বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার: মহীশূর, মারাঠা ও শিখ শক্তির পতনের ইতিহাস

সিরিজ: ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার

ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার: মহীশূর, মারাঠা ও শিখ শক্তির পতনের ইতিহাস
মহীশূর, মারাঠা ও শিখ শক্তির পতনে ভারতে ব্রিটিশ আধিপত্যের বিস্তার

১৭৬৫ সালে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আর শুধু বিদেশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ছিল না। বাংলার বিপুল রাজস্ব তার হাতে এমন একটি স্থায়ী অর্থনৈতিক ভিত্তি তুলে দেয়, যার সাহায্যে কোম্পানি বিশাল সেনাবাহিনী রক্ষণাবেক্ষণ, নতুন যুদ্ধ পরিচালনা এবং পরাজিত ভারতীয় রাজ্যকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষমতা অর্জন করে। পরবর্তী প্রায় নব্বই বছরে যুদ্ধ, কূটনীতি, ঋণ, সহায়ক জোট, উত্তরাধিকারসংক্রান্ত হস্তক্ষেপ ও সরাসরি ভূখণ্ড দখলের মাধ্যমে কোম্পানি প্রায় পুরো ভারতীয় উপমহাদেশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। বাংলা থেকে সংগৃহীত অর্থ এবং ভারতীয় সিপাহিদের শক্তি ব্যবহার করেই ব্রিটিশরা একের পর এক ভারতীয় শক্তিকে পরাজিত করেছিল।

মুঘল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দুর্বল হওয়ার পর ভারত অসংখ্য স্বাধীন ও আধা-স্বাধীন শক্তিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। দক্ষিণে মহীশূর, পশ্চিম ও মধ্য ভারতে মারাঠা সংঘ, উত্তরে শিখ সাম্রাজ্য, দাক্ষিণাত্যে হায়দরাবাদ, পশ্চিমে সিন্ধু এবং উত্তর ভারতে আওধ গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ছিল। এসব রাজ্যের অনেকেরই দক্ষ সেনাবাহিনী, সমৃদ্ধ রাজস্বব্যবস্থা ও শক্তিশালী নেতৃত্ব ছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে স্থায়ী ঐক্যের অভাব, পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং উত্তরাধিকারসংক্রান্ত সংঘাত কোম্পানিকে এক পক্ষের বিরুদ্ধে অন্য পক্ষকে ব্যবহার করার সুযোগ দেয়। কোম্পানি সাধারণত একই সঙ্গে সব শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে পর্যায়ক্রমে প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিচ্ছিন্ন করত।

দক্ষিণ ভারতে কোম্পানির সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ ছিল মহীশূর। হায়দার আলী সেনাবাহিনী আধুনিকীকরণ করে এবং ফরাসি সামরিক জ্ঞান কাজে লাগিয়ে মহীশূরকে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন। প্রথম ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে ১৭৬৭ থেকে ১৭৬৯ সালের মধ্যে তিনি দ্রুত অগ্রসর হয়ে মাদ্রাজের কাছে পৌঁছে কোম্পানিকে সন্ধিতে বাধ্য করেন। দ্বিতীয় যুদ্ধে হায়দার আলী কর্ণাটকে প্রবল আক্রমণ চালান এবং পোলিলুরে কোম্পানির বাহিনীকে বিপর্যস্ত করেন। ১৭৮২ সালে তার মৃত্যুর পর ছেলে টিপু সুলতান যুদ্ধ চালিয়ে যান এবং ১৭৮৪ সালের ম্যাঙ্গালোর চুক্তিতে উভয় পক্ষ দখল করা ভূখণ্ড ফিরিয়ে দেয়। এটি ছিল শেষবারের মতো কোনো ভারতীয় শাসক কোম্পানির সঙ্গে তুলনামূলক সমতার ভিত্তিতে চুক্তি করতে পেরেছিলেন।

টিপু সুলতান প্রশাসন, কৃষি, বাণিজ্য ও সামরিক প্রযুক্তিতে সংস্কারের চেষ্টা করেন। মহীশূরের লৌহনলবিশিষ্ট রকেট ব্রিটিশ সৈন্যদের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। তিনি ফ্রান্স ও অন্যান্য বিদেশি শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে কোম্পানির বিরুদ্ধে বৃহত্তর প্রতিরোধ তৈরির চেষ্টা করেন। এই স্বাধীন কূটনীতি ব্রিটিশদের কাছে বিপজ্জনক মনে হয়। তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে কোম্পানি হায়দরাবাদের নিজাম ও মারাঠাদের সঙ্গে জোট করে টিপুকে পরাজিত করে। ১৭৯২ সালের শ্রীরঙ্গপত্তন চুক্তিতে তাকে রাজ্যের প্রায় অর্ধেক ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে এবং বিরাট ক্ষতিপূরণ দিতে হয়।

