বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

এমেলিন প্যাঙ্কহার্স্ট: ব্রিটিশ নারীদের ভোটাধিকারের জন্য যে নারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন

সিরিজ: ইতিহাস বদলে দেওয়া নারীরা

এমেলিন প্যাঙ্কহার্স্ট: ব্রিটিশ নারীদের ভোটাধিকারের জন্য যে নারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন
ভোটাধিকারের দাবিতে ব্রিটিশ রাষ্ট্রের দমননীতিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন এমেলিন প্যাঙ্কহার্স্ট

বিশ শতকের শুরুর লন্ডনে নারীর ভোটাধিকারের দাবিতে একটি সভা বা মিছিল থেকে গ্রেপ্তার হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। কোনো নারী সংসদের সামনে প্রতিবাদ করছেন, পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তির পর তাঁকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কারাগারে তিনি অনশন শুরু করছেন, তারপর কর্তৃপক্ষ তাঁর শরীরে জোর করে খাবার প্রবেশ করাচ্ছে—ব্রিটিশ রাজনীতিতে এমন দৃশ্য একসময় নিয়মিত সংবাদে পরিণত হয়েছিল। এই সংঘাতের কেন্দ্রে থাকা সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর একটি ছিল এমেলিন প্যাঙ্কহার্স্ট। তাঁর নেতৃত্বে নারী ভোটাধিকারের আন্দোলনের একটি অংশ আবেদন ও শান্তিপূর্ণ প্রচারের সীমা অতিক্রম করে সরাসরি রাজনৈতিক সংঘাতের পথে যায়।

এমেলিন প্যাঙ্কহার্স্টের জন্ম ১৮৫৮ সালের ১৫ জুলাই, ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে এমেলিন গোল্ডেন নামে। তাঁর পরিবার রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিল এবং দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলন ও নারী অধিকারের মতো সংস্কারমূলক চিন্তার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। শিল্পবিপ্লবের অন্যতম প্রধান শহর ম্যানচেস্টারে বেড়ে ওঠার কারণে তিনি একই সঙ্গে শিল্পসমৃদ্ধি, শ্রমিকজীবনের কঠোর বাস্তবতা এবং সামাজিক বৈষম্য দেখতে পান।

তৎকালীন ব্রিটেনে নারীর রাজনৈতিক অবস্থান ছিল অত্যন্ত সীমিত। উনিশ শতকে বিবাহিত নারীর সম্পত্তি ও আইনি পরিচয়ের ওপর বহু বিধিনিষেধ ছিল। ধারাবাহিক সংস্কারে এসব ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন এলেও পার্লামেন্ট নির্বাচনে নারীরা ভোট দিতে পারতেন না। রাষ্ট্রের আইন মেনে চলা, কর দেওয়া এবং সমাজের দায়িত্ব বহন করলেও জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণে তাঁদের সরাসরি কণ্ঠ ছিল না।

১৮৭৯ সালে এমেলিন রিচার্ড প্যাঙ্কহার্স্টকে বিয়ে করেন। রিচার্ড ছিলেন আইনজীবী এবং নারী অধিকারের সমর্থক। নারীর সম্পত্তির অধিকার ও ভোটাধিকারসংক্রান্ত সংস্কারের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল। তাঁদের রাজনৈতিক অংশীদারত্ব এমেলিনের ভবিষ্যৎ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

তাঁদের পাঁচ সন্তান ছিল—ক্রিস্টাবেল, এস্টেল সিলভিয়া, ফ্রান্সিস হেনরি, অ্যাডেলা এবং হেনরি ফ্রান্সিস। সন্তানদের মধ্যে বিশেষ করে ক্রিস্টাবেল ও সিলভিয়া প্যাঙ্কহার্স্ট পরবর্তী সময়ে নারী ভোটাধিকার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তবে প্যাঙ্কহার্স্ট পরিবারকে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক পরিবার হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সময়ের সঙ্গে মা ও কন্যাদের মধ্যে কৌশল, শ্রেণি এবং রাজনীতি নিয়ে গভীর মতবিরোধ তৈরি হয়।

এমেলিন প্রথমদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নারী ভোটাধিকার সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৮৮৯ সালে তিনি ও রিচার্ড উইমেন্স ফ্র্যাঞ্চাইজ লীগ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। সংগঠনটি বিবাহিত নারীদের ভোটাধিকারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক অধিকারের দাবি তুলেছিল।

