ইরানি বিপ্লব ১৯৭৯: শাহের পতন, খোমেনির উত্থান ও ইরানের আমূল পরিবর্তনের ইতিহাস
- Author: Admin
- August 30, 2026
১৯৭৯—যে বিপ্লব ইরানকে আমূল বদলে দিয়েছিল
১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এমন এক রাজনৈতিক বিস্ফোরণ, যার অভিঘাত শুধু ইরানের শাসনব্যবস্থাই বদলে দেয়নি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য, ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক কৌশল এবং ইসলামী রাজনৈতিক আন্দোলনের গতিপথকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এই বিপ্লবের মাধ্যমে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী প্রজাতন্ত্র। কিন্তু ঘটনাটি কেবল একজন স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ জনগণের বিদ্রোহ ছিল না। এর ভেতরে একই সঙ্গে কাজ করেছিল রাজতন্ত্রবিরোধী জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় ক্ষোভ, রাজনৈতিক দমন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, দ্রুত আধুনিকায়নের সামাজিক অভিঘাত, বিদেশি হস্তক্ষেপের স্মৃতি এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন আদর্শের বিরোধী শক্তিগুলোর সাময়িক ঐক্য।
ইরানি বিপ্লবের গভীর শিকড় বুঝতে হলে ১৯৫৩ সালের ঘটনায় ফিরে যেতে হয়। সে সময় প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ইরানের তেলশিল্প জাতীয়করণের উদ্যোগ নিয়ে ব্রিটিশ স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। রাজনৈতিক সংঘাতের এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দা তৎপরতার সহায়তায় মোসাদ্দেকের সরকার উৎখাত হয়। এরপর শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ক্ষমতা অনেক বেশি সুসংহত হয়ে ওঠে। বহু ইরানির কাছে এই ঘটনা ছিল জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রতীক। পরবর্তী কয়েক দশকে শাহের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক যত গভীর হয়েছে, ১৯৫৩ সালের সেই স্মৃতিও বিরোধীদের রাজনৈতিক ভাষায় তত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
শাহের লক্ষ্য ছিল ইরানকে দ্রুত একটি আধুনিক, শিল্পোন্নত এবং সামরিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রে রূপান্তর করা। ১৯৬৩ সালে তিনি যে সংস্কার কর্মসূচি শুরু করেন, সেটি ‘শ্বেত বিপ্লব’ নামে পরিচিত হয়। ভূমি সংস্কার, নারীদের ভোটাধিকার, শিক্ষা সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্পায়ন এবং গ্রামীণ উন্নয়নের মতো নানা উদ্যোগ এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব সংস্কারের কিছু ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতিও হয়েছিল। শিক্ষার বিস্তার ঘটে, নগরায়ণ দ্রুত বাড়ে, নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠে এবং তেলের অর্থে রাষ্ট্রের অবকাঠামো ও সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়।
কিন্তু দ্রুত পরিবর্তনের মূল্যও ছিল বিশাল। ভূমি সংস্কার পুরোনো ভূস্বামী কাঠামো দুর্বল করলেও বহু কৃষকের জন্য পর্যাপ্ত জীবিকা নিশ্চিত করতে পারেনি। বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রাম ছেড়ে তেহরানসহ বড় শহরে চলে আসে। নগর অর্থনীতি এত দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। একদিকে তেলের বিপুল সম্পদ, রাজপরিবারের আড়ম্বর, অভিজাত শ্রেণির পশ্চিমা জীবনযাপন এবং বিশাল সামরিক ব্যয় দৃশ্যমান ছিল; অন্যদিকে সাধারণ মানুষের একটি অংশ মূল্যস্ফীতি, আবাসন সংকট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছিল। ফলে আধুনিকায়নের সাফল্যের পাশাপাশি বঞ্চনার অনুভূতিও তীব্র হয়ে ওঠে।
শাহের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দুর্বলতা ছিল এই যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক আধুনিকায়নের সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াননি। বরং বিরোধী দল, স্বাধীন রাজনৈতিক সংগঠন এবং সমালোচনামূলক মতপ্রকাশের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। শাহের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা সাভাক বিরোধীদের নজরদারি, গ্রেপ্তার, জিজ্ঞাসাবাদ এবং নির্যাতনের অভিযোগে কুখ্যাত হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক ভিন্নমত প্রকাশের নিরাপদ ক্ষেত্র সংকুচিত হতে হতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে সংস্কারের দাবি জানানো এবং পুরো রাজতন্ত্র উৎখাতের দাবির মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ কমতে থাকে।