১৭৯৮ সালে গভর্নর-জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি ভারতে এসে ফরাসি প্রভাব নির্মূল এবং কোম্পানির পরোক্ষ শাসন বিস্তারের নীতি গ্রহণ করেন। ১৭৯৯ সালের চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে শ্রীরঙ্গপত্তন অবরোধ করা হয়। টিপু সুলতান দুর্গ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হন। মহীশূরের একাংশ কোম্পানি ও তার মিত্রদের মধ্যে ভাগ করা হয় এবং অবশিষ্ট অংশে পুরোনো ওয়াদিয়ার রাজবংশকে ফিরিয়ে এনে ব্রিটিশনির্ভর শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়। টিপুর পতনে দক্ষিণ ভারতে কোম্পানির সবচেয়ে শক্তিশালী স্বাধীন প্রতিদ্বন্দ্বীর অবসান ঘটে।

ওয়েলেসলির প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র ছিল সহায়ক জোট ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় কোনো ভারতীয় শাসককে নিজের রাজ্যে কোম্পানির সৈন্য রাখতে এবং সেই বাহিনীর ব্যয় বহন করতে হতো। বিনিময়ে কোম্পানি তাকে বাহ্যিক আক্রমণ থেকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিত। কিন্তু শাসক কোম্পানির অনুমতি ছাড়া অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ, সন্ধি বা কূটনৈতিক সম্পর্ক করতে পারতেন না। রাজদরবারে একজন ব্রিটিশ রেসিডেন্ট অবস্থান করতেন এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব বিস্তার করতেন। ব্যয় পরিশোধে ব্যর্থ হলে রাজ্যের ভূখণ্ড কোম্পানির হাতে চলে যেত। ফলে রাজা সিংহাসনে থাকলেও তার সামরিক ও বৈদেশিক স্বাধীনতা বিলুপ্ত হতো।

হায়দরাবাদ প্রথম গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোর একটি হিসেবে এই ব্যবস্থায় যুক্ত হয়। পরে আওধ, মহীশূর এবং বিভিন্ন মারাঠা শাসকের ওপরও এটি চাপিয়ে দেওয়া হয়। আওধের নবাবের কাছ থেকে ১৮০১ সালে রোহিলখণ্ড ও গঙ্গা-যমুনা দোয়াবের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড নেওয়া হয়, কারণ তিনি কোম্পানির বাহিনীর ব্যয় বহনে অক্ষম বলে দাবি করা হয়েছিল। সহায়ক জোট কোম্পানিকে সরাসরি প্রশাসনিক দায়িত্ব না নিয়েও ভারতীয় রাজ্যের রাজস্ব, পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয়। এটি ছিল এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে সুরক্ষার প্রতিশ্রুতিই ধীরে ধীরে সার্বভৌমত্ব হারানোর মাধ্যমে পরিণত হতো।

মহীশূরের পতনের পর কোম্পানির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল মারাঠা সংঘ। পেশোয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও সিন্ধিয়া, হোলকার, ভোঁসলে ও গায়কোয়াড়দের মতো প্রধান পরিবার নিজেদের অঞ্চল ও সেনাবাহিনী নিয়ে প্রায় স্বাধীনভাবে কাজ করত। ১৭৭৫ থেকে ১৭৮২ সালের প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধে কোম্পানি পেশোয়ার উত্তরাধিকার বিরোধে হস্তক্ষেপ করে, কিন্তু প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। ১৭৭৯ সালে ওয়াডগাঁওয়ে ব্রিটিশ বাহিনী অপমানজনকভাবে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। পরে সংঘর্ষ চললেও সালবাই চুক্তিতে মারাঠাদের ক্ষমতা অনেকাংশে অক্ষুণ্ণ থাকে।