কিন্তু আন্দোলনের গতি এমেলিনকে সন্তুষ্ট করতে পারছিল না। বছরের পর বছর সভা, আবেদন, সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা এবং আইন পরিবর্তনের চেষ্টা চললেও পার্লামেন্টে নারীর ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল না। এই হতাশাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে আরও সংঘাতমুখী কৌশলের দিকে নিয়ে যায়।

এর মধ্যে ১৮৯৮ সালে রিচার্ড প্যাঙ্কহার্স্ট মারা যান। স্বামীর মৃত্যু এমেলিনের ব্যক্তিগত জীবনে বড় আঘাত হলেও রাজনৈতিক কাজ থেকে তিনি সরে যাননি। বরং পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে তিনি এমন একটি সংগঠন তৈরি করেন, যা ব্রিটিশ রাজনীতিকে প্রবলভাবে আলোড়িত করবে।

১৯০৩ সালের ১০ অক্টোবর ম্যানচেস্টারে এমেলিন প্যাঙ্কহার্স্ট উইমেন্স সোশ্যাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল ইউনিয়ন বা WSPU প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটির সদস্যপদ নারীদের জন্য নির্ধারিত ছিল এবং এর প্রধান লক্ষ্য ছিল সংসদীয় নির্বাচনে নারীর ভোটাধিকার অর্জন।

WSPU-র সঙ্গে যে স্লোগানটি সবচেয়ে বেশি যুক্ত হয়ে যায় তা হলো—“Deeds, not words”, অর্থাৎ কথার পরিবর্তে কাজ। এর পেছনের যুক্তি ছিল সহজ: বহু বছর ধরে ভদ্র ও সাংবিধানিক উপায়ে আবেদন করা হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্র নারীর দাবি উপেক্ষা করেছে। তাই সরকারকে এমন রাজনৈতিক চাপের মুখে ফেলতে হবে, যা উপেক্ষা করা সম্ভব হবে না।

এখানে ব্রিটিশ ভোটাধিকার আন্দোলনের দুটি শব্দের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। “Suffragist” শব্দটি সাধারণভাবে নারী ভোটাধিকারের সমর্থকদের বোঝাতে ব্যবহৃত হতো এবং মিলিসেন্ট ফসেটের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব উইমেন্স সাফ্রেজ সোসাইটিজ মূলত সাংবিধানিক ও অহিংস পদ্ধতি অনুসরণ করত। অন্যদিকে “Suffragette” শব্দটি বিশেষভাবে WSPU-র মতো অধিক সংঘাতমুখী কর্মীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

১৯০৫ সালে আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়। ক্রিস্টাবেল প্যাঙ্কহার্স্ট এবং শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনকর্মী অ্যানি কেনি ম্যানচেস্টারে একটি রাজনৈতিক সভায় নারীর ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং প্রতিবাদের পর গ্রেপ্তার হন। তাঁরা জরিমানা দেওয়ার পরিবর্তে কারাগারে যাওয়ার পথ বেছে নেন।

ঘটনাটি ব্যাপক সংবাদ তৈরি করে। WSPU বুঝতে পারে, গ্রেপ্তার ও কারাবরণকে রাজনৈতিক প্রচারের অস্ত্রে পরিণত করা সম্ভব। পরবর্তী বছরগুলোতে এই কৌশল আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।

এমেলিন নিজেও বারবার গ্রেপ্তার হন। WSPU সদস্যরা পার্লামেন্টে প্রবেশের চেষ্টা, রাজনৈতিক সভায় বাধা সৃষ্টি, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ এবং পুলিশের নির্দেশ অমান্য করার মতো কার্যক্রমে অংশ নিতেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল নারীর ভোটাধিকারের প্রশ্নকে এমনভাবে জনজীবনে উপস্থিত রাখা, যাতে সরকার সেটিকে সহজে এড়িয়ে যেতে না পারে।

১৯০৮ সালে লন্ডনের হাইড পার্কে বিশাল নারী ভোটাধিকার সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। হাজার হাজার মানুষ এতে অংশ নেন। WSPU ধীরে ধীরে অত্যন্ত দক্ষ প্রচারণা সংগঠনে পরিণত হয়। তাদের নিজস্ব রং—বেগুনি, সাদা ও সবুজ—রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। পোস্টার, ব্যাজ, ব্যানার, সংবাদপত্র এবং জনসভা ব্যবহার করে তারা আধুনিক রাজনৈতিক প্রচারের অনেক কার্যকর কৌশল প্রয়োগ করেছিল।

