বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যানটন: নারীর ভোটাধিকারের আন্দোলন যেভাবে বদলে দিয়েছিল আমেরিকা

সিরিজ: ইতিহাস বদলে দেওয়া নারীরা

এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যানটন: নারীর ভোটাধিকারের আন্দোলন যেভাবে বদলে দিয়েছিল আমেরিকা
নারীর ভোটাধিকারকে আমেরিকার জাতীয় রাজনৈতিক দাবিতে পরিণত করেছিলেন এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যানটন

আজকের যুক্তরাষ্ট্রে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন—বিষয়টি এতটাই স্বাভাবিক যে এর পেছনে প্রায় এক শতাব্দীব্যাপী সংগ্রামের ইতিহাস সহজেই চোখ এড়িয়ে যায়। কিন্তু উনিশ শতকের মাঝামাঝি আমেরিকায় নারীরা শুধু ভোটাধিকার থেকেই বঞ্চিত ছিলেন না; বিবাহ, সম্পত্তি, পেশা, উচ্চশিক্ষা এবং আইনি পরিচয়ের ক্ষেত্রেও তাঁদের ওপর ছিল বিস্তর সীমাবদ্ধতা। এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যে নারীরা প্রথম সংগঠিতভাবে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তাঁদের অন্যতম প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক কণ্ঠ ছিলেন এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যানটন। ১৮৪৮ সালের সেনেকা ফলস সম্মেলন থেকে শুরু করে প্রায় অর্ধশতাব্দীর আন্দোলনে তিনি নারীর ভোটাধিকারকে আমেরিকার রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

এলিজাবেথ ক্যাডির জন্ম ১৮১৫ সালের ১২ নভেম্বর, নিউইয়র্কের জনস্টাউনে। তাঁর বাবা ড্যানিয়েল ক্যাডি ছিলেন আইনজীবী এবং পরে বিচারক। পরিবারের আইনসংক্রান্ত পরিবেশ ছোটবেলা থেকেই এলিজাবেথকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার মুখোমুখি করেছিল—আইন নারী ও পুরুষকে সমানভাবে দেখত না। বিবাহিত নারীর সম্পত্তি, উপার্জন এবং সন্তানের ওপর অধিকার অত্যন্ত সীমিত হতে পারত। বাবার আইনের বই এবং তাঁর কার্যালয়ের আলোচনা শুনতে শুনতে এলিজাবেথ বুঝতে শুরু করেন যে নারীর অধীনতা শুধু সামাজিক রীতির ফল নয়; আইনও সেই বৈষম্যকে শক্তিশালী করছিল।

তাঁর পরিবার তাঁকে শিক্ষার সুযোগ দিয়েছিল, কিন্তু এখানেও তিনি নারী হওয়ার সীমা অনুভব করেন। ছেলেদের জন্য উচ্চশিক্ষার যে পথ খোলা ছিল, নারীদের জন্য তা ছিল অনেক সংকীর্ণ। তিনি ট্রয় ফিমেল সেমিনারিতে পড়াশোনা করেন। মেধা থাকা সত্ত্বেও শুধু লিঙ্গের কারণে একজন নারীর শিক্ষা ও পেশার সুযোগ সীমিত হওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

১৮৪০ সালে তিনি হেনরি ব্রুস্টার স্ট্যানটনকে বিয়ে করেন। হেনরি ছিলেন দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিয়ের সময় এলিজাবেথ প্রচলিত বিবাহের শপথে স্বামীর প্রতি “obey” বা আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানান। ঘটনাটি ছোট মনে হলেও তাঁর ভবিষ্যৎ দর্শনের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক ছিল—বিবাহ তাঁর কাছে একজন নারীর ব্যক্তিসত্তা বিলীন করে দেওয়ার প্রতিষ্ঠান হওয়া উচিত নয়।

বিয়ের পর তাঁরা লন্ডনে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ডস অ্যান্টি-স্লেভারি কনভেনশনে যান। সেখানে এলিজাবেথের পরিচয় হয় অভিজ্ঞ দাসপ্রথাবিরোধী কর্মী লুক্রেশিয়া মটের সঙ্গে। সম্মেলনে নারী প্রতিনিধিদের পূর্ণাঙ্গ অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া হয়েছিল। দাসত্বের মতো অন্যায়ের বিরুদ্ধে আয়োজিত একটি সম্মেলনেই নারীদের সমান অংশগ্রহণ অস্বীকার করা—এই বৈপরীত্য স্ট্যানটন ও মটকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাঁরা ভবিষ্যতে নারীর অধিকার নিয়ে একটি সম্মেলন আয়োজনের কথা আলোচনা করেন।