মারাঠাদের ভেতরের বিভাজন দ্বিতীয় যুদ্ধে কোম্পানির সুযোগ সৃষ্টি করে। ১৮০২ সালে পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও প্রতিদ্বন্দ্বী হোলকারের কাছে পরাজিত হয়ে ব্রিটিশদের আশ্রয় নেন। বাসেইন চুক্তিতে তিনি সহায়ক জোট গ্রহণ করেন। মারাঠা প্রধানেরা এটিকে নিজেদের স্বাধীনতার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখেন। ১৮০৩ থেকে ১৮০৫ সালের যুদ্ধে আর্থার ওয়েলেসলি ও জেরার্ড লেকের বাহিনী সিন্ধিয়া ও ভোঁসলের বিরুদ্ধে আসাই, অরগাঁও ও লাসওয়ারির মতো যুদ্ধে জয়লাভ করে। দিল্লি কোম্পানির প্রভাবাধীন হয় এবং মুঘল সম্রাট কার্যত ব্রিটিশ সুরক্ষিত শাসকে পরিণত হন।

তৃতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের সময় কোম্পানি আরও সুসংগঠিত ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী ছিল। ১৮১৭ সালে পেশোয়া, নাগপুরের ভোঁসলে ও ইন্দোরের হোলকার পৃথকভাবে প্রতিরোধ করলেও তারা ঐক্যবদ্ধ অভিযান পরিচালনা করতে পারেননি। কিরকি, সীতাবলদি ও মাহিদপুরের যুদ্ধে পরাজয়ের পর ১৮১৮ সালে পেশোয়ার পদ বিলুপ্ত করা হয় এবং দ্বিতীয় বাজিরাওকে নির্বাসিত ভাতা দেওয়া হয়। সাতারা নামের সীমিত রাজ্য রেখে মারাঠা ভূখণ্ডের বড় অংশ কোম্পানির অধীনে নেওয়া হয়। মারাঠা শক্তির পতনের পর কোম্পানি উপমহাদেশের প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়।

উত্তর-পশ্চিমে পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। মহারাজা রণজিৎ সিং খালসা বাহিনীকে ইউরোপীয় প্রশিক্ষণ, আধুনিক কামান ও শক্তিশালী প্রশাসনের মাধ্যমে সুসংগঠিত করে পাঞ্জাবে শক্তিশালী শিখ সাম্রাজ্য গড়েছিলেন। ১৮০৯ সালের অমৃতসর চুক্তির মাধ্যমে কোম্পানি ও রণজিৎ সিং শতদ্রু নদীকে প্রভাবসীমার সীমানা হিসেবে মেনে নেন। জীবদ্দশায় তিনি ব্রিটিশদের পাঞ্জাব থেকে দূরে রাখতে সক্ষম হন। কিন্তু ১৮৩৯ সালে তার মৃত্যুর পর দ্রুত শাসক পরিবর্তন, দরবারের ষড়যন্ত্র এবং সেনাবাহিনীর ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ভূমিকা সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে তোলে।

১৮৪৫ সালে প্রথম ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধ শুরু হয়। মুডকি, ফিরোজশাহ, আলিওয়াল ও সোব্রাঁওয়ের যুদ্ধে শিখ সৈন্যরা প্রবল প্রতিরোধ গড়লেও নেতৃত্বের দুর্বলতা ও সন্দেহজনক আচরণ তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করে। ১৮৪৬ সালের লাহোর চুক্তিতে পাঞ্জাব ভূখণ্ড ও ক্ষতিপূরণ হারায় এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক মহারাজা দুলীপ সিংয়ের দরবারে ব্রিটিশ প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। কাশ্মীর গুলাব সিংয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ১৮৪৮ সালে মুলতানের বিদ্রোহ থেকে দ্বিতীয় ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধ শুরু হলে চিলিয়ানওয়ালায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর গুজরাটের যুদ্ধে শিখ বাহিনী চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়। ১৮৪৯ সালে পাঞ্জাব সরাসরি কোম্পানির সাম্রাজ্যে যুক্ত হয়।

পশ্চিম সীমান্তেও কোম্পানি সম্প্রসারিত হয়। আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা প্রথম ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধে ভয়াবহ বিপর্যয়ে শেষ হলেও ১৮৪৩ সালে চার্লস নেপিয়ারের বাহিনী মিয়ানির যুদ্ধে তালপুর আমিরদের পরাজিত করে সিন্ধু দখল করে। এই অভিযানের নৈতিক ও রাজনৈতিক যুক্তি তখনও ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল। সিন্ধু দখল কোম্পানিকে নিম্ন সিন্ধু নদ, আরব সাগরের বন্দর এবং উত্তর-পশ্চিমমুখী সামরিক যোগাযোগের ওপর নিয়ন্ত্রণ দেয়।