কিন্তু সরকারের অবস্থান সহজে বদলায়নি। ফলে আন্দোলনের কৌশলও ক্রমে কঠোর হয়।

১৯১০ সালের ১৮ নভেম্বর নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে ব্ল্যাক ফ্রাইডে নামে পরিচিত একটি ঘটনা ঘটে। একটি ভোটাধিকার বিলের অগ্রগতি থেমে যাওয়ার পর শত শত নারী পার্লামেন্টের দিকে মিছিল করেন। পুলিশ তাঁদের বাধা দেয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে সংঘর্ষ চলে। বহু নারী অভিযোগ করেন যে পুলিশ তাঁদের ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করেছে। অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়।

এই ঘটনার পর রাষ্ট্র ও সাফ্রাজেটদের সম্পর্ক আরও সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে।

WSPU-র কিছু সদস্য এরপর জানালা ভাঙা, ডাকবাক্সে আগুন লাগানো, খালি ভবন ও সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ এবং যোগাযোগব্যবস্থায় ক্ষতিসাধনের মতো কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। আন্দোলনের নেতৃত্ব সাধারণত মানুষের প্রাণহানি এড়ানোর কথা বললেও এই কর্মকাণ্ড বিপজ্জনক ছিল এবং তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল।

এমেলিন প্যাঙ্কহার্স্ট এই ক্রমবর্ধমান মিলিট্যান্সির রাজনৈতিক যুক্তি প্রকাশ্যে সমর্থন করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, রাষ্ট্র যদি শান্তিপূর্ণ দাবি উপেক্ষা করে এবং নারীদের রাজনৈতিক নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত রাখে, তাহলে সম্পত্তির বিরুদ্ধে আক্রমণ রাজনৈতিক চাপ তৈরির একটি উপায় হতে পারে।

কিন্তু এই কৌশল নারী ভোটাধিকারের সমর্থকদের মধ্যেই ঐকমত্য তৈরি করেনি। মিলিসেন্ট ফসেটের মতো সাংবিধানিক সাফ্রাজিস্টরা মনে করতেন, সহিংস বা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড আন্দোলনের জনসমর্থন ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ফলে ব্রিটিশ নারী ভোটাধিকার আন্দোলনকে শুধু প্যাঙ্কহার্স্ট বা WSPU-র আন্দোলন হিসেবে দেখা ঐতিহাসিকভাবে ভুল।

সংঘাতের আরেকটি ভয়াবহ ক্ষেত্র ছিল কারাগার।

গ্রেপ্তার হওয়া সাফ্রাজেটরা নিজেদের সাধারণ অপরাধী নয়, রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি করতেন। সেই দাবি প্রত্যাখ্যাত হলে অনেকেই কারাগারে অনশন শুরু করেন। সরকার প্রথমদিকে অনশনকারীদের মুক্তি দেওয়ার পরিবর্তে জোর করে খাওয়ানোর পদ্ধতি গ্রহণ করে।

নারীদের ধরে রেখে নাক বা মুখ দিয়ে নল প্রবেশ করিয়ে তরল খাদ্য দেওয়া হতো। এই জোরপূর্বক খাদ্য প্রদান অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক এবং চিকিৎসাগতভাবে বিপজ্জনক হতে পারত। ঘটনাগুলোর বিবরণ জনসমক্ষে আসার পর সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়।

অনশন আন্দোলনের একটি কার্যকর রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়। কারাগারে একজন নারী গুরুতর অসুস্থ হয়ে মারা গেলে সরকার রাজনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হতে পারত; আবার তাঁকে নিঃশর্ত মুক্তি দিলে আন্দোলনকারীদের কাছে রাষ্ট্র দুর্বল বলে মনে হতে পারত।

এই সংকট মোকাবিলায় ১৯১৩ সালে Prisoners (Temporary Discharge for Ill Health) Act পাস করা হয়। সমালোচকেরা একে ব্যঙ্গ করে “Cat and Mouse Act” নামে ডাকতে শুরু করেন।

