বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

প্রশান্ত মহাসাগর: পৃথিবীর বৃহত্তম ও গভীরতম মহাসাগর আসলে কতটা বিশাল?

  • Author: Admin
  • September 03, 2026
প্রশান্ত মহাসাগর: পৃথিবীর বৃহত্তম ও গভীরতম মহাসাগর আসলে কতটা বিশাল?
পৃথিবীর নীল বিস্ময় প্রশান্ত মহাসাগর

পৃথিবীকে মহাকাশ থেকে দেখলে প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো এর নীল রং। স্থলভাগের তুলনায় জলভাগ এত বেশি যে পৃথিবীকে নীল গ্রহ বলাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই বিপুল জলরাশির মধ্যেও একটি মহাসাগর অন্য সবকিছুকে আকার, গভীরতা এবং ভূতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যের দিক থেকে ছাড়িয়ে গেছে—প্রশান্ত মহাসাগর। পৃথিবীর বৃহত্তম মহাসাগর বললে এর প্রকৃত বিশালতা পুরোপুরি বোঝানো যায় না। এটি এত বড় যে পৃথিবীর সমস্ত স্থলভাগকে একত্র করলেও তার তুলনায় প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তার বেশি। আবার পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর পরিচিত স্থানটিও রয়েছে এই মহাসাগরের তলদেশে।

প্রশান্ত মহাসাগরের আয়তন প্রায় ১৬ কোটি ৫০ লাখ বর্গকিলোমিটার। পৃথিবীর মোট মহাসাগরীয় জলভাগের প্রায় অর্ধেকই এর অন্তর্ভুক্ত। পৃথিবীর সম্পূর্ণ পৃষ্ঠেরও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জুড়ে রয়েছে এই এক মহাসাগর। সংখ্যাগুলো কল্পনা করা কঠিন, কারণ মানুষের পরিচিত কোনো দেশ বা মহাদেশের সঙ্গে এর সরাসরি তুলনা চলে না। পৃথিবীর সাতটি মহাদেশের স্থলভাগ একত্র করলে যে আয়তন পাওয়া যায়, প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তার তার চেয়েও বেশি। অর্থাৎ পৃথিবীর সমস্ত দেশ, মরুভূমি, পর্বতমালা, বনভূমি, নগর এবং কৃষিভূমিকে একটি কাল্পনিক অঞ্চলে একত্র করলেও প্রশান্ত মহাসাগরের বিশালতার ধারণা পুরোপুরি ধরা যায় না।

এই মহাসাগর উত্তরে বেরিং প্রণালীর কাছাকাছি অঞ্চল থেকে দক্ষিণে অ্যান্টার্কটিকার আশপাশ পর্যন্ত বিস্তৃত। পূর্বদিকে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার দীর্ঘ উপকূল এবং পশ্চিমদিকে এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার উপকূল এর সীমা গঠন করেছে। বিষুবরেখার আশপাশে এর পূর্ব-পশ্চিম বিস্তার বিশেষভাবে বিশাল। কোনো কোনো অংশে এশিয়া থেকে আমেরিকা পর্যন্ত হাজার হাজার কিলোমিটার শুধু জল আর জল। মাঝখানে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য দ্বীপ, প্রবালপ্রাচীর এবং ক্ষুদ্র দ্বীপপুঞ্জ।

প্রশান্ত মহাসাগরের নাম শুনে শান্ত জলরাশির ধারণা তৈরি হলেও বাস্তবে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় অঞ্চলগুলোর একটি। ষোড়শ শতকে পর্তুগিজ নাবিক ফের্দিনান্দ ম্যাগেলান দক্ষিণ আমেরিকার প্রণালী অতিক্রম করে এই মহাসাগরে প্রবেশ করার পর তুলনামূলক শান্ত আবহাওয়া ও জল দেখে এর নামকরণের সঙ্গে শান্তির ধারণা যুক্ত করেন। কিন্তু মহাসাগরটির প্রকৃতি মোটেও সর্বদা শান্ত নয়। এখানে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়গুলোর কিছু সৃষ্টি হয়, প্রচণ্ড ঢেউ দেখা যায়, বিধ্বংসী সুনামি তৈরি হয় এবং এর চারপাশে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরি অঞ্চল।

