জার্মান বিপ্লব, কাইজারের পতন ও ১১ নভেম্বরের যুদ্ধবিরতি: কীভাবে শেষ হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ?
সিরিজ: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস ও বদলে যাওয়া পৃথিবী
জার্মান বিপ্লব, কাইজারের পতন ও ১১ নভেম্বরের যুদ্ধবিরতি
১৯১৮ সালের শরতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চার বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাত এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যেখানে জার্মান সামরিক নেতৃত্বের কাছে বিজয়ের আশা কার্যত শেষ হয়ে গিয়েছিল। কয়েক মাস আগে জার্মানি বসন্ত আক্রমণের মাধ্যমে পশ্চিম রণাঙ্গনে শেষবারের মতো যুদ্ধের মোড় ঘোরানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেই অভিযান ব্যর্থ হয়। আগস্ট থেকে মিত্রশক্তির শত দিনের পাল্টা আক্রমণে জার্মান বাহিনী একের পর এক প্রতিরক্ষা অবস্থান ছেড়ে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছিল। একই সময়ে বুলগেরিয়া, অটোমান সাম্রাজ্য এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। জার্মানির সামনে তখন আর শুধু সামরিক পরাজয়ের প্রশ্ন ছিল না; রাষ্ট্রের ভেতরেও বিপ্লব, বিদ্রোহ, খাদ্যসংকট এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার পতন শুরু হয়ে গিয়েছিল।
সেপ্টেম্বর ১৯১৮-এর শেষে জার্মান সর্বোচ্চ সামরিক নেতৃত্ব—বিশেষ করে পল ফন হিন্ডেনবুর্গ এবং এরিখ লুডেনডর্ফ—রাজনৈতিক সরকারকে জানায় যে যুদ্ধ আর সামরিকভাবে জেতা সম্ভব নয় এবং দ্রুত যুদ্ধবিরতির চেষ্টা করা দরকার। এটি ছিল একটি নাটকীয় পরিবর্তন। মার্চে যে লুডেনডর্ফ পশ্চিমে বিশাল আক্রমণের মাধ্যমে যুদ্ধজয়ের চেষ্টা করেছিলেন, মাত্র কয়েক মাস পরে তিনিই বুঝতে পারেন যে জার্মান সেনাবাহিনী দীর্ঘমেয়াদে মিত্রশক্তির জনশক্তি ও শিল্পক্ষমতার বিরুদ্ধে টিকে থাকতে পারবে না।
মিত্রশক্তির পক্ষে এখন যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি ক্রমে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল। নতুন মার্কিন সৈন্য ইউরোপে পৌঁছাচ্ছিল, ব্রিটিশ ও ফরাসি সেনাবাহিনীও পুনর্গঠিত হয়ে আক্রমণ চালাচ্ছিল। জার্মান সেনাবাহিনী এখনও সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েনি, কিন্তু হিন্ডেনবুর্গ লাইন ভেঙে যাওয়ার পর আর কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে অজেয় মনে করা যাচ্ছিল না।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের ঘোষিত চৌদ্দ দফা নীতির ভিত্তিতে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা খুঁজতে শুরু করে। জার্মানির আশা ছিল, উইলসনের তুলনামূলক উদার নীতিকে ভিত্তি করে এমন একটি শান্তি পাওয়া যেতে পারে যা সম্পূর্ণ সামরিক দখল বা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মতো অপমানজনক হবে না।
কিন্তু মিত্রশক্তি জার্মানির রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনও চাইছিল। কাইজারের ব্যক্তিগত শাসন এবং সামরিক নেতৃত্বের প্রভাব কমিয়ে একটি সংসদীয় সরকার গঠন করার চাপ তৈরি হয়। অক্টোবর ১৯১৮-তে প্রিন্স ম্যাক্স ফন ব্যাডেন জার্মান চ্যান্সেলর হন এবং সরকারকে আরও সংসদীয় চরিত্র দেওয়ার চেষ্টা করেন।
এদিকে জার্মানির সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রা ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল। ব্রিটিশ নৌ অবরোধের ফলে খাদ্য ও কাঁচামালের সংকট দীর্ঘদিন ধরে চলছিল। কৃষি উৎপাদন কমে গিয়েছিল, পরিবহনব্যবস্থা যুদ্ধের চাপে ছিল এবং শহরে অপুষ্টি ব্যাপক হয়ে ওঠে। ১৯১৬-১৭ সালের কুখ্যাত ‘টার্নিপ উইন্টার’-এর স্মৃতি তখনও তাজা, যখন আলুর ঘাটতিতে বহু মানুষ শালগমজাতীয় খাবারের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছিল।