এর পদ্ধতি ছিল নির্মমভাবে কার্যকর। অনশন করে কোনো বন্দী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে সাময়িকভাবে মুক্তি দেওয়া হতো। বাইরে সুস্থ হয়ে উঠলে তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করে বাকি সাজা ভোগ করানো যেত। বিড়াল যেমন ইঁদুরকে ছেড়ে আবার ধরে—সেখান থেকেই জনপ্রিয় নামটির উৎপত্তি।

এমেলিন নিজেও এই গ্রেপ্তার, অনশন, মুক্তি এবং পুনরায় গ্রেপ্তারের চক্রের মধ্যে পড়েছিলেন। তাঁর শরীর দুর্বল হয়ে গেলেও রাজনৈতিক সংঘাত থামেনি।

১৯১৩ সালের ৪ জুন আন্দোলনের সবচেয়ে বিখ্যাত ও মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি ঘটে। সাফ্রাজেট এমিলি ওয়াইল্ডিং ডেভিসন এপসম ডার্বির সময় রাজা পঞ্চম জর্জের ঘোড়া আনমারের সামনে ট্র্যাকে প্রবেশ করেন। ঘোড়ার সঙ্গে সংঘর্ষে তিনি গুরুতর আহত হন এবং কয়েক দিন পর মারা যান।

তাঁর উদ্দেশ্য ঠিক কী ছিল—আত্মহত্যা, ঘোড়ায় সাফ্রাজেট পতাকা লাগানোর চেষ্টা, নাকি অন্য ধরনের প্রতিবাদ—তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। তাই ঘটনাটিকে নিশ্চিতভাবে পরিকল্পিত আত্মাহুতি বলা ঠিক নয়। কিন্তু তাঁর মৃত্যু নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়।

১৯১৩ সালেই এমেলিন প্যাঙ্কহার্স্ট “Freedom or Death” নামে পরিচিত তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা যুক্তরাষ্ট্রে দেন। সেখানে তিনি ব্রিটিশ সাফ্রাজেটদের সংগ্রামকে একটি রাজনৈতিক যুদ্ধ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল যুক্তি ছিল—যাদের আইন তৈরিতে কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই, তাদের কাছে রাষ্ট্রের আইন অন্ধ আনুগত্য দাবি করতে পারে না।

কিন্তু ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।

এমেলিন ও ক্রিস্টাবেল প্যাঙ্কহার্স্ট WSPU-র মিলিট্যান্ট ভোটাধিকার কার্যক্রম স্থগিত করেন এবং ব্রিটিশ যুদ্ধপ্রচেষ্টাকে সমর্থন করতে শুরু করেন। সরকারও WSPU বন্দীদের মুক্তি দেয়। প্যাঙ্কহার্স্ট নারীদের শিল্পকারখানা, যুদ্ধসংশ্লিষ্ট উৎপাদন এবং অন্যান্য জাতীয় কাজে অংশ নিতে উৎসাহিত করেন।

এই অবস্থান আবারও বিতর্ক সৃষ্টি করে। সিলভিয়া প্যাঙ্কহার্স্ট যুদ্ধের বিরোধিতা করেন এবং শ্রমিকশ্রেণির নারী ও সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে নিজের কাজ চালিয়ে যান। মা ও মেয়ের রাজনৈতিক সম্পর্ক ক্রমে ভেঙে পড়ে। অ্যাডেলা প্যাঙ্কহার্স্টের সঙ্গেও এমেলিনের সম্পর্ক দূরত্বপূর্ণ হয়ে যায়।

এই পারিবারিক বিভাজন দেখায় যে ‘প্যাঙ্কহার্স্ট’ নামের আড়ালে আসলে একাধিক ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শন ছিল। এমেলিন ও ক্রিস্টাবেল ক্রমে জাতীয়তাবাদী ও যুদ্ধসমর্থক অবস্থানে যান; সিলভিয়া শ্রমিকশ্রেণি, সমাজতন্ত্র ও যুদ্ধবিরোধী রাজনীতির দিকে এগিয়ে যান।

যুদ্ধ ব্রিটিশ সমাজে নারীর ভূমিকার দৃশ্যমানতাও পরিবর্তন করে। বিপুলসংখ্যক পুরুষ সেনাবাহিনীতে চলে যাওয়ায় নারীরা অস্ত্র ও গোলাবারুদ কারখানা, পরিবহন, কৃষি, প্রশাসন, চিকিৎসাসেবা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে কাজ করেন। তবে নারীরা যুদ্ধের সময় কাজ করেছেন বলেই হঠাৎ ভোটাধিকার ‘উপহার’ দেওয়া হয়েছিল—এমন ব্যাখ্যা অতিসরল।

