বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মাউন্ট এভারেস্ট: পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতের চূড়ায় পৌঁছানো এত কঠিন কেন?

  • Author: Admin
  • September 03, 2026
মাউন্ট এভারেস্ট: পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতের চূড়ায় পৌঁছানো এত কঠিন কেন?
পৃথিবীর ছাদে পৌঁছানোর বিপজ্জনক অভিযান

পৃথিবীর মানচিত্রে মাউন্ট এভারেস্ট একটি পর্বতশৃঙ্গ, কিন্তু একজন পর্বতারোহীর কাছে এটি একই সঙ্গে উচ্চতা, ঠান্ডা, অক্সিজেনের অভাব, হিমবাহ, তুষারধস, ঝড়, শারীরিক অবসাদ এবং সময়ের বিরুদ্ধে এক কঠিন লড়াই। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮,৮৪৯ মিটার উঁচু এই শৃঙ্গ পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দু। নিচ থেকে তাকালে বরফে ঢাকা বিশাল পাহাড়টিকে স্থির ও শান্ত মনে হতে পারে। বাস্তবে এর ওপরের পরিবেশ এতটাই প্রতিকূল যে সেখানে মানুষের শরীর দীর্ঘ সময় স্বাভাবিকভাবে টিকে থাকার জন্য তৈরি নয়। এভারেস্ট আরোহণের সবচেয়ে বড় রহস্য এখানেই—পর্বতারোহী শুধু পাহাড়ের বিরুদ্ধে লড়েন না, তাঁকে নিজের শরীরের ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধেও লড়তে হয়।

এভারেস্ট হিমালয়ের মহালঙ্গুর পর্বতশ্রেণিতে নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তে অবস্থিত। নেপালের দিক থেকে শৃঙ্গটিকে বলা হয় সাগরমাথা, আর তিব্বতি ভাষায় এটি চোমোলুংমা নামে পরিচিত। পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হিসেবে এর বৈজ্ঞানিক পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই মানুষের মধ্যে এর চূড়ায় পৌঁছানোর প্রবল আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। কিন্তু এভারেস্টে উঠতে গিয়ে বহু অভিযাত্রী বুঝেছেন, উচ্চতার সংখ্যাটি জানার সঙ্গে সেই উচ্চতায় শরীর কীভাবে আচরণ করে তা বোঝার মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে।

এভারেস্টে ওঠার প্রধান বাধা শুধু পাহাড়টির খাড়া ঢাল নয়; সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো বায়ুমণ্ডলের চাপ কমে যাওয়া। সমুদ্রপৃষ্ঠে মানুষের শরীর যে পরিবেশে অভ্যস্ত, এভারেস্টের চূড়ায় তার তুলনায় বায়ুচাপ অত্যন্ত কম। বাতাসে অক্সিজেনের অনুপাত মোটামুটি একই থাকলেও কম বায়ুচাপের কারণে প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গে শরীর কার্যকরভাবে অনেক কম অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে। ফলে ফুসফুস যতই দ্রুত কাজ করুক, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তাদের স্বাভাবিক চাহিদা অনুযায়ী অক্সিজেন পায় না।

এই অক্সিজেনস্বল্পতার প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো শরীরের ওপর পড়ে। একজন সুস্থ ও প্রশিক্ষিত মানুষও উচ্চতায় দ্রুত হাঁটলে হাঁপিয়ে উঠতে পারেন। হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়, ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়, ক্ষুধা কমে যেতে পারে এবং সাধারণ কাজও অত্যন্ত পরিশ্রমের মনে হয়। উচ্চতা আরও বাড়লে চিন্তাশক্তি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও দুর্বল হতে পারে। এভারেস্টের মতো জায়গায় এই মানসিক দুর্বলতা বিশেষ বিপজ্জনক, কারণ একটি ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি সেখানে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।

প্রায় ৮,০০০ মিটারের ওপরের অঞ্চলকে পর্বতারোহীরা সাধারণত ‘মৃত্যু অঞ্চল’ বলে থাকেন। নামটি নাটকীয় শোনালেও এর পেছনে কঠিন শারীরবৃত্তীয় বাস্তবতা রয়েছে। এই উচ্চতায় শরীর পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না এবং দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে শরীর নিজেকে স্বাভাবিকভাবে পুনরুদ্ধার করতে পারে না। বিশ্রাম নিলেও পূর্ণ শক্তি ফিরে আসে না। খাবার হজম করা কঠিন হয়ে পড়ে, পেশি দুর্বল হতে থাকে এবং সামগ্রিক শারীরিক সক্ষমতা কমে যায়। অর্থাৎ পর্বতারোহী যত বেশি সময় সেখানে থাকেন, তাঁর শরীর তত বেশি ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে।