প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরতাও এর আয়তনের মতোই বিস্ময়কর। এর গড় গভীরতা প্রায় চার হাজার মিটার। অর্থাৎ এই মহাসাগরের তলদেশকে যদি কোনোভাবে সমতল ধরে কল্পনা করা যায়, তাহলেও অধিকাংশ স্থানে পানির স্তর কয়েক কিলোমিটার গভীর হবে। কিন্তু বাস্তবে তলদেশ মোটেও সমতল নয়। সেখানে রয়েছে বিশাল সমুদ্রতলীয় পর্বতমালা, গভীর খাদ, সমুদ্রতলীয় সমভূমি, আগ্নেয়গিরি, বিচ্ছিন্ন পর্বতশৃঙ্গ এবং ভূত্বকের বিশাল ফাটল।

এই গভীরতার সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ মারিয়ানা খাদ। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের কাছে অবস্থিত এই বিশাল সমুদ্রখাদে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর পরিচিত অঞ্চল—চ্যালেঞ্জার ডিপ। বিভিন্ন পরিমাপে এর গভীরতা কিছুটা ভিন্ন পাওয়া গেলেও এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় এগারো কিলোমিটার নিচে পৌঁছেছে। এই গভীরতা উপলব্ধি করার জন্য পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এভারেস্টকে কল্পনা করা যেতে পারে। এভারেস্টের উচ্চতা প্রায় আট দশমিক আট কিলোমিটার। পুরো এভারেস্টকে চ্যালেঞ্জার ডিপে বসিয়ে দিলেও তার চূড়া সমুদ্রপৃষ্ঠে পৌঁছাবে না; তার ওপরেও দুই কিলোমিটারের বেশি পানি থেকে যাবে।

এত গভীরে পরিবেশ মানুষের পরিচিত পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সূর্যের আলো সেখানে পৌঁছায় না। চারদিকে স্থায়ী অন্ধকার, পানির তাপমাত্রা অত্যন্ত কম এবং চাপ অবিশ্বাস্য রকম বেশি। চ্যালেঞ্জার ডিপের তলদেশে চাপ সমুদ্রপৃষ্ঠের বায়ুচাপের এক হাজার গুণেরও বেশি হতে পারে। সাধারণ ডুবোজাহাজ সেখানে মুহূর্তেই চূর্ণ হয়ে যেতে পারে। বিশেষভাবে নির্মিত গভীর সমুদ্রযান ছাড়া মানুষের পক্ষে এমন অঞ্চলে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

তবু এই অন্ধকার ও প্রচণ্ড চাপের জগত সম্পূর্ণ প্রাণহীন নয়। প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর অঞ্চলে এমন সব জীব পাওয়া গেছে, যারা আলোহীন, ঠান্ডা এবং উচ্চচাপের পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজিত। গভীর সমুদ্রের বিভিন্ন স্তরে অদ্ভুত আকৃতির মাছ, স্বচ্ছ বা কোমলদেহী প্রাণী, ক্ষুদ্র ক্রাস্টেশীয় প্রাণী এবং নানা অণুজীব বাস করে। কিছু অঞ্চলে আবার সমুদ্রতলের উষ্ণ প্রস্রবণের আশপাশে সূর্যালোকের ওপর নির্ভর না করেই সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠেছে।

প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশ বোঝার জন্য ভূত্বকের পাতগুলোর চলাচল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর বৃহত্তম ভূত্বকীয় পাতগুলোর একটি হলো প্রশান্ত পাত। এই পাত এবং এর চারপাশের অন্যান্য পাতের পারস্পরিক সংঘর্ষ, নিমজ্জন ও সরে যাওয়ার কারণে মহাসাগরটির চারদিকে অসংখ্য ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরি সৃষ্টি হয়েছে। এই অঞ্চলকে সাধারণভাবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় আগ্নেয় বলয় বলা হয়।