যুদ্ধকালীন অবদান গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল, কিন্তু তার আগে কয়েক দশক ধরে সাফ্রাজিস্ট ও সাফ্রাজেটদের আন্দোলন, সামাজিক পরিবর্তন এবং পুরুষদের ভোটাধিকারব্যবস্থা সংস্কারের বৃহত্তর প্রয়োজন—সব মিলিয়েই পরিবর্তন আসে।

১৯১৮ সালের Representation of the People Act ব্রিটিশ নির্বাচনী ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তন আনে। এর মাধ্যমে ২১ বছরের বেশি বয়সী অধিকাংশ পুরুষ ভোটাধিকার পান। নারীদের ক্ষেত্রে ভোটাধিকার দেওয়া হয় ৩০ বছরের বেশি বয়সী নির্দিষ্ট সম্পত্তিগত বা অন্যান্য যোগ্যতা পূরণকারী নারীদের

ফলে এটি নারী-পুরুষের পূর্ণ রাজনৈতিক সমতা ছিল না। একজন ২৫ বছর বয়সী পুরুষ ভোট দিতে পারতেন, কিন্তু একই বয়সী নারী পারতেন না। তবু প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক নারী আইনগত ভোটাধিকার অর্জন করেন।

একই বছরে Parliament (Qualification of Women) Act 1918 নারীদের হাউস অব কমন্সে নির্বাচিত হওয়ার পথও খুলে দেয়। ব্রিটিশ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নারীর উপস্থিতির ক্ষেত্রে এটি আরেকটি মৌলিক পরিবর্তন ছিল।

কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়—এই বিজয়ের কৃতিত্ব কতটা এমেলিন প্যাঙ্কহার্স্ট এবং WSPU-র?

এর সহজ উত্তর নেই।

প্যাঙ্কহার্স্টের মিলিট্যান্ট আন্দোলন নারী ভোটাধিকারের প্রশ্নকে সংবাদমাধ্যম ও জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে রাখতে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিল। সরকার আর সহজে বিষয়টি উপেক্ষা করতে পারছিল না। কারাবরণ, অনশন এবং জোরপূর্বক খাদ্য প্রদানের ঘটনা রাষ্ট্রের আচরণ নিয়ে নৈতিক প্রশ্ন তুলেছিল।

অন্যদিকে মিলিসেন্ট ফসেটের নেতৃত্বাধীন সাংবিধানিক আন্দোলন বহু বছর ধরে শান্তিপূর্ণভাবে জনসমর্থন, সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক এবং সংসদীয় সমর্থন গড়ে তুলেছিল। শ্রমিকশ্রেণির নারীদের নিজস্ব আন্দোলনও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ফলে ১৯১৮ সালের পরিবর্তনকে কোনো এক নারী, একটি সংগঠন বা একটি কৌশলের সরাসরি ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না।

এমেলিনের রাজনৈতিক জীবনও ১৯১৮ সালের পর শেষ হয়নি। তাঁর অবস্থান সময়ের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়। যুদ্ধোত্তর বছরগুলোতে তিনি বলশেভিক বিপ্লব ও কমিউনিজমের তীব্র বিরোধী হয়ে ওঠেন এবং শেষ জীবনে কনজারভেটিভ পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। এটি তাঁর প্রারম্ভিক রাজনৈতিক জীবনের কিছু জোট ও সামাজিক সংস্কারমূলক অবস্থানের তুলনায় বড় পরিবর্তন।

তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ে ব্রিটিশ নারীর ভোটাধিকারের সবচেয়ে বড় অসমতাটি তখনও রয়ে গিয়েছিল—পুরুষ ও নারী একই বয়সে এবং একই শর্তে ভোট দিতে পারতেন না।

শেষ পর্যন্ত Equal Franchise Act 1928 সেই বৈষম্য দূর করে। এর মাধ্যমে ২১ বছর বয়স থেকে নারীরা পুরুষদের সমান শর্তে ভোটাধিকার লাভ করেন এবং লক্ষ লক্ষ নতুন নারী ভোটার নির্বাচনী ব্যবস্থায় যুক্ত হন।

