বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মরুভূমিতে হঠাৎ ফুলের সমুদ্র: আতাকামার ‘ডেজার্ট ব্লুম’ কীভাবে ঘটে?

  • Author: Admin
  • September 03, 2026
মরুভূমিতে হঠাৎ ফুলের সমুদ্র: আতাকামার ‘ডেজার্ট ব্লুম’ কীভাবে ঘটে?
আতাকামার শুষ্ক বুকে জেগে ওঠা ফুলের সমুদ্র

পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক অঞ্চলগুলোর একটি আতাকামা মরুভূমির দিকে বছরের অধিকাংশ সময় তাকালে জীবন যেন এখানে পরাজিত হয়েছে বলেই মনে হয়। ধূসর, বাদামি ও লালচে মাটির বিস্তীর্ণ প্রান্তর, পাথুরে পাহাড়, ধুলোময় সমতল ভূমি এবং আকাশের নিচে প্রায় উদ্ভিদহীন এক রুক্ষ জগৎ—এটাই উত্তর চিলির আতাকামার পরিচিত দৃশ্য। কিছু অঞ্চলে এত অল্প বৃষ্টি হয় যে দীর্ঘ সময় মাটিতে দৃশ্যমান সবুজ উদ্ভিদের উপস্থিতিই প্রায় থাকে না। অথচ নির্দিষ্ট কিছু বছরে এই নিষ্প্রাণ বলে মনে হওয়া ভূমির চেহারা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। যেখানে আগে শুধু ধুলো ও পাথর ছিল, সেখানে দিগন্তজুড়ে ফুটে ওঠে গোলাপি, বেগুনি, সাদা, হলুদ ও নীলচে ফুল। দূর থেকে মনে হয় মরুভূমির ওপর কেউ বিশাল রঙিন কার্পেট বিছিয়ে দিয়েছে। এই বিরল প্রাকৃতিক ঘটনাই আতাকামার বিখ্যাত ‘মরুভূমির প্রস্ফুটন’।

আতাকামার এই বিস্ময় বুঝতে হলে প্রথমেই জানতে হয়, মরুভূমিটি এত শুষ্ক কেন। দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূল ঘেঁষে বিস্তৃত এই অঞ্চল একদিকে প্রশান্ত মহাসাগর, অন্যদিকে আন্দিজ পর্বতমালার প্রভাবে একটি বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে। আন্দিজ পর্বতমালা পূর্ব দিক থেকে আসা আর্দ্র বায়ুর বড় অংশকে আটকে দেয়। অন্যদিকে উপকূলের পাশ দিয়ে প্রবাহিত ঠান্ডা হামবোল্ট স্রোত সমুদ্রের ওপরের বায়ুমণ্ডলকে এমনভাবে প্রভাবিত করে যে সহজে বৃষ্টিবাহী মেঘ তৈরি হতে পারে না। এর সঙ্গে বৃহৎ আকারের বায়ুমণ্ডলীয় উচ্চচাপ বলয় যুক্ত হয়ে বৃষ্টিপাত আরও সীমিত করে। ফলে আতাকামার কিছু অংশ পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক পরিবেশগুলোর মধ্যে স্থান পেয়েছে।