১৯১৮ সালের মধ্যে স্প্যানিশ ফ্লুর মহামারি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। যুদ্ধক্ষেত্রের হতাহতের সঙ্গে অসুস্থতা, অপুষ্টি ও ক্লান্তি মিলিয়ে জনগণের মধ্যে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব বেড়ে যায়। জার্মান সমাজের বড় অংশ আর বিশ্বাস করছিল না যে আরও কয়েক মাস যুদ্ধ চালিয়ে গেলে কোনো অর্থপূর্ণ বিজয় অর্জন করা সম্ভব।
এই অবস্থায় অক্টোবরের শেষ দিকে জার্মান নৌবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এমন একটি সিদ্ধান্ত নেন, যা বিপ্লবের সরাসরি সূত্রপাত ঘটায়। তারা হাই সিজ ফ্লিটকে ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির বিরুদ্ধে একটি শেষ বড় যুদ্ধে পাঠানোর পরিকল্পনা করে। এর সামরিক উদ্দেশ্য ছিল বিতর্কিত, কিন্তু বহু নাবিকের কাছে এটি ছিল যুদ্ধ কার্যত হারার পরও সম্মান রক্ষার নামে আত্মঘাতী অভিযানে পাঠানোর চেষ্টা।
উত্তর সাগরের উইলহেল্মশাভেন অঞ্চলে নাবিকরা আদেশ মানতে অস্বীকার করতে শুরু করে। কিছু জাহাজে বিদ্রোহ দেখা দেয় এবং বহু নাবিককে গ্রেপ্তার করা হয়। পরিস্থিতি পরে কিল বন্দরে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে ৩ নভেম্বর ১৯১৮ নাবিক ও শ্রমিকদের বিক্ষোভে গুলি চালানো হয় এবং কয়েকজন নিহত হয়।
এই ঘটনার পর বিদ্রোহ দমন হওয়ার বদলে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। কিলের নাবিকরা জাহাজ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিয়ন্ত্রণে নিতে শুরু করে এবং শ্রমিক ও সৈনিক পরিষদ গঠন করে। রুশ বিপ্লবের সোভিয়েত ব্যবস্থার অনুরূপ এই পরিষদগুলো খুব দ্রুত জার্মানির অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে পড়ে।
মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে হামবুর্গ, ব্রেমেন, কোলন, হ্যানোভার, মিউনিখসহ বিভিন্ন শহরে শ্রমিক ও সৈনিকরা পুরোনো কর্তৃপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করে। বহু স্থানে বড় ধরনের রক্তক্ষয় ছাড়াই স্থানীয় প্রশাসন পরিষদগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। রাজা, ডিউক ও অন্যান্য জার্মান রাজ্যের শাসকেরা সিংহাসন ছাড়তে শুরু করেন।
বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাভারিয়ার ঘটনা। ৭ নভেম্বর ১৯১৮ মিউনিখে বিপ্লবের মাধ্যমে বাভারিয়ার রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং কুর্ট আইসনার একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা ঘোষণা করেন। স্পষ্ট হয়ে যায়, জার্মান সাম্রাজ্যের সমস্যা আর শুধু বার্লিনে সীমাবদ্ধ নেই; পুরো সাম্রাজ্যিক রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ছে।
কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে ওঠে কাইজার দ্বিতীয় ভিলহেল্মের ভবিষ্যৎ। কাইজার তখন বেলজিয়ামের স্পায় জার্মান সামরিক সদর দপ্তরে অবস্থান করছিলেন। তিনি প্রথমদিকে সিংহাসন ছাড়তে অনিচ্ছুক ছিলেন এবং ভাবছিলেন হয়তো প্রুশিয়ার রাজা হিসেবে থেকে যেতে পারবেন কিংবা সেনাবাহিনীর সাহায্যে বিপ্লব দমন করা সম্ভব হবে।
কিন্তু সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁকে স্পষ্ট করে দেয় যে সৈন্যরা আর কাইজারের জন্য দেশের ভেতরে গৃহযুদ্ধ চালাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। রাজতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি, সেনাবাহিনীর নিঃশর্ত আনুগত্য, কার্যত ভেঙে পড়েছিল।