এ কারণেই এভারেস্টের চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছে গতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একজন পর্বতারোহী চাইলে সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে বিশ্রাম নিয়ে পরে আবার শক্তি ফিরে পেয়ে যাত্রা শুরু করতে পারেন না। তাঁকে সীমিত শক্তি, অক্সিজেন, আবহাওয়ার সুযোগ এবং দিনের আলো হিসাব করে এগোতে হয়। শৃঙ্গ জয়ের আকাঙ্ক্ষা যত প্রবলই হোক, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যথেষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করতে না পারলে ফিরে আসাই নিরাপদ সিদ্ধান্ত।

উচ্চতার সঙ্গে যুক্ত আরেকটি গুরুতর বিপদ হলো উচ্চতাজনিত অসুস্থতা। শরীর দ্রুত উচ্চতায় উঠে গেলে মাথাব্যথা, বমিভাব, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা এবং ঘুমের সমস্যার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে ফুসফুসে তরল জমা অথবা মস্তিষ্কে ফোলাভাবের মতো জীবনসংকটজনক অবস্থা তৈরি হতে পারে। একজন পর্বতারোহী বাইরে থেকে শক্তিশালী দেখালেও তাঁর শরীরের ভেতরে বিপজ্জনক পরিবর্তন ঘটতে পারে। এমন অবস্থায় সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপগুলোর একটি হলো দ্রুত নিচু উচ্চতায় নেমে আসা।

এই কারণেই এভারেস্টে কেউ সাধারণত মূল শিবিরে পৌঁছেই সরাসরি চূড়ার দিকে যাত্রা করেন না। শরীরকে উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য দীর্ঘ অভিযোজন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পর্বতারোহীরা ধাপে ধাপে উঁচু শিবিরে যান, কিছু সময় অবস্থান করেন এবং আবার নিচে নেমে বিশ্রাম নেন। এর ফলে শরীর অক্সিজেনস্বল্প পরিবেশের সঙ্গে কিছুটা মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়। রক্তে অক্সিজেন পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানোসহ বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু অভিযোজনেরও সীমা রয়েছে; মানুষ এভারেস্টের চূড়ার পরিবেশের সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাইয়ে নিতে পারে না।

নেপালের দক্ষিণ দিকের প্রচলিত পথে এভারেস্ট অভিযানের প্রথম বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হলো খুম্বু হিমপ্রপাত। এটি কোনো স্থির বরফের মাঠ নয়; বরং ধীরে ধীরে নিচের দিকে চলতে থাকা বিশাল হিমবাহের অত্যন্ত ভাঙাচোরা অংশ। এখানে গভীর ফাটল, বরফের বিশাল স্তম্ভ এবং অস্থিতিশীল বরফখণ্ড থাকে। বরফের কাঠামো ক্রমাগত পরিবর্তিত হওয়ায় আজ যে পথ নিরাপদ মনে হচ্ছে, পরদিন সেটির অবস্থাই বদলে যেতে পারে।

খুম্বু হিমপ্রপাতের গভীর ফাটলের ওপর বিশেষ মই বসিয়ে পার হওয়ার দৃশ্য এভারেস্ট অভিযানের অন্যতম পরিচিত চিত্র। কিন্তু ছবিতে যে কয়েক সেকেন্ডের পারাপার দেখা যায়, বাস্তবে সেটি অত্যন্ত চাপপূর্ণ। পায়ে ভারী পর্বতারোহণের জুতা ও বরফ আঁকড়ে ধরার কাঁটাযুক্ত সরঞ্জাম, পিঠে বোঝা, শরীরে নিরাপত্তার সরঞ্জাম—এসব নিয়ে সরু মইয়ের ওপর ভারসাম্য রেখে চলতে হয়। নিচে কখনো এত গভীর ফাটল থাকে যে তার তলদেশ স্পষ্টভাবে দেখা যায় না।

