বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

সুসান বি. অ্যান্থনি: নারীর ভোটাধিকারের জন্য আজীবন লড়াই করা কিংবদন্তি আন্দোলনকর্মী

সিরিজ: ইতিহাস বদলে দেওয়া নারীরা

সুসান বি. অ্যান্থনি: নারীর ভোটাধিকারের জন্য আজীবন লড়াই করা কিংবদন্তি আন্দোলনকর্মী
ভোট দেওয়ার ‘অপরাধে’ গ্রেপ্তার হয়েও নারীর রাজনৈতিক অধিকারের দাবি থেকে সরে যাননি সুসান বি. অ্যান্থনি

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন একটি সময় ছিল, যখন একজন নারী নির্বাচনের দিনে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ব্যালট দেওয়ার চেষ্টা করলে সেটি রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ নয়, বরং অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারত। ১৮৭২ সালের ৫ নভেম্বর সুসান বি. অ্যান্থনি সেই নিষেধাজ্ঞাকেই প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। নিউইয়র্কের রচেস্টারে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরের বছর আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে ১০০ ডলার জরিমানা করে। অ্যান্থনি সেই জরিমানা দিতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁর এই ঘটনাটি নারীর ভোটাধিকারের আন্দোলনের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রতিবাদগুলোর একটিতে পরিণত হয়।

কিন্তু সুসান বি. অ্যান্থনির ইতিহাস শুধু একটি বেআইনি ভোট দেওয়ার গল্প নয়। কয়েক দশক ধরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন, আবেদনপত্রে স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন, সংগঠন গড়েছেন এবং কংগ্রেসের কাছে নারীর ভোটাধিকারের দাবি তুলেছেন। তিনি ১৯২০ সালের সাংবিধানিক বিজয় দেখে যেতে পারেননি, কিন্তু যে আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সেই পরিবর্তন ঘটায়, তার সাংগঠনিক ভিত্তি নির্মাণে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব।

সুসান ব্রাউনেল অ্যান্থনির জন্ম ১৮২০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, ম্যাসাচুসেটসের অ্যাডামসে। তাঁর পরিবার কোয়েকার ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই পরিবেশে সরল জীবন, ব্যক্তিগত নৈতিকতা এবং মানুষের আধ্যাত্মিক সমতার ধারণা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অ্যান্থনির পরবর্তী সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তায় এই পারিবারিক পরিবেশের প্রভাব ছিল গভীর।

অ্যান্থনি পরিবার পরে নিউইয়র্কে চলে যায়। তাঁদের বাড়ি দাসপ্রথাবিরোধী কর্মীদের মিলনস্থল হয়ে ওঠে। ফ্রেডেরিক ডগলাস ও উইলিয়াম লয়েড গ্যারিসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দাসপ্রথাবিরোধী ব্যক্তিত্বও তাঁদের সামাজিক পরিমণ্ডলের অংশ ছিলেন। ফলে অ্যান্থনির রাজনৈতিক চেতনার শুরু নারী ভোটাধিকার দিয়ে নয়; দাসপ্রথা বিলোপ এবং সামাজিক সংস্কারের বৃহত্তর আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তাঁর রাজনৈতিক জীবন গড়ে ওঠে।

তরুণ বয়সে অ্যান্থনি শিক্ষকতা করেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি সরাসরি লিঙ্গভিত্তিক অর্থনৈতিক বৈষম্যের মুখোমুখি হন। একই কাজ করেও পুরুষ শিক্ষকদের তুলনায় নারী শিক্ষকরা অনেক কম বেতন পেতেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে বুঝতে সাহায্য করে যে নারীর অধীনতা শুধু পারিবারিক বা সামাজিক রীতির বিষয় নয়; অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যেও নারীকে কম মূল্য দেওয়া হচ্ছিল।

প্রথমদিকে তিনি মদ্যপানবিরোধী টেম্পারেন্স আন্দোলনেও সক্রিয় হন। কিন্তু সেখানে নারী হিসেবে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রেও বাধার সম্মুখীন হন। সামাজিক সংস্কারের পক্ষে কাজ করতে গিয়েই তিনি ক্রমে উপলব্ধি করেন—রাজনৈতিক ক্ষমতা ছাড়া নারীর পক্ষে আইন ও জননীতি পরিবর্তনে কার্যকর প্রভাব বিস্তার করা কঠিন। এই উপলব্ধিই ভোটাধিকারকে তাঁর আন্দোলনের কেন্দ্রীয় দাবিতে পরিণত করতে সাহায্য করে।