১৯৭৫ সালে শাহ কার্যত একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। রাস্তাখিজ দলকে রাষ্ট্রের প্রধান রাজনৈতিক কাঠামো বানানো হয় এবং নাগরিকদের ওপর এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চাপ সৃষ্টি হয়। এই পদক্ষেপ শাহের আধুনিকতাবাদী রাজতন্ত্রকে আরও কর্তৃত্ববাদী রূপ দেয়। রাজতন্ত্রের সমালোচকদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে শাহ অর্থনৈতিক উন্নয়ন চান, কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা ভাগ করতে প্রস্তুত নন।
ধর্মীয় বিরোধিতার কেন্দ্রে ধীরে ধীরে উঠে আসেন রুহুল্লাহ খোমেনি। ১৯৬৩ সালে তিনি শাহের শ্বেত বিপ্লব, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এবং সরকারের নীতির বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় বক্তব্য দেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করার পর ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে তাঁকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। প্রথমে তুরস্ক, পরে ইরাকের নাজাফে অবস্থান করে তিনি শাহবিরোধী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতাদর্শ বিকশিত করতে থাকেন। বহু বছর ইরানের বাইরে থেকেও তিনি দেশের ভেতরের ধর্মীয় নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন।
খোমেনির রাজনৈতিক শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল তাঁর বক্তৃতার শব্দধারণ। তাঁর বক্তব্য ধারণ করা শব্দফিতা গোপনে ইরানে প্রবেশ করত, তারপর মসজিদ, ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র, বাজার এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে অসংখ্য অনুলিপিতে ছড়িয়ে পড়ত। আধুনিক রাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের বিপরীতে এই তুলনামূলক সাধারণ প্রযুক্তিই এক বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি করেছিল। মসজিদ ও বাজারকেন্দ্রিক সামাজিক নেটওয়ার্ক বিরোধী আন্দোলনকে এমন সাংগঠনিক ভিত্তি দেয়, যা শাহের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পক্ষে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ইরানকে বিপুল অর্থ এনে দেয়। শাহ দ্রুত শিল্প, অবকাঠামো ও সামরিক খাতে অর্থ ঢালতে থাকেন। কিন্তু অর্থনীতিতে এত দ্রুত অর্থপ্রবাহ মূল্যস্ফীতি, সরবরাহ সংকট এবং বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। সরকার মূল্যবৃদ্ধির জন্য ব্যবসায়ীদের দায়ী করে অভিযান চালালে ঐতিহ্যবাহী বাজারের ব্যবসায়ী শ্রেণির একটি অংশও রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে এই বাজারি শ্রেণির দীর্ঘদিনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক পরবর্তী বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৭৭ সাল থেকে শাহবিরোধী অসন্তোষ আরও প্রকাশ্য হতে শুরু করে। বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, লেখক, শিক্ষার্থী, ধর্মীয় নেতা এবং রাজনৈতিক কর্মীরা অধিক স্বাধীনতার দাবি তুলতে থাকেন। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন মানবাধিকারকেন্দ্রিক কূটনৈতিক পরিবেশের মধ্যেও শাহের সরকার কিছুটা রাজনৈতিক শিথিলতা প্রদর্শনের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বহু বছরের জমে থাকা ক্ষোভ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে সীমিত শিথিলতা পরিস্থিতি শান্ত করার বদলে বিরোধীদের প্রকাশ্যে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়।