হিমপ্রপাতের আরেক বিপদ হলো বিশাল বরফস্তম্ভ ভেঙে পড়া। এগুলো অনেক সময় কোনো স্পষ্ট পূর্বসংকেত ছাড়াই ধসে যেতে পারে। তাই পর্বতারোহীরা সাধারণত অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা সময়ে এই অঞ্চল অতিক্রম করার চেষ্টা করেন, যখন বরফ কিছুটা স্থিতিশীল থাকে। সূর্যের তাপে বরফের কাঠামো পরিবর্তিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়তে পারে। কিন্তু কোনো সময়ই খুম্বু হিমপ্রপাতকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায় না।

খুম্বু পার হওয়ার পরও বিপদ শেষ হয় না। পশ্চিম কুম নামে পরিচিত বিস্তৃত তুষারাবৃত উপত্যকা বাইরে থেকে তুলনামূলক শান্ত মনে হতে পারে। কিন্তু বরফ ও চারপাশের পাহাড় থেকে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে দিনের বেলায় সেখানে প্রচণ্ড তাপ অনুভূত হতে পারে, আবার বাতাস ও ছায়ায় তাপমাত্রা দ্রুত কমে যায়। গভীর বরফের ফাটলও তুষারের পাতলা আবরণের নিচে লুকিয়ে থাকতে পারে। ফলে দৃশ্যত সমতল পথও সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়।

এরপর আসে লোৎসে মুখের খাড়া বরফাচ্ছাদিত অংশ। এখানে স্থির দড়ি ধরে অত্যন্ত খাড়া বরফের ওপর উঠতে হয়। উচ্চতার কারণে তখন শরীর আগেই দুর্বল। ভারী পোশাক, অক্সিজেনের সরঞ্জাম ও অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে প্রতিটি পদক্ষেপে প্রচুর শক্তি ব্যয় হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠে কয়েক মিনিটে যে দূরত্ব হাঁটা সম্ভব, সেই একই ধরনের পরিশ্রম উচ্চতায় অনেক দীর্ঘ সময় নিতে পারে।

এভারেস্টের ওপরের দিকে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা আরেকটি প্রধান শত্রু হয়ে ওঠে। তাপমাত্রা অত্যন্ত নিচে নেমে যেতে পারে এবং প্রবল বাতাস শরীর থেকে তাপ দ্রুত সরিয়ে নেয়। ফলে বাস্তব তাপমাত্রার তুলনায় অনুভূত ঠান্ডা আরও ভয়াবহ হতে পারে। আঙুল, পায়ের আঙুল, নাক ও মুখের মতো উন্মুক্ত বা দূরবর্তী অংশে রক্তসঞ্চালন কমে গেলে তুষারদাহের ঝুঁকি তৈরি হয়। গুরুতর তুষারদাহ স্থায়ীভাবে টিস্যু নষ্ট করে দিতে পারে।

এখানে পোশাক তাই আরাম বা সৌন্দর্যের বিষয় নয়, জীবনরক্ষার ব্যবস্থা। একাধিক স্তরের বিশেষ পোশাক শরীরের তাপ ধরে রাখে। কিন্তু একই সঙ্গে পর্বতারোহীকে ঘাম নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। অতিরিক্ত পরিশ্রমে ভেতরের পোশাক ভিজে গেলে পরে বিশ্রামের সময় সেই আর্দ্রতা শরীরকে দ্রুত ঠান্ডা করে দিতে পারে। ফলে কখন দ্রুত চলতে হবে, কখন ধীর হতে হবে এবং কখন পোশাকের স্তর সামঞ্জস্য করতে হবে—এসবও অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।

এভারেস্টে বাতাস নিজেই একটি বিপজ্জনক শক্তি। বছরের অধিকাংশ সময় শৃঙ্গের কাছাকাছি অত্যন্ত প্রবল উচ্চগতির বায়ুপ্রবাহ থাকতে পারে। কখনো শৃঙ্গ থেকে উড়ে যাওয়া বরফ দূর থেকে বিশাল সাদা পতাকার মতো দেখা যায়। এত প্রবল বাতাসে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে, শরীরের তাপ দ্রুত কমে এবং উন্মুক্ত স্থানে ভারসাম্য বজায় রাখাও বিপজ্জনক হতে পারে।