১৮৫১ সালে এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যানটনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় আমেরিকার নারী অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। স্ট্যানটন ইতোমধ্যে ১৮৪৮ সালের সেনেকা ফলস নারী অধিকার সম্মেলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অ্যান্থনি ও স্ট্যানটনের মধ্যে দ্রুত গভীর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব তৈরি হয়।

দুজনের দক্ষতা ছিল ভিন্ন কিন্তু পরস্পরের পরিপূরক। স্ট্যানটন ছিলেন শক্তিশালী লেখক ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদ। অন্যদিকে অ্যান্থনির অসাধারণ শক্তি ছিল সংগঠন, ভ্রমণ, প্রচার, বক্তৃতা এবং দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলন পরিচালনা। স্ট্যানটনের পারিবারিক দায়িত্বের কারণে তিনি সবসময় ভ্রমণ করতে পারতেন না; অ্যান্থনি দেশজুড়ে ঘুরে তাঁদের যৌথ ধারণাগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেন।

এই অংশীদারত্ব কয়েক দশক ধরে চলে। নারীর সম্পত্তির অধিকার, সমান বেতন, শিক্ষা, বিবাহসংক্রান্ত আইন এবং সর্বোপরি ভোটাধিকারের জন্য তাঁরা প্রচারণা চালান। অ্যান্থনি কখনো বিয়ে করেননি। তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের বড় অংশই আন্দোলন, সংগঠন এবং ভ্রমণে ব্যয় হয়।

১৮৫০-এর দশকে তিনি দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন। ১৮৫৬ সালে তিনি আমেরিকান অ্যান্টি-স্লেভারি সোসাইটির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করেন, সভার আয়োজন, বক্তৃতা এবং প্রচারপত্র বিতরণের মাধ্যমে দাসপ্রথা বিলোপের পক্ষে জনমত তৈরিতে অংশ নেন।

আমেরিকান গৃহযুদ্ধ শুরু হলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। ১৮৬৩ সালে অ্যান্থনি, স্ট্যানটন ও তাঁদের সহযোগীরা উইমেন্স লয়্যাল ন্যাশনাল লীগ গঠন করেন। সংগঠনটি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে দাসপ্রথা বিলোপের পক্ষে বিশাল আবেদন প্রচারণা চালায়। ১৮৬৫ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুমোদনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথার সাংবিধানিক বিলোপ ঘটে।

কিন্তু যুদ্ধশেষে নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার নিয়ে শুরু হওয়া বিতর্ক নারী অধিকার আন্দোলনের ভেতরে গভীর বিভাজন সৃষ্টি করে।

চতুর্দশ ও পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে এই দ্বন্দ্ব সবচেয়ে তীব্র হয়। পঞ্চদশ সংশোধনী বর্ণ, গাত্রবর্ণ অথবা পূর্ববর্তী দাসত্বের অবস্থার ভিত্তিতে ভোটাধিকার অস্বীকার নিষিদ্ধ করলেও লিঙ্গের ভিত্তিতে ভোটাধিকার অস্বীকার নিষিদ্ধ করেনি। অর্থাৎ কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের ভোটাধিকারের সাংবিধানিক সুরক্ষা তৈরি হলেও নারীরা সেই সুরক্ষা পেলেন না।

অ্যান্থনি ও স্ট্যানটন এর বিরোধিতা করেন এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সার্বজনীন ভোটাধিকারের দাবি তোলেন। অন্যদিকে ফ্রেডেরিক ডগলাস, লুসি স্টোন এবং অন্যান্য সংস্কারক পঞ্চদশ সংশোধনীকে সমর্থন করেন, যদিও তাঁদের অনেকেই নারীর ভোটাধিকারেরও সমর্থক ছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সহিংস ও বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষের ভোটাধিকার অবিলম্বে সুরক্ষিত করা জরুরি।

এই বিতর্ক নারী অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসের একটি অস্বস্তিকর অধ্যায়ও প্রকাশ করে। অ্যান্থনি ও বিশেষ করে স্ট্যানটনের প্রচারণায় এমন কিছু যুক্তি ব্যবহৃত হয়েছিল যা কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ এবং অভিবাসী জনগোষ্ঠী সম্পর্কে বর্ণবাদী ও শ্রেণিবাদী ধারণাকে আশ্রয় করেছিল। অ্যান্থনির দাসপ্রথাবিরোধী অতীত এই পরবর্তী বক্তব্যগুলোর সমস্যাজনক চরিত্র মুছে দেয় না। তাঁর অবদান বুঝতে হলে এই বৈপরীত্যটিও ইতিহাসের অংশ হিসেবে স্বীকার করতে হয়।