তবে পুরো আতাকামা একই মাত্রায় শুষ্ক নয়। মরুভূমির দক্ষিণ প্রান্ত এবং চিলির আতাকামা ও কোকিম্বো অঞ্চলের কিছু অংশে মাঝে মাঝে এমন বৃষ্টিপাত ঘটে, যা সুপ্ত উদ্ভিদজগতকে সক্রিয় করার জন্য যথেষ্ট। বিখ্যাত ফুলের বিস্তার প্রধানত এই অঞ্চলগুলোতেই দেখা যায়। অর্থাৎ আতাকামার প্রতিটি শুষ্ক সমতল ভূমি একই সঙ্গে ফুলে ঢেকে যায় না। সংবাদচিত্রে যে বিশাল রঙিন মরুভূমি দেখা যায়, সেটি আতাকামার নির্দিষ্ট অংশে উপযুক্ত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, মাটির আর্দ্রতা এবং উদ্ভিদের জীবনচক্রের সমন্বয়ে তৈরি হয়।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ফুলগুলো বৃষ্টি নামার পর হঠাৎ কোথাও থেকে আতাকামায় এসে হাজির হয় না। তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি বিশাল ভান্ডার আগে থেকেই মরুভূমির মাটিতে লুকিয়ে থাকে। অসংখ্য মরুভূমির উদ্ভিদ বীজ তৈরি করে, যেগুলো অত্যন্ত দীর্ঘ সময় প্রতিকূল পরিবেশে সুপ্ত অবস্থায় টিকে থাকতে পারে। বাইরে থেকে মাটিকে সম্পূর্ণ অনুর্বর মনে হলেও তার অগভীর স্তরে ছড়িয়ে থাকতে পারে অসংখ্য জীবিত বীজ। কিছু উদ্ভিদ আবার ভূগর্ভস্থ কন্দ, মূল বা অন্যান্য সঞ্চয়ী অঙ্গের মাধ্যমে দীর্ঘ শুষ্ক সময় পার করে। ফলে দৃশ্যমান উদ্ভিদ না থাকলেও জীবনের সম্ভাবনা মাটির নিচে নিঃশব্দে সংরক্ষিত থাকে।

সুপ্ত বীজের এই ভান্ডারকে মরুভূমির এক ধরনের প্রাকৃতিক স্মৃতি বলা যেতে পারে। একটি ভালো ফুল ফোটার মৌসুমে গাছগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পায়, ফুল তৈরি করে, পরাগায়ন সম্পন্ন করে এবং নতুন বীজ ছড়িয়ে দেয়। তারপর আবার দীর্ঘ খরা শুরু হলে দৃশ্যমান উদ্ভিদের বড় অংশ শুকিয়ে যায়। কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া বীজ মাটির মধ্যে অপেক্ষা করতে থাকে। পরের বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টি নাও হতে পারে। এমনকি কয়েক বছর ধরেও উপযুক্ত পরিস্থিতি নাও আসতে পারে। তবু বীজের একটি অংশ সুপ্ত থেকে ভবিষ্যতের অনুকূল সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে পারে। এই কারণেই দীর্ঘ বিরতির পর অনুকূল বৃষ্টি হলে একই অঞ্চলে আবার বিস্ময়কর ফুলের বিস্তার দেখা সম্ভব হয়।

তবে শুধু কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি পড়লেই এই ফুলের সমুদ্র তৈরি হয় না। বৃষ্টির পরিমাণ, বৃষ্টির সময়, মাটিতে পানি ধরে রাখার স্থায়িত্ব, তাপমাত্রা এবং পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের আবহাওয়া—সবকিছুর মধ্যে উপযুক্ত সমন্বয় প্রয়োজন। খুব সামান্য বৃষ্টি হলে মাটির ওপরের স্তর ভিজলেও বীজের অঙ্কুরোদ্গমের জন্য পর্যাপ্ত আর্দ্রতা তৈরি নাও হতে পারে। আবার বৃষ্টির পর দ্রুত তীব্র গরম ও শুষ্কতা ফিরে এলে সদ্য অঙ্কুরিত চারা মারা যেতে পারে। তাই সফল মরুভূমি প্রস্ফুটনের জন্য শুধু বৃষ্টি নয়, বৃষ্টির পরে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকাও জরুরি।

আতাকামায় বড় ধরনের প্রস্ফুটনের সঙ্গে প্রশান্ত মহাসাগরের জলবায়ুগত পরিবর্তনেরও সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে এল নিনো অবস্থার সময় পূর্ব ও মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এবং বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহে পরিবর্তন ঘটে। এর প্রভাবে উত্তর ও মধ্য চিলির কিছু শুষ্ক অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে এল নিনো ঘটলেই আতাকামায় নিশ্চিতভাবে বিশাল ফুলের সমুদ্র তৈরি হবে—বিষয়টি এত সরল নয়। কোন এলাকায় কত বৃষ্টি হলো, কখন হলো এবং পরবর্তী আবহাওয়া কেমন থাকল, তার ওপর প্রকৃত ফলাফল নির্ভর করে।