সেই পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নিতে আট বছর সময় লাগে।

১৮৪৭ সালে স্ট্যানটন পরিবার সেনেকা ফলস, নিউইয়র্কে বসবাস শুরু করে। সাত সন্তানের মা হিসেবে গৃহস্থালি ও সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব তাঁর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি অনুভব করছিলেন, শিক্ষিত ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন হওয়া সত্ত্বেও একজন নারী হিসেবে তাঁর জীবন সামাজিক নিয়মের সংকীর্ণ সীমার মধ্যে আবদ্ধ।

১৮৪৮ সালের জুলাই মাসে স্ট্যানটন, লুক্রেশিয়া মট, মার্থা কফিন রাইট, মেরি অ্যান ম্যাকক্লিনটক এবং জেন হান্ট নারীর সামাজিক, নাগরিক ও ধর্মীয় অবস্থান নিয়ে একটি সম্মেলন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন। অল্প সময়ের প্রস্তুতিতে ১৯ ও ২০ জুলাই ১৮৪৮ সেনেকা ফলসের ওয়েসলিয়ান চ্যাপেলে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তিন শতাধিক মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন।

এই সম্মেলনের জন্য তৈরি করা হয় ইতিহাসখ্যাত ডিক্লারেশন অব সেন্টিমেন্টস। দলিলটি তৈরিতে স্ট্যানটন কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন। মার্কিন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ভাষাকে আদর্শ হিসেবে ব্যবহার করে এতে ঘোষণা করা হয়—নারী ও পুরুষ সমানভাবে সৃষ্টি হয়েছে। এরপর একে একে দেখানো হয়, আমেরিকান সমাজ ও আইন কীভাবে নারীদের সেই ঘোষিত সমতা থেকে বঞ্চিত করছে।

অভিযোগের তালিকা ছিল বিস্তৃত। নারীর ভোটাধিকার নেই, বিবাহিত নারীর সম্পত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ সীমিত, অনেক লাভজনক পেশায় প্রবেশের সুযোগ নেই, উচ্চশিক্ষার পথ সংকুচিত, বিবাহ ও বিচ্ছেদের আইনে বৈষম্য রয়েছে এবং ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানেও পুরুষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত—এসব প্রশ্ন দলিলটিতে তুলে ধরা হয়েছিল। অর্থাৎ সেনেকা ফলসের দাবি শুধু “নারীদের ভোট দিতে হবে” এতটুকু ছিল না; এর কেন্দ্রে ছিল নারীকে স্বাধীন নাগরিক ও ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বৃহত্তর দাবি।

তবে ভোটাধিকারের প্রস্তাবটিই ছিল সম্মেলনের সবচেয়ে বিতর্কিত দাবিগুলোর একটি। এমনকি নারী অধিকারের প্রতি সহানুভূতিশীল অনেকের কাছেও নারীর ভোট দেওয়ার দাবি তখন অত্যন্ত র‍্যাডিক্যাল বলে মনে হয়েছিল। দাসপ্রথাবিরোধী নেতা ফ্রেডেরিক ডগলাস সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এবং ভোটাধিকারের দাবিকে সমর্থন করেন। শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।

সেনেকা ফলস সম্মেলন আমেরিকায় নারীর অধিকার নিয়ে প্রথম আলোচনা ছিল না। এর আগেও নারী শিক্ষা, সম্পত্তি ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক চলছিল। কিন্তু ১৮৪৮ সালের সম্মেলন বিচ্ছিন্ন অভিযোগগুলোকে একটি সংগঠিত রাজনৈতিক কর্মসূচির ভাষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এরপর বিভিন্ন স্থানে নারী অধিকার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে থাকে এবং আন্দোলন একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কে পরিণত হয়।

স্ট্যানটনের কাছে ভোটাধিকার ছিল গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তাঁর লক্ষ্য শুধু ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বিবাহিত নারীর সম্পত্তির অধিকার, উপার্জনের ওপর নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা, বিবাহবিচ্ছেদ আইন, সন্তানের অভিভাবকত্ব এবং পেশাগত সুযোগ নিয়েও আন্দোলন করেন। নিউইয়র্কে বিবাহিত নারীর সম্পত্তির অধিকার সম্প্রসারণের প্রচারণায়ও তিনি সক্রিয় ছিলেন।