এই মতবিরোধের মধ্যে ১৮৬৯ সালে অ্যান্থনি, স্ট্যানটন ও তাঁদের সহযোগীরা ন্যাশনাল ওম্যান সাফ্রেজ অ্যাসোসিয়েশন বা এনডব্লিউএসএ প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটি ফেডারেল সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে নারীর ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠাকে প্রধান লক্ষ্য করে। অন্যদিকে লুসি স্টোনসহ অন্য কর্মীরা আমেরিকান ওম্যান সাফ্রেজ অ্যাসোসিয়েশন গঠন করেন এবং অঙ্গরাজ্যভিত্তিক প্রচারণাকেও গুরুত্ব দেন।

অ্যান্থনি ও স্ট্যানটন The Revolution নামে একটি সংবাদপত্রের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। এর মাধ্যমে ভোটাধিকার ছাড়াও নারীশিক্ষা, বিবাহ ও বিচ্ছেদ, সমান বেতন, শ্রমঘণ্টা এবং অর্থনৈতিক প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করা হতো। অ্যান্থনি বুঝেছিলেন, রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য শুধু সভা যথেষ্ট নয়—নিজস্ব সংবাদমাধ্যমও জনমত তৈরির গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র।

কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে নাটকীয় রাজনৈতিক পদক্ষেপ আসে ১৮৭২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে

অ্যান্থনি যুক্তি দিয়েছিলেন, চতুর্দশ সংশোধনীর অধীনে নারীও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং নাগরিকত্বের সঙ্গে ভোট দেওয়ার অধিকার যুক্ত হওয়া উচিত। এই ধারণাকে পরীক্ষা করতে তিনি এবং আরও কয়েকজন নারী নিউইয়র্কের রচেস্টারে ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার চেষ্টা করেন। নির্বাচনী কর্মকর্তারা শেষ পর্যন্ত তাঁদের নিবন্ধন গ্রহণ করেন।

১৮৭২ সালের ৫ নভেম্বর সুসান বি. অ্যান্থনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দেন। তাঁর ব্যালটের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ছিলেন ইউলিসিস এস. গ্রান্ট। এটি কোনো গোপন কাজ ছিল না; বরং নারীর নাগরিক অধিকার নিয়ে একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ছিল।

দুই সপ্তাহেরও কম সময় পর, ১৮ নভেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ—আইনগত অধিকার না থাকা সত্ত্বেও ফেডারেল নির্বাচনে ভোট দেওয়া। অ্যান্থনি এই মামলাকেই নারীর রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে জাতীয় বিতর্ক তৈরির সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেন। বিচার শুরুর আগে তিনি এলাকাজুড়ে বক্তৃতা দিয়ে প্রশ্ন তুলতে থাকেন—একজন মার্কিন নাগরিকের ভোট দেওয়া কীভাবে অপরাধ হতে পারে?

১৮৭৩ সালের জুনে তাঁর বিচার অনুষ্ঠিত হয়। বিচারক ওয়ার্ড হান্ট মামলাটি পরিচালনা করেন। অ্যান্থনিকে নিজের পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং বিচারক জুরিদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে না দিয়ে দোষী রায় দেওয়ার নির্দেশ দেন। শেষ পর্যন্ত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে ১০০ ডলার জরিমানা করা হয়।

অ্যান্থনি জরিমানা দিতে অস্বীকার করেন।

বিচারক তাঁকে কারাগারে পাঠাননি। এর ফলে মামলাটি উচ্চ আদালতে নিয়ে যাওয়ার সুযোগও কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। অ্যান্থনি আশা করেছিলেন, মামলাটি আপিলের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে নারীর ভোটাধিকারের সাংবিধানিক প্রশ্ন পরীক্ষা করা সম্ভব হবে। সেটি আর ঘটেনি।

আইনি দিক থেকে তিনি মামলায় হেরেছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে বিচারটি নারী ভোটাধিকারের প্রশ্নকে জাতীয় পর্যায়ে প্রচার করতে সাহায্য করে। একজন নারী শুধু ভোট দেওয়ার কারণে আদালতে দাঁড়িয়ে আছেন—এই দৃশ্যই ভোটাধিকারবিরোধী ব্যবস্থার বৈপরীত্যকে অত্যন্ত স্পষ্ট করে তুলেছিল।