এ কারণেই শীর্ষে ওঠার অভিযান সাধারণত আবহাওয়ার একটি সীমিত অনুকূল সময়কে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত হয়। বছরের বিশেষ সময়ে উচ্চ বায়ুমণ্ডলের প্রবল বায়ুপ্রবাহ কিছুটা সরে গেলে কয়েক দিনের জন্য তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। পর্বতারোহীরা সেই সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু পাহাড়ের আবহাওয়া দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। পূর্বাভাস ভালো থাকলেও পরিস্থিতি প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত খারাপ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয় না।

তুষারধস এভারেস্ট অঞ্চলের আরেক বাস্তব বিপদ। নতুন তুষার, প্রবল বাতাসে জমে থাকা তুষারের স্তর, তাপমাত্রার পরিবর্তন এবং বরফের অস্থিতিশীলতা মিলিয়ে কোনো ঢাল বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। বিশাল বরফখণ্ড ভেঙে পড়লেও তুষার ও বরফের ধস সৃষ্টি হতে পারে। পর্বতারোহীর দক্ষতা অনেক ঝুঁকি কমাতে পারে, কিন্তু পাহাড়ের বিশাল প্রাকৃতিক কাঠামোর আচরণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

চূড়ান্ত আরোহণের সময় ক্লান্তি বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছায়। অনেক দল রাতের অন্ধকারেই সর্বোচ্চ শিবির থেকে যাত্রা শুরু করে, যাতে সকালে বা দিনের প্রথম ভাগে শৃঙ্গে পৌঁছে পর্যাপ্ত সময় হাতে রেখে নিচে নামা যায়। মাথায় আলো, শরীরে ভারী পোশাক, মুখে অক্সিজেনের মুখোশ—এই অবস্থায় অন্ধকারের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে হয়। কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার পরই থেমে শ্বাস নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

পরিপূরক অক্সিজেন এভারেস্ট অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অধিকাংশ পর্বতারোহী ওপরের উচ্চতায় অক্সিজেনের বোতল ব্যবহার করেন। কিন্তু এই ব্যবস্থাও সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ততার নিশ্চয়তা দেয় না। বোতলে অক্সিজেন সীমিত, প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং মুখোশ বা নিয়ন্ত্রক যন্ত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত অক্সিজেন বহন করলে আবার ওজন বাড়ে। ফলে কতটি বোতল কোথায় রাখা হবে, কত গতিতে অক্সিজেন ব্যবহার করা হবে এবং জরুরি অবস্থার জন্য কতটা মজুত থাকবে—সবকিছু পরিকল্পনার অংশ।

এভারেস্টের ওপরের অংশে সরু পথ এবং স্থির দড়ির কারণে মানুষের ভিড়ও বিপদ বাড়াতে পারে। একই অনুকূল আবহাওয়ার সুযোগে অনেক অভিযাত্রী শৃঙ্গের দিকে গেলে নির্দিষ্ট স্থানে অপেক্ষার সারি তৈরি হতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠে আধঘণ্টা অপেক্ষা করা সাধারণ ব্যাপার হলেও মৃত্যু অঞ্চলে অপ্রয়োজনীয় অপেক্ষা মানে শরীরের শক্তি ও অক্সিজেনের মজুত কমতে থাকা। ঠান্ডায় স্থির দাঁড়িয়ে থাকাও শরীরের জন্য বিপজ্জনক।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চূড়ায় পৌঁছানো অভিযানের শেষ নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে নামার সময়ই সবচেয়ে বড় বিপদ তৈরি হয়। শীর্ষে ওঠার পর একজন পর্বতারোহী মানসিকভাবে উচ্ছ্বসিত হলেও তাঁর শরীর তখন দিনের সবচেয়ে ক্লান্ত অবস্থায় থাকে। অক্সিজেন কমে এসেছে, পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে, বহু ঘণ্টার পরিশ্রমে পেশি দুর্বল এবং মনোযোগও কমে যেতে পারে। অথচ নামার সময়ও একই খাড়া ঢাল, দড়ি, বরফ ও ফাটল অতিক্রম করতে হয়।