৯ নভেম্বর বার্লিনে বিপুল শ্রমিক ও সৈনিক রাস্তায় নামে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় চ্যান্সেলর ম্যাক্স ফন ব্যাডেন কাইজারের আনুষ্ঠানিক সম্মতির আগেই তাঁর পদত্যাগ ঘোষণা করেন। একই দিন তিনি সরকারপ্রধানের দায়িত্ব সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নেতা ফ্রিডরিখ এবার্টের হাতে তুলে দেন।
এরপর আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নেতা ফিলিপ শাইডেমান রাইখস্টাগ ভবনের একটি জানালা বা বারান্দা থেকে জার্মানিতে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বামপন্থী নেতা কার্ল লিবকনেখট আরও বিপ্লবী চরিত্রের একটি ‘ফ্রি সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক’ ঘোষণা করেন। এর ফলে স্পষ্ট হয়, রাজতন্ত্রের পতনের পর নতুন জার্মান রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়েও তীব্র রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।
কাইজার দ্বিতীয় ভিলহেল্ম তখন বুঝতে পারেন তাঁর অবস্থান আর টেকসই নয়। ১০ নভেম্বর তিনি নেদারল্যান্ডসে চলে যান, যেখানে পরবর্তীকালে নির্বাসিত জীবন কাটাবেন। ২৮ নভেম্বর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জার্মান সম্রাট ও প্রুশিয়ার রাজা হিসেবে সিংহাসন ত্যাগের নথিতে স্বাক্ষর করেন।
এভাবে ১৮৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত জার্মান সাম্রাজ্যের হোহেনৎসোলার্ন রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে।
কিন্তু রাজতন্ত্রের পতনের আগেই যুদ্ধবিরতির আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছিল। নভেম্বরের শুরুতে ম্যাথিয়াস এর্জবার্গারের নেতৃত্বে জার্মান প্রতিনিধিদল মিত্রশক্তির সঙ্গে আলোচনার জন্য ফ্রান্সে যায়। তাদের গন্তব্য ছিল কমপিয়েন অরণ্য, যেখানে একটি রেলওয়ে বগিতে মিত্রবাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ডার মার্শাল ফার্দিনান্দ ফশ অপেক্ষা করছিলেন।
৮ নভেম্বর জার্মান প্রতিনিধিরা ফশের সামনে উপস্থিত হয়। তারা আশা করেছিল শান্তি নিয়ে আলোচনা হবে, কিন্তু বাস্তবে তাদের সামনে একটি কঠোর যুদ্ধবিরতির শর্তপত্র তুলে ধরা হয়। জার্মান প্রতিনিধিদের দরকষাকষির সুযোগ খুব সীমিত ছিল।
শর্ত অনুযায়ী জার্মানিকে বেলজিয়াম, ফ্রান্স, লুক্সেমবার্গ এবং আলসাস-লোরেন থেকে দ্রুত সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে। রাইনের পশ্চিম তীর মিত্রবাহিনীর দখলে যাবে এবং পূর্ব তীরে নির্দিষ্ট নিরপেক্ষ অঞ্চল তৈরি হবে। বিপুলসংখ্যক কামান, মেশিনগান, বিমান, রেল ইঞ্জিন ও সামরিক যান হস্তান্তর করতে হবে।
জার্মান সাবমেরিনগুলো আত্মসমর্পণ করতে হবে এবং হাই সিজ ফ্লিটের প্রধান যুদ্ধজাহাজগুলোকে নিরস্ত্র ও আটক করার ব্যবস্থা করা হবে। পূর্ব ইউরোপে ব্রেস্ট-লিটভস্ক ও সংশ্লিষ্ট চুক্তির সুবিধাগুলোও কার্যত বাতিল হয়ে যায়।
একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল—মিত্র নৌ অবরোধ সঙ্গে সঙ্গে তুলে নেওয়া হয়নি। জার্মানির জন্য এটি ছিল গুরুতর উদ্বেগ, কারণ খাদ্যসংকট তখনও প্রবল। তবু জার্মান প্রতিনিধিদের কাছে বিকল্প খুব কম ছিল। সামরিক নেতৃত্ব নিজেই যুদ্ধবিরতি চাইছিল, দেশে বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ছিল এবং মিত্রবাহিনী পশ্চিমে অগ্রসর হচ্ছিল।
আলোচনার সময় জার্মান প্রতিনিধিরা বার্লিন থেকে খবর পায় যে কাইজারের পতন হয়েছে এবং নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। ফলে তারা শুধু পরাজিত সাম্রাজ্যের নয়, সদ্য জন্ম নেওয়া নতুন জার্মান রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিনিধিতেও পরিণত হয়।