১৮৫১ সালে সুসান বি. অ্যান্থনির সঙ্গে তাঁর পরিচয় নারী অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দুজনের দক্ষতা ছিল পরস্পরের পরিপূরক। স্ট্যানটন ছিলেন অসাধারণ লেখক, তাত্ত্বিক এবং যুক্তিনির্মাতা; অ্যান্থনি ছিলেন দক্ষ সংগঠক ও প্রচারক। স্ট্যানটন অনেক বক্তৃতা ও লেখা প্রস্তুত করতেন, আর অ্যান্থনি দেশজুড়ে ভ্রমণ করে আন্দোলন সংগঠিত করতেন। তাঁদের এই সহযোগিতা কয়েক দশক ধরে আমেরিকান নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে।

স্ট্যানটনের পারিবারিক জীবনও তাঁর রাজনৈতিক কাজকে প্রভাবিত করেছিল। তিনি সাত সন্তানের মা ছিলেন। সন্তানরা ছোট থাকাকালে দীর্ঘ সময় ভ্রমণ করা তাঁর জন্য কঠিন ছিল। ফলে অনেক সময় তিনি বাড়িতে বসেই বক্তৃতা, আবেদনপত্র, প্রবন্ধ ও রাজনৈতিক যুক্তি লিখতেন, যা অ্যান্থনি ও অন্যরা জনসমক্ষে নিয়ে যেতেন। তাঁর জীবন তাই সেই বৈপরীত্যের একটি বাস্তব উদাহরণ—যে নারী সমাজে নারীর গৃহস্থালি ভূমিকার সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তাঁকেই একই সঙ্গে বিশাল পরিবারের দৈনন্দিন দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে।

আমেরিকান গৃহযুদ্ধ নারী অধিকার আন্দোলনের গতিপথ বদলে দেয়। স্ট্যানটন ও অ্যান্থনি দাসপ্রথা বিলোপের পক্ষে ছিলেন এবং ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দাসপ্রথা বিলোপকে সমর্থন করেন। কিন্তু যুদ্ধের পর নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার নিয়ে নতুন সাংবিধানিক প্রশ্ন দেখা দেয়।

চতুর্দশ সংশোধনী সংবিধানে প্রথমবারের মতো ভোটসংক্রান্ত ধারায় “male” বা পুরুষ শব্দটি যুক্ত করে। এরপর পঞ্চদশ সংশোধনী বর্ণ, গাত্রবর্ণ বা পূর্ববর্তী দাসত্বের অবস্থার ভিত্তিতে ভোটাধিকার অস্বীকার নিষিদ্ধ করে, ফলে কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের ভোটাধিকারের সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি হয়। কিন্তু নারীরা এর বাইরে থেকে যান।

এই পর্যায়েই স্ট্যানটনের উত্তরাধিকারের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় শুরু হয়। তিনি ও অ্যান্থনি পঞ্চদশ সংশোধনীকে সমর্থন করতে অস্বীকৃতি জানান যদি একই সঙ্গে নারীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত না করা হয়। অন্যদিকে লুসি স্টোনসহ অনেক নারী অধিকারকর্মী কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের ভোটাধিকারকে অবিলম্বে সমর্থন করে নারীর ভোটাধিকারের সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন। এই মতবিরোধ আন্দোলনকে বিভক্ত করে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই বিতর্কের সময় স্ট্যানটন এমন কিছু বক্তব্য ও যুক্তি ব্যবহার করেছিলেন যাতে বর্ণবাদী এবং অভিবাসীবিরোধী শ্রেণিগত ধারণা প্রকাশ পায়। শিক্ষিত শ্বেতাঙ্গ নারীরা ভোটাধিকার না পেলেও সদ্য মুক্ত কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ বা দরিদ্র অভিবাসী পুরুষেরা ভোট পাবে—এই বিষয়টি নিয়ে তাঁর কিছু বক্তব্য সমতার সার্বজনীন নীতির সঙ্গে স্পষ্টভাবে সংঘাতপূর্ণ ছিল। তাঁর ঐতিহাসিক অবদান মূল্যায়নের পাশাপাশি এই দিকটি উপেক্ষা করলে তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা বাদ পড়ে যায়।

