কামানের মুখে বেঁধে উড়িয়ে দেওয়া, গ্রাম ধ্বংস এবং সন্দেহভাজনদের নির্বিচারে হত্যার মতো কঠোর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। একইভাবে বিদ্রোহের শুরুতে বহু ইউরোপীয় বেসামরিক মানুষও নিহত হয়েছিল। কিন্তু ঔপনিবেশিক প্রতিশোধ ছিল বৃহত্তর, সংগঠিত এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় পরিচালিত। বিদ্রোহী অঞ্চলগুলোর সাধারণ মানুষ যুদ্ধ, খাদ্যসংকট, লুণ্ঠন ও বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়। ফলে ১৮৫৭–৫৮ সালের সংঘাত শুধু সেনা ও শাসকের যুদ্ধ ছিল না; এটি অসংখ্য সাধারণ পরিবারের জীবন ধ্বংস করেছিল।
এই বিপর্যয়ের পর ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে একটি বাণিজ্যিক কোম্পানির হাতে ভারতের মতো বিশাল ভূখণ্ড রাখা নিরাপদ নয়। ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন বিলুপ্ত করে ভারতের প্রশাসন সরাসরি ব্রিটিশ রাজমুকুটের অধীনে নেওয়া হয়। কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ বোর্ড ও পরিচালক পরিষদের পরিবর্তে লন্ডনে ভারতসচিব এবং তাকে সহায়তার জন্য ভারত পরিষদ গঠিত হয়। গভর্নর-জেনারেল একই সঙ্গে ভাইসরয় হিসেবে ব্রিটিশ সম্রাটের প্রতিনিধি হন। লর্ড ক্যানিং ছিলেন প্রথম ভাইসরয়।
১৮৫৮ সালের নভেম্বরে রানি ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্রে ভারতীয়দের ধর্মে হস্তক্ষেপ না করা, দেশীয় রাজাদের চুক্তি ও অধিকার রক্ষা, যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি চাকরির সুযোগ এবং নির্বিচার ভূখণ্ড দখল বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। স্বত্ববিলোপ নীতি কার্যত পরিত্যক্ত হয় এবং দত্তক উত্তরাধিকারীর অধিকার স্বীকৃত হয়। ব্রিটিশরা বুঝেছিল, দেশীয় রাজ্যগুলোকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার পরিবর্তে সাম্রাজ্যের অনুগত সহযোগী হিসেবে রাখা অধিক কার্যকর। ফলে হায়দরাবাদ, কাশ্মীর, গোয়ালিয়র ও অন্যান্য রাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে টিকে থাকলেও তাদের প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক সম্পর্ক ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে থাকে।
সেনাবাহিনীও পুনর্গঠন করা হয়। ভারতীয় ও ইউরোপীয় সৈন্যের অনুপাত পরিবর্তন করে ইউরোপীয় সেনার সংখ্যা বাড়ানো হয়। কামানবাহিনীর অধিকাংশ ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয় এবং একই জাতি, ধর্ম বা অঞ্চলের সিপাহিদের বড় আকারে একত্রিত না করার নীতি গ্রহণ করা হয়। পাঞ্জাবি, শিখ, গোর্খা ও পাঠানদের তথাকথিত “যোদ্ধা জাতি” হিসেবে বেশি নিয়োগ দেওয়া হতে থাকে। এই শ্রেণিবিন্যাস বৈজ্ঞানিক ছিল না; এটি ছিল আনুগত্যের ঔপনিবেশিক ধারণা এবং ভারতীয় সমাজের বিভাজনকে সামরিকভাবে ব্যবহারের কৌশল।
১৮৫৭ সালের পর ব্রিটিশ শাসন বাহ্যিকভাবে আরও সতর্ক হলেও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ শেষ হয়নি। ভূমি থেকে রাজস্ব আদায়, ভারতীয় কাঁচামাল রপ্তানি, ব্রিটিশ শিল্পপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং সাম্রাজ্যিক যুদ্ধের ব্যয় ভারতের ওপর চাপানো অব্যাহত থাকে। রেলপথ, টেলিগ্রাফ ও খাল নির্মিত হলেও সেগুলো প্রশাসন, সেনা চলাচল এবং বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের সাম্রাজ্যিক প্রয়োজনও পূরণ করত। একই সঙ্গে শাসক ও শাসিতের মধ্যে জাতিগত দূরত্ব বেড়ে যায় এবং উচ্চ সরকারি পদে ভারতীয়দের প্রবেশ সীমিত থাকে।
১৮৫৭ সালের ঘটনাকে “সিপাহী বিদ্রোহ”, “মহাবিদ্রোহ” অথবা “প্রথম স্বাধীনতাযুদ্ধ”—বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়। কোনো একক নাম ঘটনাটির সম্পূর্ণ বৈচিত্র্য ধারণ করতে পারে না। এটি সর্বভারতীয় আধুনিক জাতীয় আন্দোলন ছিল না, আবার কেবল কার্তুজ নিয়ে কয়েকজন সিপাহির বিদ্রোহও ছিল না। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ ভিন্ন উদ্দেশ্যে লড়েছিলেন—কেউ হারানো সিংহাসনের জন্য, কেউ জমির অধিকার, কেউ ধর্ম ও সামাজিক মর্যাদা, আবার কেউ বিদেশি শাসন উৎখাতের আশায়। তাদের লক্ষ্য এক না হলেও প্রতিপক্ষ ছিল একই ঔপনিবেশিক ক্ষমতা।
বিদ্রোহ সামরিকভাবে ব্যর্থ হলেও ভারতের শাসনব্যবস্থা মৌলিকভাবে বদলে দেয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রায় আড়াই শতাব্দীর অস্তিত্ব এবং এক শতাব্দীর ভূখণ্ড শাসনের অবসান ঘটে। তার জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রিটিশ রাজ, যেখানে ভারতের সম্পদ, সেনাবাহিনী ও প্রশাসন সরাসরি ব্রিটিশ রাষ্ট্রের সাম্রাজ্যিক নীতির অধীন হয়। একই সঙ্গে ১৮৫৭ সালের স্মৃতি পরবর্তী প্রজন্মের জাতীয়তাবাদীদের কাছে প্রতিরোধ, আত্মত্যাগ ও ঔপনিবেশিক শোষণের প্রতীকে পরিণত হয়। কোম্পানি বিদ্রোহ দমন করে ভারত ধরে রেখেছিল, কিন্তু সেই বিদ্রোহই দেখিয়ে দিয়েছিল যে ব্রিটিশ শাসন কখনোই চিরস্থায়ী বা প্রশ্নাতীত হতে পারে না।
কম্বোডিয়া ও লাওসে ভিয়েতনাম যুদ্ধ: গোপন বোমাবর্ষণ, হো চি মিন ট্রেইল ও লাম সন ৭১৯
নিক্সনের ভিয়েতনামাইজেশন: সেনা প্রত্যাহার, হ্যামবার্গার হিল ও দক্ষিণের যুদ্ধ
আমেরিকায় যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন: টেট, কেন্ট স্টেট ও পেন্টাগন পেপারসের প্রভাব
হুয়ে যুদ্ধ ও মাই লাই গণহত্যা: ভিয়েতনাম যুদ্ধের অন্ধকার অধ্যায়
হিরোশিমা-নাগাসাকি বিতর্ক ও উত্তরাধিকার: কীভাবে শুরু হয়েছিল পারমাণবিক অস্ত্রের যুগ?
হিরোশিমা ও নাগাসাকির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব: তেজস্ক্রিয়তা, ক্যানসার ও পুনর্গঠনের ইতিহাস