কিন্তু এমেলিন প্যাঙ্কহার্স্ট সেই মুহূর্তটি দেখে যেতে পারেননি।

১৯২৮ সালের ১৪ জুন, ৬৯ বছর বয়সে তিনি মারা যান। মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর, ২ জুলাই ১৯২৮, Equal Franchise Act রাজকীয় অনুমোদন লাভ করে। যে পূর্ণ রাজনৈতিক সমতার জন্য তাঁর জীবনের বড় অংশ ব্যয় হয়েছিল, সেটি আইন হওয়ার একেবারে দ্বারপ্রান্তে এসে তাঁর জীবন শেষ হয়।

এমেলিন প্যাঙ্কহার্স্টের উত্তরাধিকার তাই একই সঙ্গে শক্তিশালী ও বিতর্কিত। তিনি নিঃসন্দেহে ব্রিটিশ নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের সবচেয়ে পরিচিত নেতাদের একজন। তিনি এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করতে সাহায্য করেছিলেন যেখানে নারীর ভোটাধিকারের প্রশ্নকে উপেক্ষা করার রাজনৈতিক মূল্য ক্রমশ বাড়তে থাকে।

কিন্তু তাঁর ব্যবহৃত কৌশল নিয়ে তখনও বিতর্ক ছিল, আজও রয়েছে। সম্পত্তি ধ্বংস, অগ্নিসংযোগ এবং রাজনৈতিক সংঘাত কি ভোটাধিকারের আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছিল, নাকি সম্ভাব্য সমর্থকদের দূরে সরিয়ে দিয়েছিল—ইতিহাসবিদদের মধ্যে এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। একইভাবে WSPU-র কেন্দ্রীভূত নেতৃত্ব, শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতা এবং প্যাঙ্কহার্স্ট পরিবারের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বও তাঁর ইতিহাসের অংশ।

তাঁকে বুঝতে হলে তাই শুধু একজন বীর নারী অথবা শুধু একজন উগ্র আন্দোলনকারী—কোনো একটি সরল পরিচয়ে আটকে রাখা যায় না। তিনি এমন একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন, যিনি মনে করেছিলেন রাষ্ট্র যখন দীর্ঘদিন শান্তিপূর্ণ আবেদন উপেক্ষা করে, তখন আন্দোলনকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে যেখানে রাষ্ট্রকে প্রতিক্রিয়া জানাতেই হবে। সেই সিদ্ধান্ত ব্রিটিশ নারী আন্দোলনকে আরও দৃশ্যমান করেছিল, আবার একই সঙ্গে তীব্র বিতর্ক ও সংঘাতও সৃষ্টি করেছিল।

এমেলিন প্যাঙ্কহার্স্ট একা ব্রিটিশ নারীদের ভোটাধিকার এনে দেননি। তাঁর আগে ও পাশাপাশি হাজার হাজার নারী দীর্ঘদিন ধরে সংগঠন, আবেদন, জনসভা, শ্রমিক আন্দোলন, সংসদীয় প্রচার এবং নাগরিক প্রতিবাদের মাধ্যমে একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছিলেন। কিন্তু প্যাঙ্কহার্স্ট সেই সংগ্রামের একটি পর্যায়কে এতটাই তীব্র করে তুলেছিলেন যে নারীকে রাজনৈতিক নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্ন ব্রিটিশ রাষ্ট্রের জন্য আর সহজে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার বিষয় থাকেনি।

১৯০৩ সালে ম্যানচেস্টারের একটি ছোট রাজনৈতিক সংগঠন থেকে শুরু হওয়া তাঁর আন্দোলন কারাগার, অনশন, পুলিশি দমন, যুদ্ধ এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পর যখন ব্রিটিশ নারী ও পুরুষ সমান শর্তে ভোট দেওয়ার অধিকার পেলেন, তখন একটি যুগের সমাপ্তি ঘটে। যে নারী একসময় ভোটাধিকারের দাবিতে রাষ্ট্রের আইন ভেঙে কারাগারে গিয়েছিলেন, তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে সেই রাষ্ট্রই নারীর সমান রাজনৈতিক নাগরিকত্বকে আইনের অংশ করতে বাধ্য হয়েছিল।


আপনার পছন্দ হতে পারে