১৮৬৯ সালে স্ট্যানটন ও অ্যান্থনি ন্যাশনাল ওম্যান সাফ্রেজ অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটি ফেডারেল পর্যায়ে নারীর ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্য সাংবিধানিক সংশোধনী চেয়েছিল এবং একই সঙ্গে বিবাহ, সম্পত্তি ও অন্যান্য নারী অধিকার প্রশ্নেও তুলনামূলক বিস্তৃত কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। অন্যদিকে লুসি স্টোন ও তাঁর সহযোগীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে আমেরিকান ওম্যান সাফ্রেজ অ্যাসোসিয়েশন।

পরবর্তী দুই দশক নারী ভোটাধিকার আন্দোলন এই বিভক্ত কাঠামোর মধ্যে এগোয়। স্ট্যানটন বক্তৃতা, প্রবন্ধ এবং রাজনৈতিক প্রচারের মাধ্যমে নারীর নাগরিক স্বাধীনতার ধারণাকে আরও বিস্তৃত করেন। তাঁর কাছে ভোটাধিকার ছিল শুধু নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নয়; এটি ছিল আইনের ওপর প্রভাব বিস্তার এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার রাজনৈতিক ক্ষমতা।

তিনি এমন বিষয় নিয়েও কথা বলতেন, যেগুলো তাঁর সময়ের অনেক সংস্কারকের কাছেও অস্বস্তিকর ছিল। বিবাহবিচ্ছেদের অধিকতর ন্যায্য আইন, নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতা, মাতৃত্ব, শিক্ষা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কীভাবে নারীর অধীনতাকে সমর্থন করেছে—এসব প্রশ্ন তিনি প্রকাশ্যে তুলেছিলেন। ১৮৫৪ সালে নিউইয়র্কের আইনসভাকে উদ্দেশ্য করে প্রস্তুত করা তাঁর বক্তব্যে নারীর পূর্ণ নাগরিক অধিকার, সম্পত্তি ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি স্পষ্টভাবে উঠে আসে।

১৮৮০-এর দশকে তাঁর কাজের বড় অংশ লেখালেখির দিকে চলে যায়। সুসান বি. অ্যান্থনি ও মাটিল্ডা জসলিন গেজের সঙ্গে তিনি History of Woman Suffrage-এর প্রথম কয়েকটি খণ্ড প্রস্তুত করেন। এর মাধ্যমে আন্দোলনের দলিল, বক্তৃতা এবং ঘটনাগুলো সংরক্ষণ করার চেষ্টা করা হয়। তবে এই ইতিহাসও মূলত আন্দোলনের নির্দিষ্ট নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নির্মিত হয়েছিল এবং নারী ভোটাধিকারের বহুমাত্রিক ইতিহাসের সব কণ্ঠ সমানভাবে সেখানে স্থান পায়নি।

১৮৯০ সালে দীর্ঘদিনের বিভক্ত দুটি প্রধান ভোটাধিকার সংগঠন একত্রিত হয়ে National American Woman Suffrage Association গঠন করে। স্ট্যানটন এর প্রথম সভাপতি হন। কিন্তু আন্দোলনের নতুন নেতৃত্ব ক্রমে ভোটাধিকারের একক লক্ষ্যের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে, যেখানে স্ট্যানটন নারী, পরিবার, ধর্ম ও সমাজের আরও মৌলিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলতে আগ্রহী ছিলেন।

এই পার্থক্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর The Woman’s Bible প্রকাশের পর। ১৮৯৫ ও ১৮৯৮ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে তিনি বাইবেলের বিভিন্ন অংশ এবং সেগুলোর পুরুষকেন্দ্রিক ব্যাখ্যা কীভাবে নারীর অধীনতাকে ন্যায্যতা দিতে ব্যবহৃত হয়েছে, তা সমালোচনা করেন। এই অবস্থান এতটাই বিতর্কিত হয়ে ওঠে যে নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের অনেক নেতাও তাঁর থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেন।

স্ট্যানটনের জীবন তাই সরল কোনো বিজয়গাথা নয়। তিনি একই সঙ্গে অগ্রগামী এবং বিতর্কিত। নারীর আইনি ব্যক্তিসত্তা, ভোটাধিকার, শিক্ষা ও সামাজিক স্বাধীনতার পক্ষে তাঁর যুক্তি পরবর্তী প্রজন্মের আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি শক্তিশালী করেছিল। আবার Reconstruction-পরবর্তী সময়ে তাঁর কিছু বর্ণবাদী ও শ্রেণিবাদী বক্তব্য দেখায় যে সমতার জন্য লড়াই করা একজন সংস্কারকও নিজের সময়ের অন্য বৈষম্য থেকে মুক্ত নাও থাকতে পারেন।