১১ নভেম্বর ১৯১৮ ভোর প্রায় পাঁচটার দিকে কমপিয়েনের রেলওয়ে বগিতে যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হয়। শর্ত অনুযায়ী সেটি একই দিন সকাল ১১টায় কার্যকর হবে।
এই ছয় ঘণ্টার ব্যবধান প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক মুহূর্তগুলোর একটি। সবাই জানত যুদ্ধ শেষ হতে যাচ্ছে, তবু বহু সেক্টরে লড়াই চলতে থাকে। কিছু কমান্ডার নির্ধারিত সময়ের আগে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করতে চেয়েছিলেন; অন্য কোথাও যোগাযোগ পৌঁছাতে বিলম্ব হয়। ফলে শেষ কয়েক ঘণ্টাতেও সৈন্য নিহত ও আহত হয়েছে।
সকাল এগারোটায় পশ্চিম রণাঙ্গনের কামান অবশেষে থেমে যায়।
চার বছরেরও বেশি সময় ধরে যে ফ্রন্টে কামানের শব্দ, মেশিনগানের গুলি এবং বিস্ফোরণ ছিল প্রতিদিনের বাস্তবতা, সেখানে হঠাৎ অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে আসে। কোথাও সৈন্যরা উল্লাস করে, কোথাও অবিশ্বাসের সঙ্গে ট্রেঞ্চের বাইরে তাকিয়ে থাকে, আবার বহু মানুষের কাছে আনন্দের চেয়ে ক্লান্তি ও হারানো সহযোদ্ধাদের স্মৃতিই বেশি প্রবল ছিল।
১১ নভেম্বরের যুদ্ধবিরতি অবশ্য আইনি অর্থে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি ছিল না। এটি মূলত যুদ্ধ থামানোর সামরিক চুক্তি। জার্মানি ও মিত্রশক্তির মধ্যে আনুষ্ঠানিক শান্তির শর্ত পরে ১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তিতে নির্ধারিত হবে। তবু বাস্তবে ১১ নভেম্বরই পশ্চিম রণাঙ্গনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রধান যুদ্ধের সমাপ্তির দিন।
কেন্দ্রীয় শক্তির অন্যান্য সদস্য ইতিমধ্যে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। বুলগেরিয়া সেপ্টেম্বরের শেষে, অটোমান সাম্রাজ্য ৩০ অক্টোবর এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি নভেম্বরের শুরুতে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। ফলে জার্মানির যুদ্ধবিরতি পুরো কেন্দ্রীয় শক্তির সামরিক পরাজয়কে সম্পূর্ণ করে।
জার্মান বিপ্লবের গুরুত্ব এখানেই শেষ নয়। নতুন সরকারকে একই সঙ্গে তিনটি সংকট সামলাতে হয়েছিল—যুদ্ধ শেষ করা, রাজতন্ত্রের পরিবর্তে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আরও বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে মোকাবিলা করা। ডিসেম্বর ও ১৯১৯ সালের শুরুতে এই দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হবে এবং শেষ পর্যন্ত ভাইমার প্রজাতন্ত্রের জন্ম হবে।
কিন্তু যুদ্ধবিরতির পর জার্মান রাজনীতিতে একটি বিপজ্জনক মিথও জন্ম নিতে শুরু করে। সামরিক বাহিনী জার্মানির মূল ভূখণ্ডে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়নি এবং মিত্রশক্তি যুদ্ধবিরতির আগে বার্লিন দখল করেনি। ফলে পরবর্তী সময়ে জাতীয়তাবাদী ও ডানপন্থী গোষ্ঠী দাবি করতে থাকে যে সেনাবাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত হয়নি; বরং দেশের ভেতরের রাজনীতিবিদ, সমাজতন্ত্রী ও অন্যান্য গোষ্ঠীর বিশ্বাসঘাতকতায় পরাজয় এসেছে।
এই ধারণাই পরে ‘পেছন থেকে ছুরিকাঘাতের মিথ’ হিসেবে পরিচিত হয়। বাস্তবে ১৯১৮ সালের সেপ্টেম্বরেই জার্মান সামরিক নেতৃত্ব বুঝেছিল যে যুদ্ধ জেতা সম্ভব নয় এবং তারাই যুদ্ধবিরতির জন্য রাজনৈতিক সরকারকে চাপ দিয়েছিল। জার্মান বিপ্লব সামরিক সংকট সৃষ্টি করেনি; বরং সামরিক পরাজয় ও দীর্ঘ যুদ্ধের চাপই বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করেছিল।