গভর্নর-জেনারেল লর্ড ডালহৌসি ১৮৪৮ থেকে ১৮৫৬ সালের মধ্যে সরাসরি ভূখণ্ড দখল আরও ত্বরান্বিত করেন। তার স্বত্ববিলোপ নীতি অনুযায়ী কোনো দেশীয় শাসক স্বাভাবিক পুরুষ উত্তরাধিকারী ছাড়া মারা গেলে দত্তক উত্তরাধিকারীকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বীকৃতি না দিয়ে রাজ্য কোম্পানির অধীনে নেওয়া হতো। সাতারা, ঝাঁসি, নাগপুর ও আরও কয়েকটি রাজ্য এই নীতিতে দখল করা হয়। যদিও ভারতীয় রাজপরিবারে দত্তক গ্রহণ স্বীকৃত ঐতিহ্য ছিল, কোম্পানি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য তা উপেক্ষা করে। এতে রাজপরিবার, অভিজাত, সেনাকর্মী ও তাদের ওপর নির্ভরশীল বহু মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জন্মায়।

১৮৫৬ সালে আওধকে স্বত্ববিলোপ নীতিতে নয়, কথিত কুশাসনের অভিযোগে দখল করা হয়। অথচ দীর্ঘদিন ধরে আওধ কোম্পানির মিত্র এবং তার সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগক্ষেত্র ছিল। নবাবকে অপসারণ, তালুকদারদের জমির অধিকার ক্ষুণ্ন এবং রাজদরবারনির্ভর মানুষের জীবিকা নষ্ট হওয়ায় অঞ্চলটিতে গভীর অসন্তোষ ছড়ায়। পরের বছর বিদ্রোহ শুরু হলে আওধ তার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। এতে বোঝা যায়, কোম্পানির সম্প্রসারণ শুধু রাজাদের ক্ষমতা কেড়ে নেয়নি; এটি ভূমি, চাকরি ও সামাজিক মর্যাদার বিস্তৃত কাঠামোও ভেঙে দিয়েছিল।

কোম্পানির সাফল্যের পেছনে শুধু উন্নত অস্ত্র ছিল না। ভারতীয় রাজস্বে পরিচালিত বিশাল সিপাহি বাহিনী, নিয়মিত বেতন, দক্ষ কামান, সামুদ্রিক যোগাযোগ, ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীদের ঋণ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী রাজ্যগুলোর বিভাজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। অনেক ভারতীয় শাসক নিজেদের প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে কোম্পানির সাহায্য নিয়েছিলেন; পরে সেই কোম্পানিই তাদের স্বাধীনতা সীমিত করেছে। পরাজিত রাজ্যের অর্থ ও সৈন্য আবার পরবর্তী রাজ্য দখলে ব্যবহার করা হয়েছে। কোম্পানির সাম্রাজ্য ছিল ভারতীয় সম্পদে অর্থায়িত এবং প্রধানত ভারতীয় সৈন্যের মাধ্যমে নির্মিত একটি ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা।

১৮৫৬ সালের মধ্যে কোম্পানি বাংলা, উত্তর ভারত, পাঞ্জাব, সিন্ধু, দাক্ষিণাত্য ও ভারতের বৃহৎ অংশ সরাসরি শাসন করছিল। হায়দরাবাদ, মহীশূর ও বিভিন্ন দেশীয় রাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে টিকে থাকলেও তাদের বৈদেশিক নীতি ও প্রতিরক্ষা ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। তবে এই দ্রুত সম্প্রসারণ স্থিতিশীলতা আনেনি। দখল করা রাজ্যের অভিজাত, ভূমির মালিক, কৃষক, কারিগর ও সিপাহিদের মধ্যে জমে থাকা অসন্তোষ ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে বিস্ফোরিত হয়। মহীশূর, মারাঠা ও শিখ শক্তিকে পরাজিত করে কোম্পানি প্রায় পুরো উপমহাদেশ দখল করেছিল, কিন্তু সেই জয়ের পদ্ধতিই তার শাসনের বিরুদ্ধে বৃহত্তম বিদ্রোহের ভিত্তি তৈরি করেছিল।


আপনার পছন্দ হতে পারে