তবে অ্যান্থনি একা এই কৌশল গ্রহণ করেননি। ১৮৭০-এর দশকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে শত শত নারী চতুর্দশ সংশোধনীর নাগরিকত্বের যুক্তি ব্যবহার করে ভোট দেওয়া বা ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের চেষ্টা করেছিলেন। ভার্জিনিয়া মাইনরের মতো কর্মীরাও আদালতের মাধ্যমে একই সাংবিধানিক প্রশ্ন পরীক্ষা করেন। ফলে অ্যান্থনির ১৮৭২ সালের ভোট ছিল বৃহত্তর ‘নিউ ডিপারচার’ কৌশলের সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণগুলোর একটি।

পরবর্তী কয়েক দশকে অ্যান্থনি অসাধারণ গতিতে আন্দোলন চালিয়ে যান। তিনি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বক্তৃতা দেন, স্থানীয় সংগঠন গড়তে সাহায্য করেন, আইনসভা ও কংগ্রেসের কাছে আবেদন করেন এবং ফেডারেল সাংবিধানিক সংশোধনীর দাবিকে জীবিত রাখেন। তাঁর শক্তি ছিল দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক শৃঙ্খলা—একটি নির্বাচনে পরাজয় বা একটি আইন প্রত্যাখ্যাত হওয়া তাঁর কাছে আন্দোলনের সমাপ্তি ছিল না।

১৮৭৮ সালে কংগ্রেসে এমন একটি ফেডারেল সাংবিধানিক সংশোধনীর প্রস্তাব উত্থাপিত হয়, যা লিঙ্গের ভিত্তিতে ভোটাধিকার অস্বীকার নিষিদ্ধ করবে। পরবর্তী দশকগুলোতে প্রস্তাবটি বারবার সামনে আসে। শেষ পর্যন্ত যে ভাষা ঊনবিংশ সংশোধনীতে পরিণত হয়, সেটি দীর্ঘদিন “Susan B. Anthony Amendment” নামেও পরিচিত ছিল।

অ্যান্থনি বুঝেছিলেন যে আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যানটন ও মাটিল্ডা জসলিন গেজের সঙ্গে তিনি History of Woman Suffrage তৈরিতে কাজ করেন। আন্দোলনের বক্তৃতা, দলিল এবং ঘটনাগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।

তবে এই প্রকল্পেরও সীমাবদ্ধতা ছিল। এতে মূলত শ্বেতাঙ্গ নারী ভোটাধিকারকর্মীদের কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্রে রাখা হয় এবং কৃষ্ণাঙ্গ নারী আন্দোলনকর্মীদের অবদান যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। ফলে আজ নারী ভোটাধিকারের ইতিহাস গবেষণায় সোজার্নার ট্রুথ, ফ্রান্সেস এলেন ওয়াটকিন্স হার্পার, মেরি চার্চ টেরেল, আইডা বি. ওয়েলসসহ কৃষ্ণাঙ্গ নারী কর্মীদের স্বতন্ত্র সংগ্রামকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়।

১৮৯০ সালে দীর্ঘদিন বিভক্ত থাকা ন্যাশনাল ওম্যান সাফ্রেজ অ্যাসোসিয়েশন এবং আমেরিকান ওম্যান সাফ্রেজ অ্যাসোসিয়েশন একত্রিত হয়ে ন্যাশনাল আমেরিকান ওম্যান সাফ্রেজ অ্যাসোসিয়েশন গঠন করে। প্রথম সভাপতি হন এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যানটন। পরে ১৮৯২ সালে অ্যান্থনি সংগঠনটির সভাপতি হন এবং ১৯০০ সাল পর্যন্ত নেতৃত্ব দেন।

বয়স বাড়লেও তিনি আন্দোলন থেকে পুরোপুরি সরে যাননি। ১৯০৫ সালেও তিনি প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের সঙ্গে নারী ভোটাধিকারের সাংবিধানিক সংশোধনী নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ে আন্দোলনের নেতৃত্ব ধীরে ধীরে নতুন প্রজন্মের হাতে চলে যাচ্ছিল।

১৯০৬ সালের ১৩ মার্চ, নিউইয়র্কের রচেস্টারে সুসান বি. অ্যান্থনি মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। প্রায় অর্ধশতাব্দী নারীর ভোটাধিকারের জন্য কাজ করেও তিনি নিজের দেশের নারীদের জাতীয় পর্যায়ে সমান সাংবিধানিক ভোটাধিকার অর্জন করতে দেখে যেতে পারেননি।