বৃষ্টি যখন যথেষ্ট পরিমাণে মাটির ভেতরে প্রবেশ করে, তখন দীর্ঘদিনের সুপ্ত বীজের ভেতরে বিপাকীয় কার্যক্রম আবার সক্রিয় হতে শুরু করে। পানি শোষণের ফলে বীজ ফুলে ওঠে, সুপ্ত ভ্রূণের বৃদ্ধি শুরু হয় এবং মূল বেরিয়ে মাটির মধ্যে প্রবেশ করে। মরুভূমির ক্ষণস্থায়ী সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য এসব উদ্ভিদের জীবনচক্র সাধারণত অত্যন্ত দ্রুত। কারণ তাদের হাতে সময় কম। মাটির আর্দ্রতা শেষ হওয়ার আগেই তাদের পাতা তৈরি, বৃদ্ধি, ফুল ফোটানো, পরাগায়ন এবং নতুন বীজ উৎপাদনের কাজ শেষ করতে হয়। যে উদ্ভিদ দ্রুত এই চক্র সম্পন্ন করতে পারে, শুষ্ক পরিবেশে তার বংশধারা টিকে থাকার সম্ভাবনাও বেশি।

ফলে বৃষ্টির কয়েক সপ্তাহ পর যে পরিবর্তন শুরু হয়, তা সত্যিই নাটকীয়। প্রথমে মাটির ওপর ক্ষুদ্র সবুজ অঙ্কুর দেখা যায়। ধীরে ধীরে সেই অঙ্কুর ঘন হতে থাকে এবং পরে বিভিন্ন প্রজাতির ফুল ফুটতে শুরু করে। সব প্রজাতি একই দিনে বা একই গতিতে ফুল ফোটায় না। তাপমাত্রা, উচ্চতা, মাটির ধরন, আর্দ্রতা ও স্থানীয় পরিবেশ অনুযায়ী বিভিন্ন অঞ্চলে প্রস্ফুটনের সময় কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। এই কারণে মরুভূমির রঙও সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। কোনো এলাকায় প্রথমে সাদা বা হলুদ ফুল প্রাধান্য পেতে পারে, পরে সেখানে গোলাপি কিংবা বেগুনি ফুলের আধিক্য দেখা যেতে পারে।

আতাকামার প্রস্ফুটনে সবচেয়ে পরিচিত ফুলগুলোর মধ্যে রয়েছে স্থানীয়ভাবে ‘পাতা দে গুয়ানাকো’ নামে পরিচিত বেগুনি ও গোলাপি আভাযুক্ত ফুল এবং ‘আনানিউকা’ নামে পরিচিত আকর্ষণীয় ফুল। এছাড়াও হলুদ, সাদা, নীলচে ও বেগুনি রঙের বহু প্রজাতির উদ্ভিদ এই মৌসুমি বিস্ফোরণে অংশ নেয়। অঞ্চলটির অনেক উদ্ভিদ স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে অভিযোজিত, এবং কিছু প্রজাতির বিস্তার অত্যন্ত সীমিত। তাই এই ঘটনা শুধু সুন্দর ফুল দেখার বিষয় নয়; এটি একটি বিশেষ মরু প্রতিবেশের জীববৈচিত্র্য বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