১৯০২ সালের ২৬ অক্টোবর, নিউইয়র্ক সিটিতে ৮৬ বছর বয়সে এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যানটনের মৃত্যু হয়। যে ভোটাধিকারের জন্য তিনি অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় আন্দোলন করেছিলেন, সেটি তিনি জীবদ্দশায় অর্জিত হতে দেখেননি।

তাঁর মৃত্যুর পর আন্দোলনের নেতৃত্ব নতুন প্রজন্মের হাতে চলে যায়। ক্যারি চ্যাপম্যান ক্যাট, অ্যালিস পলসহ বহু সংগঠক এবং অসংখ্য স্থানীয় কর্মী বিভিন্ন কৌশলে আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যান। কৃষ্ণাঙ্গ নারী ভোটাধিকারকর্মীরাও বর্ণ ও লিঙ্গ—দুই ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যান। অবশেষে ১৯২০ সালে, সেনেকা ফলস সম্মেলনের ৭২ বছর পর, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ঊনবিংশ সংশোধনী অনুমোদিত হয়, যা লিঙ্গের ভিত্তিতে ভোটাধিকার অস্বীকার নিষিদ্ধ করে।

তবে ১৯২০ সালেও আমেরিকার সব নারী বাস্তবে সমানভাবে ভোট দিতে পারেননি। বিশেষ করে দক্ষিণের অঙ্গরাজ্যগুলোতে কৃষ্ণাঙ্গ নারী ও পুরুষদের ভোটাধিকার দমনে কর, সাক্ষরতা পরীক্ষা, ভয়ভীতি, সহিংসতা এবং অন্যান্য বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা ব্যবহৃত হতে থাকে। ফলে নারী ভোটাধিকারের সাংবিধানিক বিজয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমেরিকায় সার্বজনীন ও কার্যকর ভোটাধিকারের সংগ্রাম তখনও অসম্পূর্ণ ছিল।

এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যানটনের সবচেয়ে স্থায়ী অবদান সম্ভবত একটি মৌলিক প্রশ্নকে আমেরিকার রাজনৈতিক ভাষার মধ্যে প্রবেশ করানো—যে রাষ্ট্র স্বাধীনতা ও প্রতিনিধিত্বকে নিজের প্রতিষ্ঠার মূলনীতি বলে, সেই রাষ্ট্র তার অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত থেকে বাদ রাখবে কেন? সেনেকা ফলসের ডিক্লারেশন অব সেন্টিমেন্টস সেই প্রশ্নকে সম্পত্তি, শিক্ষা, বিবাহ, পেশা ও ভোটাধিকারের সঙ্গে যুক্ত করে নারীর নাগরিকত্বের একটি বিস্তৃত দাবি তৈরি করেছিল।

তিনি একা এই আন্দোলন সৃষ্টি করেননি এবং নারীর ভোটাধিকারও তাঁর একক অর্জন ছিল না। লুক্রেশিয়া মট, সুসান বি. অ্যান্থনি, লুসি স্টোন, সোজার্নার ট্রুথ, ফ্রেডেরিক ডগলাস এবং পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য পরিচিত ও অজ্ঞাত কর্মীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আন্দোলন এগিয়েছিল। কিন্তু স্ট্যানটন সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান চিন্তাবিদ ছিলেন, যিনি নারীর ব্যক্তিগত অসন্তোষকে নাগরিক অধিকার ও সাংবিধানিক সমতার রাজনৈতিক প্রশ্নে রূপ দিতে সাহায্য করেছিলেন।

সেনেকা ফলসের ছোট একটি চ্যাপেলে যে দাবি একসময় অনেক আমেরিকানের কাছে প্রায় অকল্পনীয় মনে হয়েছিল, কয়েক প্রজন্মের সংগ্রামে সেটিই দেশের সংবিধানের অংশ হয়ে যায়। সেই দীর্ঘ যাত্রার শুরু ও বিকাশের সঙ্গে এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যানটনের নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁর ইতিহাস তাই শুধু একজন নারীর ভোট চাওয়ার গল্প নয়; এটি আমেরিকায় ‘নাগরিক’ শব্দটির অর্থ কার জন্য প্রযোজ্য—সেই প্রশ্নকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার ইতিহাস।


আপনার পছন্দ হতে পারে