এই আগ্নেয় বলয় প্রায় চল্লিশ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বিশাল ভূতাত্ত্বিক অঞ্চল হিসেবে প্রশান্ত মহাসাগরকে ঘিরে রেখেছে। দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকার পশ্চিম উপকূল থেকে আলাস্কা, আলেউশিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, কামচাটকা, জাপান, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়ার কিছু অঞ্চল এবং দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে এর বিস্তার। পৃথিবীর সক্রিয় ও সম্ভাব্য সক্রিয় আগ্নেয়গিরির একটি বড় অংশ এই অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত। পৃথিবীর অধিকাংশ শক্তিশালী ভূমিকম্পও প্রশান্ত মহাসাগর ঘিরে থাকা পাতসীমার কাছাকাছি ঘটে।

এই ভূতাত্ত্বিক অস্থিরতার কারণেই প্রশান্ত মহাসাগর সুনামির জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। সমুদ্রতলের নিচে বড় ভূমিকম্প হলে বিশাল জলরাশি হঠাৎ স্থানচ্যুত হতে পারে। সেই শক্তি দীর্ঘ তরঙ্গ হিসেবে মহাসাগর পেরিয়ে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের উপকূলেও পৌঁছাতে পারে। গভীর সমুদ্রে এই তরঙ্গ খুব বেশি উঁচু মনে না হলেও অগভীর উপকূলীয় অঞ্চলে পৌঁছে তা ভয়াবহ উচ্চতার জলপ্রাচীরে পরিণত হতে পারে।

প্রশান্ত মহাসাগর শুধু গভীর খাদে পূর্ণ নয়; এর তলদেশে রয়েছে অসংখ্য পর্বতও। সমুদ্রের নিচে এমন হাজার হাজার পাহাড় ও আগ্নেয় পর্বত রয়েছে, যাদের অনেকগুলোর চূড়া কখনো সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপরে ওঠেনি। আবার কোনো কোনো আগ্নেয় পর্বতের চূড়া পানির ওপর উঠে দ্বীপে পরিণত হয়েছে। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ এর অসাধারণ উদাহরণ। সমুদ্রতলের নিচ থেকে পরিমাপ করলে হাওয়াই অঞ্চলের বিশাল আগ্নেয় পর্বতগুলোর প্রকৃত উচ্চতা পৃথিবীর স্থলভাগের অনেক বিখ্যাত পর্বতের উচ্চতার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে।

প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপের সংখ্যাও বিস্ময়কর। এর মধ্যে রয়েছে হাওয়াই, সামোয়া, টোঙ্গা, ফিজি, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ এবং আরও অসংখ্য দ্বীপ ও প্রবালদ্বীপ। প্রশান্ত মহাসাগরের বহু ক্ষুদ্র দ্বীপ এত বিচ্ছিন্ন যে নিকটতম বৃহৎ স্থলভাগ থেকে সেগুলোর দূরত্ব হাজার হাজার কিলোমিটার হতে পারে। এই বিচ্ছিন্নতা বিভিন্ন দ্বীপে স্বতন্ত্র প্রাণবৈচিত্র্য, ভাষা এবং সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

মানব ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রশান্ত মহাসাগর অসাধারণ। আধুনিক নৌযান, মানচিত্র বা দিকনির্ণয় ব্যবস্থা আবিষ্কারের বহু আগে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপবাসীরা বিশাল সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিল। তারা নক্ষত্র, সূর্য, ঢেউয়ের ধরন, বাতাস, মেঘ এবং পাখির চলাচল পর্যবেক্ষণ করে এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যাত্রা করত। পলিনেশীয় নাবিকদের এই সমুদ্রজ্ঞান মানবসভ্যতার অন্যতম বিস্ময়কর নৌচালনা ঐতিহ্য।

প্রশান্ত মহাসাগরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর বিশাল স্রোতব্যবস্থা। সমুদ্রের পানি স্থির নয়; বায়ুপ্রবাহ, পৃথিবীর ঘূর্ণন, তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার পার্থক্যসহ বিভিন্ন কারণে পানি বিশাল স্রোতের আকারে চলাচল করে। উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের কুরোশিও স্রোত এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। উষ্ণ এই স্রোত পূর্ব এশিয়ার সামুদ্রিক পরিবেশ ও আবহাওয়ায় প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে ক্যালিফোর্নিয়া স্রোতের মতো শীতল স্রোত উত্তর আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