১৯৭৮ সালের জানুয়ারিতে একটি সংবাদপত্রে খোমেনিকে আক্রমণ করে প্রকাশিত নিবন্ধ পরিস্থিতিকে বিস্ফোরক করে তোলে। ধর্মীয় নগরী কোমে প্রতিবাদ শুরু হয় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে মানুষ নিহত হয়। শিয়া শোকসংস্কৃতিতে মৃত্যুর চল্লিশ দিন পর স্মরণানুষ্ঠানের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ফলে কোমে নিহতদের চল্লিশতম দিনের স্মরণে অন্য শহরে বিক্ষোভ হয়, সেখানে আবার প্রাণহানি ঘটে এবং নতুন করে চল্লিশ দিনের শোকচক্র শুরু হয়। এই ধারাবাহিকতা আন্দোলনকে শহর থেকে শহরে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে।
তাবরিজসহ বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদ ক্রমে বৃহৎ আকার ধারণ করে। আন্দোলনের দাবিও বদলাতে থাকে। প্রথম দিকে অনেকেই রাজনৈতিক সংস্কার, দমননীতি বন্ধ এবং সাংবিধানিক সীমার মধ্যে রাজতন্ত্রের দাবি তুললেও ধীরে ধীরে ‘শাহকে যেতে হবে’—এই অবস্থান শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ধর্মীয় রক্ষণশীল, উদারপন্থী, জাতীয়তাবাদী, বামপন্থী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ নগরবাসীর বিভিন্ন অংশ একই রাজতন্ত্রবিরোধী স্রোতে এসে মিলিত হয়।
১৯৭৮ সালের আগস্টে আবাদানের রেক্স প্রেক্ষাগৃহে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শত শত মানুষ মারা যায়। আগুনের দায় কার ছিল, তা নিয়ে তখন থেকেই তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিরোধীরা শাহের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অভিযুক্ত করে, আবার পরবর্তী অনুসন্ধান ও আলোচনায় ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের সংশ্লিষ্টতার প্রশ্নও উঠে আসে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল—ঘটনাটি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনরোষকে আরও গভীর করে। গুজব, অবিশ্বাস এবং রাষ্ট্রবিরোধী ক্ষোভ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে সরকারের বক্তব্যের ওপর বিপুলসংখ্যক মানুষ আর আস্থা রাখছিল না।
এরপর আসে ১৯৭৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বর—ইরানের বিপ্লবী ইতিহাসে ‘কালো শুক্রবার’ নামে পরিচিত দিন। তেহরানের ঝালে চত্বরে সামরিক আইন অমান্য করে বিপুলসংখ্যক মানুষ সমবেত হলে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালায়। নিহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন দাবি করা হয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। শাহ ও বিরোধীদের মধ্যে আপসের সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে নিহতদের স্মৃতি আন্দোলনের শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়।
বিক্ষোভের পাশাপাশি ধর্মঘট ছিল শাহের পতনের অন্যতম নির্ণায়ক অস্ত্র। ব্যাংক, সরকারি প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম, পরিবহন এবং বিশেষ করে তেলশিল্পের শ্রমিকেরা ধর্মঘটে গেলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি কেঁপে ওঠে। ইরানের রাজস্ব ও বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস ছিল তেল। তেলশ্রমিকদের ধর্মঘট উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয় এবং সরকারকে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে চাপে ফেলে। বিপ্লব তখন আর শুধু রাজপথের বিক্ষোভ ছিল না; রাষ্ট্রযন্ত্রের দৈনন্দিন কার্যক্রমও অচল হতে শুরু করেছিল।
১৯৭৮ সালের শেষ দিকে মুহাররম মাসের ধর্মীয় আবহ আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে। আশুরার প্রতীক—অত্যাচারের বিরুদ্ধে ইমাম হোসাইনের আত্মত্যাগ—শাহবিরোধী রাজনৈতিক ভাষার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। লক্ষ লক্ষ মানুষ তেহরান ও অন্যান্য শহরের মিছিলে অংশ নেয়। ধর্মীয় প্রতীক, রাজনৈতিক দাবি এবং গণঅংশগ্রহণ এমনভাবে একীভূত হয় যে শাহের শাসনের বৈধতা দ্রুত ক্ষয় হতে থাকে।
শাহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বারবার কৌশল পরিবর্তন করেন। কখনো কঠোর সামরিক ব্যবস্থা, কখনো বিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা, কখনো দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ, আবার কখনো রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হয়। তিনি জনগণের বিপ্লবী বার্তা শুনেছেন বলেও ঘোষণা দেন। কিন্তু এই নীতিগত দোদুল্যমানতা সরকারের শক্তি প্রদর্শনের বদলে দুর্বলতার বার্তা ছড়ায়। নিরাপত্তা বাহিনীও বুঝতে পারছিল না শেষ পর্যন্ত কঠোর দমন চালানো হবে, নাকি রাজনৈতিক সমঝোতার পথ নেওয়া হবে।