ফুল ফোটার সঙ্গে সঙ্গে মরুভূমির প্রাণিজগতেও পরিবর্তন আসে। ফুল মানেই মধু, পরাগ এবং নতুন খাদ্যের উৎস। ফলে মৌমাছি, প্রজাপতি, পতঙ্গ ও অন্যান্য পরাগবাহীর কার্যকলাপ বেড়ে যায়। কিছু প্রাণীর জন্য নতুন উদ্ভিদ খাদ্য সরবরাহ করে, আবার পোকামাকড়ের সংখ্যা বাড়লে তাদের ওপর নির্ভরশীল প্রাণীরাও উপকৃত হয়। অর্থাৎ বৃষ্টির প্রভাব শুধু উদ্ভিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; অল্প সময়ের জন্য পুরো খাদ্যজালের কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেতে পারে। যে মরুভূমিকে কয়েক সপ্তাহ আগেও প্রায় প্রাণহীন মনে হচ্ছিল, সেটিই হঠাৎ জটিল জৈবিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

এখানে পরাগায়ন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একটি ফুল ফুটলেই সেই উদ্ভিদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয় না। তাকে সফলভাবে পরাগায়িত হয়ে বীজ তৈরি করতে হবে। মরুভূমির স্বল্পস্থায়ী অনুকূল সময়ের মধ্যে ফুল এবং পরাগবাহী প্রাণীর জীবনচক্রের সমন্বয় তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো মৌসুমে প্রচুর ফুল ফুটলেও যদি পরাগবাহীর সংখ্যা বা কার্যকলাপ পর্যাপ্ত না হয়, তাহলে ভবিষ্যতের বীজভান্ডার প্রত্যাশিত মাত্রায় সমৃদ্ধ নাও হতে পারে। আবার সফল মৌসুমে বিপুল বীজ উৎপন্ন হয়ে পরবর্তী বহু বছরের জন্য মাটিতে নতুন সম্ভাবনা জমা করতে পারে।

আতাকামার ফুলের সমুদ্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর অস্থায়িত্ব। এটি স্থায়ী তৃণভূমিতে রূপান্তর নয়। ফুলের বিস্তার কয়েক সপ্তাহ বা অনুকূল অবস্থায় কিছুটা দীর্ঘ সময় আকর্ষণীয় থাকতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মরুভূমির স্বাভাবিক শুষ্ক পরিবেশ ফিরে আসে। মাটির পানি কমে যায়, বাতাস ও সূর্যের প্রভাবে বাষ্পীভবন বাড়ে, গাছ শুকিয়ে যেতে শুরু করে। কিছুদিন পর আবার সেই পরিচিত বাদামি ও ধূসর ভূদৃশ্য ফিরে আসে। কিন্তু এই ক্ষণস্থায়ী উদ্ভিদগুলো ইতিমধ্যে তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পন্ন করে ফেলে—পরবর্তী প্রজন্মের বীজ মাটিতে রেখে যায়।

এই কারণেই আতাকামার ফুলের বিস্তারকে সাধারণ বসন্তকালীন ফুল ফোটার সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে ঋতুচক্রের অংশ হিসেবে প্রতি বছর বসন্তে ফুল ফোটা অনেকটাই অনুমানযোগ্য। আতাকামায় বিষয়টি অনেক বেশি অনিশ্চিত। এখানে ক্যালেন্ডারের নির্দিষ্ট মাস এলেই ফুলের সমুদ্র তৈরি হয় না। বছরের পর বছর অপেক্ষার পর এমন একটি বৃষ্টির ঘটনা ঘটতে পারে, যা পর্যাপ্ত সংখ্যক সুপ্ত বীজকে সক্রিয় করে। ফলে প্রতিটি বড় প্রস্ফুটন একটি বিরল পরিবেশগত ঘটনার ফল।

পর্যটনের দৃষ্টিকোণ থেকেও এই ঘটনা অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্ফুটনের খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশ-বিদেশ থেকে বিপুল মানুষ ফুলে ঢাকা মরুভূমি দেখতে আসেন। কিন্তু এই জনপ্রিয়তাই আবার প্রতিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। দর্শনার্থীরা নির্ধারিত পথ ছেড়ে ফুলের মধ্যে হাঁটলে শুধু দৃশ্যমান গাছই নষ্ট হয় না, মাটির ওপরের সূক্ষ্ম স্তর এবং ভবিষ্যতের বীজভান্ডারও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গাড়ি নিয়ে ফুলের মাঠে প্রবেশ করা আরও ধ্বংসাত্মক। একটি গাড়ির চাকা একই সঙ্গে অসংখ্য উদ্ভিদ পিষে ফেলতে এবং মাটির গঠন বদলে দিতে পারে।