প্রশান্ত মহাসাগর পৃথিবীর আবহাওয়া ও জলবায়ু ব্যবস্থারও অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক। এর বিশাল জলরাশি বিপুল পরিমাণ সৌরশক্তি গ্রহণ, সংরক্ষণ এবং পুনর্বণ্টন করে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার পরিবর্তন বায়ুমণ্ডলের প্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে এবং তার প্রভাব প্রশান্ত মহাসাগরের সীমানা ছাড়িয়ে পৃথিবীর বহু অঞ্চলে পৌঁছায়।

এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ এল নিনো ও লা নিনা। স্বাভাবিক অবস্থায় বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরে বায়ু ও সমুদ্রস্রোতের একটি নির্দিষ্ট বিন্যাস থাকে। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের পানি অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে উঠলে এল নিনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। বিপরীতভাবে একই অঞ্চলের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ঠান্ডা হলে লা নিনা দেখা দিতে পারে। এই পরিবর্তন বৃষ্টিপাত, খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা এবং কৃষি উৎপাদনের ওপর পৃথিবীর বহু অঞ্চলে প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রশান্ত মহাসাগরের বিশালতা বোঝার আরেকটি উপায় হলো এর সময় অঞ্চলের দিকে তাকানো। আন্তর্জাতিক তারিখরেখার একটি বড় অংশ প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে গেছে। ফলে এই মহাসাগরের দুই পাশের দ্বীপ বা অঞ্চলের মধ্যে ক্যালেন্ডারের তারিখে এক দিনের পার্থক্য থাকতে পারে। পৃথিবীতে নতুন দিন শুরু হওয়া এবং আগের দিন শেষ হওয়ার ভৌগোলিক নাটকীয়তা এই বিশাল মহাসাগরের মাঝেই সবচেয়ে স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়।

জীববৈচিত্র্যের ক্ষেত্রেও প্রশান্ত মহাসাগর অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ। উষ্ণমণ্ডলীয় প্রবালপ্রাচীর থেকে শীতল উত্তরাঞ্চলীয় সমুদ্র পর্যন্ত এখানে অসংখ্য সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র রয়েছে। তিমি, ডলফিন, হাঙর, সামুদ্রিক কচ্ছপ, টুনা, অক্টোপাস, জেলিফিশ, প্রবাল এবং অসংখ্য ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণী এই মহাসাগরের বিভিন্ন অঞ্চলে বাস করে। সমুদ্রের অতি ক্ষুদ্র উদ্ভিদসদৃশ অণুজীবও সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল এবং পৃথিবীর কার্বনচক্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

প্রশান্ত মহাসাগরের সম্পদ মানুষের অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যক্ষেত্রগুলোর অনেকগুলো এখানে অবস্থিত। কোটি কোটি মানুষের খাদ্য ও জীবিকা প্রশান্ত মহাসাগরের সামুদ্রিক সম্পদের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। একই সঙ্গে এশিয়া, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও ওশেনিয়ার মধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিশাল অংশ এই মহাসাগরের নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রতিদিন অসংখ্য পণ্যবাহী জাহাজ এর ওপর দিয়ে চলাচল করে।