১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে শাহ শেষ চেষ্টা হিসেবে শাপুর বখতিয়ারকে প্রধানমন্ত্রী করেন। বখতিয়ার ছিলেন জাতীয়তাবাদী বিরোধী ধারার একজন রাজনীতিক। তিনি সাভাক বিলুপ্ত করা, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্ত করা এবং অধিক রাজনৈতিক স্বাধীনতার মতো সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তত দিনে আন্দোলনের মূলধারা রাজতন্ত্রের ভেতরে সংস্কার মেনে নেওয়ার পর্যায় অতিক্রম করেছে। খোমেনি বখতিয়ার সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করেন।
১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি এবং সম্রাজ্ঞী ফারাহ ইরান ত্যাগ করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে সাময়িক বিদেশযাত্রা হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ এটিকে রাজতন্ত্রের পতনের সূচনা হিসেবে দেখে। শাহের বিমান দেশ ছাড়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে রাস্তায় উল্লাস শুরু হয়। পাহলভি রাজবংশ তখনও আইনগতভাবে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি, কিন্তু তার রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কার্যত ভেঙে পড়েছিল।
খোমেনি তখন ফ্রান্সের নোফ্ল-ল্য-শাতোতে অবস্থান করছিলেন। সেখান থেকে তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ব্যাপক মনোযোগ পান এবং ইরানের আন্দোলনের সবচেয়ে দৃশ্যমান নেতা হয়ে ওঠেন। ১৯৭৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রায় পনেরো বছরের নির্বাসন শেষে তিনি ইরানে ফিরে আসেন। তেহরানে তাঁর প্রত্যাবর্তন ছিল বিপ্লবের সবচেয়ে প্রতীকী মুহূর্তগুলোর একটি। বিপুল জনসমুদ্র তাঁকে স্বাগত জানায়। বিমানবন্দর থেকে বেহেশতে জাহরা কবরস্থানের দিকে যাওয়ার পথে তাঁর যাত্রা কার্যত একটি বিজয়যাত্রায় পরিণত হয়।
দেশে তখন একই সঙ্গে দুটি ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি হয়েছিল। একদিকে বখতিয়ারের আনুষ্ঠানিক সরকার, অন্যদিকে খোমেনির বিপ্লবী কর্তৃত্ব। খোমেনি মেহদি বাজারগানকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে মনোনীত করেন। ফলে প্রশ্নটি আর কেবল শাহ বনাম বিরোধীদের ছিল না; বরং কোন সরকার প্রকৃত বৈধতা বহন করছে, সেটিই কেন্দ্রীয় সংঘাতে পরিণত হয়।
ফেব্রুয়ারির প্রথম ভাগে সামরিক বাহিনীর ভেতরেও ভাঙন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিমানবাহিনীর কিছু সদস্য বিপ্লবীদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন অংশের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয় এবং বিপ্লবীরা অস্ত্রাগার, পুলিশকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা দখল করতে থাকে। ১১ ফেব্রুয়ারি সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ পরিষদ রাজনৈতিক সংঘাতে নিরপেক্ষ থাকার ঘোষণা দিলে বখতিয়ার সরকারের শেষ কার্যকর প্রতিরোধও ভেঙে পড়ে। এই দিনটিকেই সাধারণভাবে বিপ্লবের বিজয়ের দিন হিসেবে ধরা হয়।
শাহের পতন ঘটলেও তখনও পরিষ্কার ছিল না নতুন ইরান ঠিক কেমন রাষ্ট্র হবে। বিপ্লবে অংশগ্রহণকারীদের লক্ষ্য এক ছিল না। উদারপন্থীরা গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক রাষ্ট্র চেয়েছিলেন, বামপন্থীরা সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের স্বপ্ন দেখছিলেন, জাতীয়তাবাদীরা বিদেশি প্রভাবমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র চাইছিলেন, আর খোমেনি ও তাঁর অনুসারীরা ইসলামী নীতির ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। শাহবিরোধিতা তাদের এক করেছিল; শাহ চলে যাওয়ার পর ক্ষমতার প্রকৃত সংগ্রাম শুরু হয়।