ফুল ছিঁড়ে নেওয়াও দেখতে সামান্য কাজ মনে হলেও এর পরিবেশগত মূল্য রয়েছে। একটি ফুল গাছের প্রজননচক্রের অংশ। ফুলটি পরাগায়িত হয়ে ফল ও বীজ তৈরি করার আগেই ছিঁড়ে ফেললে সেই উদ্ভিদের পরবর্তী প্রজন্ম তৈরির সুযোগ কমে যায়। বিশেষ করে সীমিত বিস্তারের বিরল প্রজাতির ক্ষেত্রে অসংখ্য পর্যটকের একই আচরণ উল্লেখযোগ্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই আতাকামার ফুলের সৌন্দর্য রক্ষা করতে নির্ধারিত পথ অনুসরণ, ফুল না ছেঁড়া, গাছের ওপর না হাঁটা এবং সংরক্ষিত এলাকার নিয়ম মানা অত্যন্ত জরুরি।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই প্রাকৃতিক ঘটনাটি বিজ্ঞানীদের জন্য আরও আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন শুধু গড় তাপমাত্রা বাড়ায় না; বৃষ্টিপাতের ধরন, চরম আবহাওয়ার ঘনত্ব এবং সমুদ্র-বায়ুমণ্ডলের পারস্পরিক সম্পর্কেও পরিবর্তন আনতে পারে। আতাকামার মতো পরিবেশে যেখানে উদ্ভিদের জীবনচক্র অল্প কয়েকটি বৃষ্টির ঘটনার ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল, সেখানে বৃষ্টির সময় বা তীব্রতার পরিবর্তনও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বেশি বৃষ্টি মানেই সব সময় বেশি ফুল নয়। অতিরিক্ত প্রবল বৃষ্টিতে ভূমিক্ষয়, আকস্মিক বন্যা বা বীজ ও মাটির স্থানান্তর ঘটতে পারে। আবার বৃষ্টি অঙ্কুরোদ্গম ঘটানোর পর দীর্ঘ শুষ্কতা ফিরে এলে নতুন চারার বড় অংশ মারা যেতে পারে।

এই ফুলের বিস্তার বিজ্ঞানীদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলে ধরে—চরম পরিবেশে জীবন আসলে কতটা স্থিতিস্থাপক? মানুষের চোখে আতাকামার শুকনো মাটি মৃত বলে মনে হতে পারে, কিন্তু জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সেটি অপেক্ষমাণ একটি ব্যবস্থা। সেখানে জীবন সব সময় দৃশ্যমান নয়, কিন্তু তার সম্ভাবনা সংরক্ষিত থাকে। বীজের সুপ্তাবস্থা এমন একটি বিবর্তনীয় কৌশল, যার মাধ্যমে উদ্ভিদ প্রতিকূল বছরগুলো এড়িয়ে অনুকূল সময়ে সক্রিয় হতে পারে। সব বীজ যদি প্রথম সামান্য বৃষ্টিতেই অঙ্কুরিত হয়ে যেত, তাহলে পরের খরায় পুরো প্রজন্ম নিশ্চিহ্ন হওয়ার ঝুঁকি থাকত। বীজের অঙ্কুরোদ্গম বিভিন্ন সময়ে ছড়িয়ে পড়লে অন্তত কিছু অংশ ভবিষ্যতের ভালো মৌসুম পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে।