জার্মানির পরাজয়ের কারণও একক ছিল না। ব্রিটিশ নৌ অবরোধ অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে, বসন্ত আক্রমণে অভিজ্ঞ সৈন্যদের বিপুল ক্ষয় হয়েছে, আমেরিকান জনশক্তি মিত্রশক্তির পক্ষে ভারসাম্য বদলেছে এবং শত দিনের অভিযানে জার্মান সেনাবাহিনী ক্রমাগত পিছিয়ে গেছে। একই সময়ে জার্মানির মিত্র রাষ্ট্রগুলো একের পর এক পতন করেছে।
সামরিক পরাজয়, অর্থনৈতিক ক্লান্তি এবং রাজনৈতিক বিপ্লব—এই তিনটি প্রক্রিয়া ১৯১৮ সালের শরতে একসঙ্গে মিলিত হয়েছিল। কোনোটিকে আলাদা করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ব্যাখ্যা করা যায় না।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার মানবিক মূল্য ছিল অকল্পনীয়। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সালের সংঘাতে সামরিক ও বেসামরিক মিলিয়ে কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটে এবং আরও বহু কোটি মানুষ আহত, বাস্তুচ্যুত বা রোগ ও ক্ষুধায় আক্রান্ত হয়। ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংস হয়ে যায়, সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে এবং ইউরোপ অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়।
আর শান্তিও সঙ্গে সঙ্গে স্থিতিশীল বিশ্ব সৃষ্টি করেনি। রাশিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলছে, মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে নতুন রাষ্ট্র ও সীমান্ত নিয়ে সংঘর্ষ শুরু হচ্ছে, অটোমান সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত এবং জার্মানিতে বিপ্লব ও রাজনৈতিক সহিংসতা অব্যাহত। ১১ নভেম্বর যুদ্ধের গোলাগুলি থামিয়েছিল, কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রাজনৈতিক বিস্ফোরণ তখনও শেষ হয়নি।
১৯১৮ সালের শুরুতে জার্মানি এখনও পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধ জয়ের জন্য বিশাল আক্রমণ চালাচ্ছিল। মাত্র কয়েক মাস পরে তার সেনাবাহিনী পশ্চাদপসরণ করছে, মিত্ররা একে একে আত্মসমর্পণ করছে, নাবিকেরা বিদ্রোহ করছে, রাজতন্ত্র ভেঙে পড়ছে এবং কাইজার নির্বাসনে চলে যাচ্ছেন।
৯ নভেম্বরের জার্মান বিপ্লব, কাইজারের পতন এবং ১১ নভেম্বর কমপিয়েনের যুদ্ধবিরতি তাই একই সংকটের তিনটি পরস্পরসংযুক্ত অধ্যায়। প্রথমটি দেখিয়েছিল জার্মান রাষ্ট্রের ভেতরের পুরোনো ব্যবস্থা আর যুদ্ধের চাপ সহ্য করতে পারছে না; দ্বিতীয়টি ১৮৭১ সালের সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক অবসান ঘটিয়েছিল; আর তৃতীয়টি পশ্চিম রণাঙ্গনের বন্দুকগুলোকে অবশেষে নীরব করেছিল। সকাল এগারোটায় গোলাবর্ষণ থেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধক্ষেত্রের অধ্যায় শেষ হয়—কিন্তু সেই যুদ্ধের শান্তিচুক্তি, সীমান্ত, ক্ষোভ ও অসমাপ্ত রাজনৈতিক হিসাবই পরবর্তী দুই দশকের ইউরোপকে আবারও আরেকটি আরও ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধের দিকে নিয়ে যাবে।
জঁ-জাক রুশোর সামাজিক চুক্তি: জনগণের সার্বভৌমত্ব, সাম্য ও স্বাধীনতা
মন্টেস্কু ও ভলতেয়ার: ক্ষমতার বিভাজন, ধর্মীয় সহনশীলতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
জন লক ও আধুনিক গণতন্ত্র: প্রাকৃতিক অধিকার, সামাজিক চুক্তি ও জনগণের সম্মতি
আলোকায়ন যুগের সূচনা: বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ও যুক্তিবাদে বদলে যাওয়া ইউরোপ
লিজে মাইটনার: পারমাণবিক বিভাজনে নোবেলবঞ্চিত বিজ্ঞানীর অবদান
রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন: ডিএনএর গঠন আবিষ্কারে তাঁর প্রকৃত অবদান