১৯৭৯ সালের মার্চের শেষে গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং বিপুল সরকারি সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে ফল ঘোষণা করা হয়। ১ এপ্রিল ইরানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়। এরপর নতুন সংবিধান তৈরির প্রক্রিয়ায় খোমেনির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ধারণা ‘বেলায়াতে ফকিহ’ বা ইসলামী আইনজ্ঞের অভিভাবকত্ব কেন্দ্রীয় স্থান পায়। এর মাধ্যমে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ব্যাপক সাংবিধানিক কর্তৃত্ব দেওয়া হয়।
বিপ্লবের পর দ্রুত পুরোনো রাজতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে ফেলা হয়। বিপ্লবী আদালত গঠিত হয়, শাহের শাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সামরিক কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের অনেককে বিচার করা হয় এবং অনেকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। বিপ্লবী কমিটি এবং নতুন সশস্ত্র সংগঠন গড়ে ওঠে। এর মধ্যে ইসলামী বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী পরবর্তী সময়ে ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
একই সঙ্গে বিপ্লবের প্রাথমিক জোটও দ্রুত ভেঙে যায়। ধর্মনিরপেক্ষ উদারপন্থী, বামপন্থী এবং অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব ক্রমে সংকুচিত হতে থাকে। সংবাদমাধ্যম, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, পোশাকনীতি এবং সামাজিক জীবনে ইসলামী বিধানের প্রভাব বাড়ে। নারীরা শাহবিরোধী আন্দোলনে বিপুলসংখ্যায় অংশগ্রহণ করলেও বিপ্লবের পর বাধ্যতামূলক পোশাকবিধিসহ নতুন সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে অনেক নারী প্রতিবাদ করেন। ফলে বিপ্লব যে স্বাধীনতার আশা সৃষ্টি করেছিল, তার অর্থ বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কাছে দ্রুত ভিন্ন হয়ে ওঠে।
১৯৭৯ সালের নভেম্বরে তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস দখল বিপ্লবের গতিপথকে আরও আমূল পরিবর্তন করে। শাহ চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করার পর ইরানের অনেক বিপ্লবীর মধ্যে আশঙ্কা জন্মায় যে ১৯৫৩ সালের মতো আবারও বিদেশি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে পুরোনো শাসন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হতে পারে। বিপ্লবী শিক্ষার্থীরা মার্কিন দূতাবাস দখল করে কূটনীতিক ও কর্মীদের জিম্মি করে। দীর্ঘস্থায়ী জিম্মি সংকট যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ককে কার্যত ভেঙে দেয় এবং ইরানের অভ্যন্তরে বিপ্লবের অধিক কট্টরপন্থী অংশের রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করে।
ইরানি বিপ্লবের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকগুলোর একটি হলো শাহের রাষ্ট্র বাইরে থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী মনে হলেও ভেতরে তার রাজনৈতিক ভিত্তি কত দ্রুত ভেঙে পড়েছিল। তাঁর হাতে আধুনিক সামরিক বাহিনী, বিপুল তেলসম্পদ, শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রের শক্তি শুধু অস্ত্র বা অর্থের ওপর নির্ভর করে না; বৈধতা, রাজনৈতিক আস্থা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর আনুগত্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ রাজপথে নামে, অর্থনীতির প্রধান খাতগুলো ধর্মঘটে অচল হয়ে যায়, প্রশাসন দুর্বল হয় এবং সামরিক বাহিনীর আনুগত্য অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন বাহ্যিকভাবে শক্তিশালী রাজতন্ত্রও দ্রুত ভেঙে পড়তে পারে।
তবে বিপ্লবকে শুধু ধর্মীয় উত্থান হিসেবে ব্যাখ্যা করাও অসম্পূর্ণ। শুরুতে আন্দোলনের মধ্যে ধর্মীয় নেতা যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী, উদারপন্থী, মার্ক্সবাদী, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, মধ্যবিত্ত পেশাজীবী এবং বাজারের ব্যবসায়ীরা। তাদের প্রত্যেকের শাহবিরোধিতার কারণ এক ছিল না। কেউ রাজনৈতিক স্বাধীনতা চেয়েছিল, কেউ সামাজিক ন্যায়বিচার, কেউ বিদেশি প্রভাবের অবসান, কেউ ইসলামী রাষ্ট্র, আবার কেউ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। খোমেনির সাফল্য ছিল এই বিচিত্র ক্ষোভকে এমন একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী দাবির অধীনে সংগঠিত করা—শাহকে অপসারণ করতে হবে।