তবে এই বিশাল মহাসাগর মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। প্লাস্টিক বর্জ্য, অতিরিক্ত মাছ ধরা, সামুদ্রিক দূষণ, প্রবালপ্রাচীরের ক্ষতি, সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং অম্লতার পরিবর্তন প্রশান্ত মহাসাগরের বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রকে চাপের মুখে ফেলছে। উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলে স্রোতের কারণে বিপুল পরিমাণ ভাসমান প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য জমা হওয়ার ঘটনাও বিশেষভাবে আলোচিত। এটিকে কোনো শক্ত প্লাস্টিকের দ্বীপ ভাবা ভুল; বরং বিশাল জলসীমায় বিভিন্ন ঘনত্বে ছড়িয়ে থাকা ভাসমান ও ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার অঞ্চল হিসেবে বোঝা বেশি সঠিক।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রশান্ত মহাসাগরের ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। অনেক প্রবালদ্বীপের সর্বোচ্চ উচ্চতাই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে খুব সামান্য। ফলে কয়েক দশকে সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনামূলক ছোট পরিবর্তনও উপকূল ক্ষয়, লবণাক্ত পানি ভূগর্ভস্থ মিঠাপানিতে প্রবেশ এবং বসতিপূর্ণ ভূমি হারানোর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরের বিশালতা তাই শুধু প্রাকৃতিক বিস্ময়ের বিষয় নয়; এটি বর্তমান পৃথিবীর পরিবেশগত ভবিষ্যতের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত বড় মহাসাগর সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান এখনও অসম্পূর্ণ। উপগ্রহের মাধ্যমে সমুদ্রপৃষ্ঠ অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হলেও গভীর সমুদ্রের তলদেশ সরাসরি উচ্চমাত্রার বিস্তারিত মানচিত্রে রূপান্তর করা কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। আধুনিক শব্দতরঙ্গভিত্তিক জরিপ, স্বয়ংক্রিয় ডুবোযান এবং দূরনিয়ন্ত্রিত সমুদ্রযানের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা ক্রমাগত নতুন তথ্য সংগ্রহ করছেন। তবু প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরতম অঞ্চলগুলোর বহু অংশ এখনও মানুষের প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের বাইরে।

প্রশান্ত মহাসাগরকে তাই শুধু পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জলরাশি হিসেবে দেখলে এর গুরুত্বের সামান্য অংশই বোঝা যায়। এটি একই সঙ্গে পৃথিবীর বৃহত্তম মহাসাগরীয় অববাহিকা, গভীরতম পরিচিত স্থানের আবাস, অসংখ্য আগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্পের ক্ষেত্র, হাজার হাজার দ্বীপের জন্মভূমি, বৈশ্বিক জলবায়ুর অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক এবং অগণিত প্রাণের বিশাল আবাসস্থল।

একদিকে এর পৃষ্ঠে সূর্যের আলোয় ঝলমলে নীল জল, প্রবালদ্বীপ ও সবুজ দ্বীপপুঞ্জ; অন্যদিকে কয়েক কিলোমিটার নিচে রয়েছে আলোহীন এমন এক পৃথিবী, যেখানে চাপ মানুষের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়। কোথাও সমুদ্রতলের নিচে নতুন ভূত্বকীয় পরিবর্তন ঘটছে, কোথাও একটি পাত অন্য পাতের নিচে নিমজ্জিত হচ্ছে, কোথাও আগ্নেয়গিরি নতুন দ্বীপ তৈরির পথ তৈরি করছে, আবার কোথাও গভীর খাদে এমন প্রাণ বেঁচে রয়েছে যাদের অস্তিত্ব একসময় অসম্ভব বলে মনে হতে পারত।

পৃথিবীর মানচিত্রে প্রশান্ত মহাসাগরকে দেখে আমরা সাধারণত একটি বিশাল নীল অঞ্চল দেখি। কিন্তু সেই নীল রঙের নিচে লুকিয়ে রয়েছে পর্বত, খাদ, আগ্নেয়গিরি, সমভূমি, জীবজগৎ এবং কোটি কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসে গড়ে ওঠা এক সম্পূর্ণ জগৎ। এর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের দূরত্ব, প্রায় এগারো কিলোমিটার গভীর খাদ এবং পৃথিবীর পৃষ্ঠের প্রায় এক-তৃতীয়াংশজুড়ে বিস্তার একসঙ্গে বিবেচনা করলে বোঝা যায়—প্রশান্ত মহাসাগর শুধু পৃথিবীর বৃহত্তম মহাসাগর নয়, এটি আমাদের গ্রহের সবচেয়ে বিশাল, গতিশীল এবং এখনও অনেকটাই অজানা প্রাকৃতিক জগতগুলোর একটি।


You may also like