এটি প্রকৃতির এক ধরনের ঝুঁকি-বণ্টন কৌশল। একই প্রজাতির সব বীজ একই পরিবেশগত সংকেতে সাড়া না দিলে কোনো একটি ব্যর্থ বর্ষা পুরো বংশধারাকে ধ্বংস করতে পারে না। মরুভূমির মতো অনিশ্চিত পরিবেশে এই বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত কার্যকর। যে কারণে আতাকামার মাটির নিচে শুধু বীজ নয়, বহু বছরের পরিবেশগত ইতিহাসও যেন জমা থাকে। কোন বছরে কত ফুল ফুটেছিল, কত সফলভাবে বীজ তৈরি হয়েছিল এবং পরবর্তী বছরগুলোতে সেই বীজের কত অংশ টিকে ছিল—এসবের সম্মিলিত ফলই ভবিষ্যতের প্রস্ফুটনের সম্ভাবনা নির্ধারণ করে।

আতাকামার ‘ফুলের সমুদ্র’ তাই নিছক একটি সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য নয়। এটি ভূগোল, সমুদ্রস্রোত, বায়ুমণ্ডল, বৃষ্টিপাত, মাটির আর্দ্রতা, বীজের সুপ্তাবস্থা, উদ্ভিদের অভিযোজন, পরাগায়ন এবং প্রাণিজগতের পারস্পরিক সম্পর্কের এক অসাধারণ সম্মিলিত ফল। এই ব্যবস্থার কোনো একটি অংশকে আলাদা করে দেখলে পুরো ঘটনাটি বোঝা যায় না। প্রশান্ত মহাসাগরের হাজার কিলোমিটারজুড়ে চলমান জলবায়ুগত পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত চিলির একটি শুষ্ক মাটিতে ঘুমিয়ে থাকা ক্ষুদ্র বীজের জীবনচক্র নির্ধারণ করতে পারে—প্রকৃতির আন্তঃসংযোগের এর চেয়ে সুন্দর উদাহরণ খুব কমই আছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার সম্ভবত এটাই যে, ফুল না থাকলেও আতাকামার সেই ভূমি পুরোপুরি নিষ্প্রাণ নয়। রুক্ষ মাটির নিচে ভবিষ্যতের একটি রঙিন পৃথিবী লুকিয়ে থাকে। বছরের পর বছর সূর্য, ধুলো এবং খরার মধ্যে সেই সম্ভাবনা অপেক্ষা করে একটি যথাযথ সংকেতের জন্য। তারপর কোনো বিরল মৌসুমে আকাশ থেকে পর্যাপ্ত পানি নেমে এলে মাটির নিচের সেই নিঃশব্দ ভান্ডার জেগে ওঠে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পৃথিবীর অন্যতম শুষ্ক ভূদৃশ্য পরিণত হয় ফুল, পরাগবাহী পতঙ্গ এবং নতুন জীবনের এক ব্যস্ত জগতে।

আবার কিছুদিন পর সব রং মুছে যায়। ফুল শুকিয়ে যায়, সবুজ হারিয়ে যায়, মরুভূমি ফিরে পায় তার পুরোনো রুক্ষ চেহারা। একজন পর্যটকের কাছে তখন মনে হতে পারে সেই অলৌকিক দৃশ্যটি বুঝি শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু প্রকৃতির হিসাবে ঘটনাটি শেষ নয়। অসংখ্য নতুন বীজ ইতিমধ্যে মাটিতে ছড়িয়ে পড়েছে। তারা আবার সুপ্ত হয়ে অপেক্ষা করবে—এক বছর, কয়েক বছর কিংবা আরও দীর্ঘ সময়। আর কোনো এক ভবিষ্যৎ বর্ষায় যখন পানি, তাপমাত্রা ও সময় আবার সঠিক সমীকরণে মিলবে, তখন আতাকামার ধূসর বুক আবারও রঙে ভরে উঠবে। মরুভূমি তখন যেন মনে করিয়ে দেবে—জীবন সব সময় চোখে দেখা যায় না; কখনো কখনো জীবন শুধু সঠিক মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করে।