এই বাস্তবতা থেকেই পর্বতারোহণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা এসেছে—শৃঙ্গ ঐচ্ছিক, ফিরে আসা বাধ্যতামূলক। চূড়া থেকে কয়েকশ মিটার দূরে পৌঁছেও সময়, আবহাওয়া বা শারীরিক অবস্থার কারণে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। এটি মানসিকভাবে অত্যন্ত কঠিন। মাসের পর মাস প্রস্তুতি, বিপুল অর্থব্যয় এবং এত কষ্টের পর সামনে চূড়া দেখা গেলে ফিরে আসতে মানুষের মন স্বাভাবিকভাবেই বাধা দেয়। কিন্তু এভারেস্টে আবেগের চেয়ে পরিস্থিতি বিচার করার ক্ষমতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এভারেস্ট জয়ের আরেকটি কম আলোচিত কঠিন দিক হলো পানিশূন্যতা ও পুষ্টির ঘাটতি। ঠান্ডায় তৃষ্ণা কম অনুভূত হলেও দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীর থেকে প্রচুর আর্দ্রতা বেরিয়ে যায়। উচ্চতায় ক্ষুধা কমে যাওয়ায় পর্যাপ্ত শক্তি গ্রহণ করাও কঠিন হয়। পানি পেতে বরফ গলাতে হয়, যার জন্য জ্বালানি ও সময় প্রয়োজন। অথচ শরীরকে উষ্ণ রাখা এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা আরোহণ চালিয়ে যাওয়ার জন্য বিপুল শক্তি দরকার।

ঘুমের সমস্যাও অভিযানের সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। উচ্চতায় অনেকের ঘুম বারবার ভেঙে যায়, শ্বাসের স্বাভাবিক ছন্দে পরিবর্তন ঘটে এবং শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায় না। কয়েক সপ্তাহ ধরে এমন পরিস্থিতির মধ্যে অভিযাত্রীদের চলতে হয়। ফলে চূড়ান্ত অভিযানের আগেই শরীরে দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি জমে থাকতে পারে। এভারেস্টে একজন মানুষ একদিনের জন্য শক্তিশালী হলেই যথেষ্ট নয়; তাঁকে কয়েক সপ্তাহ ধরে নিজের শারীরিক সক্ষমতা সংরক্ষণ করতে হয়।

এর সঙ্গে রয়েছে মানসিক চাপ। চারপাশে বিপজ্জনক ভূখণ্ড, আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা, পরিবার থেকে দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা এবং নিজের সক্ষমতা নিয়ে সংশয়—সব মিলিয়ে মানসিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মৃত্যু অঞ্চলে অক্সিজেনের অভাব চিন্তাশক্তি দুর্বল করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। কখন এগোতে হবে, কখন থামতে হবে এবং কখন ফিরে যেতে হবে—এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য শুধু সাহস নয়, শৃঙ্খলা ও বাস্তববোধ দরকার।

এভারেস্ট অভিযান ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার গল্প হলেও এর পেছনে বিশাল দলগত ব্যবস্থা কাজ করে। বিশেষ করে নেপালের শেরপা জনগোষ্ঠীর দক্ষ পর্বতারোহীরা বহু অভিযানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পথ প্রস্তুত করা, দড়ি স্থাপন, সরঞ্জাম ও অক্সিজেন বহন, উঁচু শিবির স্থাপন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা করার মতো কঠিন কাজের বড় অংশ তাঁদের ওপর নির্ভর করে। এভারেস্ট জয়ের বহু বিখ্যাত কাহিনির আড়ালে তাই স্থানীয় উচ্চপর্বত কর্মীদের দক্ষতা, শ্রম এবং ঝুঁকি গ্রহণের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

১৯৫৩ সালের ২৯ মে এডমন্ড হিলারি এবং তেনজিং নোরগে সফলভাবে এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। তাঁদের সাফল্য আধুনিক এভারেস্ট অভিযানের প্রতীক হয়ে আছে। কিন্তু পরবর্তী দশকগুলোতে পোশাক, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, যোগাযোগব্যবস্থা, অক্সিজেন সরঞ্জাম এবং আরোহণের প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে উন্নত হলেও এভারেস্ট কখনো সহজ পাহাড়ে পরিণত হয়নি। প্রযুক্তি ঝুঁকি কমাতে পারে, কিন্তু উচ্চতা ও প্রকৃতির মৌলিক সীমাবদ্ধতা দূর করতে পারে না।