কিন্তু আন্দোলন থামেনি।

পরবর্তী প্রজন্মে ক্যারি চ্যাপম্যান ক্যাট, অ্যালিস পল এবং অসংখ্য জাতীয় ও স্থানীয় কর্মী ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে প্রচারণা এগিয়ে নেন। কেউ অঙ্গরাজ্যভিত্তিক ভোটাধিকার অর্জনের চেষ্টা করেন, কেউ কংগ্রেস ও প্রেসিডেন্টের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন, আবার কেউ হোয়াইট হাউসের সামনে প্রতিবাদ করেন। কয়েক দশকের সংগঠিত প্রচেষ্টার পর ১৯১৯ সালে কংগ্রেস নারী ভোটাধিকারের সাংবিধানিক সংশোধনী অনুমোদন করে।

অবশেষে ১৯২০ সালের ১৮ আগস্ট টেনেসি ৩৬তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে সংশোধনী অনুমোদন করলে প্রয়োজনীয় সংখ্যক রাজ্যের সমর্থন পূর্ণ হয়। ঊনবিংশ সংশোধনী যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের অংশ হয়ে লিঙ্গের ভিত্তিতে ভোটাধিকার অস্বীকার নিষিদ্ধ করে। অ্যান্থনির মৃত্যুর চৌদ্দ বছর পর তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক লক্ষ্য সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়।

তবে এই বিজয়কেও সম্পূর্ণ সার্বজনীন ভোটাধিকারের সমাপ্তি হিসেবে দেখা যায় না। বিশেষ করে দক্ষিণে কৃষ্ণাঙ্গ নারী ও পুরুষদের ভোটাধিকার দমনে বৈষম্যমূলক আইন, সাক্ষরতা পরীক্ষা, কর, ভয়ভীতি ও সহিংসতা আরও কয়েক দশক ব্যবহৃত হয়েছে। নেটিভ আমেরিকান ও এশীয় বংশোদ্ভূত অনেক নারীর ক্ষেত্রেও নাগরিকত্বসংক্রান্ত বাধা ছিল। ফলে ১৯২০ ছিল একটি বিশাল সাংবিধানিক বিজয়, কিন্তু আমেরিকার সব নারীর জন্য সমানভাবে ভোট দেওয়ার বাস্তব সুযোগ তখনও নিশ্চিত হয়নি।

সুসান বি. অ্যান্থনির উত্তরাধিকারও তাই সরল কোনো নিখুঁত নায়িকার গল্প নয়। তিনি দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলনে কাজ করেছেন, নারীকে স্বাধীন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য কয়েক দশক লড়েছেন এবং ভোটাধিকারের দাবিকে জাতীয় রাজনীতিতে ধরে রাখতে অসাধারণ সাংগঠনিক ভূমিকা পালন করেছেন। একই সঙ্গে Reconstruction যুগের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে তাঁর কিছু অবস্থান ও বক্তব্যে সেই সময়ের বর্ণগত ও শ্রেণিগত বৈষম্যের ছাপ ছিল। পূর্ণ ইতিহাস বুঝতে তাঁর অর্জন এবং এই সীমাবদ্ধতা—দুটিই দেখতে হয়।

তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত ছিল দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনের প্রকৃতি বোঝার ক্ষমতা। তিনি এমন একটি দাবি নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন, যেটিকে বহু মানুষ অস্বাভাবিক কিংবা বিপজ্জনক মনে করত। সভা বাতিল হয়েছে, আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, রাজনৈতিক জোট ভেঙেছে, সংবাদপত্র আর্থিক সমস্যায় পড়েছে, এমনকি ভোট দেওয়ার জন্য তাঁকে অপরাধীও করা হয়েছে। তবু নারী পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হলে তার রাজনৈতিক কণ্ঠও থাকতে হবে—এই মৌলিক দাবি থেকে তিনি সরে যাননি।

১৮৭২ সালে যে নারী ব্যালট দেওয়ার কারণে আদালতে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুর চৌদ্দ বছর পর সেই কাজ আর শুধু নারীর জন্য বৈধই হয়নি—লিঙ্গের ভিত্তিতে ভোটাধিকার অস্বীকার নিষিদ্ধ করার নীতি মার্কিন সংবিধানের অংশ হয়ে যায়। সেই পরিবর্তন কোনো এক ব্যক্তির অর্জন ছিল না; কয়েক প্রজন্মের নারী ও পুরুষ আন্দোলনকর্মীর সম্মিলিত সংগ্রামের ফল ছিল। কিন্তু সেই দীর্ঘ আন্দোলনকে সংগঠিত রাখা, মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং বারবার রাজনৈতিক ব্যবস্থার সামনে একই দাবি তুলে ধরার ক্ষেত্রে সুসান বি. অ্যান্থনির ভূমিকা তাঁকে আমেরিকার নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের অন্যতম স্থায়ী প্রতীকে পরিণত করেছে।


আপনার পছন্দ হতে পারে