শাহের আধুনিকায়ন প্রকল্পের মধ্যেও একটি ঐতিহাসিক বৈপরীত্য ছিল। তিনি যে শিক্ষা বিস্তার, নগরায়ণ, যোগাযোগব্যবস্থা এবং সামাজিক পরিবর্তনকে উৎসাহিত করেছিলেন, সেগুলোই নতুন শিক্ষিত জনগোষ্ঠী, নগর মধ্যবিত্ত ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন তরুণ প্রজন্ম তৈরি করেছিল। এই জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ অর্থনৈতিক আধুনিকতার পাশাপাশি রাজনৈতিক অংশগ্রহণও প্রত্যাশা করেছিল। রাষ্ট্র যখন সেই সুযোগ সীমিত করে রাখে, তখন আধুনিকায়নের ফলে তৈরি নতুন সামাজিক শক্তিগুলোর একটি অংশই শেষ পর্যন্ত রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
১৯৭৯ সালের বিপ্লব মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেও মৌলিক পরিবর্তন আনে। শাহের ইরান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান আঞ্চলিক মিত্র এবং সোভিয়েত প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। বিপ্লবের পর ইরান যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে এবং নিজেকে স্বাধীন ইসলামী বিপ্লবী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে। উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো নতুন শাসনকে সন্দেহের চোখে দেখতে থাকে। পরবর্তী ইরান-ইরাক যুদ্ধ, লেবাননসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ইরানের প্রভাব বিস্তার এবং উপসাগরীয় নিরাপত্তা রাজনীতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধারার পেছনে ১৯৭৯ সালের পরিবর্তনের দীর্ঘ ছায়া রয়েছে।
ইরানি বিপ্লব তাই একটি রাজবংশের পতনের গল্পের চেয়ে অনেক বড় ঘটনা। এটি দেখিয়েছিল যে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন রাজনৈতিক বৈধতার বিকল্প নয়, বিদেশি সমর্থন কোনো শাসকের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে না এবং বহু আদর্শের মানুষ একটি সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে একত্র হলেও বিজয়ের পর রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের ঐক্য অটুট থাকে না। শাহকে উৎখাত করার আন্দোলনে যারা পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিল, তাদের অনেকেই কয়েক বছরের মধ্যে নতুন ক্ষমতাকাঠামোর প্রতিদ্বন্দ্বী বা শিকার হয়ে যায়।
১৯৭৯ সালের শুরুতে ইরান ছিল হাজার বছরের রাজতান্ত্রিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহনকারী একটি দেশ; বছরের শেষে সেটি দ্রুত একটি নতুন ইসলামী রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। শাহ দেশ ছেড়েছিলেন এই ধারণায় যে হয়তো পরিস্থিতি বদলালে ফিরে আসা সম্ভব হবে, কিন্তু তাঁর প্রস্থানই পাহলভি রাজতন্ত্রের শেষ অধ্যায় হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ফিরে আসা খোমেনি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। রাজপথের বিক্ষোভ, ধর্মীয় শোকানুষ্ঠান, শ্রমিক ধর্মঘট, বাজারের অর্থনৈতিক শক্তি, রাজনৈতিক দমন-পীড়নের স্মৃতি, বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং ধর্মীয় নেতৃত্ব—সবকিছু মিলেই এমন এক বিপ্লব সৃষ্টি করেছিল, যা শুধু শাহকে উৎখাত করেনি; ইরানের রাষ্ট্র, সমাজ এবং বিশ্বরাজনীতিতে তার অবস্থানের সংজ্ঞাই পাল্টে দিয়েছিল।
কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকট ১৯৬২: যেভাবে কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত বিশ্বকে পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়েছিল
থ্যাচারের পোল ট্যাক্স ১৯৯০: যে বিতর্কিত করব্যবস্থা ব্রিটেনে গণবিক্ষোভ ও দাঙ্গার জন্ম দিয়েছিল
নতুন অর্থনৈতিক নীতি ১৯২১: কমিউনিজম থেকে লেনিনের সাময়িক পিছু হটার ইতিহাস
নিক্সনের কম্বোডিয়া বোমাবর্ষণ ১৯৬৯–১৯৭০: ভিয়েতনাম যুদ্ধের গোপন সম্প্রসারণ
অশ্রুর পথ ১৮৩৮: অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের নির্মম আদিবাসী উচ্ছেদনীতি ও চেরোকিদের মর্মান্তিক যাত্রা
তিয়ানআনমেন স্কয়ার বিক্ষোভ ১৯৮৯: চীনে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সংস্কারের লড়াই