আজ বাণিজ্যিক অভিযানের মাধ্যমে অভিজ্ঞ গাইড, পূর্বনির্ধারিত শিবির, স্থির দড়ি, আবহাওয়ার তথ্য এবং অক্সিজেন সহায়তা পাওয়া সম্ভব। বাইরে থেকে তাই মনে হতে পারে, পর্যাপ্ত অর্থ থাকলেই এভারেস্টে ওঠা যায়। বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। অর্থ ভালো সরঞ্জাম ও সহায়তা কিনতে পারে, কিন্তু উচ্চতায় শরীর কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে তা কিনে নেওয়া যায় না। খারাপ আবহাওয়া থামানো যায় না, বরফের কাঠামোকে স্থির রাখা যায় না এবং মৃত্যুঅঞ্চলে শরীরের অক্সিজেনস্বল্পতাও পুরোপুরি দূর করা যায় না।

উদ্ধারকাজও এখানে সাধারণ পাহাড়ি এলাকার মতো সহজ নয়। নিচু উচ্চতায় অসুস্থ মানুষকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার যে সুযোগ থাকে, এভারেস্টের অত্যন্ত উঁচু অঞ্চলে তা সীমিত। প্রতিকূল আবহাওয়া, উচ্চতা ও ভূখণ্ডের কারণে আকাশপথে উদ্ধার সব জায়গায় বা সব সময় সম্ভব হয় না। গুরুতর অসুস্থ একজন পর্বতারোহীকে নিচে নামাতে অন্যদেরও প্রচণ্ড ঝুঁকি নিতে হতে পারে। ফলে প্রতিটি অভিযাত্রীকে এমন মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই উঠতে হয় যে জরুরি পরিস্থিতিতে সাহায্য পৌঁছাতে দেরি হতে পারে।

এভারেস্টের কঠিনতা তাই কোনো একটি বিপদ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। যদি শুধু ঠান্ডা থাকত, উন্নত পোশাক দিয়ে তার মোকাবিলা করা যেত। শুধু খাড়া বরফ থাকলে দক্ষতা ও দড়ি দিয়ে ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতো। শুধু অক্সিজেনের ঘাটতি থাকলে পরিপূরক অক্সিজেন অনেকটা সমাধান দিত। কিন্তু এভারেস্টে এই সমস্যাগুলো একই সঙ্গে উপস্থিত থাকে। একজন ক্লান্ত পর্বতারোহী অক্সিজেনস্বল্প অবস্থায় প্রচণ্ড ঠান্ডা ও বাতাসের মধ্যে খাড়া বরফের ওপর দাঁড়িয়ে যখন জটিল সিদ্ধান্ত নেন, তখন প্রতিটি ঝুঁকি অন্য ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

এই কারণেই পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দুতে দাঁড়ানোর কয়েক মিনিটের পেছনে থাকে মাস কিংবা বছরের প্রস্তুতি এবং বহু সপ্তাহের অভিযান। শারীরিক প্রশিক্ষণ, উচ্চতার সঙ্গে অভিযোজন, প্রযুক্তিগত আরোহণের দক্ষতা, আবহাওয়া বোঝা, সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনা, অক্সিজেন পরিকল্পনা, পুষ্টি, দলগত সমন্বয় এবং মানসিক দৃঢ়তা—সবকিছুর সমন্বয় ছাড়া নিরাপদে চূড়ায় পৌঁছে ফিরে আসা অত্যন্ত কঠিন।

মাউন্ট এভারেস্ট মানুষের কাছে এত আকর্ষণীয় সম্ভবত শুধু এই কারণে নয় যে এটি পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত। এর আকর্ষণের গভীরে রয়েছে মানুষের সীমাবদ্ধতাকে পরীক্ষা করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। চূড়ায় পৌঁছানোর শেষ কয়েকশ মিটারে পৃথিবীকে নিচে রেখে মানুষ এমন এক পরিবেশে প্রবেশ করে, যেখানে তার শরীর প্রকৃত অর্থেই টিকে থাকার সংগ্রাম করছে। প্রতিটি শ্বাস মূল্যবান, প্রতিটি পদক্ষেপ কষ্টকর এবং প্রতিটি সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এভারেস্ট জয় আসলে শুধু ৮,৮৪৯ মিটার ওপরে ওঠার গল্প নয়; এটি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিকূল পরিবেশগুলোর একটিতে নিজের শারীরিক ও মানসিক সীমার কাছে পৌঁছে আবার নিরাপদে ফিরে আসার গল্প।


You may also like